কোনো এক সন্ধ্যায় সূর্যাস্ত দেখার লোভে বাঁশবাড়িয়া সৈকতে

‘আমি শুনেছি সেদিন তুমি সাগরের ঢেউয়ে চেপে, নীল জল দিগন্ত ছুঁয়ে এসেছো…’ মৌসুমী ভৌমিকের এই গানটি কে না শুনেছি? আর গানটি শুনলেই বোধ করি সকলের মনের মধ্যে ভেসে ওঠে গর্জন করে করে বালুচরে আছড়ে পড়া বিশাল কিছু ঢেউ।

বুকের মধ্যে যেন তখনই কেউ হাহাকার করে বলে, সাগরে যাবো, সাগরে যাবো, বালুমাখা তীরে হেঁটে সূর্যাস্ত দেখে প্রাণ জুড়াবো। আজ তেমন বালুমাখা একটি সৈকত নিয়েই কথা বলবো। কক্সবাজার, কুয়াকাটা, পতেঙ্গা বীচের মতো বহুল পরিচিত বা প্রচুর লোক সমাগমে এই বীচটি মুখরিত থাকে তেমনটা নয়।

কিন্তু ব্যতিক্রম কিছু বিষয়ের জন্য যেন ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে দিন দিন প্রিয় থেকে প্রিয়তর হচ্ছে একটি সৈকতের নাম। বলছিলাম বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকতের কথা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে চট্টগ্রাম শহরের ২৫ কি.মি. উত্তরে একটি ছোট্ট বাজারের নাম বাঁশবাড়িয়া বাজার।

বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে সবুজ; source: লেখিকা

এই বাজারের মধ্য দিয়ে মাত্র ১৫ মিনিটেই পৌঁছানো যায় বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র উপকূলে। বাঁশবাড়িয়া মূলত চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড উপজেলার অন্তর্গত একটি ইউনিয়ন। প্রায় ২২ হাজার জনসংখ্যা বহুল ইউনিয়নটির আয়তন ২৭.৫৩ বর্গ কি.মি.। বাঁশবাড়িয়া নামকরণটি নিয়েও রয়েছে জনশ্রুতি।

বলা হয়ে থাকে, সীতাকুণ্ডের অন্যান্য এলাকার তুলনায় এই এলাকায় একসময় প্রচুর বাঁশ উৎপন্ন হতো কিংবা ভালো করে বলতে গেলে এই এলাকার প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ছিল বাঁশঝাড়। সেই থেকেই ইউনিয়নটির এরূপ নামকরণ।

বাঁশবাড়িয়া বাজার থেকে সিএনজি করেই পৌঁছানো যায় সৈকতের কাছে। একদিকে সাগরের গর্জন, অন্যদিকে ঝাউবনের ছোঁয়া, পাখির কলতান, নির্বাক করে দেওয়ার মতো সূর্যাস্ত দেখার জন্য জায়গাটির সত্যিই তুলনা হয় না। পরিবারের সবাই একসাথে সময় কাটানোর জন্য উপযুক্ত পরিবেশ এই সৈকতটি।

আরেকটু হাঁটলেই দেখা মিলবে ব্রিজটির; source: লেখিকা

এই সৈকতের মূল আকর্ষণ বিশেষ ব্রিজটি। বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের পশ্চিম দিকে সন্দীপ চ্যানেল। মূলত সেই সন্দীপে পৌঁছানোর ঘাটের জন্য এই বিশেষ সড়ক বা ব্রিজটি নির্মিত হয়েছে। ব্রিজটি মূলত ব্যক্তি মালিকানাধীন। জানা যায়, এলাকার একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির মালিকানায় এই ব্রিজটি নির্মিত যা একান্তই সন্দ্বীপবাসীদের চলাচলের জন্য।

পর্যটকদের কাছে এখন এটিই হয়ে উঠেছে আকর্ষণের মূল কেন্দ্র কারণ সাগর থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার ভেতরে যাওয়ার অনুভূতিটা আসলেই অসাধারণ। সমুদ্রের তীর ঘেঁষে যখন ঢেউ আসে তখন এই ব্রীজের মতো বিশেষ রাস্তাটির উপর দাঁড়িয়ে থাকা যেন মনের ভেতরটাকে এক উদাসী আনন্দে ভরিয়ে দেওয়া।

সমুদ্রস্নানের উচ্ছ্বাস; source: লেখিকা

তাছাড়া এখান থেকে সহজেই সূর্যাস্ত দেখা যায়। আর সৈকতের পাড়ে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে রয়েছে সবুজ ঘাসের সমারোহ আর বিভিন্ন গাছগাছালি। দেখতে পাবেন ব্রিজের গোড়ায় ভেজা শুকনো বালি মাটিতে অসংখ্য লাল কাকড়ার দল।

আশেপাশে ঝাউবন দিয়ে ঘেরা ভিন্নরকম এই সমুদ্র সৈকতটি অন্য যেকোনো সৈকতের চেয়ে আলাদা। পর্যটকরা চাইলে ঘাট থেকে স্পীডবোট করে সন্দীপও ঘুরে আসতে পারবেন।

ব্রিজের উপর পদচারণা; source: লেখিকা

আশেপাশের আরো কিছু জায়গার নাম :

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড যেন পর্যটকদের মন রাঙানোর জন্যই। বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকতে আপনি ঘুরতে আসলে যদি সময় বেঁচে যায় তাহলে ঘুরে দেখতে পারেন আরো কিছু জায়গা। সৈকতের একটু দূরেই রয়েছে কুমিরা জাহাজঘাট যেখানে গেলে দেখতে পাবেন পুরনো জাহাজের মেরামত বা ধ্বংসাবশেষ।

