এক নজরে একটি জেলা: ইতিহাসের পাতা থেকে বাগেরহাট

ইউনেস্কো কর্তৃক ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মর্যাদা প্রাপ্ত বাগেরহাটে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা কিছু স্থাপনাও। বাগেরহাট নিয়ে আমার লেখা ‘বাগেরহাটের প্রকৃতি’ ইতিমধ্যে নিশ্চয় সবাই পড়ে ফেলেছেন! সেখানে সবাইকে অনুরোধ করেছিলাম বাগেরহাটের প্রাচীন মসজিদগুলো সম্পর্কে লেখাটা দেখে আসতে। সেটাও নিশ্চয় সবাই দেখে ফেলেছেন। তাই বাগেরহাটের বিখ্যাত বা সুপরিচিত মসজিদগুলো সম্পর্কে আমি আর লিখছি না।
এই লেখায় তুলে ধরা হয়েছে বাগেরহাটের এমন কিছু জায়গা সম্পর্কে, যার অস্তিত্ব বা তাৎপর্য না জানার দরুণ পর্যটকেরা প্রায়ই মিস করে থাকেন।

খান জাহান আলীর মাজার

খান জাহান আলীর মাজার, মসজিদ ও লেখক; Source: অমিতাভ অরণ্য

খান জাহান আলীর মাজার ভক্তদের মাঝে বেশ পরিচিত হলেও, পর্যটকদের কাছে এটি ততধিক পরিচিত নয়। হযরত খান জাহান আলী (র.) (জন্ম ১৩৬৯ ইং – মৃত্যু অক্টোবর ২৫, ১৪৫৯) ছিলেন একজন মুসলিম ধর্ম প্রচারক এবং বাগেরহাটের স্থানীয় শাসক। বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদের কাছেই রয়েছে তাঁর মাজার। এই মাজারের শিলালিপি অনুযায়ী তাঁকে উলুঘ খান, খান-ই-আজম ইত্যাদি নামেও অভিহিত করা হয়।
হযরত উলুখ খান জাহান আলীর জন্ম দিল্লিতে হলেও, ধারণা করা হয় তাঁর পূর্ব পুরুষ তুরস্কের অধিবাসী। তিনি মূলত বাংলা বিজয় করে এখানে ইসলাম প্রচার ও প্রসারের উদ্দেশ্য অনেক মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর নির্মিত মসজিদগুলোর মধ্যে ষাট গম্বুজ মসজিদ অন্যতম, যা এখনো টিকে আছে।
খান জাহান আলীর মাজারটি ঐতিহাসিক খাঞ্জালি দীঘির পাড়ে অবস্থিত। এখানে তাঁর সমাধিকে কেন্দ্র করে ২৫ ফুট উঁচু একটি সমাধিসৌধ রয়েছে, যার উপরে একটি গম্বুজ রয়েছে। প্রতি বছর চৈত্র মাসের পূর্ণিমার সময় এই মাজার প্রাঙ্গণে ওরস অনুষ্ঠিত হয় এবং এই সময় দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা প্রচুর লোকের সমাগম হয়।

খাঞ্জেলী দীঘি

খাঞ্জেলী দীঘি; Source: bagerhatnews.com

খাঞ্জেলী দীঘি হযরত খান জাহান আলী (রহঃ) মাজারের ঠিক দক্ষিণ দিকে অবস্থিত। একে কেউ কেউ ঠাকুর দীঘিও বলেন। এর আয়তন প্রায় ২০০ বিঘা। জানা যায়, এখানে হযরত খান জাহান আলী (রহঃ) কালাপাহাড় ও ধলাপাহাড় নামে দুইটি কুমির ছেড়েছিলেন। কুমির দুইটি পরবর্তীতে মারা যায়। এখন তার একটি ষাট গম্বুজ মসজিদের জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
বর্তমানে এখানে কিছু মিঠা পানির পুকুর রয়েছে। মাজার জিয়ারতের উদ্দেশ্যে আসা লোকেরা এই কুমিরগুলোকে হাঁস, মুরগি, ভেড়া, খাসিসহ নানা ধরনের মানতের পশু উৎসর্গ করেন।

