কলকাতা কালীঘাট: প্রাচীন এক ধর্মীয় তীর্থক্ষেত্রের ইতিকথা

মায়ের পায়ের জবা হয়ে উঠো না ফুটে মন

আমার মায়ের পায়ের জবা হয়ে উঠো না ফুটে মন

তার গন্ধ না থাক যা আছে সে নয়রে ভূয়ো আবরণ

মায়ের পায়ের জবা হয়ে উঠো না ফুটে মন।

বাঙালির তন্ত্র সাধনা আর মাতৃ সাধনার ইতিহাস বেশ পুরনো। আর এই দুই সাধনাই মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে দেবী কালী’র আরাধনায়। হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষেরা অনাদিকাল থেকেই পুজো করে আসছে মা কালীর। তাই বিভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার মন্দির। এদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত মন্দিরগুলোর একটি কলকাতার কালীঘাটে অবস্থিত কালী মন্দির। কালীঘাটের মন্দিরটি হুগলী নদী যা আদিগঙ্গা নামে খ্যাত- তার তীরে অবস্থিত। চলুন আজ ঘুরে আসা যাক এই প্রাচীন মন্দির থেকে।

দেবী কালী হিন্দুধর্মের একজন প্রধান উপাস্য; ছবি: Pinterest

কালীঘাটের পীঠ দেবী হলেন দেবী কালী আর পীঠ রক্ষক হলেন দেবতা নকুলেশ্বর। মহাদের শিবই এই অভিধায় ভূষিত! এখানে দেবী কালীর যে রূপ পূজিত হয় তার নাম দক্ষিণা-কালী। মহাদেব শিবের বুকের পরে দেবীর দক্ষিণ পা থাকে বলেই দেবী দক্ষিণা-কালী নামে পরিচিত। এটিই দেবী কালীর সবচেয়ে পরিচিত রূপ। এছাড়া দেবী কালীর আরো দুটি রূপ আছে। একটি মহাকালী যাকে মৃত্যুর প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এবং অন্যটি শ্মশানকালী- তান্ত্রিকেরা দেবীর যে রূপটি পুজো করে থাকে।
কালীঘাট মন্দির বা কালী ক্ষেত্র একান্নটি শক্তিপীঠের একটি। পৌরাণিক কিংবদন্তি অনুযায়ী, একবার দক্ষরাজ যজ্ঞ করেছিলেন। সেখানে সবাইকে আমন্ত্রণ জানালেও নিজের কন্যা-জামাতাকে আমন্ত্রণ জানাননি। সতী বিনা নিমন্ত্রণে যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হলে সবাই মহাদেবের নিন্দা করেন। এতে সতী দেহত্যাগ করেন।
ক্রুদ্ধ হয়ে মহাদেব শিব যখন তার দেহ কাঁধে নিয়ে প্রলয় নৃত্য আরম্ভ করেছিলেন, তখন বিষ্ণু তার সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহকে খণ্ডবিখণ্ড করে দেন। তখন তাঁর ডান পায়ের চারটি (মতান্তরে একটি) আঙুল এখানে পড়েছিল। কালীঘাট একটি প্রাচীন তীর্থস্থান। কোনো কোনো গবেষকের মতে “কালী ক্ষেত্র” বা “কালীঘাট” কথাটি থেকে “কলকাতা” নামটির উদ্ভব হয়েছে।
কালীঘাট মন্দির; ছবি: উইকিপিডিয়া

কলকাতার বর্তমান কালীঘাট মন্দিরটিকে যেভাবে আমরা দেখি সেটি নির্মিত হয়েছে দু’শ বছরেরও বেশি আগে। ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে বড়িশার বিখ্যাত জমিদার সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের উদ্যোগে বর্তমান মন্দিরটি নির্মিত হয়। নিপুণ পোড়ামাটির টেরাকোটা দিয়ে মন্দিরটি সাজানো হয়েছিল। পরে মন্দিরের পোড়ামাটির কাজ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় জনৈক সন্তোষ রায়চৌধুরী ২৫ হাজার টাকা দিয়ে মন্দির সংস্কার করেছিলেন।
মন্দিরটি প্রায় নব্বই ফুট উঁচু। আট বছর ধরে আটচালা রীতিতে মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল। মূল মন্দিরের সাথে আরো অনেকগুলো ছোট ছোট মন্দির রয়েছে। মোট ৬টি মন্দির নিয়ে কালীঘাট মন্দির গঠিত- ষষ্ঠী তলা, নাট মন্দির, জোড় বাংলা, হারকাঠ তলা, রাধা কৃষ্ণ মন্দির এবং কুণ্ড পুকুর। মূল কালী মন্দিরের উত্তর-পূর্ব কোণে পীঠ রক্ষক ভৈরব নকুলেশ্বরের মন্দির।
আদি মন্দিরটি কত পুরনো তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। মন্দির সংলগ্ন অঞ্চলে গুপ্তযুগের রাজা কুমারগুপ্তের মুদ্রা পাওয়া গেছে। এ থেকে ধারণা করা হয়, সেই প্রাচীন আমলেও এটি একটি পীঠস্থান ছিল। কালীমূর্তি নিয়ে অনেক কিংবদন্তী প্রচলিত আছে। একটি কাহিনী অনুসারে, একজন ব্রাহ্মণ ভক্ত ভ্রমণকালে আদি গঙ্গায় একটি উজ্জ্বল আলোর রেখা দেখতে পান। দেবীর নির্দেশে তিনি সেখানে গিয়ে দেখতে পান একটি পাথর খণ্ড থেকে আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। পাথরটি পায়ের পাতার মতো দেখতে। একই সাথে মহাদেব শিব যিনি এখানে নকুলেশ্বর ভৈরবের নামে পূজিত হন, তারও একটা মূর্তি পেয়েছিলেন। সেই ভক্তই কালী মূর্তি এবং ভৈরব মূর্তি স্থাপন করেন।
কালী প্রতিমা; ছবি: Remote Traveler

ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রাচীনকালে কালীঘাট মন্দিরটি একটি কুঁড়েঘরের মতো ছিল। লোক সমাগমও ছিল কম। কারণ গভীর বনের মধ্যে খরস্রোতা হুগলী নদীর পাড়ে ছিল দেবীর আরাধনা স্থান। দুর্গম বিপদসংকুল জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এখানে পুজো দিতে আসতে হতো। বারো ভুঁইয়াদের অন্যতম যশোররাজ প্রতাপাদিত্যের কাকা বসন্ত রায় এখানে একটি মন্দিরটি নির্মাণ করে দিয়েছিলেন।
সেটি জীর্ণ হয়ে গেলে এটি নির্মাণ করে দেয় সাবর্ণ জমিদাররা। ১৮৩৫ সালে তৈরি হয় নাট মন্দির। বিখ্যাত ষষ্ঠীতলা তৈরি হয় ১৮৮০ সালে গোবিন্দদাস মণ্ডলের উদ্যোগে। এই ষষ্ঠীতলার সেবার অধিকার কেবল নারীদের জন্যই সংরক্ষিত। হাড়কাঠতলা, কাককুণ্ড- মন্দির তৈরির শুরু থেকেই ছিল।
পঞ্চদশ শতকের মনসা ভাসানের গানের কথায় কালীঘাটের উল্লেখ আছে। এছাড়া সপ্তদশ শতকে কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চণ্ডীমঙ্গলেও কালীঘাটের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই মন্দির ইতিহাস, পুরান, লোককথা আর হাজারো ভক্তের ভক্তির সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। প্রতিদিন সহস্র মানুষ এখানে আসেন তাদের আরাধ্য দেবীর মুখদর্শন করতে- নিজের আত্মাকে শান্তি দিতে।
আদি গঙ্গা; ছবি: Kalighattemple.com

কীভাবে যাবেন?

কালীঘাট মন্দির দক্ষিণ কলকাতায় অবস্থিত। কলকাতার সব জায়গা থেকেই এখানে যাওয়ার বাস রয়েছে। দক্ষিণ কলকাতাগামী সকল বাসই শ্যামা প্রসাদ রোড দিয়ে যায়। কালীঘাট মন্দির এই রোডের পাশেই অবস্থিত। বাস থেকে কালীঘাট বাস স্ট্যান্ডে নেমে কালীঘাট রোড ধরে এগিয়ে গেলেই সেই বিখ্যাত মন্দির। মেট্রো রেল থেকেও কালীঘাটে যাওয়া যায়। সবচেয়ে কাছের মেট্রো স্টেশন দুটি হলো উত্তরদিকে যতীন দাস পার্ক স্টেশন আর দক্ষিণদিকে কালীঘাট স্টেশন।
মন্দির ভোর পাঁচটা থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত খোলা থাকে। আর বিকেল পাঁচটা থেকে রাত সাড়ে দশটা পর্যন্ত খোলা থাকে। দুপুর দুইটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত মায়ের ভোগের জন্য খোলা থাকে। সকাল এবং সন্ধ্যায় দুইবার আরতি সম্পন্ন হয়। শনিবার আর মঙ্গলবার- এই দুইদিন বিশেষ দিন। তবে আপনি যদি একটু কম ভিড় পছন্দ করেন তাহলে বুধবার কিংবা বৃহস্পতিবার বেছে নেওয়াই উচিত হবে। সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য আলাদা লাইন রয়েছে। এছাড়া আরো তিনটি লাইন রয়েছে- সেবাইতদের লাইন, স্টাফদের লাইন আর বিশেষ দর্শনার্থীদের লাইন।
লাইনগুলো আপনাকে দুটি জায়গায় নিয়ে যাবে। প্রথম লাইন দিয়ে আপনি যেতে পারবেন গর্ভগৃহে আর দ্বিতীয়টি দিয়ে বারান্দায়। এর মধ্যে আপনার জন্য প্রথমটিই উত্তম হবে কারণ এটি নিয়ন্ত্রণ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজন। কিন্তু পরের লাইন ধরে যেতে গেলে দালাল আর পাণ্ডাদের হাতে পকেট ফাঁকা হয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে।
ফিচার ইমেজ- columbia.edu

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

টংলু ভ্যালীর প্রেমে: সান্দাকফুর পথে

ঘের থেকে বাগদা চিংড়ি ধরা দেখা