এক নজরে একটি জেলা: গারো পাহাড়ের দেশ শেরপুর (সব বিনোদন কেন্দ্র)

ভারতের মেঘালয় ঘেঁষা শেরপুর জেলার অনেকখানি জায়গা জুড়ে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী গারো পাহাড়। আর এই পাহাড়কে ঘিরে এখানে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি পর্যটন অঞ্চল বা পার্ক। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা এই সকল পার্কের বর্ণনা দিয়েই লিখছি আজকের এই ফিচার।  

মধুটিলা ইকোপার্ক

মধুটিলা ইকোপার্ক; Source: shobshomoy.com

শেরপুর জেলার নলিতাবাড়ি উপজেলায় রয়েছে মধুটিলা ইকোপার্ক। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে তথা মেঘালয়ের কাছে গারো পাহাড়ে অবস্থিত এই ইকোপার্কটি ময়মনসিংহ বন বিভাগ নিয়ন্ত্রিত। এটি মধুটিলা রেঞ্জের সমেশ্চূড়া বিটের প্রায় একশত হেক্টর পাহাড়ি বনভূমি জুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে। এই প্রকল্পটি পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অধীনে সম্পূর্ণ সরকারী অর্থায়নে করা হয়েছে।

এখানে নিঝুম দ্বীপের মতো অসংখ্য গাছ-গাছড়ায় ভরা ছোট-বড় পাহাড় রয়েছে। এছাড়া রয়েছে একটি ওয়াচ টাওয়ার, যেখান থেকে ভারতের মেঘালয়ের তুড় পাহাড় দেখা যায়, বাইনোকুলারে চোখ রাখলে দেখা যায় বিএসএফ ক্যাম্পও।

গারো পাহাড়ের গায়ে তৈরি করা উঁচু-নিচু রাস্তা বেয়ে যতই ভেতরের দিকে যাওয়া যায় ততই মুগ্ধ হতে হয়। চারদিকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ছড়াছড়ি, তার মাঝে বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর নির্বাক চেয়ে থাকা। ভয় পাবেন না, ওগুলো শুধুমাত্র তাদের ভাস্কর্য।

ভাস্কর্য; banglarroop.wordpress.com

চোখে পড়ে কুমারী মৎস্য কন্যার ভাস্কর্য, আর তার কাছেই রয়েছে একটি কৃত্রিম লেক। এটি পাহাড়ি ঝর্ণার পানির লেক। লেকের পানিতে ভেসে বেড়াতে পারবেন প্যাডেল বোট বা দেশিয় নৌকায় করে।

মধুটিলা ইকোপার্কে আরো রয়েছে লেকের পানিতে নির্মিত মনোরম স্টার ব্রিজ, পাহাড়ের চূড়ায় মহুয়া রেস্ট হাউজ, ডিসপ্লে মডেল, তথ্যকেন্দ্র, গাড়ি পার্কিং জোন, ক্যান্টিন, মিনি চিড়িয়াখানা, ঔষধি ও বিভিন্ন প্রজাতির সৌন্দর্যবর্ধক বৃক্ষ, মৌসুমি ফুলসহ বিভিন্ন রঙের গোলাপের বাগান, পিকনিক স্পট ও শিশুদের জন্য পার্ক।

গজনী অবকাশ কেন্দ্র

সারি সারি শাল, গজারি, সেগুনবন ও লতার বিন্যাসে সজ্জিত এই পার্কটি হতে পারে প্রকৃতি প্রেমীদের গন্তব্য। ঐতিহ্যবাহী গারো পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই পর্যটন কেন্দ্রে পাবেন পাহাড় ও পাহাড়ি ঝর্ণার সাথে একাত্ম হওয়ার সুযোগ। এখানে প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম সৌন্দর্যের মেল বন্ধন ঘটানো হয়েছে, যা যে কারো হৃদয়ে আনন্দের হিন্দোল তুলে দিতে পারে।

প্রকৃতির অপরূপ রূপে শোভিত এ জায়গাটি শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলায় অবস্থিত। ঝিনাইগাতির এই জায়গাটি ভারতের মেঘালয়ের কাছাকাছি অবস্থিত।

গাজনি লেক; Source: greatbengaltoday.com

দিকে দিকে লাল মাটির উঁচু পাহাড় আর পাহাড়ি টিলার মাঝে সমতল ভূমি। এখানে পাহাড়ি ঝর্ণার গতিপথে বাঁধ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম লেক। লেকের মাঝে রয়েছে কৃত্রিম পাহাড়, যা দোদুল্যমান ব্রিজ দ্বারা তীরের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে। আর পাহাড়ে রয়েছে ‘লেক ভিউ পেন্টাগন’। 

এখানে অবকাশ যাপনের জন্য গারো পাহাড়ের চূড়ায় একটি আধুনিক রেস্ট হাউজ রয়েছে। পাহাড়ের পাদদেশ থেকে শুরু করে গেস্ট হাউজ পর্যন্ত রয়েছে পদ্মসিঁড়ি বা আঁকাবাঁকা সিঁড়িপথ।

