এক নজরে একটি জেলা: বাগেরহাটের প্রকৃতি

আমি যখন কোথাও বেড়াতে যাই, তখন আগে গুগল সার্চ করে দেখি যে সেই জেলায় কী কী দর্শনীয় স্থান আছে। কিছু কিছু জেলারটা সহজেই পেয়ে গেলেও, অধিকাংশ জেলার পর্যটন স্থানগুলো একটি আর্টিকেলে পাওয়া যায় না। হয়তো অনেকেই  আমার মতো এই রকম সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। সেই মানুষগুলো তথা ভ্রমণ পিপাসু ও জ্ঞান পিপাসুদের কথা চিন্তা করে আমি উদ্যোগ নিয়েছি জেলাভিত্তিকভাবে প্রতিটি জেলার দর্শনীয় স্থানগুলোর কিছু পরিচিতি ফিচার লিখবো। এই লেখাটি তারই প্রথম পর্ব। আসুন জেনে নিই বাগেরহাট জেলার দর্শনীয় স্থানগুলো।

মংলা বন্দর

মংলা বন্দর চ্যানেল; Source: samakal

বাগেরহাট জেলায় অবস্থিত মংলা বন্দর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্র বন্দর। এটি আলোচিত রামপাল উপজেলার কাছাকাছি অবস্থিত। খুলনা শহর থেকে এর দূরত্ব ৪৮ কিলোমিটার, যা বঙ্গোপসাগর থেকে প্রায় ১০০ কিঃমিঃ দূরত্বে অবস্থিত।
এটি একটি ছোট বন্দর হলেও এখানে সর্বোচ্চ দুই ডজন পর্যন্ত সমুদ্রগামী জাহাজ ভিড়তে দেখা যায়। প্রধানত এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার জাহাজগুলো এই বন্দরে নোঙর করলেও, পৃথিবীর প্রায় সব প্রধান সমুদ্র বন্দরের সাথেই এর বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। মংলা বন্দরের রাতের দৃশ্য মনোমুগ্ধকর।

দুবলার চর

দুবলার চর; Source: Sohozlink

আমরা সবাই কম-বেশি জানি যে, সুন্দরবন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ‘ম্যানগ্রোভ’ বন। আর এই গহীন অরণ্যের মাঝে রয়েছে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার উপযুক্ত একটি স্থান যার নাম দুবলার চর। এটি সুন্দরবনের ৪৫ এবং ৮ নম্বর কম্পার্টমেন্টে অবস্থিত।
ধু-ধু বালুকাময় দুবলার চরের সবুজ প্রান্তে দেখা মিলতে পারে চিত্রা হরিণের। কারণ চর সংলগ্ন বনে শত শত চিত্রা হরিণের অবাধ বিচরণ রয়েছে। আরো রয়েছে লাল বুক মাছরাঙ্গা ও মদনটাক পাখি। সবুজ বেষ্টনীর অন্য পাশে থাকা সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে হারিয়ে যেতে পারবেন প্রকৃতির এক ভিন্ন আয়োজনে।
দুবলার চরের আরেকটি অংশ; Source: crimebarta.com

দুবলার চর মূলত মৎস্য আহরণ ও শুঁটকি উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে যখন ইলিশ ধরার কাজ শেষ হয়, তখন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জেলেরা এসে এখানে সাময়িক বসতি গড়ে তোলে।
দুবলার চর আরো একটি কারণে বিখ্যাত আর তা হলো, রাস মেলা। ধারণা করা হয়, প্রায় দুই শতক ধরে এই মেলা হয়ে আসছে। হিন্দু ধর্মালম্বিদের এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়, প্রতি বছর কার্তিক মাসের শেষে বা অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম দিকের ভরা পূর্ণিমায়। এই সময় পাপ মোচন ও কল্যাণের লক্ষে লোকেরা পূর্ণিমার জোয়ারের নোনা পানিতে স্নান করে। বর্তমানে নানা ধর্ম ও বর্ণের মানুষের আগমনে এই মেলা জমজমাট হয়ে ওঠে।

