এক নজরে একটি জেলা: জামতলার রসগোল্লা, খেজুরের গুড় আর নকশি কাঁথার যশোর

বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীনতা অর্জনকারী জেলা ও প্রথম ডিজিটাল জেলা হিসেবে যার খ্যাতি রয়েছে, সেটিই যশোর জেলা। এই জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যেমন বলে শেষ করা যায় না, তেমনই এখানকার দর্শনীয় স্থানের সংখ্যাও অনেক।
যশোর জেলা খেজুরের গুড় বা পাটালী গুড়ের জন্য বিখ্যাত। এছাড়াও এটি জামতলার রসগোল্লা ও নকশি কাঁথার জন্য প্রসিদ্ধ।
আজকের এই ফিচারে যশোরের অসংখ্য দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে জনপ্রিয়গুলোর পরিচিতি তুলে ধরা হলো, যা আপনার যশোর ভ্রমণকে সার্থক করে তুলতে পারে।

জেস গার্ডেন

জেস গার্ডেন; Source: http://jessgardenpark.com

যশোর শহর থেকে মাত্র ২.৫ কিঃমিঃ দূরে সুন্দর, নির্মল ও নিরিবিলি পরিবেশে ১২ একর জমির উপর অবস্থিত “জেস গার্ডেন পার্ক”। বর্তমানে এটি যশোরের একটি অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র।
দুই পাশে সবুজ ফসলের মাঠ দ্বারা বেষ্টিত হওয়ায়, পার্কের সৌন্দর্য বেড়েছে দ্বিগুণ। পার্কের ভেতরে বাচ্চাদের জন্য বিভিন্ন রাইড সহ রয়েছে একটি কৃত্রিম জলাশয় যেখানে পদ্মফুল ফুটে থাকে, একটি মূর্যাতল আছে যেখানে গ্রাম বাংলার প্রতিচ্ছবি তুলে ধরা হয়েছে।

কালেক্টর পার্ক

ভৈরব নদীর তীরে অবস্থিত কালেক্টরেট ভবন চত্বর যশোরের আরেকটি জনপ্রিয় বিনোদন কেন্দ্র। এটি আগে নিয়াজ পার্ক নামে পরিচিত হলেও বর্তমানে তা কালেক্টরেট পার্ক নামে অধিক পরিচিত। এই কালেক্টরেট পার্ক অনেক আন্দোলন সংগ্রামের নীরব সাক্ষী রূপে দাঁড়িয়ে আছে যশোরের বুকে।

শ্রীধরপুর জমিদার বাড়ি

শ্রীধরপূর মন্দির; Source: somewhereinblog.net

যশোরের প্রাচীন স্থাপনার মধ্যে শ্রীধরপুর জমিদার বাড়ি অন্যতম। এটি আজ থেকে প্রায় ৪’শ বছরের পুরানো। জমিদার বাড়ি ছাড়াও এখানে রয়েছে হুগলী থেকে আগত জমিদার বনমালী বসু নির্মিত একটি মন্দির ও দীঘি। জমিদার বাড়ির মন্দিরে প্রতি বছর শ্যামা পূজা অনুষ্ঠিত হয়।

বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের মাজার

বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদের নাম জানে না এমন লোক পাওয়া দুষ্কর। আর এই অতি পরিচিত বীরশ্রেষ্ঠের মাজার রয়েছে যশোরের কাশীপুরে। ঘুরে আসতে পারেন সেখান থেকেও, আর দেখে আসতে পারেন এই অমর যোদ্ধার সমাধি।

ভরতের দেউল

ভরতের দেউল; Source: অমিতাভ অরণ্য

মহাস্থানগড়ের কথা হয়তো কম-বেশি সবাই শুনেছি বা অনেকে দেখে এসেছি। কিন্তু যেটা অনেকের কাছেই অপরিচিত সেটা হলো ভরত ভায়নার দেউল। এটি দেখতে খানিকটা মহাস্থান গড়ের মতোই।
ভরতের দেউল বা ভরত ভায়নার দেউল প্রায় দু’হাজার বছর আগে অর্থাৎ গুপ্ত যুগে নির্মাণ করা হয়। এটি আসলে একটি বৌদ্ধ সপ্তক, যা নির্মাণ করেছিলেন ভরত নামক এক রাজা। ধারণা করা হয়, এর উপরিভাগে একটি উপাসনালয় ছিল।

মীর্জা বাড়ি হাম্মাম খানা

সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে মীর্জা সফসি খান ফৌজদার নিযুক্ত হন। তিনি যশোরের কেশবপুর থেকে ৭ কি: মিঃ পশ্চিমে কপোতাক্ষ নদ ও বুড়িভদ্রা নদীর সঙ্গমস্থল তথা তৎকালীন ত্রিমোহিনী নামক স্থানে একটি কিল্লাবাড়ি স্থাপন করেন। এলাকাটি বর্তমানে মির্জানগর নামে পরিচিত।
মির্জানগরে তিনি পরিখা খনন সহ একটি হাম্মামখানা নির্মাণ করেন। তখন এর নামকরণ করেন মতিঝিল। এটিই বর্তমানে মির্জাবাড়ি হাম্মামখানা নামে পরিচিত। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ১৯৯৬ সালে এটিকে পুরাকীর্তি হিসাবে ঘোষণা করে।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়ি

