নৈনিতালের অভিজাত নানক হোটেল

লেকের পাড়ে গাড়ি রেখেই প্রথমে ছুটলাম দুই দিনের জন্য একটি মান সম্মত হোটেল বা থাকার জায়গা খুঁজে পেতে। যদিও বাজেট একটা বড় ব্যাপার। কারণ আমাদের বাজেট সাধারণত ১,২০০-১,৫০০ এর মধ্যেই আমরা রাখার চেষ্টা করি। যদিও কখনো কখনো এই বাজেট বেড়ে যায় সেটা আমরা মাথাতে রাখি আর এই জন্যই চেষ্টা করি ১,২০০ এর নিচে যদি পাওয়া যায়! কিন্তু নৈনিতালে যে ১,০০০ টাকায় কোনো হোটেল পাবো না সেটা এই শহরে ঢুকতেই বেশ বুঝতে পারছিলাম।

যে কারণে আমরা ১,৫০০ টাকার বেশী হলেও রুম নিয়ে নেব বলে ঠিক করে রেখেছিলাম দুটি কারণে। এক, হোটেল খুঁজে খুঁজে সময় নষ্ট করা যাবে না। আর দুই, সবাই বেশ ক্লান্ত ছিল সারাদিনের লম্বা জার্নি করে। তাই বাজেট যতটা সম্ভব সাধ্যের মধ্যে রেখেই দুই একটি হোটেল দেখে উঠে যেতে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।

হোটেলের বেলকোনি থেকে। ছবিঃ লেখক

আল্লাহর রহমতে ভাগ্য আমাদের ভীষণ রকমের ভালো ছিল। কারণ একদম প্রথমে যে হোটেলে রুম দেখতে গিয়েছিলাম, সেই হোটেলের বাইরে থেকে দেখে তেমন পছন্দ না হলেও, ভেতরের সিঁড়ি দিয়ে উপরে ওঠার সময় আর রুম দেখতে গিয়ে তো নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম এই হোটেল আমাদের জন্য নয়। এর মানের সাথে যে দাম হবে সেটা আমাদের সাধ্যের অনেক বাইরে হবে। হোটেলের রিশেপসন কক্ষ ততটা বনেদী না হলেও, সিঁড়ি টাইলস, রুমের আকার, ধবধবে নরম বিছানা, মনকাড়া কম্বল, বিশাল ওয়াশরুম, দেয়ালে ঝোলানো টিভির আকার দেখেই সেটা বুঝতে পেরেছিলাম।

আর বেলকোনিতে গিয়ে তো আরও বেশি করে আফসোসে পুড়েছিলাম যে ইশ এই হোটেলে থাকতে পারলে কী দারুণ-ই না হতো। কারণ বেলকোনিতে দাঁড়ালেই পুরো নৈনিতালের টলটলে জলের, ঝলমলে হাসিতে হেসে থাকা রূপালী জলের লেক আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। যার চার দিকেই পাহাড়ের দেয়াল দ্বারা সুরক্ষিত সব সময়। আর পাহাড়ের ঢালে ঢালে রয়েছে নানা রকমের স্থাপনার আকর্ষণ। কিন্তু সেই সব দেখে, কিছুটা আক্ষেপ নিয়েই নিচে নেমে এলাম। দেখেছি যেহেতু, ভাড়াটা জিজ্ঞাসা করেই যাই একবার। মন তো মানবে যে এত ভাড়া দেবার সাধ্য আমাদের নেই।

হোটেলের দোতালায় ওঠার সিঁড়ি। ছবিঃ লেখক

ভাড়াটা আসলেই আমাদের ভাবনার চেয়েও বাইরে। অনেক অনেক বেশী। ৮,০০০ রুপী একটি চার বেডের রুমের ভাড়া। উহ, শুনেই পারলে সাথে সাথেই নেমে যাই। কিন্তু আমাদেরকে ভীষণ অবাক করে দিয়ে হোটেলের ম্যানেজার জানালো তবে সেটা শুধু পিক আওয়ারে। মানে যখন রুমের চাহিদা বেশী থাকে। যেটার শুরু হবে ২৫ ডিসেম্বর মানে বড় দিনের শুরু থেকে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত। তবে আমরা যদি চাই তবে ২৩ আর ২৪ ডিসেম্বর এই দুই দিনের জন্য ২,২০০ রুপীতেই নিতে পারবো! দুই পরিবারের জন্যই চার বেডের এক বিশাল রুম! সত্যি শুনলাম কিনা জানি না। কিছুটা না, ভীষণই অবাক হয়েছি। ভাবা যায় ৮,০০০ রুপীর রুম মাত্র ২,২০০ রুপীতে দিতে চায়!  

