এক নজরে একটি জেলা: পাবনার ধর্মশালা

পাবনা কীসের জন্য বিখ্যাত? এর উত্তরে হয়তো এক শ্রেণী বলে উঠবেন, পাগলের জন্য! তাদের জ্ঞাতার্থে বলছি, পাবনা পাগলের জেলা নয়। প্রাচীন জনপদের এই জেলাতে জন্ম হয়েছে অসংখ্য মহামানবের; এখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে তাঁদের অসংখ্য কীর্তি, যা একবারে বলে ফেলা অতটা সহজ কার্য নয়। আমি আজ আলোচনা করছি এমনই কিছু দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে, যা পাবনা জেলার প্রাচীনত্ব ও ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে।

জোড় বাংলা মন্দির

জোড় বাংলা মন্দির; Source: wikipedia

এই জোড় বাংলা মন্দিরটি পাবনা জেলার রাঘবপুর উপজেলায় অবস্থিত। এটি পাবনা জেলার একটি অন্যতম পুরাকীর্তি। মন্দিরটির গায়ে কোনো শিলালিপি না থাকায় এর নির্মাণকাল সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে স্থানীয় জনশ্রুতি অনুসারে, মন্দিরটি ১৮ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মুর্শিদাবাদের নবাবের তহশীলদার ব্রজমোহন ক্রোড়ী কর্তৃক নির্মাণ করা হয়েছিল।

একটি অনুচ্চ বেদির উপর নির্মিত এই জোড় বাংলা মন্দিরটি বাংলাদেশের একটি অতি পরিচিত স্থাপত্য শৈলিতে নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া এর দেয়ালে অঙ্কিত নকশা ও টেরাকোটাগুলো দিনাজপুরের কান্তজীউ বা কান্ত নগর বা কান্তজির মন্দিরের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। বর্তমানে এই মন্দিরটি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতাধীন রয়েছে।   

চাটমোহর শাহী মসজিদ ও আশরাফ জিন্দানী (রহঃ)-এর মাজার

চাটমোহর শাহী মসজিদটি চাটমোহর উপজেলার অদূরে সমাজ গ্রামে অবস্থিত একটি সুপ্রাচীন মসজিদ। এটি স্থানীয়ভাবে সমাজ শাহী মসজিদ নামে পরিচিত। মসজিদটির নির্মাণকাল সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য না পাওয়া গেলেও; বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৪০০ বছর পূর্বে তৎকালীন দিল্লীর শাসক শেরশাহের পুত্র সুলতান সেলিম এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন।

তিনটি মূল গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদটি লাল জাফরি ইট দ্বারা নির্মাণ করা হয়েছিল। এটির উচ্চতা ৩০ হাত, দৈর্ঘ্য ৩৪ হাত এবং প্রস্থ ১৫ হাত। মসজিদটির পাশেই রয়েছে আশরাফ জিন্দানী (রহঃ)-এর মাজার। আর তার পাশেই রয়েছে একটি বিশাল দীঘি।

বেরুয়ান জামে মসজিদ

বেরুয়ান জামে মসজিদ; Source: atghoria.pabna.gov.bd

বেরুয়ানা জামে মসজিদটি আটঘরিয়া উপজেলার চাঁদভা ইউনিয়নের বেরুয়ানা গ্রামে অবস্থিত। মসজিদটির নির্মাণকাল সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, এটি সতেরো শতকের শেষের দিকে বা আঠারো শতকের শুরুতে নির্মাণ করা হয়।

তিন গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদটি আকৃতিতে আয়তাকার, যার দৈর্ঘ্য ১৪.১৯ মিটার এবং প্রস্থ ৫.৯০ মিটার। এছাড়া ভেতর থেকে এর দৈর্ঘ্য ১৩.৩০ মিটার এবং প্রস্থ ৪.০০ মিটার, অর্থাৎ এর দেওয়ালগুলো প্রায় ১ মিটার প্রসস্ত।

বার বার সংস্কারের ফলে মসজিদটির আদি বৈশিষ্ট্য কিছুটা নষ্ট হয়ে গেলেও, কিছু নকশা এখনো চোখে পড়ে।

ভাড়ারা শাহী মসজিদ

ভাড়ারা শাহী মসজিদ; Source: bhararaup.pabna.gov.bd

প্রাচীন মসজিদ নিয়ে গল্প-কথা কম নেই। তেমনই ভাড়ারা শাহী মসজিদ নিয়েও একটি জনশ্রুতি আছে; প্রায় ৪০০ বছর পূর্বের কথা, এক গভীর রাতে দোগাছি বাজারের কাছাকাছি একটি মসজিদ নির্মিত হয়। আর সেই মসজিদটিই এখন ভাড়ারা মসজিদ নামে পরিচিত। তবে ইতিহাস তার স্বীকৃতি দেয় না; বলা হয়, ১৭৫৭ সালে যখন বাদশাহ শাহ আলমের রাজত্ব চলছিল, মূলত তখনই দৌলত খাঁর পুত্র আসালত খাঁ এই ভাড়ারা শাহী মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন।

