চর আলেকজান্ডারের পথে

লেগুনা ছুটছে দুরন্ত বেগে। যাত্রী অল্প নিয়েই টানের উপর আছে পাইলট মামা। সড়কে যেন বিমানের ছোঁয়া। একটু পর পর থামছে নতুন যাত্রী উঠাচ্ছে। আর যাত্রীগণ তাদের মাঝে দুর্বোধ্য ভাষায় কথা বলছে। আমাদের ঢাকার টোন শুনে পাশের এক কিশোরী হেসে কুটি কুটি। আগে জানতাম সিলেট, চট্টগ্রামের মানুষই এলিয়েন ল্যাংগুয়েজে কথা বলে। লিস্টে নতুন সংযোজন হলো লক্ষীপুরবাসী। অল্পক্ষণের মাঝেই তারা বুঝে গেল আমরা স্থানীয় নই।

বিরামহীন যাত্রার মাঝে অনেক সময় কথা বলতেও ক্লান্তি লাগে। তো বসে বসে জানান দেই চর আলেকজান্ডারের ইতিহাস৷ চর আলেকজান্ডারের অবস্থান রামগতি উপজেলার ৪নং ইউনিয়নে। ব্রিটিশ আমলে রামগতি এসিল্যান্ড অফিসে রেভিনিউ কালেকটর পদে আলেকজান্ডার নামে এক ইংরেজ ভদ্রলোক কর্মরত ছিলেন। ধারণা করা হয়, তার নাম অনুসারেই আলেকজান্ডার ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়৷ রামগতি উপজেলার আলেকজান্ডার একটি ঐতিহ্যপূর্ণ ঘন বসতি এলাকা। তবে নদী ভাংগনের ফলে চর আলেকজান্ডার প্রায় বিলুপ্তির পথে ছিল।

মনোযোগী ছাত্র। ছবি – আশিক সারওয়ার

আলেকজান্ডারকে রক্ষার জন্য বাংলাদেশে সরকার এখানে বাঁধ নির্মাণ করে, যার বাস্তবায়ন করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর স্পেশাল ওয়ার্কস আর্গানাইজেশনের অধীনস্ত ১৯ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকসন ব্যাটেলিয়ন (১৯ ইসিবি)। আলেকজান্ডার চরের চেয়ারম্যান ঘাটের কোল ঘেঁষে তৈরি হওয়া এই নতুন বাধের পারে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে ভীড় জমাচ্ছে ভ্রমণ পিপাসু মানুষ।

দেড় ঘণ্টার ক্লান্তির এই পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছালাম সেই চেয়ারম্যান ঘাট৷ এবার রিক্সা ঠিক করলাম। রিক্সায় ওয়াফি আর আমার মাঝে পড়ে তুলতুলে ভুঁড়ির জুয়েল রানা কাষ্ঠ সুরে ডাক ছেড়ে হাসিতে লাগিলো। ভাবিলাম উনার মতিভ্রম হইয়াছে। গুরুচণ্ডালী ভাষা পরিত্যাগ করিয়া সিগারেটে কষে দু টান দিয়ে গন্তব্যের পথে পা বাড়ালাম।

সুখী মানুষ। ছবি – জুয়েল রানা।

কিছুক্ষণ পর রিক্সা আমাদের নামিয়ে দিল মেঘনার পাড়ের আলেকজান্ডার বাধের সামনে। কী শান্তি, কী নির্জন, নেই কোনো কোলাহল, নিরিবিলি পরিবেশ। নীল আকাশে সাদা সাদা পেঁজা তুলার মতো মেঘের ভেলা যেন ডুবে যাচ্ছে মেঘনার বুকে। সূর্যটা যেন হাঁটছে আমার সাথে। চারদিকে সবুজের সমাহার।

সামনে আলেকজান্ডার বাঁধ৷ বাঁধের পাশে দাঁড়িয়ে দেখা যাচ্ছে না মেঘনার ওপার৷ এখান থেকে মেঘনার মোহনা আর বে অফ বেঙ্গল খুবই কাছে। শরতের এই নীল আকাশের প্রতিবিম্ব পড়েছে যেন পানিতে। এই নীল জলরাশির মোহনীয় খেলায়, মুগ্ধতায় ভরে গেল আমার দু’চোখ। এখানে জোয়ার-ভাটার খেলা চলে। উঁচু ঢেউ আ‍ঁছড়ে পড়ে।

