ট্রেকিংয়ে শক্তির রহস্য আপেল টনিক!

dig

আমার মনে হয় শুধু আমার নয়, পাহাড়ে এমন সীমাহীন কষ্টের মুহূর্ত সবাই কমবেশি উপভোগ করেছেন, যারা পাহাড়ে যান, পাহাড় ভালোবাসেন আর পাহাড়ে পাহাড়ে হেঁটে বেড়ান। না, পাহাড়ে যাবার সময় কোনো কষ্টকেই কেন যেন কখনো তেমন কোনো কষ্ট মনে হয় না। কিন্তু প্রতিবার পাহাড়ে চড়া যখন শেষ হয়, পাহাড়ে হাঁটা, ঘুরে বেড়ানো বা ট্রেকিং যখন শেষ হয়, যখন ঘরে ফেরার পথ ধরি, তখনই এই রকম অদ্ভুত, অসহ্য আর অসহনীয় অনুভূতির শিকার হই।

প্রতিটা স্টেপে স্টেপে যেন নানা রকম দুঃখ, কষ্ট আর যন্ত্রণা জেঁকে বসে। বারে বারে মনে হয় কেন যে এলাম এত কষ্ট করতে! আর এসব যদি মনে নাও হয়, বারে বারে ট্রেক শেষ না হওয়া পর্যন্ত মনে হয় আর পাহাড়ে আসবো না, আর এত এত কষ্ট করতে পারবো না।

ফেরার মুগ্ধ পথ, কিন্তু মুগ্ধতা ছিল না! ছবিঃ লেখক

এই ভাবনাগুলো আমি ভুজবাসা থেকে গাঙ্গোত্রী ট্রেক শুরু করার আগেই মাথায় এসে চেপে বসেছিল। কিন্তু তখন নিজেকে নানা রকম অনুপ্রেরণা দিয়ে ভাবনাকে মাথা চাঁড়া দিয়ে উঠতে দেইনি। নিজেকে শান্ত রেখে বেশ দ্রুতই এক টানা চিরবাসা এসে গেছি। ভীষণ ক্লান্ত শরীরে, ভারী ব্যাগটা যখন কাঁধ থেকে নামাই, শরীরকে আর ধরে রাখতে পারেনি অবসন্ন পা দুটি।

ব্যাগের সাথে নিজের শরীরটাকেও সঁপে দিয়েছিলাম পাথরের উপরে। ব্যাগের সাথেই পাথরের উপরে ঠেস দিয়ে বসে ধীরে ধীরে কাঁধ থেকে ব্যাগ ছাড়িয়ে ছিলাম। সেই মুহূর্তে আর কিছুই ভালো লাগছিল না, কিছুই না। না পাহাড়, না নদী, না ঝর্ণা, না সবুজ, না কোনো প্রকৃতি! সব কিছুই কেমন যেন তিক্ততায় ভরে উঠেছিল। মন মেজাজ দারুণ রুক্ষ আর মেজাজের কর্কশ অবস্থা হয়েছিল ভীষণ রকমের।  

চিরবাসা ফেরার পথে। ছবিঃ লেখক

মনে হচ্ছিল আর বোধহয় এগোতে পারবো না আজ। এখানে, এই চিরবাসাতেই কী থেকে যেতে হবে আজ? অনেক অনেকক্ষণ চুপ করে রোদের মাঝে ঝিম মেরে বসে থাকার পরে একটু ভালো লাগতে শুরু করলো। একটু ভালোলাগার অনুভূতি হতেই কিছু খেয়ে শরীরে শক্তি ফিরিয়ে আনার জন্য ঝটপট চায়ের অর্ডার দিয়ে বিস্কিট, পানি, খেজুর খুলে খেতে শুরু করলাম।

এসব শেষে চায়ের উষ্ণতায় কিছুটা বিষণ্ণতা কাটাতে কাটাতে মনে পড়লো। আরে আমার ব্যাগে তো একটা বিশাল সাইজের আপেল আছে, সেটা শুধু শুধু আর ব্যাগে বহন করে ব্যাগের ওজন বাড়ানোর কোনো মানে হয় না। ইচ্ছা না করলেও সেটা খেয়ে নেব বলে ব্যাগ থেকে বের করে অনিচ্ছার কামড় বসাতে শুরু করলাম।

ট্রেকিং টনিক আপেল! ছবিঃ লেখক

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কী যেন কী হয়ে গেল কে জানে। আপেলে প্রতিটা কামড়ের সাথে সাথে যেন বিষণ্ণতা দূর হয়ে, অবসন্নতা কেটে গিয়ে শরীরে নতুন উদ্যম পেতে শুরু করলাম অদ্ভুতভাবেই। এরপর দারুণ আয়েশ করে আপেল খেতে লাগলাম রসিয়ে রসিয়ে, একই সাথে স্বাদ আর শারীরিক শক্তি ফিরে পেয়ে। বিশাল সাইজের একটি আপেল যেটা অন্তত ২৫০ গ্রাম ওজন তো হবেই।

