আমস্টারডাম ভ্রমণ: জলে কিংবা জাদুঘরে

একটা দেশের বেশীরভাগ অংশই বাঁধের উপর অবস্থিত! সমুদ্র উপকূলের খুব কাছেই অবস্থান করেও যে অঞ্চলের সর্বোচ্চ বিন্দু ভালসেরবার্গ মাত্র ৩২৩ মিটার উঁচু! (যেখানে আমাদের দেশের কেওক্রাডংয়ের উচ্চতাই প্রায় ৯৬৬ মিটার) নেদারল্যান্ড কিংবা হল্যান্ড, দুই নামেই আমরা একই দেশকে চিনলেও, দেশটির নাম কিন্তু কেবল নেদারল্যান্ডই। এই দেশের দুইটি রাজ্যকে একত্রে হল্যান্ড নামকরণ করা হয়েছে, সেটা কীভাবে দেশটির নামেরই প্রতিশব্দ হয়ে গেল, সেই আলাপ অন্য একদিন হবে।

আজ গল্প করবো সেই নেদারল্যান্ডের রাজধানী শহর আমস্টারডাম নিয়ে এবং আমস্টারডাম শহর ভ্রমণে যা যা ঘুরে দেখতে পারেন সেই বিষয়ে।

শহরের বুক চিরে যাওয়া খালগুলোতে ভ্রমণ

আমস্টারডাম পানি দিয়ে ঘেরা এক শহর। অসংখ্য খালের সমারোহ এবং অ্যামস্টেল নদীর পানি সাম্রাজ্যের মাঝে গড়ে উঠেছে আমস্টারডাম। আমস্টারডামের খালগুলো অনেক বেশী সুন্দর! আবার একই সাথে খালের উপর বোটে বসে শহর দেখার মধ্যে যে এক অদ্ভুত আনন্দ তার তুলনা হয় না!

বোটে বসে শহর দেখার ব্যাপারটা কিছুটা অনুভব করতে চাইলে বার্ট হান্সট্রা (Bert Haanstra) এর দ্য মিরর অফ হল্যান্ড, নামক ছোট্ট ডকুমেন্টরিটা এখান থেকে দেখে নিতে পারেন।

তবে খালের উপর বড় আকারের যে বোটগুলো আছে, সেগুলোয় উঠবেন না। একেবারে গলাকাটা দাম রাখে। তারচেয়ে বরং ঘণ্টাপ্রতি ২০ ইউরো দরে প্রাইভেট বোট পাবেন। গাইডের জন্য রেড লাইট ডিসট্রিক্টে খোঁজ নেওয়া ভালো। এছাড়াও আপনি চাইলে Hop-on Hop-off বোটগুলোও ভাড়া করতে পারেন।

এ ধরনের বোটগুলো ছোট হলেও, ভ্রমণটা হয় আন্তরিক। আপনার বোটের চালক আপনার মনের মতো করে ঘুরে দেখাবে শহরটিকে। এই বোটগুলো ছাড়ে ঘাট নং ৬ থেকে। এক ঘণ্টার এই ভ্রমণ শেষে যেতে হবে পরের গন্তব্যে।

ছবিসূত্র: tripsite

ভ্যান গগ মিউজিয়াম

প্রেমিকার জন্য কান কেটে ফেলা এই বিখ্যাত ডাচ চিত্রকরকে কে না চেনে! বিশেষ করে তার বিখ্যাত চিত্রকর্ম, The Starry Nights এর জন্য ভুবনবিখ্যাত হয়ে আছেন ভ্যান গগ। স্বাভাবিকভাবে তাঁর নামের মর্যাদা রক্ষার্থে এই মিউজিয়ামটিতে লোকসমাগম হয় সর্বাধিক। কিন্তু তাই বলে এই মিউজিয়ামটিতে না যাওয়া হবে আপনার জীবনের অনেক বড় একটি অপ্রাপ্তি।