এছাড়া রয়েছে একটি ওয়াচ টাওয়ার, মিনি চিড়িয়াখানা, খেলার মাঠ, ক্যাকটাস পল্লী, চুকু লিপি চিলড্রেন পার্ক, ক্রিসেন্ট লেক, লেকের উপরে রয়েছে রংধনু ব্রিজ, কৃত্রিম জলপ্রপাত, পানসিতরী নৌকা, প্যান্ডেল বোট, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ, কাজী নজরুল ইসলাম ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিফলক, পাতাল পথ, লাভলেইন ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রকৃতি। আর বাড়তি পাওয়া হিসেবে রয়েছে গারো পাহাড়ে বসবাসকারী আদিবাসীদের জীবন যাত্রা পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ। 

চুকু লুপি চিলড্রেন্স পার্ক

চুকু লুপি চিলড্রেন্স পার্ক; Source: Jagonews24

চুকু লুপি চিলড্রেন্স পার্কটি গজনী অবকাশ কেন্দ্রেই অবস্থিত। প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে তোলা এই পার্কটি থেকে ঘুরে আসতে পারেন আপনার বাচ্চাকে নিয়ে। এখানে আধুনিক সব রাইডের মধ্যে রয়েছে, বৈদ্যুতিক নাগরদোলা, সুপার চেয়ার, মেরি গো রাউন্ড, দোলনাসহ বিভিন্ন রাইডস। তবে এগুলোর মধ্যে বিদ্যুৎ ও চৌম্বুক শক্তির মাধ্যমে ফ্লাইওভার রেল রাইডসটি সবচেয়ে আকর্ষণীয়।

অর্কিড পর্যটন প্রকল্প

শেরপুর শহরের কান্দারপাড়া এলাকায় ব্যক্তি উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে এই অর্কিড পার্ক। এখানে রয়েছে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন প্রজাতির সবুজ গাছের সারি, সবুজতার মাঝে শান বাঁধানো পুকুর। পুকুরের চারপাশে সাদা বকের আনাগোনা পর্যটকদের নজর কাড়ে। এমনই এক মনোরম পরিবেশে রয়েছে খাঁচায় ভরা বানর, টার্কিশ, খরগোশ সহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী।

গাছের সারি; Source: nokkhotro.com

শহুরে জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে অনেকেই আসেন অর্কিড পর্যটন প্রকল্পে; অনেকে আসেন বিকেলের আড্ডা জমাতেও। কারণ এখানে বন্ধু-বান্ধব বা পরিবারের সাথে আড্ডা জমাতে রয়েছে বেশ কয়েকটি ছাতা। এছাড়া রয়েছে একটি ছনের তৈরি সুদৃশ্য ক্যান্টিন ও রেস্ট হাউজ। প্রকৃতির সাথে একটি সুন্দর বিকেল কাটাতে চাইলে আপনিও ঘুরে আসতে পারেন অর্কিড পর্যটন পকল্প থেকে।

ডিসি লেক

শহরের প্রাণ কেন্দ্রে অবস্থিত সদ্য নির্মিত এই ডিসি লেক ইতোমধ্যেই শহরের মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এখানে ছায়া নিবিড় পরিবেশে লেকের স্বচ্ছ পানির সাথে শীতল বাতাস গায়ে মাখতে মাখতে মনে হয় যেন নদীর পাড়ের কোনো ছোট্ট গ্রামে বসে আছি।

ডিসি লেকের পাড়ে বসে সময় কাটানোর জন্য অনেকগুলো বেঞ্চি রয়েছে। আর লেকের উপর রয়েছে একটি বাঁশের তৈরি সেতু, যা রাঙ্গানো হয়েছে বিভিন্ন রঙে। রঙিন এই সেতুটি স্থানীয় মানুষের কাছে সেলফি ব্রিজ নামে পরিচিতি পেয়েছে।

এছাড়া লেকের পানিতে ঘুরে বেড়ানোর জন্য কয়েকটি বোট রয়েছে। জানা যায়, এই বোটগুলো উল্লিখিত গজনী অবকাশ কেন্দ্র থেকে আনা হয়েছে। বর্তমানে লেক এলাকায় একটি নতুন সংযোজন করা হয়েছে, আর তা হলো নির্ঝরের আনন্দধারা নামক একটি সৌন্দর্য বর্ধনকারী ঝর্ণা।  

লাউচাপড়া

ওয়াচ টাওয়ারের উপর থেকে; Source: porjotonlipi.com

লাউচাপড়া শেরপুর জেলার শেষ প্রান্তে ভারত সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত একটি বিনোদন কেন্দ্র। এটি শেরপুর জেলা পরিষদ নিয়ন্ত্রিত একটি পর্যটন অঞ্চল। চারপাশে থাকা সবুজ পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য এখানে রয়েছে ১৫০ ফুট উঁচু পাহাড়ের উপর নির্মিত একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। এখান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করতে আপনিও ঘুরে আসতে পারেন লাউচপড়া বিনোদন কেন্দ্র থেকে।

কিছু কথা:

শেরপুরে সচরাচরই দেখা মেলে জংলা হাতির। তাই এখানে গেলে একটু সাবধানে চলাফেরা করা উচিৎ।

Feature Image: ealies tipu(Youtube)

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

E T B এর ইভেন্ট: আমিয়াখুম, নাফাখুম এবং লাংলুক ঝর্ণা ভ্রমণ

E T B এর ইভেন্ট: কেওক্রাডং পাহাড়ের চূড়ায় ইটিবির সাথে ভ্রমণ