এক নজরে একটি জেলা: নড়াইলের ঘাটে ঘাটে পড়ে আছে ইতিহাস

নড়াইল জেলার কথা লিখতে গিয়ে মনে পড়ে জনপ্রিয় একটি গানের কথা, “তোমার বাড়ি আমার বাড়ি, মধ্যে চিত্রা নদী। ইচ্ছা হইলে আইসো বন্ধু তোমায় ডাকি যদি…”। আজ সেই চিত্রা নদীর তীরে অবস্থিত শহর নড়াইলের দর্শনীয় স্থানগুলোর সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি।

বাঁধা ঘাট

প্রায় ২০০ বছরের পুরনো জমিদারদের নির্মাণ করা ঘাট বাঁধা ঘাট, যা নড়াইল জেলার রূপগঞ্জে চিত্রা নদীর তীরে অবস্থিত। এটি রোমান স্থাপত্যের আদলে নির্মিত। সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র এই ঘাটের প্রেমে পড়েছিলেন বলে জানা যায় তাঁর ‘কমলাকান্তের দপ্তর’ আর ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ গ্রন্থে।

ভিক্টোরিয়া কলেজ

১৮৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই কলেজটি রানী ভিক্টোরিয়ার নাম অনুসারে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি বাংলাদেশের প্রাচীন কলেজগুলোর মধ্যে অন্যতম। বাঁধা ঘাটের ঠিক কাছেই এই কলেজের অবস্থান। এখানে গেলে দেখা যায় কলেজের পুরাতন সব ভবনগুলো।

সুলতান কমপ্লেক্স

এস এম সুলতানের সমাধি; Source: অচিন্ত্য আসিফ

বিশ্ব বরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের বাড়িতে গড়ে তোলা হয়েছে সুলতান কমপ্লেক্স। এটি নড়াইলের মাছিমদিয়া গ্রামে অবস্থিত। এখানে রয়েছে, এস এম সুলতানের সমাধি, তাঁর ব্যবহার্য জিনিসপত্র, চিত্র কর্ম ও চিত্রা নদীর তীরে রাখা আছে তাঁর বজরা বা নৌকা। এগুলো ছাড়াও এখানে রয়েছে এস এম সুলতানের নিজে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান “শিশু স্বর্গ” আর্ট স্কুল ও ‘লাল বাউল’ সঙ্গীত একাডেমী।

মাশরাফি বিন মর্তুজার বাড়ি

নড়াইল এক্সপ্রেস খ্যাত এ যুগের ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মর্তুজার বাড়ি রয়েছে এই নড়াইলে। এটি ‘নড়াইল জেলা ঈদগাহ’-এর ঠিক পাশেই অবস্থিত। এছাড়াও এখানে তাঁর বাড়ির সামনে রয়েছে একটি খেলার মাঠ, যেখানে তিনি শৈশবে খেলাধুলা করতেন।

হাটবাড়িয়া মন্দির ও জমিদার বাড়ি

অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে নড়াইলের জমিদার রতন বাবু কর্তৃক হাটবাড়িয়ায় নির্মিত হয় একটি কালী মন্দির, যা এখনো কালের সাক্ষী হিসেবে পড়ে আছে। এখানে এক সময় জমিদার বাড়ির অস্তিত্বও ছিল কিন্তু এখন তা ধ্বংস স্তূপে পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে সরকার এখানে একটি প্রজাপতি পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন।

সর্বমঙ্গলা কালী মন্দির

মাদরাসা প্রাঙ্গনে মন্দির; Source: অমিতাভ অরণ্য

সম্ভবত জমিদার রতন বাবুর ভাই কালীপ্রসন্ন বাবু ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে রতনগঞ্জে সর্বমঙ্গলা কালী মন্দির স্থাপন করেন। মন্দিরটি এখনও প্রাণ নিয়ে বেঁচে আছে। এছাড়াও এর পিছনের দিকে একটু হেঁটে গেলেই চোখে পড়ে একটি মাদরাসা অঙ্গন, সেখানে রয়েছে জমিদারি আমলের আরো একটি মন্দির ও একটি ঘোড়াশাল। এখানে আগে বিশাল জায়গা জুড়ে জমিদার বাড়ির এলাকা ছিল, কিন্তু ১৯৮৩-৮৪ সালে এগুলো সরকারী নিলামে বিক্রি হয়ে যায়। সেই জায়গায় এখন গড়ে উঠেছে পুলিশ লাইন ও সরকারি শিশুসদন।

