ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মর্তুজার বাড়ির পাশে কয়েক বছর

আসলে এটাকে ভ্রমণ কাহিনী বললে কতটুকু যুক্তিসঙ্গত হবে জানি না। কারণ আমি আজ লিখতে বসেছি আমার প্রাণের জেলা নড়াইলের মাশরাফি বিন মর্তুজার বাড়ি নিয়ে, যেখানে আমি অনেকবারই গিয়েছি।

যেহেতু এলাকাটি আমার চিরচেনা, তাই শুধু মাশরাফির বাড়ি নয়; লিখছি তাঁর শৈশব থেকে শুরু করে কৈশোরের খেলার মাঠ সম্পর্কেও।

আসলে সত্যি বলতে, আমার বাড়ি নড়াইলে হওয়া সত্ত্বেও প্রথমবার মাশরাফির বাড়িতে গিয়েছিলাম ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার পর। আমি তখন নড়াইল মূল শহরে থাকি। অনেক আগ্রহ নিয়ে গিয়েছিলাম মাশরাফির বাড়ি দেখতে। ভেবেছিলাম, সবাই দেখতে যায় যেহেতু, নিশ্চয় এ কোনো আলাদা চিজ। তাই এটা যে বাড়িই হবে তা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম।

গ্রামের বাড়িতে মাছ ধরছেন মাশরাফি বিন মর্তুজা; Source: MTnews24.com

বয়েজ স্কুলের পেছনে গিয়ে এক বন্ধু আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো, ঐ যে মাশরাফির বাড়ি। আমি ভ্রু কুচকে খুঁজতে লাগলাম, কই? সে যেদিকে দেখাচ্ছে তা একটি সাধারণ এক তলা বাড়ি। ভাবতেই অবাক লাগে, মাশরাফির মতো একজন খেলোয়াড়ের বসত বাড়ি এমন সাধারণ!

শুনেছি বলিউডের হিরোরা অনেক সুন্দর সুন্দর বাড়িতে থাকে। মাশরাফি তাঁদের চেয়ে কম কীসে? বন্ধু নিশ্চিত করে জানালো, এটাই মাশরাফি ভাইয়ের বাড়ি। তাতেও আমার সংশয় কাটে না। রাস্তার একজন মানুষের কাছে জিজ্ঞেস করতেই তিনিও সে দিকেই আঙুল ঘোরালেন।

কী আর করার, বিশ্বাস করে নিলাম। তবে সেদিন অনেক আশাহত হলাম। এরপর থেকে আমি নড়াইলেই আছি। প্রায় প্রতিদিন বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে ঘুরে আসি মাশরাফির বাড়ির এলাকা থেকে। মাশরাফির বাড়ির সামনের খেলার মাঠে বসে কিছুক্ষণ খেলা দেখি, সময় কাটাই। শুনেছি এই মাঠেই নাকি মাশরাফি ব্যাট ধরা শিখেছেন। হয়তো প্রথমবার বল ছুঁয়ে দেখেছেনও এই মাঠেই।

মাশরাফির বাড়ির সামনের মাঠ; Source: অচিন্ত্য আসিফ

অনেক দিন পর হঠাৎ একদিন চোখে পড়ে, মাশরাফির বাড়ি ভাঙার কাজ চলছে। আমি বেশ অবাক হলাম, মাশরাফির বাড়ি ভেঙে ফেলছে! পরে জানতে পারলাম, পুরাতন বাড়িটি ভেঙে এখানেই একটা নতুন বাড়ি করা হবে। শুনে বেশ ভালো লাগল এই ভেবে যে, অনেক দিন পর হয়তো এবার মাশরাফি বলিউডের হিরোদের মতো বাড়ি করবে।

দিন যায়, বাড়ির কাজ চলতে থাকে। আমিও মাঝে মাঝে ওদিকে ঘুরতে যাই। একসময় বাড়ির পুরো কাঠামো নির্মাণ হয়ে যায়। আমি তখনও বেশ আশাহত হলাম, এটা নিশ্চয় বলিউডের হিরোদের মতো হবে না!

