বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বাইরে অবস্থিত একমাত্র প্রতিষ্ঠান: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা

সকাল সকাল বেরিয়ে পড়েছিলাম চট্টগ্রাম ওয়্যার সিমেট্রি দেখতে। কিছু চিনি না বলে বন্ধু নিলয় কিছুক্ষণ পর পরই কল করে খবর নিচ্ছিল, আমি হারিয়ে যাচ্ছি কিনা! গতকাল সারাদিন অফিস ফাঁকি দিয়ে আমার সাথে সঙ্গ দিয়েছে চট্টগ্রাম শহর ঘুরে দেখার জন্য। আজ আর পারেনি। তাই ফোনে যতটুকু সহায়তা করা যায়, করছে।

বাইরের দেয়ালের চিত্রকর্ম। সোর্স: লেখিকা

জিইসি মোড় থেকে রিকশাওয়ালা সিমেট্রি আসার জন্য ভাড়া চেয়েছিল ৫০ টাকা। নিলয় বলেছিল, এখান থেকে হেঁটে যেতে বড়জোর পনেরো মিনিট লাগবে। বাদশা মিয়া সড়কের মোড় পর্যন্ত হেঁটে আসতে লাগলো সাত মিনিট। তারপর বাদশা মিয়া সড়কে পা বাড়িয়েই বুঝলাম, কেন রিকশাচালক এত টাকা চেয়েছে। এই রাস্তাটা ক্রমশ খাড়া উপরের দিকে উঠে গিয়েছে। এত উপরে টেনে নিতে রিকশাওয়ালার জান বেরিয়ে যেত।

বাইরের দেয়ালের চিত্রকর্ম। সোর্স: লেখিকা

উপরে উঠে সবে সিমেট্রির সীমানা ধরে এগুচ্ছি, তখনই নিলয় ফোন করে বলল, ‘এখনো সম্ভবত সিমেট্রির গেট খোলেনি। তুই এক কাজ কর, কাছেই সিমেট্রির গেটের অপর পাশে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা। তুই একটু খুঁজলেই পেয়ে যাবি।’
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘কী বলিস? বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এত দূরে চারুকলা? তা হয় নাকি? তুই নিশ্চিত?’

উত্তরে ও হেসে বলল, ‘হ্যাঁ, চারুকলা বিভাগটা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যম্পাসের বাইরেই। আমি অনেকদিন আগে এসেছিলাম, তাই এক্সেক্ট লোকেশনটা তোকে বলতে পারছি না। তুই একটু এগিয়ে গিয়ে দেখ। কোনো সমস্যা নাই, এটা সর্বসাধারণের জন্য খোলা। তুই দেখলেই বুঝবি কোনটা চারুকলা।’

বাইরের দেয়ালের চিত্রকর্ম। সোর্স: লেখিকা

সিমেট্রির গেট খোলা। তবুও আমি পাহাড়ি এই খাড়াই রাস্তা বেয়ে উঠে গেলাম। একটু সামনে যেতেই চোখে পড়লো ওটা। না, চারুকলার গেট নয়। আমার চোখে প্রথমেই পড়ল চারুকলা ইনস্টিটিউটের ঠিক বিপরীতে পাহাড়ের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা দেয়ালটার দিকে। পুরো দেয়াল জুড়ে চমৎকারভাবে আঁকা আছে রঙের কারুকাজ। ওসব দেখে নিয়ে ধীর পায়ে নিস্তব্ধ চারুকলা ইনস্টিটিউটের গেটের হুড়কো খুলে ভিতরে ঢুকলাম।

আর্ট গ্যালারি। সোর্স: লেখিকা

চারুকলা ইনস্টিটিউট চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ও মানববিদ্যা অনুষদের অন্তর্ভুক্ত একটি অন্যতম ইনস্টিটিউট। ১৯৬৯ সালে শিল্পী রশিদ চৌধুরীর উদ্যোগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের অধীনে ‘সহায়ক’ বিষয় হিসেবে শিল্পকলা বিষয় অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে চারুকলা শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়। পরবর্তীতে ১৯৭০ সালে রশিদ চৌধুরীকে বিভাগীয় প্রধান নিযুক্ত করার মধ্য দিয়ে স্বতন্ত্রভাবে এই বিভাগ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। 