তারপরেও সুযোগ যেহেতু পেয়েছি-ই, তাই অভ্যেস বশত আবারো সেই দরদাম করে ২,২০০ এর পরিবর্তে ২,০০০ রুপীতে ঠিক করে ফেললাম অভিজাত নৈনিতালের এক অভিজাত হোটেলের দারুণ মনকাড়া, মন ভালো করা ঝকঝকে থাকার জায়গা। হোটেল নানকে। সবাই দারুণ খুশি, ভীষণ আনন্দিত, মনের মতো রুম পেয়ে আর সময় নষ্ট না হওয়াতে। তবে আমি নিশ্চিত সবাই এরচেয়েও বেশী খুশি হয়েছিল রুমের বাইরে গিয়ে সেখান থেকে নৈনিতালের প্রধান আকর্ষণ এর লেকের সম্পূর্ণ ভিউ দেখে। কারণ কোনো রকমে রুমে ব্যাগপত্র এসে যাওয়ার পরেই, সবাই এক ছুটে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম আমাদের অভিজাত হোটেলের অপূর্ব আকর্ষণের সেই বেলকোনিতে। অনেকটা সময় সেখানে কাটিয়ে অবশেষে রুমে ফিরেছিলাম ক্ষুধা অনুভব করাতে।

হোটেলে ওঠার পথ। ছবিঃ লেখক

রুমে ফিরে, গরম পানিতে সবাই যে যার মতো ফ্রেশ হয়ে, নরম তুলতুলে বিছানায় একটু শরীর ডুবিয়ে দিলাম কম্বলের নিচে। আর সাথে সাথে বোধহয় জেঁকে ধরেছিল রাজ্যের ক্লান্তি। কারণ আরামের আর উষ্ণ বিছানা পেয়ে সবাই ক্ষুধা ভুলে গিয়ে একটু আয়েশ করে দুইচোখ বুজে ফেলেছিলাম। আর আধো ঘুমে আধো জাগরণেই নিজেদের মধ্যে আলাপ করছিলাম যে, এত এত ভালো মানের আর সাধ্যের মধ্যে দামের হোটেল যে এত দ্রুত পেয়ে যাবো সেটা আমরা ভাবতেই পারিনি।

অন্দরের আয়োজন। ছবিঃ লেখক

আসলে উপরওয়ালা সবাইকেই কিছু না কিছু দিয়ে থাকে। শুধু কষ্ট বা যন্ত্রণাই থাকে না সব সময়, যেমন থাকে না শুধু সুখ আর হাসি আনন্দ সব সময়। ঠিক তেমনই অনেক লম্বা পথের আর দীর্ঘ সময়ের বেশ কষ্টের আর নানা রকম ক্লান্তির শেষে বিধাতা আমাদের জন্য উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন নৈনিতালের শহরের লেকের পাড়েই এক অভিজাত হোটেলের আরাম আয়েশ আর আনন্দে কাটানোর জন্য দুটি দিন। আর সেটা অবশ্যই সবার সাধ্যের মধ্যেই।

রুম ভাড়ার তালিকা। ছবিঃ লেখক

সবার ফ্রেশ হওয়া আর কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে ক্লান্তি দূর করার পরে, অবশেষে একদম শেষ বিকেলে বা বলা যায় প্রায় সন্ধ্যায় নেমে যাওয়ার মুখে বেরিয়ে পড়েছিলাম খাওয়া দাওয়া করতে আর ঘুরে ঘুরে দেখতে এক নতুন শহর, এক অন্য রকম পাহাড়ি আকর্ষণ, এক অনিন্দ্য সুন্দর পাহাড় ঘেরা লেকের আলোকিত আর অভিজাত শহর নৈনিতাল। অবাক ব্যাপার ছিল এই যে এই পাহাড়ি শহরের সাথে আমি অন্য পাহাড়ি শহরের তেমন একটা মিল খুঁজে পেলাম না। এটা একদমই এক ভিন্ন আমেজের আর অন্য রকম স্বাদের, উপভোগের পাহাড়ি শহর, নৈনিতাল।

হোটেল নানক। ছবিঃ লেখক

ঢাকা থেকে নৈনিতাল যেতে হলে বাসে, ট্রেনে বা প্লেনে কলকাতা থেকে দিল্লি হয়ে কাঠগোদাম যেতে হবে। কাঠগোদাম থেকে বাসে বা ট্যাক্সিতে করে এক ঘণ্টার পথে যাওয়া যায় শৈল শহর নৈনিতালে।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কায়াকে করে বাংলা চ্যানেল পাড়ি দুই অভিযাত্রীর

তিলাবনী পাহাড়ে জুমারিং-র‍্যাপ্লিং ক্লাসের বৃত্তান্ত