কটকা সমুদ্র সৈকত

কটকার হরিণ; Source: Deshghuri.com

একটি রোমাঞ্চকর ভ্রমণের জন্য আপনাকে যেতে হবে কটকা সমুদ্র বন্দরে। কটকার জামতলা ওয়াচ টাওয়ার থেকে দেখা যায় সুন্দরবনের নানা প্রাণী। এখান থেকে হয়তো কখনো দেখতে পাবেন দল বেঁধে হরিণের ছোটাছুটি আবার হয়তো কখনো দেখতে পাবেন রাজকীয় কায়দায় হেঁটে চলা রয়েল বেঙ্গল টাইগার। এই মুহূর্তে আপনার মনে হবে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়তে থাকা পাখিদের সাথে উড়ে বেড়াতে আর পুরো সুন্দরবনের প্রাণী বৈচিত্র্য দেখতে।
কটকা থেকে একটু হেঁটে গেলেই রয়েছে জামতলা সমুদ্র সৈকত। ওদিকে হেঁটে যেতে যেতে দেখতে পাবেন সারি সারি জামগাছ, যা এর নামের সার্থকতা প্রকাশ করে।
কটকা সমুদ্র সৈকতেও একটি ওয়াচ টাওয়ার রয়েছে। এই ওয়াচ টাওয়ার থেকেও আপনি সুন্দরবনের রূপ দেখতে পাবেন।

কচিখালী সমুদ্র সৈকত

কচিখালী সমুদ্র সৈকত; Source: YouTube

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমির নাম কচিখালী সমুদ্র সৈকত। এটি সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জ এবং কটকা নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত হওয়ায়, সুন্দরবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্যটন স্থান এটি। প্রতিনিয়ত দেশের নানা এলাকা থেকে পর্যটকেরা দল বেঁধে ঘুরতে আসেন এখানে।
দেশের বাইরে থেকে আসা পর্যটকরা সুন্দরবনে এলে কটকা-কচিখালীকে অবশ্য দ্রষ্টব্যের তালিকায় রাখেন। কারণ এখানকার বন এবং সাগরের সৌন্দর্য আর যে কোনো পর্যটন কেন্দ্রের চেয়ে বেশি সুন্দর; এখানে গেলে সাগরে মিশে যাওয়া কটকা নদীর মোহনায় অবিরাম ডলফিন আর শুশুকের খেলা আপনাকে আনন্দে আত্মহারা করে তুলবে। এখানে মাঝেমধ্যে হয়তো ভেসে থাকা কুমিরের দেখাও মিলতে পারে।
ফুল-ফলে ছেয়ে থাকা চর সংলগ্ন বনে রয়েছে হাজার হাজার হরিণ, যা পর্যটকদের মনে রোমাঞ্চকর অনুভূতির সঞ্চার করে। এছাড়াও জেলেরা বলেন, এখানে নাকি বাঘও রয়েছে।
নানা ধরনের বন্য প্রাণী ও পাখির ঝাঁকের সাথে সাথে চোখ জুড়ায় নানা বৈশিষ্ট্যের কাঁকড়ার দেখায়। লালচে রঙের ছোট ছোট কাঁকড়ার ঝাঁকেরা মানুষ বা পশুদের পায়ের আওয়াজ পেলেই গর্তে ঢুকে যায়। বিভিন্ন প্রজাতির এই কাঁকড়ার চলার পথে তৈরি হয় বিভিন্ন রকম আলপনা, যা আপনার ভ্রমণে এনে দেবে শৈল্পিকতার গন্ধ।

