এক নজরে একটি জেলা: পাবনার জমিদার বাড়িসমূহ

ফরিদপুর রাজবাড়ি/বনওয়ারী নগর

আমরা অনেকে অনেক জায়গায় ভ্রমণ করি; হয়তো কোনো কোনো জায়গা ব্যতিক্রম মনে হয় বা কোনো স্থানের সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ হয়ে প্রেমেও পড়ে যাই, কিন্তু সেই জায়গায় কি ঘাঁটি স্থাপনের ইচ্ছা পোষণ করি? তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে থেকে যেতে ইচ্ছে হলেও, তা আর বাস্তবে রূপ পায় না। তবে এমন মানুষ যে এক সময় ছিল তার দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা যায়, জমিদার বনওয়ারী লাল রায়ের নাম।

জমিদার বাড়ির পাশে নব নির্মিত ভবন; Source: protibhanews

প্রচলিত আছে জমিদার বনওয়ারী লাল রায় একদিন বড়াল নদীর উপর দিয়ে পাবনা সদরে খাজনা দিতে যাচ্ছিলেন। এসময় তিনি নদীর তীরে একটি ছায়া সুনিবিড় পরিবেশে যাত্রা বিরতি করেন। এই জায়গাটিই এখন বনওয়ারী নগর নামে পরিচিত।

বনওয়ারী লাল রায় যখন সেখানে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, তখন তিনি একটি অদ্ভুত দৃশ্য দেখে চমকে যান। তিনি দেখেন, ব্যাঙ সাপকে ভক্ষণ করছে। এতে তিনি জায়গাটিকে ব্যতিক্রমধর্মী মনে করতে শুরু করেন। কারণ আমরা জানি, হিন্দুধর্ম অনুসারে সাপকে মনসাদেবীর প্রতিমূর্তি মনে করা হয়। এসময় তিনি এখানে নিজের নামে একটি নগর প্রতিষ্ঠা করেন এবং দীঘি বেষ্টিত একটি রাজবাড়ি নির্মাণ করেন। এই রাজবাড়িটি এখনো কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে।

দিঘী বেষ্টিত ফরিদপুর রাজবাড়ি;Source: protibhanews

এছাড়া ঐতিহাসিকদের মতে, বনওয়ারী লাল রায় মূলত নদী বেষ্টিত এই জায়গাটির ছায়া সুনিবিড় আম্র কাননের সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ হয়েই এমন সব কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন।

বর্তমানে এখানে জমিদারদের রাজস্ব অফিস, বাসভবন, জেলখানা, হাওয়া খানা ও দীঘির পানির মধ্যে নির্মিত অভিজাত গোসলখানা রয়েছে। উল্লেখিত ভবনগুলো এখন সরকারি অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

তাড়াশ ভবন

তাড়াশ ভবন; Source: protibhanews

তাড়াশ ভবনটি গ্রিক স্থাপত্য শৈলীর অন্যতম একটি রীতি ডোরিক অর্ডারে নির্মিত হয়েছিল। এর বিশেষত্ব প্রবেশ তোরণে। বাংলাদেশে এই ধরনের প্রবেশ তোরণ দূর্লভ। এতে ৮টি থামের মাঝে অর্ধ বৃত্তাকার খিলান পথ রয়েছে, যা সে সময়ের অর্থ প্রতিপত্তির প্রকাশ ঘটায়।

তাড়াশ ভবনের নির্মাতা ছিলেন বনওয়ারী নগরের প্রতিষ্ঠাতা বনওয়ারী লাল রায়। বর্তমানে এই ভবনটি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত ইমারতের আওতাভুক্ত রয়েছে।

বনওয়ারী লাল রায়ের মৃত্যুর পর তাঁর দত্তক পুত্র বনমালী রায় তাড়াশের জমিদারী গ্রহণ করেন। একটি মজার বিষয় হলো, তাড়াশের জমিদাররা দত্তক পুত্রের কর্মের জন্য আজও স্মরণীয় হয়ে আছেন। বনমালী রায় তাঁর স্বীয় দক্ষতার জন্য ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ‘রায় বাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত হন। এই একই উপাধি তাঁর পিতা বনওয়ারী রায়ও পেয়েছিলেন। বলা হয়, পাবনার জমিদারদের মধ্যে বনমালী রায়ই শ্রেষ্ঠ জমিদার ছিলেন।

ক্ষেতুপাড়া জমিদার বাড়ি

ক্ষেতুপাড়া জমিদার বাড়ি; Source: pabna.gov.bd

সাথিয়া উপজেলার ক্ষেতুপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে রয়েছে ক্ষেতুপাড়া জমিদার বাড়ি। জনশ্রুতি রয়েছে, প্রায় ৩০০ বছর আগে ভারত থেকে নব কুমার নামে এক জমিদার এসে এই বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন এবং এখানে তিনি ১৫৪টি তৌজ নিয়ে তাঁর জমিদারি পরিচালনা করতেন।

এভাবেই কেটে যায় তিন পুরুষ অবধি। এক সময় নব কুমারের বংশধর দীপক কুমার রায় এই জমিদার বাড়িটি বিক্রি করে দেন এবং তা চলে যায় শাহজাদপুরের সন্ধ্যা রানীর মালিকানায়। বর্তমানে এখানে সন্ধ্যা রানী ও তাঁর পরিবার বসবাস করছে।