সৈকতে এসে উপচে পড়া ঢেউ; source: লেখিকা

তাছাড়া চাইলে যেতে পারেন গুলিয়াখালী সী বীচে। সেখানে দেখতে পাবেন সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট সবুজের অপরূপ কারসাজি। যেতে পারেন মহামায়া লেকে, সেখানে করতে পারবেন কায়াকিং। তাছাড়াও নিকটেই রয়েছে সুপ্তধারা, সহস্রধারা, চন্দ্রনাথ পাহাড় ও ইকো পার্কের মতো আরো দারুণ কিছু ট্যুরিস্ট স্পট।

যেভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী বাসে আসলে নেমে পড়ুন সীতাকুণ্ড বাজারেই। সেখান থেকে ১৫ টাকার ভাড়ায় কয়েক মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যাবেন বাঁশবাড়িয়া বাজারে। বাজার থেকে সিএনজি করে জনপ্রতি ২০ টাকায় পৌঁছে যেতে পারবেন সৈকতে। চাইলে রিক্সাতেও যেতে পারেন। ভাড়া পড়বে ৪০-৫০ টাকা।

ট্রেনে করে আসলে সীতাকুণ্ড নেমে তারপর বাসে ১৫ টাকা ভাড়ায় বাঁশবাড়িয়া বাজার। সেখান থেকে সৈকতে।

যখন যাবেন:

আপনি চাইলে যেকোনো সময়েই উপস্থিত হতে পারেন এই নিরিবিলি সৈকতে। সকালে পাবেন একরকম স্নিগ্ধতা আবার বিকেল বা সন্ধ্যায় উপভোগ করতে পারবেন সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য। তবে জোয়ারের সময় এখানে যাওয়া উত্তম। তাই যাওয়ার আগে জোয়ার আসার সময় জেনে নেওয়া ভালো।

মন ভালো কিংবা মন খারাপের সন্ধ্যা; source: লেখিকা

সাধারণত সকাল ৭টা ও দুপুর ১টার দিকে জোয়ার আসে। জোয়ার যখন আসে আর ব্রিজটি ডুবতে থাকে ধীরে ধীরে তখন আধ মাইলের এই ব্রিজের উপর হেঁটে হেঁটে নিজের পদচারণায় ঢেউকে স্বাগতম জানানোর অনুভূতি আসলেই প্রকাশ করা যাবে না। আর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ঝাউবনের সারি তো আছেই।

সতর্কতা:

আমাদের মূল আকর্ষণের ব্রিজটি প্লাস্টিক আর স্বল্প পরিমাণের লোহার সমন্বয়ে তৈরি কারণ সমুদ্রের লবনাক্ত পানিতে লোহা বা স্টিল সহজেই ক্ষয় হয়ে যায়। আবার পর্যাপ্ত পরিমাণে খুঁটিও ব্যবহৃত হয়নি ব্রিজটিতে। তাই ইদানিং যে হারে পর্যটকের ঢল নেমেছে এই সৈকতে ব্রিজটি যেন এখন পরিণত হচ্ছে ভয়ের উৎস হিসেবেও।

একটুখানি অসতর্কতাও আপনার জীবন বিপন্নের কারণ হিসেবে দাঁড়াতে পারে। তাছাড়া আমরা অনেকেই সাগরের ঢেউ দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়ার অভ্যেস পুষে রাখি। কিন্তু এই বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত যেন মাঝেমধ্যেই আকার ধারণ করে ভয়াল রূপে। যেন পরিণত হয় এক মৃত্যুকূপে।

সর্বশেষ ৬ জুলাই, ২০১৮ শুক্রবার বিকেলে বেড়াতে এসে বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকতে গোসল করতে নেমে নিখোঁজ হন তিন তরুণ। ভাটার প্রচণ্ড টান থাকায় পানিতে নামার কিছুক্ষণের মধ্যেই তলিয়ে যান তারা। যদিও তখন এই স্পটটি নিষিদ্ধ বলে ঘোষিত ছিল।

তাই কিছু না জেনে বুঝেই আমরা যেন আনন্দের আতিশয্যে সাগরে ঝাঁপিয়ে না পড়ি সেদিকে রাখতে হবে বিশেষ সতর্কতা। এছাড়াও এখানে নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের অগোচরে দেখা যায় মাদকের আখড়া। এই সমুদ্র সৈকতে হাত বাড়ালেই যেন পাওয়া যায় ইয়াবা, ফেনসিডিল, দেশি-বিদেশি মদ ও গাঁজা যা সহজে সেবন করছে দর্শনার্থীরা। 

ভেজা বালুচর; source: লেখিকা

তাই এসব থেকে দূরে থাকার জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে অতি শীঘ্রই। সন্ধ্যার আগেই সৈকত থেকে ফিরে আসা উচিৎ। কারণ নিরিবিলি জায়গা হওয়ায় মানুষ এখানে অনেক, সন্ধ্যার পরে সিএনজির জন্য বেগ পাওয়ার সম্ভাবনা আছে তাই সন্ধ্যা হতে হতেই ফিরে আসা ভালো।

অবশেষে বলবো, সাগরপ্রেমীদের জন্য বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত একটি অনিন্দ্য সুন্দর জায়গা। তবে অবশ্যই পরিবেশ দূষিত না করে এবং প্রয়োজনীয়তা সতর্কতা অবলম্বন করে আমরা এই সৈকতের মোহনীয় সুধা দৃষ্টি দিয়ে পান করবো।

Feature Image: লেখিকা

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নো ম্যান্স ল্যান্ডে নানা রঙের মেঘের খেলা

বিলুপ্ত প্রায় সাদা বাঘের খোঁজে সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানায়