এক নজরে একটি জেলা: প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদের সাতক্ষীরা

নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর অসাধারণ ইতিহাসমণ্ডিত সাতক্ষীরা জেলার প্রাকৃতিক দর্শনীয় স্থানগুলোর বর্ণনায় লিখেছিলাম ‘প্রকৃতির মায়ায় সাতক্ষীরা’ পর্বটি। এবার ইতিহাসের অন্তরালে হারিয়ে যাওয়ার পালা। আমরা এই পর্বে সাতক্ষীরা জেলার উল্লেখযোগ্য প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলো সম্পর্কে জানব।

যশোরেশ্বরী কালী মন্দির

পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী, সত্য যুগে দক্ষ যজ্ঞের পর সতী মাতা পিতা দক্ষের কটূক্তির পরে দেহ ত্যাগ করেন। এতে মহাদেব উন্মত্ত হয়ে সতীর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রলয় নৃত্য শুরু করেন। ফলে পৃথিবী ধ্বংসের সম্মুখীন হয়। এর থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করার জন্য বিষ্ণুদেব সুদর্শন চক্র দ্বারা সতীর মৃতদেহ ছেদন করেন। এতে সতী মাতার দেহ খণ্ডসমূহ বিভিন্ন স্থানের মোট ৫১টি জায়গায় পতিত হয়। এ সকল স্থান পীঠ হিসেবে পরিচিত।

লৌকিক ধারণা অনুযায়ী, সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ঈশ্বরীপুর গ্রামে অবস্থিত যশোরেশ্বরী কালী মন্দির ৫১ পীঠের একটি। ধারণা করা হয়, পুরাকালে মন্দিরটি আনারি নামের এক ব্রাহ্মণ কর্তৃক নির্মিত হয়। তিনি এই যশোরেশ্বরী শক্তিপীঠের ১০০টি দরজা নির্মাণ করেন। কিন্তু ঠিক কখন মন্দিরটি নির্মিত হয় তা জানা যায়নি। পরে লক্ষ্মণ সেন ও প্রতাপাদিত্য এই মন্দিরের সংস্কার করেন। মূল মন্দিরের নিকটেই নাটমন্দির নামে একটি বড় মঞ্চ মণ্ডপ নির্মাণ করা হয়েছিল। ১৯৭১ সালের পর এটি ভেঙে পড়ে। বর্তমানে শুধু স্তম্ভগুলোই দেখা যায়।

প্রবাজপুর শাহী মসজিদ

প্রবাজপুর শাহী মসজিদ; Source: bbarta24.net

প্রবাজপুর শাহী জামে মসজিদ সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার প্রবাজপুর গ্রামে অবস্থিত একটি প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা। এটি ১৬৯৩ সালে নির্মিত হয়। সম্রাট আওরঙ্গজেব তখন সিংহাসনে। এই এলাকায় তার একটি সেনাচৌকি ছিল। সৈন্যদের নামাজ পড়ার জন্য আওরঙ্গজেব সুবেদার পরবাজ খানকে একটি মসজিদ নির্মাণ করার নির্দেশ দেন। পরবাজ খান নির্দেশ অনুসারে একটি এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ নির্মাণ করেন। সুবেদার পরবাজ খানের নামানুসারে এই এলাকার নাম হয় প্রবাজপুর আর মসজিদটি প্রবাজ শাহী মসজিদ।

কালীগঞ্জ সদর উপজেলা থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে এখনো কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মুঘল আমলে প্রতিষ্ঠিত সেই ঐতিহাসিক মসজিদ। পোড়ামাটির ইটে তৈরি অনন্য এই স্থাপনাটির বাইরের দিকে দৈর্ঘ্য ৫২ ফুট ৫ ইঞ্চি এবং প্রস্থ ৩৯ ফুট ৮ ইঞ্চি। আর মসজিদটির ভেতরের দিকে ২১ ফুট ৬ ইঞ্চির বর্গাকৃতির একটি নামাজের জায়গা রয়েছে।

মসজিদের দেয়ালগুলোর পুরুত্ব ৫ ফুট ৯ ইঞ্চি থেকে ৭ ফুট পর্যন্ত আর প্রধান দরজাটি ৪ ফুট ৭ ইঞ্চি প্রশস্ত। মসজিদটিতে ৬ ফুট ৯ ইঞ্চি প্রশস্ত একটি বারান্দা ছিল। কিন্তু কালের বিবর্তনে তা ভেঙে পড়েছে। মসজিদটিতে মোট ১০টি দরজা ছিল। কিন্তু বর্তমানে দরজার নিচের অংশে পাতলা গাঁথুনি নির্মাণ করে সেগুলোকে জানালার আকৃতি করা হয়েছে। এছাড়া তিনটি অলংকৃত মেহরাবও রয়েছে মসজিদটিতে।

তেতুলিয়া জামে মসজিদ

তেতুলিয়া জামে মসজিদ; Source: ইমরান সামি

হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন। তেতুলিয়া জামে মসজিদই বটে, তবে এটা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলা নয়। এই তেতুলিয়া সাতক্ষীরা জেলায় অবস্থিত। তেতুলিয়া জামে মসজিদ সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার তেতুলিয়া গ্রামে অবস্থিত একটি অনন্য স্থাপত্য। এটি খান বাহাদুর সালামতুল্লাহ মসজিদ এবং তেতুলিয়া শাহী মসজিদ নামেও পরিচিত।

তেতুলিয়ার বিখ্যাত জমিদার কাজী বংশ কর্তৃক এটি ১৮৫৮-৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়া একটি রাজবাড়ী তথা ‘সালাম মঞ্জিল’ প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে সেই মসজিদ। মসজিদটি ছয় গম্বুজ বিশিষ্ট। নির্মাণে মুঘল স্থাপত্যশৈলীর ছাপ রয়েছে। মসজিদের আঙ্গিনায় প্রবেশের জন্য একটি সিংহদরজা ছিল। ১৯৯৮ সালে এটি ভেঙে পড়ে। পরবর্তীতে সিংহদরজা পুনরায় নির্মাণ করা হয়।

মসজিদের আঙ্গিনার একপাশে একটি ঝুলন্ত ছাদের নিচে লম্বা একটি বারান্দা আছে। ধারণা করা হয়, জমিদারদের দাপ্তরিক কাজ এখানেই সম্পন্ন করা হতো। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এই হলুদ স্থাপনাটি আপনাকে হারিয়ে নিয়ে যাবে অতীত ইতিহাসের বুক থেকে।

দরবার স্তম্ভ

দরবার স্তম্ভ; Source: Dutta Dipu

চলুন এবার ঘুরে আসি বঙ্গভঙ্গের সময়। ভারতীয় মহাদেশ তখন ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে উত্তাল। দুর্বার আন্দোলন চলছে। এমন সময়ে ব্রিটিশরা কৌশলগত উপায়ে আন্দোলন দমাতে চাইলো। তারা বাংলাকে ভেঙে দু’ভাগ করে দিলো। এতে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যাবে- এই প্রত্যাশাই ছিল ইংরেজদের। কারণ বাংলা ছিল আন্দোলনের কেন্দ্রভূমি।

কিন্তু বঙ্গভঙ্গের ফলাফল হিতে বিপরীত হলো। এই সিদ্ধান্তের ফলে স্বাধীনতাকামীরা আন্দোলন আরো দুর্বার করে তুলল। ফলে ইংরেজরা বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হয়। ১৯১১ সালের ১২ই ডিসেম্বর সম্রাট জর্জ দিল্লিতে বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণা দেন। এই বিজয়কে উদযাপন করতে রাজনীতিবিদ রাজকুমার বসু সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলায় একটি বিজয়স্তম্ভ নির্মাণ করেন।

ছয়ঘরিয়া জোড়াশিব মন্দির

ছয়ঘরিয়া জোড়াশিব মন্দিরটি সাতক্ষীরা শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত একটি অসাধারণ মন্দির। বাংলা ১২২০ সালের পহেলা বৈশাখ একজন সাধক ফকিরচাঁদ ঘোষ এই জোড়াশিব মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। দুটি মন্দিরই আকারে বর্গাকৃতির।

মন্দিরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এই মন্দিরের দেয়ালের গায়ের টেরাকোটার নকশা। হরেক রকম বিষয় এখানে ঠাঁই পেয়েছে। এর মধ্যেই রয়েছে ফুল, লতা-পাতা, পরী, বাদক, অশ্বারোহী, হস্তীরোহী প্রভৃতি। সাতক্ষীরা অঞ্চলে যত টেরাকোটার কাজ পাওয়া গেছে তার মধ্যে ছয়ঘরিয়ার জোড়াশিব মন্দিরের টেরাকোটার কাজ সবার থেকে উত্তম।

ছয়ঘরিয়া জোড়াশিব মন্দির; Source: dailysatkhira.com

শ্যামনগরের যীশুর গির্জা

শ্যামনগরের যিশুর গির্জা বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার ঈশ্বরীপুর গ্রামে অবস্থিত। এটি বাংলাদেশে নির্মিত প্রথম খ্রিস্টান গির্জা। এটি সাতক্ষীরা শহর থেকে ৭৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। যশোররাজ প্রতাপাদিত্যের আমলে এই গির্জা প্রতিষ্ঠিত হয় জেসুইটা সম্প্রদায় কর্তৃক এই গির্জা প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৫৪০ সালে ইগ্নেসিয়াস লয়োলা নামক একজন স্প্যানিশ ব্যক্তি কর্তৃক এই সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সম্প্রদায়ের একজন পাদ্রী ফনসেকো ১৪৯৯ সালে প্রতাপাদিত্যের রাজধানী ঈশ্বরীপুরে এসে একটি গির্জা নির্মাণের অনুমতি চান। প্রতাপাদিত্যের সম্মতি পেয়ে গির্জার নির্মাণকাজ শুরু হয়। এমনকি রাজা প্রতাপাদিত্য গির্জা নির্মাণে অর্থও প্রদান করেন। এই নির্মাণকাজ ১৫৪০ সালে শেষ হয়। সেই সাথে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের প্রথম গির্জা।

জাহাজ ঘাটা হাম্মামখানা ও তৎসংলগ্ন প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ

ষোল শতকের শেষ দশকে যমুনা ইছামতী নদীর পূর্বপাড়ে অবস্থিত এই জায়গায় রাজা প্রতাপাদিত্যের নৌদুর্গ চিল। এখানে রাজা প্রতাপাদিত্যের রণতরী তৈরি ও সংস্কার করা হতো। জাহাজঘাটায় প্রতাপাদিত্যের নৌবাহিনীর পোতাশ্রয় ও প্রধান কার্যালয় ছিল। এই নৌবাহিনীর প্রধান ছিল পর্তুগীজ সেনানায়ক ডুডলি। এখনো নৌ সেনাপতি ডুডলির নাম অনুসারে বর্তমানে একটি গ্রাম রয়েছে যার নাম দুদলি গ্রাম।

তো আপনি যদি সাতক্ষীরার অতীত খুঁজতে যান, তাহলে এর মধ্যে কোন জায়গায় আগে পদার্পণ করবেন মনে করছেন?

Feature Image: ইমরান সামি

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ঈদের ছুটিতে বান্দরবানে ফ্যামিলি ট্রিপ

ঈদের ছুটিতে তিনাপ সায়তার অভিযান