আপেল শেষ করতে করতে পেট পুরো ভরে গেল। আপেল শেষ হতেই যেন পুরো শরীরে পূর্ণ শক্তি ফিরে পেলাম! আর তখনই ভাবলাম এখন, বাকি পথটুকু আরও যতটা দ্রুত সম্ভব ট্রেক করবো। তখনো ৮ কিলোমিটার দারুণ উত্থান পতনের আর ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি ট্রেইল, গিরিখাত, ঝুলন্ত সেতু দিয়ে খরস্রোতা গঙ্গা পেরিয়ে যাওয়ার ভয়াবহতা রয়েছে জেনেই।

ফিরে আসার কষ্টের পথ। ছবিঃ লেখক

তবে কী অদ্ভুত ব্যাপার যে ঘটে গেল আপেল শেষ হয়েই পুরোপুরি তরতাজা হয়ে গেলাম যেন মুহূর্তেই! আপেলের নানা রকম গুণ আছে জানতাম, জানতাম এটা অনেক উপকারী, দারুণ কাজে দেয় শারীরিক নানা সমস্যায়, কিন্তু তাই বলে এতটা? কল্পনাতীত ছিল যে সেটা। ঠিক তখনই মনে পড়লো আর চোখে ভেসে উঠলো যে গতকাল যাবার সময় আর আজকে একদম সকালে ভুজবাসা থেকে গোমুখ ট্রেক শুরু করার ঠিক আগে আগে প্রায় সবগুলো আর্জেন্টাইনকেই দেখেছি আপেল খাচ্ছে।

তখন মনে মনে ভেবেছিলাম এত সকাল সকাল হাভাতের মতো আপেল খাচ্ছে কেন সবাই? এমনকি আগের দিনও যখন যেখানে রেস্ট নিয়েছে, সেখানেই অনেককে দেখেছি আপেল খাচ্ছে! তখন ওদের এই আপেলে মশগুল থাকা দেখে মনে মনে ভেবেছি, আসলে ওরা তো আর আমাদের মতো যা তা খায় না, ফলই হলো ওদের খাদ্যের অন্যতম একটা মেন্যু, তাই সুযোগ পেলেই ভাত বা রুটির পরিবর্তে ফল বা আপেল খাচ্ছে।

আপেল নয়, পাহাড়ি বন্ধু! ছবিঃ লেখক

তখন ওদেরকে বোকা, গাধা আর আপেল খেকো মনে হলেও, আজ এই চিরবাসায় বসে নিজে আপেল খেয়ে আর সাথে সাথে আপেলের শক্তি আর মানসিক পরিবর্তন দেখে নিজেকেই নিজে আহাম্মক উপাধি দিতে বাধ্য হলাম। আর বুঝে গেলাম যে আপেলের কী গুণ আর আপেলের কী জীবনী শক্তি, আপেলের কী তাৎপর্য। বিশেষ করে তাৎক্ষনিক শারীরিক ও মানসিক শক্তি ফিরে পেতে, নতুন উদ্যমে পথ চলা শুরু করতে। আরও সেটা যদি হয় পাহাড়ের মতো রুক্ষ জায়গায় তাহলে তো কথাই নেই। এরপর আর কোনো দিকে না তাকিয়ে পথ চলতে শুরু করলাম। সাথে মনের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা আর অনুপ্রেরণা ছিল, ব্যাগে আরও আপেল আছে মনে করে।

হাঁটতে হাঁটতে নতুন উপলব্ধি আন্দোলিত করছিল, যে আসলেই পাহাড় মানুষকে অনেক কিছু দেখায়, উপলব্ধি করায়। এই যেমন আপেলের অনেক গুণ জানতাম কিন্তু সেটা যে এত দ্রুত সেটা কি আদৌ ভেবেছি কোনোদিন? আজকে পাহাড়ে দারুণ কষ্টের ট্রেকে এসে জানলাম। আর তাই ঠিক করেছি, এখন থেকে পাহাড়ে যখনই যাবো খুঁজে খুঁজে হলেও নিজের কাছে আপেল রাখবোই রাখবো। এত দারুণ একটা ট্রেকিং টনিক সাথে না রাখার কোনো মানেই নেই।

ফিরে আসার সেই রুক্ষ পথে… ছবিঃ লেখক

আর শুধু তাই নয়, আসছে আপেলের মৌশুম, মানে শীতকালে অস্ট্রেলিয়ান আপেলের বেশ রমরমা অবস্থা থাকে, তাই অন্যান্য বছরের মতো আমি এবারও আপেলের উপর জোর দেব। শুধু অন্যান্য বছরের মতো নয় তার চেয়ে ঢের বেশী। প্রতিদিন আমার অস্ট্রেলিয়ান আপেল এক বা একাধিক চাই-ই চাই। আর এরপর থেকে পাহাড়ে গেলে তো আর কথাই নেই। তাই আজকাল আমার বাসায় দুই দিনে এক কেজি করে অস্ট্রেলিয়ান আপেলের উৎসব শুরু হয়েছে। চলবে যতদিন এমন স্বাদের আর দামের আপেল বাজারে পাওয়া যাবে। 

আর যাই হোক, এত শুধু আপেল নয়, একটা টনিক। আপেল টনিকে আপাতত মশগুল আছি আর থাকবো।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফারাও

ফারো আইল্যান্ড: ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে ৫০০ বছর ধরে সংগ্রাম করছে যে দ্বীপের মানুষ

ইউরোপের চারটি বাজেট ট্যুর