জিন্দা পীরের মাজার

জিন্দা পীরের মাজার; Source: আদার ব্যাপারী

খাঞ্জেলী দীঘির পাড় ধরে কিছুদূর হাঁটলেই পৌঁছে যাবেন এক গম্বুজ বিশিষ্ট একটি মসজিদ প্রাঙ্গণে, যা জিন্দা পীরের মাজার নামে পরিচিত। জিন্দা পীর ছিলেন মূলত খান জাহান আলীর একজন অনুসারী।

বিবি বেগনি মসজিদ

বিবি বেগনি মসজিদটি ষাট গম্বুজ মসজিদ থেকে আনুমানিক ৮০০ মিটার পশ্চিমে ঘোড়া দীঘির পশ্চিম পাশে অবস্থিত। এছাড়াও চাইলে সহজে খুলনা-বাগেরহাট মহাসড়কের বারাকপুর বাজারের উত্তর দিকের পথ ধরেও এখানে যাওয়া যায়। মসজিদটির নামকরণের সঠিক কোনো তথ্য না পাওয়া গেলেও কেউ কেউ মনে করেন বিবি বেগনি ছিলেন খান জাহান আলীরই স্ত্রী।

সাবেকডাঙ্গা পুরাকীর্তি

সাবেকডাঙ্গা পুরাকীর্তি; Source: DW

সাবেকডাঙ্গা পুরাকীর্তিটি ষাট গম্বুজ মসজিদ থেকে ৬ কি: মিঃ দূরে কাড়াপাড়া ইউনিয়নের সাবেকডাঙ্গা গ্রামে অবস্থিত। স্থানীয়ভাবে একে অনেকে সাবেকডাঙ্গা মসজিদ বা সাবেকডাঙ্গা নামাজঘর বলে থাকে। এই মন্যুমেন্টটি ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকাভুক্ত।
সাবেকডাঙ্গা পুরাকীর্তিটি প্রাচীন চৌচালা রীতিতে তৈরি, যা এই রীতির একমাত্র নিদর্শন হিসেবে এখনো বেঁচে আছে। ধারণা করা হয়, খান জাহান আলীর মৃত্যুর কিছু পরেই এটি স্থাপিত। তবে লোকমুখে প্রচলিত আছে, এটি হযরত খান জাহান আলীর ইবাদতখানা।

বাংলাদেশ সেবাশ্রম গোড়ানালুয়া

বাংলাদেশ সেবাশ্রম গোড়ানালুয়া; Source: bagerhat.gov.bd

১০ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত এই সেবাশ্রমটি ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাতা হলেন শ্রীমৎ আচার্য বিবেকানন্দ গোস্বামী। তাঁর প্রতিষ্ঠিত আরো ৫৩টি আশ্রম রয়েছে, যার মধ্যে ৪৮টি বাংলাদেশে এবং ৫টি ভারতে অবস্থিত। এটি বাগেরহাট জেলার শিবপুর ইউনিয়নের গোড়ানালুয়া বাজারের পাশে অবস্থিত।
বাংলাদেশ সেবাশ্রম গোড়ানালুয়ায় রয়েছে শ্রীমৎ আচার্য  বিবেকানন্দ গোস্বামী এর সমাধি মন্দির, ময়ূর পঙ্খী খচিত সিংহাসন, একটি ঘাট বাঁধানো পুকুর ও পুরাতন ঘর, শ্রী শ্রী গোবিন্দ মন্দির, শ্রী কৃষ্ণের কালিয়া দমন এবং আকর্ষণীয় তুলসী বেদী । এখানে প্রতি বছর ফাল্গুন মাসে বড় পরিসরে দোল উৎসব পালন করা হয়। এ সময় ৩ দিন ব্যাপী নামযজ্ঞ, ধর্মীয় আলোচনা সভা, ভজনগীতি অনুষ্ঠান হয়। দেশ বিদেশের অগনিত ভক্তের আগমনে আশ্রম অঙ্গণ মুখর হয়ে ওঠে।