মাশরাফির বাড়ির সামনে আমরা; Source: হৃদয়

এরপর বিভিন্ন কাজে আটকা পড়ে অনেক দিন ওদিকে যাওয়া পড়েনি। এক দিন আবার গেলাম আর দেখতে পেলাম একটা বিলাসবহুল বাড়ি, কিন্তু অতটা সুন্দর নয়। মাশরাফির বাড়ি যেমন হওয়া উচিৎ তেমন নয়।

এক দিন শুনলাম মাশরাফি ভাই বাড়ি এসেছে, কিন্তু আমি অতটা আগ্রহ দেখালাম না। কারণ এত দিন তাঁর বাড়ির সামনে ঘুরতে ঘুরতে সেই আবেগ আর নেই। এক ছোটভাই এসে বেশ জোর করেই বলল, চল ঘুরে আসি। আমি মাশরাফি ভাইয়ের সাথে একটা সেলফি তুলব।

মাশরাফি বিন মর্তুজার বাড়ির সামনে আমি; Source: হৃদয়

আমরা রওনা হলাম। প্রথমে গেলাম মাশরাফির বাড়িতে, সেখানে তিনি নেই। বাড়ির লোকের কাছে জিজ্ঞেস করতেই জানলাম সে তাঁর মামার বাড়িতে; গেলাম মামার বাড়িতে। সেখানেও ভাই নেই, কিন্তু আমাদের মতো অনেক মানুষ বসে বসে অপেক্ষা করছে। আমরাও অপেক্ষা করতে লাগলাম।

বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো, তারপর মাশরাফি ভাই এলো। তিনি আসতেই মানুষের ঠেলা-ঠেলি লেগে গেল। আমি কী করব ভেবে পাচ্ছিলাম না। এমন সময় দেখলাম আমার সাথে থাকা ছোটভাইটি ইতিমধ্যেই ঠেলাঠেলির পাল্লায় প্রথম স্থান অধিকার করেছে। সে গিয়ে মাশরাফি ভাইকে জোরে জাপটে ধরে আছে। আমি সেই দৃশ্য দেখে হাসব নাকি মাশরাফি ভাইয়ের কষ্টের কথা ভেবে কাঁদব বুঝতে পারছিলাম না।

মাশরাফির সাথে আমারই এক ছোট ভাই; Source: অচিন্ত্য আসিফ 

মাশরাফি ভাই হাত উঁচু করে বার বলছে, আপনারা সবাই এক এক জন করে আসেন। আমি সবার সাথে ছবি তুলব, কিন্তু কে শোনে কার কথা। এতে যেন ঠেলা ঠেলি আরো বেড়ে যাচ্ছে। মাশরাফি ভাই খানিকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে ভেতরে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ দরজা বন্ধ করে থেকে আবার এলেন। এবার সবাই শান্ত, এক এক জন করে যাচ্ছে আর ছবি তুলছে।

মাশরাফি ভাই একজনকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কোথা থেকে এসেছেন? উত্তরে সে জানালো, সাতক্ষিরা থেকে। ভাই অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, এত দূর থেকে আমার সাথে ছবি তুলতে এসেছেন? উত্তরে সে হ্যাঁ সূচক শব্দ করল। মাশরাফি ভাই একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, আচ্ছা তোলেন, দ্যাখেন ফেসবুকে কয়টা লাইক পান!

আমি এই কথোপকথন শুনে মাশরাফি ভাইয়ের মনের অবস্থা সম্পর্কে ঠিকই বুঝতে পারছিলাম। আমি আর সেলফি তুলতে যাইনি, তবে সবাই যখন চলে যায় তখন শুধু মাশরাফি ভাইয়ের একটা ছবি তুলেছিলাম।

মামা বাড়ির সামনে মাশরাফি ভাই; Source: অচিন্ত্য আসিফ

কীভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে নড়াইল যাওয়ার জন্য বেশ কয়েকটি রুট রয়েছে। তবে আপনি যে রুট দিয়েই আসেন না কেন, পদ্মা পাড়ি দিতেই হবে। তাই পদ্মার সৌন্দর্য উপভোগ করবেন বোনাস হিসেবে।

আমি যখন এই রুটে যাতায়াত করি, তখন অধিকাংশ সময়েই ভেঙে ভেঙে যাই। এতে ভ্রমণটা অনেক মজার হয়ে ওঠে। তবে আপনি যদি এই রুটে প্রথমবার আসেন তবে ডিরেক্ট গাড়িতেই আসবেন।

ঢাকা-নড়াইল রুটের কিছু কাউন্টার:

দিগন্ত এক্সপ্রেস: হুজুর বাড়ি, জনপথের মোড় সায়দাবাদ।

ফোন: ০১৭৪৯-০১০৪৭১

ভাড়া: ৪০০ টাকা

হানিফ এন্টারপ্রাইজ:  

গাবতলি

ফোন:  02-9012902.

সায়দাবাদ

ফোন: 01713-402673.

ভাড়া: ৫০০ টাকা

একে ট্রাভেলস:

গাবতলি ১

ফোন: 01709-964204

ভাড়া: ৪৫০ টাকা

Feature Image: Youtube

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ঈদ ভ্রমণ: ঈশ্বরদীর পথে বিচিত্র এক ভ্রমণ অভিজ্ঞতা

চলো যাই মেঘ পাহাড়ের দেশ সাজেক ভ্যালীতে