মধুপল্লি; poriborton.com

যশোরের কেশবপুর থানার সাগরদাঁড়ি ইউনিয়নে রয়েছে ‘মধুপল্লি’ বা মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়ি। এখানে একটি যাদুঘরে সংরক্ষিত হয়েছে তাঁর ব্যবহৃত জিনিসপত্র। এছাড়াও রয়েছে তাঁর বাড়ি, অাবক্ষ মূর্তি, সমাধি, পাঠাগার, দীঘি ও বহুল আলোচিত কপোতাক্ষ নদ। বর্তমানে এটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

রাজবাড়ি

এক সময় যশোর ছিল রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজত্ব। যশোর শহরের কাছেই রয়েছে তাঁর প্রাচীন রাজবাড়িটি। বর্তমানে এর অনেকটাই ধ্বংস প্রাপ্ত হয়ে গেছে।
এখানে আরো আছে একটি শিবমন্দির, দশ মহাবিদ্যা মন্দির, জোড়াজিং মন্দির।

চাঁচড়া শিব মন্দির

চাঁচড়া শিব মন্দির; Source: Poriborton

যশোর বেনাপল হাইওয়েতে অবস্থিত চাঁচড়া শিব মন্দিরটি ৩২১ বছরের পুরাতন একটি মন্দির। প্রতাপাদিত্যের পরাজয়ের পর রাজা উপাধির জমিদার শ্রী মনোহর রায় ১৬৯৬ খ্রিঃ এই মন্দিরটি নির্মাণ করেন। জানা যায়, তিনি তাঁর রাজ্যাভিষেক উপলক্ষে এই মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। এক কালে মন্দিরের পাশেই নাকি রাজপ্রাসাদ ছিল, কিন্তু এখন তা কালের গর্ভে বিলীন।

হাজী মোহাম্মাদ মহসিন ইমামবাড়া

হাজী মোহাম্মদ মহসিন ইমামবাড়া যশোর জেলার মুড়ালীতে অবস্থিত। এটি মুড়ালী ইমামবাড়া নামেও পরিচিত। যশোর জেলার বিখ্যাত পুরাকীর্তির মধ্যে এটি অন্যতম।
হাজী মোহাম্মদ মহসিন ইমামবাড়াটি নির্মাণ করেছিলেন মহসিনের বৈপিত্রেয়ী বোন হাজী মুন্নুজান খানম। তিনি মৃত্যুবরণ করার পূর্বে তাঁর এই ইমামবাড়াসহ সমস্ত সম্পত্তি হাজী মুহাম্মদ মহসিনকে দিয়ে যান, যার মধ্যে এই ইমামবাড়াটি এখনো কালের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। ১৯৮৭ সালে এটিকে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

ভাসমান সেতু

ভাসমান সেতু; Source: tareq irfan

আমি রাঙ্গামাটির ঝুলন্ত ব্রিজ ও বান্দরবানের মেঘলার ঝুলন্ত ব্রিজ দেখেছি। এসবের থেকে আমার কাছে বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়েছে যশোরের ভাসমান ব্রিজটি। এটি মনিরামপুর উপজেলার রাজগঞ্জের ঝাঁপা বাঁওড়ে নির্মিত হয়েছে। হাজার ফুট দীর্ঘ এই দৃষ্টিনন্দন সেতুটি দেখতে প্রতিদিন প্রচুর মানুষের আগমন ঘটে।

কিছু কথা:

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী একটি জেলার নাম যশোর। আগেই বলেছি- এখানে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান রয়েছে, যা একটি ফিচারে লেখা সম্ভব নয়। তবে আমি যেহেতু আপনাদেরকে প্রতিটি জেলার সমস্ত দর্শনীয় স্থানের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে চাই, সেহেতু আমার আগামী ফিচারটি যশোরের আরো কিছু ঐতিহাসিক, দৃষ্টিনন্দন ও মজার স্থানের বর্ণনায় সাজিয়ে তুলব।
আসছে:
১. এগারো শিব মন্দির, ২. পৌর পার্ক, ৩. বেনাপোল স্থল বন্দর, ৪. কেশবপুরের হনুমান গ্রাম, ৫. দম দম পীরের ডিবি, ৬. তুলা বীজ বর্ধন খামার, ৭. খড়িঞ্চা বাঁওড়, ৮. গদাধরপুর বাঁওড়, ৯. ধীরাজ ভট্টাচার্যের বাড়ি, ১০. কালুডাঙ্গা মন্দির, ১১. যশোর বধ্যভূমি, ১২. যশোর বোট ক্লাব, ১৩. বিনোদিয়া ফ্যামিলি পার্ক, ১৪. গদখালীর ফুলের বাগান এবং সবজির ক্ষেত, ১৫. খান জাহান আলী জামে মসজিদ, ১৬. কায়েম কোনা মসজিদ, ১৭. শেখপুর জামে মসজিদ, ১৮. লাল দীঘি, ১৯. পানিগ্রাম রিসোর্ট।
Feature Image: jessgardenpark.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মেঘালয়ে মেঘবিলাস : শিলং শহরের কড়চা

নিরিবিলি পিকনিক স্পটে মজার ভ্রমণ