The Starry Night; ছবিসূত্র: 1st Art Gallery

ভ্যান গগের চিত্রকর জীবন প্রারম্ভ থেকে শুরু করে জীবন সায়াহ্নে এসেও যা যা ছবি এঁকেছেন সবগুলো ছবি এখানে ধারাবাহিকভাবে সাজানো আছে। এছাড়াও ভ্যান গগের জীবনের নানা কথকতা সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা আছে এখানে। ভ্যান গগের চিত্রকর্মগুলোর পাশাপাশি রেনেসাঁ ও ইম্প্রেশনিস্ট যুগের মনেঁ, মানেঁ, ম্যাতিস এনাদের বেশ কিছু চিত্রকর্মও সাজানো আছে এখানে।

মিউজিয়ামটি ছোট হলেও চিত্রকর্মগুলো দেখতে দেখতে কখন যে সময় কেটে যাবে টেরই পাবেন না। এখানে বেড়াতে আসার জন্য ভালো হয় শেষ বিকালের সময়টায়। তখন ভিড় অনেকখানিই কমে আসে।

ভ্যান গগ মিউজিয়াম; ছবিসূত্র: Wladyslaw/Wikipedia

রিজ্‌কস মিউজিয়াম

রিজ্‌কস মিউজিয়াম; ছবিসূত্র: Tickets Holland

ভ্যান গগ মিউজিয়ামের ঠিক পাশেই এই মিউজিয়ামটির অবস্থান। বছরের পর বছর নানারকম সংস্কারের পর অবশেষে এটির বর্তমান চেহারা হয়েছে আকর্ষণীয়! মিউজিয়ামটিতে রয়েছে রেম্ব্রান্ট ভ্যান রিনের আঁকা বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘দ্য নাইট ওয়াচ’। রেম্ব্রান্টের পাশাপাশি ফ্রান্স হ্যালস, জোহানেস ভারমিয়ারের মতো বিখ্যাত ডাচ চিত্রকরদের আঁকা চিত্রকর্মগুলোও ঠাঁই পেয়েছে এখানে।

সব মিলিয়ে প্রায় দশ লক্ষাধিক চিত্রকর্ম, কারুকাজ এবং ঐতিহাসিক বস্তু সংগ্রহে আছে এই মিউজিয়ামটিতে, যার মধ্যে প্রায় ৮,০০০ শিল্পকর্ম সবার জন্য উন্মুক্ত করে রাখা আছে। পুরো মিউজিয়াম ঘুরে দেখতে চাইলে হাতে বেশ কিছু সময় নিয়ে আসাই ভালো!

মিউজিয়ামটির অভ্যন্তরের একাংশ; ছবিসূত্র: cnn.com

অ্যানা ফ্রাংকের বাড়ি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার নির্মম প্রতীক হিসেবে রয়েছে অ্যানা ফ্রাংক নামের এক কিশোরীর হাসিমাখা মুখ আর তার লেখা বিখ্যাত ডায়েরি। অ্যানা ফ্র্যাংকের নিবাস ছিল এই আমস্টারডামেই।

আপনি যদি অ্যানা ফ্রাংক সম্পর্কে আগ্রহী হন তাহলে অবশ্যই সেই মেয়েটির বাড়িটিও ঘুরে দেখতে চাইবেন নিশ্চয়ই। যে সিঁড়ি-ঘরে লুকিয়ে অ্যানা লিখত তার মনের কথাগুলো, সেখানে দাঁড়িয়ে সেই একই রোমাঞ্চ অনুভব করতে ইচ্ছা হবেই।

অ্যানা ফ্রাংক; ছবিসূত্র: geo.de

কিন্তু ঝামেলা বাঁধবে সেই বাড়িটিতে ঢুকতে গিয়েই। হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন ঘুরে দেখতে আসে এই বাড়িটি। এখানে আসার দুই/তিন মাস আগে থেকে যদি অনলাইনে বুকিং দিয়ে রাখেন তাহলে কোনো ধাক্কাধাক্কি কিংবা সিরিয়াল ছাড়াই বাড়িটিতে ঢুকে যেতে পারবেন।

নইলে সামাল দিতে হবে বিশাল লাইন, পার হবে দুই থেকে তিন ঘণ্টা। অথবা খুব সকালে উঠেই চলে আসতে পারেন এখানে। ভিড় অনেকটাই কম থাকে তখন।