সুন্দরবন

রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার; Source:Deshghuri.com

বিশ্বের প্রাকৃতিক বিস্ময়াবলীর অন্যতম একটি বন হলো সুন্দরবন। এই বন কোনো এক সময় ‘সমুদ্র বন’ বা ‘চন্দ্র বান্ধে’ নামে পরিচিত ছিলো। সুন্দরবন নামের পেছনে রয়েছে এখানকার সুন্দরী গাছের প্রাচুর্য। সুন্দরবনের প্রায় ৭০% জায়গা জুড়ে রয়েছে সুন্দরী গাছের অস্তিত্ব।
সুন্দরবন বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত একটি প্রশস্ত বনভূমি। বিশাল এই বনভূমি খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালি ও বরগুনা জেলা জুড়ে বিস্তৃত।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে এর খ্যাতি রয়েছে, যা কারো অজানা নয়। সুন্দরবনের পুরো অংশের আয়তন ১০,০০০ বর্গ কিলোমিটার। এর মধ্যে বাংলাদেশে রয়েছে ৬,০১৭ বর্গ কিলোমিটার, যা সুন্দরবনের সিংহভাগ।
সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন নদ-নদী। এছাড়াও মোট বনভূমির ৩১.১ শতাংশ এলাকা জুড়েই রয়েছে নদী-নালা, খাঁড়ি, বিল মিলিয়ে জনাকীর্ণ অঞ্চল।
এই বনভূমির সাথে সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে আছে বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের নাম। এছাড়াও এখানে রয়েছে নানান ধরনের পাখি, চিত্রা হরিণ, কুমির ও সাপসহ অসংখ্য প্রজাতির প্রাণী। বর্তমানে এখানে আনুমানিক প্রায় ২০০-৩০০টি বাঘ ও ৩০,০০০টি চিত্রা হরিণ রয়েছে।

হাড়বাড়িয়া ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র

সরকারী উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে এই হাড়বাড়িয়া ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র। একদিনে সুন্দরবন দেখার ইচ্ছা থাকলে ঘুরে আসতে পারেন এখান থেকে।

কিছু কথা:

আসলে বাগেরহাট এমনই একটি জায়গা, যেখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেমন রয়েছে ঠিক তেমনই রয়েছে ঐতিহাসিক স্থাপনাও। তাই যদি একটি ফিচারেই এখানকার দর্শনীয় স্থানগুলো তুলে ধরি, তবে তা সংক্ষিপ্ত যেমন হবে তেমনই হবে অবিচারও।
আজকের এই আর্টিকেলে শুধুমাত্র বাগেরহাটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনা দিলাম। আগামী পর্বে ঐতিহাসিক স্থাপনা ও অন্যান্য কিছু নিয়ে আলোচনা করা হবে। তাঁর আগে জেনে নিতে পারেন মসজিদের শহর বাগেরহাটের ঐতিহাসিক মসজিদগুলো সম্পর্কে। বাগেরহাট জেলায় ছড়িয়ে থাকা প্রাচীন মসজিদের পাতাগুলো ছুঁয়ে দেখা  লিখেছেন: সুরাইয়া হেনা
আসছে:

প্রাচীন স্থাপত্যের নগরী বাগেরহাট; Source: abashannews24.com

১. ষাট গম্বুজ মসজিদ ২. হযরত খানজাহান আলী (র:) ও তাঁর মাজার ৩. খাঞ্জেলী দীঘি ৪. চন্দ্র মহল ৫. ইকো পার্ক ৬. বাগেরহাট জাদুঘর ৭. খান জাহান আলী সেতু ৮. অযোধ্যা মঠ/কোদলা মঠ ৯. রেজা খোদা মসজিদ ১০. জিন্দা পীর মসজিদ ১১. ঠাণ্ডা পীর মসজিদ ১২. সিংগাইর মসজিদ ১৩. বিবি বেগুনি মসজিদ ১৪. চুনাখোলা মসজিদ ১৫. নয় গম্বুজ মসজিদ ১৬. রণবিজয়পুর মসজিদ ১৭. দশ গম্বুজ মসজিদ ১৮. খাঞ্জেলী দীঘি ১৯. সাবেকডাঙ্গা পুরাকীর্তি ২০. হারবাড়িয়া  ২১. কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর বাড়ি, ২২. ইপিজেড, ২৩. বাংলাদেশ সেবাশ্রম গোড়ানালুয়া (চিতলমারি), ২৪. মঘিয়া রাজ বাড়ী (কচুয়া)
Feature Image: আদার ব্যাপারী

Loading...

2 Comments

Leave a Reply
  1. ভাই ,,,,,মংলা বন্দর রামপাল উপজেলায় এ কথা আপনাকে কে বলেছে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মস্কো ক্রেমলিন: রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন (ভিডিও)

চুনখোলা মসজিদের মায়ায় একদিন বাগেরহাটে