ছবি – আশিক সারওয়ার

এই নৈর্সগিক সৌন্দর্যের মাঝেও বেরসিক ওয়াফি বাধ সাধলো। আশিক ভাই ক্ষুধা লেগেছে। চলেন কিছু খেয়ে নেই৷ চোখের ক্ষুধা তো কবে মিটে গেছে, এবার পেটের জ্বালা মিটাতে পাড়েই খুঁজে পেলাম ইটালিয়ান হোটেল। ওয়াফির সেই স্বভাবসুলভ ডিমের আইটেম পেয়ে গেল৷ ডিম আর ওয়াফি যেন দু’জন দু’জনার জন্যই তৈরি হয়েছে। মেঘনার পাড়ে এসে ইলিশ মাছ না খেলে তো পাপ হয়ে যাবে। আমরা পাপ মোচন করলাম ঠাণ্ডা জমে যাওয়া ভাতের সাথে ইলিশ মাছ দিয়ে। ততক্ষণে বিকাল পেরিয়ে বিষন্ন সন্ধ্যার অপেক্ষায়, সূর্যের সেই শেষ আভা নিয়ে বসে আছে অদ্ভুত তিনটা মানুষ।

মৃদু মৃদু বাতাস বইছে। বাতাসে দুলছে দেহ মন। দূরে দেখা যাচ্ছে পাল তোলা নৌকা। যেন দিন শেষে পাখির মতো নিজ নীড়ে ফিরে আসছে মাঝি। সাথে ভেসে আসছে ছোট ছোট ডিঙি নৌকা। শেষ বিকেলের সূর্যের সেই আভায় সোনালী আলোয় চক চক করছে নৌকার পাটাতন। রূপালি ইলিশ ধরা পড়েছে জেলের জালে। পলি জমে সৃষ্টি হয়েছে নতুন বালুর বেলাভূমি। সেখানে খেলে বেড়ায় ডানপিটে শিশুদের দল। মুহূর্তগুলো যদি এখানে থেমে যেত তাহলে কেমন হতো। যেন আমি অন্ততকাল ধরে দেখতে রাজি আছি এই দৃশ্য। এবার যে ফেরার পালা। মন্ত্রমুগ্ধ সময়ের কিছু স্মৃতি নিয়ে ফিরে যায় পথিক তার নিজ নীড়ে।

আমাদের ফিরা আসাটা অবশ্য এত সোজা ছিল না। লক্ষ্মীপুর সদরে এসে জানতে পারলাম ছেড়ে দিয়েছে ঢাকার শেষ বাস। গল্পের শুরুতে নিজেদের ট্রাবল মেকার তো শখে বলিনি। লক্ষ্মীপুর থেকে এবার দু’ পা বাড়ালাম বেগমগঞ্জের পথে। সেই দিন বোধ হয় বৃহস্পতিবার ছিল। বেগমগঞ্জ আসতে আসতে প্রায় রাত ৯টা বেজে গেল। এবার শুরু হলো আসল ট্রাবলিং। জুয়েল ভাই যাবে সিলেট, আমরা দু’জন ঢাকা। ঢাকার বাসে টিকেট নেই, সিলেটের বাসে সিট নেই। টিকেট বিক্রি হয়ে যাওয়ায় সিলেটের কাউন্টার বন্ধ করে দিয়েছে রসিলা কাউন্টারম্যান। আমরা ঢাকার বাসে পাচ্ছি না টিকেট।

ছবি – আশিক সারওয়ার

অনেক কষ্টে একুশে বাসে দুটো টিকেট পেলাম দুই সময়। ওয়াফি ১০.৩০ এর বাসে যাবে, আমি ১২টার বাসে। টিকেট কেটে জুয়েল ভাইকে আমরা উদ্ধার করতে চলে আসলাম। সিলেট কিছু মাইক্রোবাস ডাকছে কিন্তু ডাকাতির ভয়ে যেতে সাহস পাচ্ছে না জুয়েল ভাই। সিলেটের লোকাল বাসগুলোও ঢুকছে না। কী আছে জীবনে? ট্রাবলিং মন্ত্রে দীপ্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত জুয়েল ভাই মাইক্রোবাসে উঠে গেল। রাত সাড়ে দশটায় চলে গেল ওয়াফি আহমেদ।

একা লেখক দুরু দুরু মনে বিরিয়ানির দোকানে ঢুকে দু’প্লেট মেরে দিল ভয়কে জয় করতে। ঠিক ১২টায় আমার বাস ছাড়লো। মনে করেছিলাম আস্তে ধীরে চলে আমায় ভোরে নামিয়ে দেবে। চোখ মুদিলাম, নিদ্রা তন্দ্রার জগতে বিচরন করিতে লাগিলাম। রাত ২.৫০ এ শুনলাম সুপার ভাইজার ডাকছে যাত্রাবাড়ী যাত্রাবাড়ী। সায়েদাবাদ জনপথের মোড়ে রাত তিনটায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে লেখক চিন্তা করে এই তো জীবন। কিছু গল্প না হয় থাকুক অপূর্ণ। স্বপ্নযাত্রা এবার ঘরের পথে।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আমেরিকার যত ভ্রমণস্থানের গল্প: সান ডিয়েগো নামা

গুঠিয়ায় ২১টি পবিত্র জায়গার মাটি সম্বলিত বাইতুল আমান জামে মসজিদ