চিত্রা রিসোর্ট

চিত্রা নদীর সঠিক রূপ উপভোগ করতে চাইলে আপনি যেতে পারেন চিত্রা রিসোর্টে। রিসোর্টের নিজস্ব বোটে নৌকা পার হয়ে ওখানে গিয়ে দেখতে পাবেন বিনোদনের নানা আয়োজন। এখানে রয়েছে বাচ্চাদের খেলাধুলার জায়গা সহ বয়োবৃদ্ধদের জন্য নিরিবিলি স্থান।

মির্জাপুর

পদ্ম তুলতে তুলতে ক্লান্ত অমিতাভ অরণ্য নামক একজন কৃষক; Source: অচিন্ত্য আসিফ

নড়াইলের মির্জাপুর একটি ঐতিহ্যবাহী গ্রাম। এখানে জন্ম হয়েছিল অবিভক্ত বাংলার স্পিকার ও কংগ্রেস নেতা মরহুম সৈয়দ নওশের আলী ও যশোর জেলা বোর্ডের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও এমএলএ মরহুম ওয়ালিয়ার রহমানের। এছাড়াও এই গ্রামে একটি পদ্মবিল রয়েছে।

নীহাররঞ্জন গুপ্তের বাড়ি

বাংলা সাহিত্যের খ্যাতনামা ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও চলচ্চিত্র কাহিনীকার ডা: নীহাররঞ্জন গুপ্তের পৈত্রিক নিবাস নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার ইতনা গ্রামে। প্রায় ৭০ একর জমি জুড়ে এই বাড়িতে এখনো টিকে আছে একটি দ্বিতল ভবন ও পুকুর।

নিরিবিলি পিকনিক স্পট

নিরিবিলি পিকনিক স্পটের পুকুরে আমি; Source: অমিতাভ অরণ্য

নড়াইল তথা দক্ষিণ বঙ্গের একটি অন্যতম বিনোদন কেন্দ্রের নাম নিরিবিলি পিকনিক স্পট। এটি প্রায় ১৪ একর জায়গার উপর প্রতিষ্ঠিত। এখানে রয়েছে পিকনিক স্পট, মিনি চিড়িয়াখানা, শিশু পার্ক, এস এম সুলতানের শিল্পকর্ম নিয়ে একটি প্রদর্শন গ্যালারি, বিভিন্ন রাইড, ফুল ও ফলের বাগান ও একটি রিসোর্ট। এ ছাড়া বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সহ বিভিন্ন গুণী ব্যক্তিদের ভাস্কর্য।

স্বপ্নবীথি পিকনিক স্পট

নিরিবিলি পিকনিক স্পট থেকে কাছেই প্রায় ১২ একর জায়গার জুড়ে প্রতিষ্ঠিত স্বপ্নবীথি পিকনিক স্পট। এখানে রয়েছে বিভিন্ন রাইড সহ পশু পাখির একটি সংগ্রহশালা। নড়াইলের সুন্দর পিকনিক স্পটগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।

সুলতানী মসজিদ

সুলতানী মসজিদটি নড়াইল জেলার গোয়াল বাথান গ্রামে অবস্থিত। এটি প্রায় ৩০০ বছর পূর্বে মুন্সি হযরত তুল্লাহ নামক এক ব্যক্তি নির্মাণ করেন। এটি একটি ঐতিহ্যবাহী পুরাকীর্তি।

লোহাগড়া জোড়বাংলা মন্দির  

আনুমানিক ২৫০ বৎসর পূর্বে নির্মিত জোড়বাংলা মন্দিরটি লোহাগড়া আদর্শ কলেজের ঠিক পশ্চিম পাশে অবস্থিত। বর্তমানে মন্দিরটির খিলান এবং ছাদ ভেঙে পড়েছে, কিন্তু এর দেয়ালের সুদৃশ্য নকশা দেখে সেই সময়কার শিল্প অগ্রগতির অনুমান করা যায়। এই নকশাগুলো টেরাকোটা চিত্র বলে পরিচিত।