অ্যানি ফ্রাংকের বাড়ি; ছবিসূত্র: The Restless Worker

আমস্টারডাম হিস্টরি মিউজিয়াম

এই মিউজিয়ামে আমস্টারডামের পুরো ইতিহাস থরে থরে সাজানো রয়েছে। মিউজিয়ামটি আকারে বিশাল এবং পুরো মিউজিয়াম ঘুরে আসতে কম করে হলেও তিন-চার ঘণ্টা সময় লাগবেই, যদি ভালো করে দেখতে চান। বহু প্রাচীন তৈজসপত্র, ম্যাপ, চিত্রকর্ম এবং দেয়ালে প্রোজেক্টরের মাধ্যমে ভিডিও আর্ট চলছে সর্বক্ষণ।

সবচেয়ে আকর্ষণীয় লাগবে একেবারে প্রবেশপথেই কম্পিউটার গ্রাফিক্সের মাধ্যমে দেখানো হয় আমস্টারডাম শহরটির বেড়ে ওঠার ইতিহাস। নিঃসন্দেহে এই মিউজিয়ামটিতে ভ্রমণ আপনার জীবনের স্মরণীয় একটি মুহূর্ত হয়ে থাকবে।

আমস্টারডাম হিস্টরি মিউজিয়াম; ছবিসূত্র: CODART

দ্য টিউলিপ মিউজিয়াম

আমস্টারডাম টিউলিপ মিউজিয়াম; ছবিসূত্র: Amsterdam info

এটি একটি বেজমেন্ট মিউজিয়াম, যেটি কিনা আবার একটি টিউলিপ ফুলের দোকানের ভেতর অবস্থিত। এই মিউজিয়ামের মজার ব্যাপার হলো, এখানে যখনই আসুন ভিড় পাবেন না।

বরং হল্যান্ডের টিউলিপ ফুলের ইতিহাস জানা যাবে, একই সাথে সপ্তদশ শতাব্দীতে টিউলিপ ফুলের প্রতি যে কুখ্যাত পাগলামি ছিল এই অঞ্চলের মানুষদের মাঝে সেটিও জানা যাবে।

টিউলিপ মিউজিয়ামের একাংশ; ছবিসূত্র: Turnipsedd Travel

আমস্টারডামের সবচেয়ে কম জনপ্রিয় কিন্তু আকর্ষণীয় জায়গাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। প্রবেশ মূল্য পাঁচ ইউরো, ছাত্র/ছাত্রীদের জন্য ৩ ইউরো।

রেড লাইট ডিসট্রিক্ট

সারাদিনের ঘোরাঘুরি শেষে রাতের বেলায় শান্তিতে কিছু সময় কাটানোর জন্য ভালো জায়গা। দিনে এখানে তেমন কোনো মানুষজন না থাকলেও রাত হলেই এখানের লাল আলোয় মুগ্ধ হয়ে কফি কিংবা পছন্দের পানীয়তে চুমুক দিয়ে ঘুরে ঘুরে বেড়াতে পারেন। লেকের পানিতে লাল আলোর প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে সময় কাটবে চমৎকার।

বন্ধুবান্ধব নিয়ে গেলে আড্ডা দিতে পারবেন। আর আপনি আড্ডা না দিলেও অন্য পর্যটকরা ঠিকই ঘুরে ঘুরে আড্ডা দিয়ে বেড়াবে এখানে, আপনার চারপাশে।

ছবিসূত্র: GetYourGuide

এসব ছাড়াও বাইসাইকেল ভাড়া করেও ঘুরে বেড়াতে পারবেন শহর জুড়ে। এখানকার প্রধান বাহনই বাইসাইকেল। সব মিলিয়ে বলতে গেলে, ইউরোপ ভ্রমণে বেড়াতে এলে আমস্টারডাম শহরটিকে ভুলে যাবেন না যেন!

ফিচার ইমেজ: I Amsterdam

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

যশোরের চাঁচড়া শিব মন্দিরের উপাখ্যান

বইয়ের আলোয় আলোকিত জাহাজের আদলে তৈরি চট্টগ্রামের বাতিঘর