শুরুতে কলা ও মানববিদ্যা অনুষদের ড. আবদুল করিম ভবনে এই বিভাগের সকল কার্যক্রম পরিচালিত হতো। ১৯৭৩ সালে রশিদ চৌধুরীর উদ্যোগে শিল্পী সবিহ্-উল আলমকে প্রিন্সিপাল নিযুক্ত করে নগরীর বাদশা মিয়া সড়কে চট্টগ্রাম সরকারি চারুকলা কলেজ নামে আলাদা একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু হয়।

ভাস্কর্য শিল্প। সোর্স: লেখিকা

দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা বিভাগের পাশাপাশি এই প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হওয়ার পর ১৯৯৯ সালে সর্বপ্রথম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ এবং চট্টগ্রাম সরকারি চারুকলা কলেজকে একীভূত করে একটি ইনস্টিটিউট তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। তৎকালীন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন অধ্যাপক আবদুল মান্নান।

১৯৯৯ সালের ১১ মার্চ, চারুকলা বিভাগ ও চট্টগ্রাম সরকারি চারুকলা কলেজকে একীভূত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক ‘চারুকলা ইন্সটিটিউট’ ঘোষণা দিয়ে একটি গেজেট প্রকাশিত হয়। তবে পরবর্তীতে আইনগত সমস্যা এবং বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আপত্তি প্রকাশের কারণে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইন্সটিটিউট নির্মাণের এই প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ সময় ধরে স্থগিত রাখা হয়।

আর্ট গ্যালারির সিঁড়ির পাশের ভাস্কর্য। সোর্স: লেখিকা

২০১০ সালের ২ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে প্রেরিত এক চিঠিতে চট্টগ্রাম সরকারি চারুকলা কলেজের অস্থাবর সকল সম্পদ ডিউ অব গিফটের আওতায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিকট হস্তান্তরের মাধ্যমে একে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে একীভূত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন চারুকলা ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই চিঠির প্রেক্ষিতে ২০১১ সালে নগরীর মেহেদিবাগের বাসিন্দা মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম চট্টগ্রাম সরকারি চারুকলা কলেজকে আত্মীকরণ এবং প্রতিষ্ঠানের সকল সম্পত্তি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক হস্তান্তর সম্পূর্ণ অবৈধ উল্লেখ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট ডিভিশনে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন।

উচ্চ আদালত এই রায় স্থগিত রাখেন। তবে এই স্থগিত আদেশ বলবৎ থাকাকালীন সময়ে ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে মাসে, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদেরকে কোনো প্রকার ঘোষণা না দিয়েই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চারুকলা কলেজকে আত্মীকরণ করে চারুকলা বিভাগকে বাদশা মিয়া সড়কে স্থানান্তরিত করে। একই বছর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থেকে আলাদা হয়ে এ ইনস্টিটিউট কার্যপরিচালনা শুরু করে। 

শিল্পী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনকে পরিচালক নিযুক্ত করে নতুনভাবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের কার্যক্রম শুরু হয়। ২০১১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি নগরীর বাদশাহ মিয়া চৌধুরী সড়কে বর্তমান চারুকলা ইনস্টিটিউটের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে এখানে ৩০ জন অনুষদ সদস্য রয়েছেন, পাশাপাশি সর্বমোট ৭০টি আসন রয়েছে।

সূর্যের আলোর ঝলকে অদ্ভুত রঙের খেলা তৈরি করেছে সিঁড়িগুলো। সোর্স: লেখিকা

ঢুকতে প্রথমেই চোখে পড়লো, শিল্পী রশিদ চৌধুরী আর্ট গ্যালারি। বছর দুয়েক আগে এখানে স্কাল্পচার নেটওয়ার্ক নামে জার্মানি-ভিত্তিক সংগঠনের উদ্যোগে ‘প্রকৃতি’ শিরোনামে একটি আন্তর্জাতিক ভাস্কর্য প্রদর্শনী পরিচালিত হয়। আন্তর্জাতিকভাবে এই প্রদর্শনী সপ্তমবারের মতো আয়োজিত হয়েছে। ভাস্কর্যশিল্প আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সৃষ্টিতে বিশ্বের ১৮টি দেশের ৫৮টি স্থানে প্রদর্শনীর আয়োজন করে।