আজিম চৌধুরীর জমিদার বাড়ি

আজিম চৌধুরীর জমিদার বাড়ি ;Source: Fair News Service

আজিম চৌধুরীর জমিদার বাড়ি, যা স্থানীয়ভাবে চৌধুরী বাড়ি নামে পরিচিত। লোক মুখে প্রচলিত আছে আজিম চৌধুরী ছিলেন এই অঞ্চলের একজন দক্ষ এবং প্রজ্ঞাবান জমিদার। তাঁর আমলে অনেক কঠোর শাসন ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল বটে, কিন্তু তিনি অসহায় মানুষের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করতেন। এছাড়া তিনি হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে কোনো বিভেদ করতেন না। এমনকি তিনি মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও হিন্দুদের পূজা পার্বণে জাকজমকপূর্ণ উৎসবের আয়োজন করতেন। এসব কারণে তিনি আজও স্মরণীয় হয়ে আছেন।

আজিম চৌধুরী জমিদার বাড়িটি সুজানগর উপজেলার দুলাই গ্রামে অবস্থিত। বাড়িটির নাম আজিম চৌধুরীর নামে হলেও, মূলত এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তাঁর পিতা রহিমুদ্দি চৌধুরী। তিনিই এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা।

জানা যায়, আজিম চৌধুরী যখন এই জমিদার বাড়ির জমিদারি পান মূলত তখনই এর বিস্তার ঘটে। তিনি তাঁর অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়ে দুলাই গ্রামে দুইটি নীল কুঠি স্থাপন করেন এবং তার পর পরই দিকে দিকে তাঁর জয়গান শোনা যায়।

আজিম চৌধুরী জমিদার বাড়িটি একটি দ্বিতলবিশিষ্ট প্রাসাদ। এর অভ্যন্তরে একটি পুকুর সহ বাইরের দিকে একটি পুকুর ও বড় দীঘি রয়েছে।

শীতলাই জমিদার বাড়ি

শিতলাই জমিদার বাড়ি; Source: Poriborton

শীতলাই জমিদার বাড়িটি পাবনা জেলার চাটমোহর থানার নিমাইচড়া ইউনিয়নের শীতলাই গ্রামে অবস্থিত। এই জমিদার বাড়ির জমিদার যোগেন্দ্রনাথ মৈত্রেয় ১৯ শতকের প্রথম দিকে পাবনার রাঘবপুরে ১৫ একর জায়গা জুড়ে সুউচ্চ প্রাচীর বেষ্টিত একটি প্রাসাদ নির্মাণ করেন। প্রাসাদটির নাম হয় ‘শীতলাই হাউজ’। বর্তমানে এটি EDRUC নামক একটি ড্রাগ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের ল্যাবরেটরি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

‘শীতলাই হাউজ’ নামক এই দ্বিতল প্রাসাদটি ইন্দো-ইউরোপিয়ান বা উপনিবেশিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত হয়েছে। পুরো ভবনে মোট ৩০টি কক্ষ রয়েছে। এত ভালো অবস্থা ও বিশালাকায় জমিদার বাড়ির সংখ্যা বাংলাদেশে হাতেগোনা কয়েকটি আছে।

শীতলাই জমিদার পরিবার মূলত সিরাজগঞ্জ জেলার শরৎনগর এলাকার জমিদার ছিলেন। নাটোরের রানী ভবানীর শাসনকালে প্রচুর করমুক্ত ‘দেবোত্তর’ সম্পত্তি লাভ করে চাঁদিপ্রসাদ মৈত্রেয় শীতলাই জমিদার বাড়ির সূত্রপাত করেন।

শিতলাই জমিদার বাড়ি; Source: Poriborton

চাঁদিপ্রসাদ মৈত্রেয়ের পুত্র ছিলেন জগন্নাথ মৈত্রেয়, যিনি শীতলাই জমিদারি বংশের দ্বিতীয় পুরুষ। তার দুই পুত্র এবং এক কন্যা ছিল। বড় সন্তানের নাম ছিল লোকনাথ (রাজশাহীর সুখ্যাত দানবীর, ১৮৪৯ সালে রাজশাহীর লোকনাথ স্কুল তারই প্রতিষ্ঠিত)।

লোকনাথ জমিদারি ছেড়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। সেখান থেকে তিনি অনেক অর্থ সম্পদ অর্জন করেছিলেন। এছাড়া তিনি ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ‘রায় বাহাদুর’ উপাধিতেও ভূষিত হয়েছিলেন। এত অর্থ প্রতিপত্তির মালিক হয়েও তিনি কোনো উত্তরসূরি রেখে যেতে পারেননি।

লোকনাথের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী দুর্গা সুন্দরী চন্দ্রনাথ মৈত্রেয়কে দত্তক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। চন্দ্রনাথ মৈত্রেয়ও নিঃসন্তান ছিলেন। তাই সংসার জীবনে তিনি যোগেন্দ্রনাথ মৈত্রেয়কে দত্তক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। আর এই যোগেন্দ্রনাথ মৈত্রেয়ই সপরিবারে স্থানান্তরিত হওয়ার উদ্দেশ্যে শীতলাই প্রাসাদটি নির্মাণ করেছিলেন।

Feature Image: protibhanews

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লাকমাছড়ার শীতল জলধারার স্নিগ্ধ পরশ

ট্রেকারদের স্বর্গ রুট সান্দাকফু থেকে ফালুটের পথে