এক নজরে একটি জেলা: প্রকৃতির মায়ায় সাতক্ষীরা

একবার সাতজন জ্ঞানী মনীষী দেশভ্রমণে বেরিয়েছিলেন। নানা জায়গা ঘুরতে ঘুরতে তারা এলেন এক সমুদ্র, নদী-নালা আর সবুজ বনে ঘেরা এলাকায়। অসাধারণ সৌন্দর্যময় সেই স্থানে ঘুরতে ঘুরতে তাদের খিদে পেয়ে গেল। তারা তখন সেই স্থানে ক্ষীর রান্না করে নিজেদের খিদে মেটালেন। সাতজন জ্ঞানী ব্যক্তি সেখানে ক্ষীর খেয়েছিলেন বলে সেখান থেকে জায়গাটির নাম হয়ে গেল সাতক্ষীরা।

ঠিক ধরেছেন। সাতক্ষীরা জেলার নামের পেছনে রয়েছে এমনই মজার লোককথা। অবশ্য আধুনিক ঐতিহাসিকেরা যে গল্পটি বলে থাকেন, সেটা একটু অন্যরকম।  

তখন ইংরেজ আমল। সবে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু হয়েছে। এমন সময় নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের এক কর্মচারী বিষুরাম চক্রবর্তী নিলামে চূড়ন পরগনা ক্রয় করলেন। সেই পরগণার একটি জায়গা তার খুব পছন্দ হলো। তিনি সেই জায়গায় বাড়ি তৈরি করেন। জায়গাটির নাম ছিল সাতঘরিয়া। বিষুরাম চক্রবর্তীর ছেলে প্রাণনাথ চক্রবর্তী সাতঘরিয়া অঞ্চলে ব্যাপক উন্নয়ন করেন। ১৮৬১ সালে ইংরেজ শাসকেরা মহকুমা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন। এসময় তারা তাদের পরিচিত সাতঘরিয়াতেই প্রধান কার্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন। এই  সাতঘরিয়াই ইংরেজ রাজকর্মচারীদের মুখে ‘সাতক্ষীরা’ হয়ে যায়।

বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের একটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত জেলা যার পথে প্রান্তরে ছড়িয়ে আছে হাজারো ইতিহাস। সাতক্ষীরা জেলার উত্তরে যশোর জেলা, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে খুলনা জেলা এবং পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য অবস্থিত। সুন্দরবনের একটি বড় অংশ এই জেলার এক তৃতীয়াংশ জায়গা জুড়ে অবস্থিত। চলুন আজ জেনে আসা যাক এই অসাধারণ জেলার উল্লেখযোগ্য ভ্রমণ স্থলগুলো সম্পর্কে।

আজকের পর্বে আমরা প্রাকৃতিক দর্শনীয় জায়গাগুলো সম্পর্কে জানবো। দ্বিতীয় পর্বে থাকবে ঐতিহাসিক জায়গাগুলোর বর্ণনা।

সুন্দরবন

দুই পাশে সুন্দরবন; Source: অমিতাভ অরণ্য

সাতক্ষীরার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসবে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের কথা। সুন্দরবনের মোট আয়তন ১০,০০০ বর্গ কিলোমিটার। এর মধ্যে সাতক্ষীরা জেলার মধ্যে পড়েছে ১,৪৪৫.১৮ বর্গ কিলোমিটার।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এই ম্যানগ্রোভ জঙ্গলের গভীর ঝোপের ফাঁকে ভয়াল সৌন্দর্য নিয়ে অপেক্ষা করে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, নদীর তীরে খেলা করে চিত্রল হরিণ, কাদার মাঝে গড়াগড়ি করে বুনো শুয়োর, গাছের ফাঁকে লম্ফঝম্প করে দুষ্টু বাঁদরেরা, আর নদীর জলে নাক ডুবিয়ে শ্বাস নেয় নোনা পানির কুমির। সেই সাথে আপনার মন কেড়ে নেবে গাঙ্গেয় শুশুক বা ডলফিন।