ওখান দিয়ে এগিয়ে সামনে যেতেই পুরো ইন্সটিটিউটের সবচেয়ে সুন্দর অংশটি নজরে এলো। চমৎকার কিছু ভাস্কর্য সার বেঁধে রাখা হয়েছে ওখানটায়। এটার পাশ দিয়েই নেমে গেছে অনেকগুলো সিঁড়ির ধাপ। তরতর করে নিচে নেমে উপরের দিকে তাকালাম। সিঁড়ির ধাপগুলো জায়গায় জায়গায় ক্ষয়ে গিয়েছে। তবুও এগুলো বিশেষত্ব ধারণ করে আছে। প্রত্যেকটি সিঁড়ি রঙ করা। ফলে সূর্যের আলোর ঝলকে অদ্ভুত রঙের খেলা তৈরি করেছে। সিঁড়ির পাশের দেয়ালে আঁকা আছে চিত্রকর্ম।

সিঁড়ির পাশের দেয়ালে আঁকা আছে চিত্রকর্ম। সোর্স: লেখিকা

আরো কিছু সিঁড়ির ধাপ আরো নিচে নেমে গেছে। এখানটায় এসে দেখলাম, কিছু ভাস্কর্য নির্মাণাধীন অবস্থায় পড়ে আছে। এতক্ষণ পর্যন্ত কোথাও টু শব্দের আওয়াজ না পেলেও, এখানে এসে একজন লোকের সাথে দেখা হয়ে গেল। আমি কিছু না বলে উপরে উঠে এলাম।

তবে আগের রাস্তা ধরে যাইনি। মূল ভবনের আঙিনায় ওঠার জন্য আরোও একটা সিঁড়ি পথ আছে। এই সিঁড়িপথটুকু আরো নান্দনিক। ঘুরে ঘুরে একটু পর পর অল্প কিছু কিছু সিঁড়ির ধাপ। আমি এভাবে ঘুরে ঘুরেই উঠলাম। এই সিঁড়িগুলোর পাশের দেয়ালে আঁকা আছে ট্রাইবাল নৃত্য।

ট্রাইবাল নৃত্য। সোর্স: লেখিকা

মূল ভবনের দেয়ালে ১৪২৩ সালের বর্ষবরণের জন্য আঁকা হয়েছে। ওতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বাংলার গ্রামীণ চিত্র। মূলত এই প্রতিষ্ঠানটির যেখানেই খালি দেয়াল আছে, সেখানেই আঁচড় পড়েছে রঙ তুলির শৈল্পিকতা।

বর্ষবরণের জন্য আঁকা বাংলার গ্রামীণ চিত্র। সোর্স: লেখিকা

কীভাবে যাবেন:

চট্টগ্রামের জিইসির মোড় থেকে সোজা পূর্ব দিকে কিছু দূর এগিয়ে গেলে একটা তিন রাস্তার চত্বর পাওয়া যাবে। ওটা পেরিয়ে একটু সামনে এগুলেই বাদশা মিয়া সড়ক। এই সড়ক ধরে হেঁটে গেলেই চারুকলা পাওয়া যাবে খুব সহজেই। আমি সাজেশন দেব এখানে রিকশা নিয়ে না আসার। জিইসি থেকে হেঁটে আসাই ভালো উপায়। তবে কেউ সিএনজি করে আসতে চাইলে, অনায়াসেই আসতে পারবে।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

যে ১২টি জায়গায় প্রাকৃতিক ভূদৃশ্যের সাথে প্রকৃতি মেতে ওঠে

কোণার্ক সূর্য মন্দিরের অসাধারণ চিত্রকলা ও অতীত ইতিহাস