তিন গম্বুজবিশিষ্ট এই শাহী মসজিদটি শাহী শাসন আমলের ঐতিহ্য নিয়ে আজও সগৌরবে টিকে আছে। মসজিদটি পাবনার ভাড়ারা ইউনিয়নে অবস্থিত। এর পাশেই একটি লম্বা আকৃতির মাজার রয়েছে। মাজারটি ফকির শাহ মাজার নামে পরিচিত।

শাহ ফরিদ (রঃ) এর মাজার

মাজার; Source: faridpur.pabna.gov.bd

বাংলাদেশের অনেক জেলায় পীর-আউলিয়েদের নিয়ে অনেক অলৌকিক গল্প-কথা প্রচলিত রয়েছে। তেমনই একজন অলৌকিক ক্ষমতাধর পীরের নাম শাহ ফরিদ (র)। তাঁর সম্পর্কে জনশ্রুতি রয়েছে, তিনি ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম দিকে পদ্মা নদী থেকে কুমিরের পিঠে চড়ে চারঘাট হয়ে বড়াল নদীর উপর দিয়ে সারকেল সারি ঘাটে এসে থামেন, জায়গাটি বর্তমানে পারফরিদপুর গ্রামের মধ্যবর্তি। এখানে তখন গভীর বন-জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। হযরত শাহ ফরিদ (র:) তখন এই নির্জন জায়গায় তাঁর আস্তানা গাঁড়েন। কিছুদিন ঘুরতে না ঘুরতেই এখানে তাঁর কিছু শিষ্য ও ভক্ত তৈরি হয় এবং জায়গাটির নাম হয় ফরিদপুর।

শাহ ফরিদ (রঃ) এর মৃত্যুর পর সেখানেই গড়ে ওঠে তাঁর মাজার। বর্তমানে এখানে মাজার সহ একটি প্রাচীন মসজিদ রয়েছে। মাজার এবং মসজিদটি ফরিদপুর থানার ফরিদপুর ইউনিয়নের পারফরিদপুর গ্রামে অবস্থিত।    

শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের সৎসঙ্গ (আশ্রম-মন্দির)

অনুকূল চন্দ্রের সৎসঙ্গ/আশ্রম; Source: pabna.gov.bd

শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের সৎসঙ্গ (আশ্রম) পাবনা মূল শহর থেকে সাত কিলোমিটার দূরে হেমায়েতপুর গ্রামে অবস্থিত। এই সৎসঙ্গ বা আশ্রমটি মুলত নির্মাণ করা হয়েছিল সৎ মানুষ গড়ার লক্ষ্যে। এছাড়া পিতা-মাতার স্মৃতি রক্ষা করার লক্ষ্যও সুস্পষ্ট হয়, সম্মুখ প্রাসাদে ‘স্মৃতি মন্দির’ কথাটির উল্লেখ হেতু।

শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূল চন্দ্র সৎসঙ্গের ব্যখ্যা দিয়ে বলেন, সৎ ও সংযুক্তির সহিত তদগতিসম্পন্ন যাঁরা তাঁরাই সৎসঙ্গী, আর তাদের মিলনক্ষেত্র হলো সৎসঙ্গ। মহাত্মা গান্ধী এই সৎসঙ্গের কর্মকাণ্ড দর্শন করে ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন বলে জানা যায়।

কিছু কথা: আমি যখন এই ফিচারটি লিখতে শুরু করি তখন পাবনা জেলার একজন লোকের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, ভাই আপনাদের এলাকায় কী কী দর্শনীয় স্থান রয়েছে? তিনি জবাবে আমাকে বললেন, পাবনা জেলাই একখান দর্শনীয় স্থান বাই, কুনু কিছু কুমতি নেই (পাবনা জেলাই একটা দর্শনীয় স্থান, ভাই। এখানে কোনো কিছুর কমতি নেই)।

বুঝতেই পারছেন, এই জেলায় এত দর্শনীয় স্থান যে সেগুলো একটি তো নয়ই দুই তিনটি ফিচারে লিখে শেষ করা যাবে কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তাই এই জেলা নিয়ে আরো কয়েকটি পর্ব লেখার ইচ্ছে আছে, সেই পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকুন। আর ইচ্ছে হলে কিছু জায়গা সাজেস্টও করতে পারেন।

Feature Image: pabna.gov.bd

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পুণ্যস্থান গয়া কাব্য: রাজগিরির পথে পথে

পুণ্যস্থান বেনারস কাব্য: দ্বিতীয় দিনে নগর ভ্রমণ