বানর; Source: অমিতাভ অরণ্য

সুন্দরবনের এই শ্বাসরুদ্ধকর সৌন্দর্য অবলোকন করতে প্রতিবছর এখানে পাড়ি জমায় দেশ বিদেশের হাজার হাজার পর্যটক। শীতকাল সুন্দরবনে যাওয়ার শ্রেষ্ঠ সময়। এ সময় ঢাকা কিংবা খুলনা থেকে বিভিন্ন ভ্রমণ কোম্পানি নানান রকম প্যাকেজ ট্যুরের আয়োজন করে ভ্রমণ পিপাসীদের জন্য।

তবে সুন্দরবনের আদিম রুক্ষ আর মোহময় রূপ দেখতে চাইলে আপনাকে স্থানীয়ভাবে ভ্রমণের আয়োজন করতে হবে। মনে রাখবেন, সাতক্ষীরার মানুষজনের একটি দিক থেকে খুব সুনাম আছে। তাদের ব্যবহার অত্যধিক রকম ভালো হয়।

সুন্দরবনে আপনি ব্যক্তিগত ট্যুর দিলে সাতক্ষীরার নিচের হোটেলগুলোতে থাকতে পারবেন-

হোটেল সীমান্ত- মোঃ মুজিবর রহমান, ফোন: ০১৮১৬২৭৫৭৬২

হোটেল সম্রাট প্লাজা- মোঃ বশীর আহমেদ, ফোন: ০১৭৬৮৯৬৪৯৭১

সংগ্রাম আবাসিক হোটেল- মোঃ বশীর আহমেদ, ফোন: ০১৭১২৯২৯৪৯৫, ০৪৭১-৬৩৫৫১

হোটেল মোজাফফার গার্ডেন এন্ড রিসোর্ট- কে এম খায়রুল মোজাফফার (মন্টু), ফোন: ০১৭১৯৭৬৯০০৯

হোটেল হাসান- মোঃ আব্দুল বারি, ফোন: ০১৭৪০৬৫০৫০২

এছাড়া খুলনা থেকেও যেতে পারবেন। 

মান্দারবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত

মান্দারবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত; Source: আদার ব্যাপারী

যারা কক্সবাজার কিংবা কুয়াকাটার ব্যস্ত জনবহুল সমুদ্র সৈকত দেখে দেখে ক্লান্ত তাদের জন্য খোঁজ দিচ্ছি এমন একটি সমুদ্র সৈকতের যেখানে আপনি একান্ত নিরিবিলিতে উপভোগ করতে পারবেন সাগরের বিশালতা, অস্তগামী সূর্যের মহত্ত্ব আর নিবিড় অরণ্যের নিস্তব্ধতা। এই সৈকতটির নাম মান্দারবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত। সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর থানায় বঙ্গোপসাগরের তীরভূমি জুড়ে ৮ কিলোমিটার লম্বা এই নয়নাভিরাম সৈকতটি এখনো অনেকটা আলগোছে মানুষের চোখের আড়ালে পড়ে রয়েছে। এই সমুদ্রসৈকত আপনাকে যতটা না মুগ্ধ করবে তার চেয়ে বেশি মুগ্ধ করবে সেখানে পৌঁছানোর পথ।

সাতক্ষীরা জেলার বুড়ি গোয়ালিনীর অন্তর্গত নীলডুমুর নৌঘাট থেকে যেতে হয় এখানে। নীলডুমুর ঘাট থেকে খোলপেটুয়া- কপোতাক্ষ নদের সঙ্গমস্থলের পাশ কাটিয়ে কলাগাছিয়া, আড়পাঙ্গাশিয়া, মালঞ্চ নদী তারপর আপনি পৌঁছাবেন মান্দারবাড়িয়া সমুদ্র সৈকতে। পথের আনুমানিক দূরত্ব ৭৫ কিলোমিটার। আর এই পথের সবটুকুই সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে।

মান্দারবাড়ি সমুদ্র সৈকত; Source: আদার ব্যাপারী

বিভিন্ন নদীর বুক চিরে দু’পাশে গভীর বিস্তীর্ণ বনভূমিকে ফেলে আপনি এগিয়ে যাবেন এক নৈসর্গিক সৌন্দর্যের দিকে। আপনি হয়তো কক্সবাজার, টেকনাফ, কুয়াকাটা, উখিয়া, ইনানী, সেন্টমার্টিন সহ দেশ-বিদেশের যত সৈকত দেখে থাকুন না কেন, এখানে এসে পাবেন সম্পূর্ণ অন্যরকম অনুভূতি। সামনে দিগন্ত বিস্তৃত সমুদ্রের মাঝে মন হারিয়ে যেতে যেতে এক পলক পেছনে তাকাতে হবে আপনাকে- এই রে! পেছন থেকে বাঘ মামা এসে ঘাড় মটকাবে না তো?