লহ্মীপাশা কালীমন্দির

বাংলাদেশের প্রাচীন কালী বাড়িগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো, লোহাগড়া থানায় অবস্থিত লক্ষ্মীপাশা কালীবাড়ি। এই কালীবাড়ি থেকে প্রাপ্ত ইতিহাস পুস্তক থেকে জানা যায়, এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কামদেব নামক জনৈক সিদ্ধি পুরুষ। কালীমন্দির ছাড়াও এখানে আরো রয়েছে একটি শিবমন্দির ও নাটমন্দির।

রারগ্রাম জোড়বাংলা মন্দির(লোহাগড়া)

নবগঙ্গার তীরবর্তী গ্রাম রায়গ্রামে একটি জোড়বাংলা মন্দির রয়েছে। এটি রাজা সীতারামের জোড়বাংলা মন্দিরের অনুকরণে নির্মিত। মন্দিরে অঙ্কিত শিলালিপি থেকে জানা যায়, এটি রামসংকর নামক একজন ব্যক্তি ১৭২৪ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেছিলেন। এছাড়াও তিনি এখানে একটি শিব মন্দিরও স্থাপন করেছিলেন।

বীরশ্রেষ্ঠ নূর মুহাম্মদ শেখের বাড়ি

নড়াইল শহর থেকে প্রায় ১০ কিঃমিঃ দূরে লোহাগড়া থানার আওতাধীন নূর মোহাম্মদনগরেই বীর শ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদের পৈতৃক নিবাস। এখানে সরকারী উদ্যোগে একটি ট্রাস্ট গ্রন্থাগার ও নূর মোহাম্মদের স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়াও এখানে তাঁর নামে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ রয়েছে।

রথ মন্দির

মন্দিরের গেট; Source: অচিন্ত্য আসিফ

নড়াইলের কালিয়া উপজেলায় রয়েছে একটি শত বছরের পুরনো মন্দির, যার নাম দেবত্র মন্দির। এখানে রক্ষিত আছে উপমহাদেশের সব থেকে বড় পিতলের রথ। এটি নির্মাণ করেছিলেন ভবানী সেন নামক এক ব্যারিস্টার। জানা যায়, এক সময় এখানেই ছিল কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নায়িকা সুচিত্রা সেনের নানা বাড়ি। তাঁর শৈশবও নাকি এখানেই কেটেছে।

নৃত্যশিল্পী উদয় শংকরের বাড়ি

নড়াইলের কালিয়া উপজেলায় রয়েছে নৃত্যশিল্পী উদয় সরকারের পৈতৃক বাড়ি। বর্তমানে তাঁর বাড়ির ভবনটি কালিয়া ডাকবাংলো হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

শুকতাইল মঠ

নড়াইলের শুকতাইল গ্রামে রয়েছে শুকতাইল মঠ, যা প্রায় ১৭শ’ বছর পূর্বে সম্রাট অশোকের শাসনামলে নির্মাণ করা হয় বলে ধারণা করা হয়। গ্রামটি মধুমতী নদীর তীরে অবস্থিত।
উপরোক্ত স্থানগুলো ছাড়াও নড়াইলের দর্শনীয় স্থানগুলো মধ্যে রয়েছে, শত বছরের পুরনো নিশিনাথ তলা মন্দির (বাঁধা ঘাটের পাশে), কালিয়ায় বিশ্ববিখ্যাত সেতারা বাদক রবিশংকরের বাড়ি, তপনভাগ দীঘি, সদরের ডুমদিতে রয়েছে কবিয়াল বিজয় সরকারের বাড়ি, তারাপুরে রয়েছে জারি সম্রাট মোসলেমউদ্দিনের বাড়ি ও পুরুলিয়া গ্রামে রয়েছে ৪০০ বছরের পুরাতন পোড়া মন্দির, এস এম সুলতান ব্রিজ, সদ্য নির্মিত শেখ রাসেল ব্রিজ। এছাড়াও বগুড়া গ্রামে রয়েছে মধুমতী, নবগঙ্গা ও চিত্রা নদীর সঙ্গমস্থল।
আর দেরি কেন! নড়াইলের ইতিহাসকে ঘেঁটে দেখতে আজই আপনার নৌকা ভিড়ান নড়াইলের ঘাটে।
Feature Image: Achinto Asif

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্বল্প খরচে ভ্রমণের জন্য সেরা দশটি গন্তব্য

গোড়ার মসজিদ: বারোবাজারের ৫০০ বছরের পুরনো এক অনন্য স্থাপত্য