মঘিয়া রাজ বাড়ী এবং রাজ মন্দির

মঘিয়া রাজ মন্দিরের ভিতরের দৃশ্য; Source: bagerhat.gov.bd

মঘিয়া রাজ বাড়ি ও রাজ মন্দিরটি বাগেরহাটের মঘিয়া ইউনিয়নে অবস্থিত। মনে করা হয়, অনেক আগে এই গ্রামে মঘিয়া নামক এক রাজার শাসন প্রচলিত ছিল, আর তাঁর নাম অনুসারেই এই জায়গার নাম মঘিয়া।
মঘিয়া রাজবাড়ির পূর্ণ অস্তিত্ব পাওয়া না গেলেও, এখানে এর যে ধ্বংসাবশেষ রয়েছে তার খোঁজে অনেক মানুষের আগমন ঘটে এই গ্রামে। এছাড়াও এখানকার রাজ মন্দিরে এখনো পূজা-অর্চনা হয়। পূজার সময় কয়েক জেলার মানুষ এখানে পূজা দিতে আসেন।

চন্দ্রমহল ইকো পার্ক

চন্দ্র মহল; Source: অচিন্ত্য আসিফ

একটি অনন্য স্থাপনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে চন্দ্রমহল ইকো পার্ক। এখানে রয়েছে মুঘল স্থাপত্য রীতির অনুরূপ একটি মহল, যার চারপাশে জলাধার বেষ্টিত। মহলের ভেতরে প্রবেশ করার জন্য পানির নিচের সুড়ঙ্গ পথ ব্যবহার করতে হয়। এটি আসলে একটি জাদুঘর, যেখানে এর নির্মাতার সারা জীবনের সংগ্রহ রয়েছে।
মূলত সুন্দরবনে ঘুরতে আসা পর্যটকেরা ফেরার সময় এখান থেকে একটু ঢুঁ মেরে যান। তাছাড়া স্নিগ্ধ একটি বিকাল কাটাতেও আসেন অনেকেই।

কোদলা মঠ/ অযোধ্যা মঠ

কোদলা মঠ ও অমিতাভ অরণ্য; Source: অচিন্ত্য আসিফ

আনুমানিক ১৮.২৯ মিটার উচ্চতা বিশিষ্ট এই কোদলা মঠ আসলে একটি প্রাচীন হিন্দু মন্দির। এর বাইরের দেয়ালের অপূর্ব কারুকাজ সমৃদ্ধ অলঙ্করণ মানুষের নজর কাড়ে। শত বছর পূর্বে অনেক উন্নত মানের ইট ব্যবহার করে এটি নির্মাণ করা হয়েছিলো, যা এখনো সমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে।
কোদলা মঠে যেতে হলে, বাগেরহাট শহর থেকে আনুমানিক ১০ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে পুরাতন রূপসা-বাগেরহাট সড়কের যাত্রাপুর বাজার হতে প্রায় ৩ কিলোমিটার ভেতরে যেতে হয়। জায়গাটি বাগেরহাট সদর উপজেলার বারুইপাড়া ইউনিয়নের অযোধ্যা গ্রাম। প্রাচীন ভৈরব নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত এই অযোধ্যা মঠ বা কোদলা মঠে যাওয়ার সময় রাস্তার দুই পাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য আপনার প্রাণ জুড়াবে।
বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী মসজিদ ষাটগম্বুজ মসজিদ দেখতে যাওয়া পর্যটকদের অধিকাংশই সময় পেলে ঘুরে আসেন এখান থেকে। বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এই মঠটিকে কোদলা মঠ নামে লিখলেও, স্থানীয়ভাবে এটি অযোধ্যা মঠ নামেই বেশি পরিচত।

কিছু কথা:

উল্লিখিত স্থানসমূহ ছাড়াও বাগেরহাট জেলায় রয়েছে ঠাণ্ডা পীরের মসজিদ ও বাগেরহাট জাদুঘর। এছাড়াও সময় পেলে কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহর বাড়ি ও ইপিজেড থেকেও ঘুরে আসতে পারেন।
Feature Image: abashannews24.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিশ্ব বিখ্যাত ও জনপ্রিয় কয়েকটি প্রাচীরের গল্প

স্বরূপকাঠীর সন্ধ্যা নদীতে ও খালে বিলে ভ্রমণ