আপনি এখানে থাকতে চাইলে বেশ কিছু হোটেল রয়েছে শ্যামনগরে।

বরষা রিসোর্ট- এ, কে, এম, আনিছুর রহমান, ফোন: ০১৭১৫২৫১৯৬৩

গোপালপুর পিকনিক কর্নার- জনাব শেখ মোকসেদ আলী, ফোন: ০১৭৫৪৬৫০৯৩২

সুন্দরবন হোটেল- জনাব ডাঃ শাহাজান, ফোন: ০১৭১০১২৬৬২৪

জেলা পরিষদ ডাকবাংলো, শ্যামনগর বাসষ্ট্যান্ড বাজার, শ্যামনগর, সাতক্ষীরা।  

জেলা পরিষদ ডাকবাংলো, বুড়ি গোয়ালিনী (নীলডুমুর), শ্যামনগর, সাতক্ষীরা। 

বনবিবির বটগাছ

বনবিবির বট গাছ; Source: 
barciknews.com

সাতক্ষীরার দেবহাটার টাউন শ্রীপুরে তিন-চার বিঘা জায়গা জুড়ে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী বনবিবির বটতলা। এত বড় বটগাছ খুব কমই দেখা যায়। অজস্র ঝুরি মাটিতে নেমে এসে প্রকাণ্ড কাণ্ডের রূপ নিয়েছে। সম্পূর্ণ জায়গা জুড়ে তাদের আধিক্যে কেমন আবছায়া হয়ে থাকে জায়গাটি। কত পুরনো এই বটগাছ? কেউ ঠিক করে বলতে পারে না।

কেউ বলে দু’শো বছরের পুরনো! কেউ বলেন আরো পুরনো। স্থানীয় মানুষের কাছে এই বটগাছের পরিচিত বনবিবির বটগাছ নামে। সুন্দরবন এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় একজন লৌকিক দেবী হিসেবে এই বনবিবি পূজিত হন।

এখানে প্রতি বছর পহেলা মাঘ মেলা বসে। এর একটু দূর দিয়েই বয়ে গেছে ইছামতী নদী। নদীর এপারে বাংলাদেশ আর ওপারে ভারত। কাছাকাছি একটি কৃত্রিম বনায়নেরও সৃষ্টি করা হয়েছে। আপনার হাতে সময় থাকলে এখানে আসতে একদমই ভুল করবেন না।

সামনের পর্বে থাকছেঃ ১। প্রবাজপুর শাহী মসজিদ, ২। তেতুলিয়া জামে মসজিদ, ৩। ইশ্বরীপুর হাম্মামখানা, ৪। জাহাজ ঘাটা হাম্মামখানা ও তৎসংলগ্ন প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ, ৫। ঝুঁড়িঝাড়া ঢিবি, ৬। দরবার স্তম্ভ, ৭। গোবিন্দ দেবের মন্দির ঢিবি, ৮। যীশুর গির্জা (শ্যামনগর), ৯। যশোরেশ্বরী মন্দির, ১০। শ্যাম সুন্দর মন্দির, ১১। কোঠাবাড়ির থান, ১২। ছয়ঘরিয়া জোড়াশিব মন্দির, ১৩। অন্নপূর্ণা মন্দির, ১৪। দ্বাদশ শিব মন্দির, ১৫। জমিদার বাড়ি জামে মসজিদ

Feature Image: আদার ব্যপারী

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এক নজরে একটি জেলা: সাগর পাড়ের চট্টগ্রাম (কয়েকটি সমুদ্র সৈকত)

রায়-চৌধুরি পরিবারের রামগোপালপুর জমিদার বাড়ি ও মন্দির