ট্রেকিং পোলের আদ্যোপান্ত

ট্রেকিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই ট্রেকিং পোল। অনেকের কাছে উটকো ঝামেলা আবার অনেকের পথ চলা সহজ করে দেয় এই ট্রেকিং পোল। অনেকের মুখেই শুনেছি ট্রেকিং পোল হাতে থাকা মানে শুধু শুধু হাতের পেশীগুলো ব্যস্ত রাখা, যাতে করে মূল্যবান শক্তির অপচয় হয়। আবার অনেকের ভাষ্যমতে ট্রেকিং পোল তাদের ট্রেকিং অভিজ্ঞতা সাবলীল করে তোলে।

এটা আসলে ব্যক্তিগত এবং সাইকোলজিক্যাল একটা ধারণা। পাহাড়ে বসবাস করা মানুষেরা প্রতিনিয়ত পাহাড়ে চড়েন ও নামেন। উঁচুনিচু পাহাড়ে চলাফেরার জন্য অনেক পাহাড়িদের দেখেছি হাতে কোনো না কোনো লাঠি নিয়ে ঘোরেন। যাতে করে ওঠার সময় বা নামার সময় শুধু পায়ের উপর ভর না দিয়ে হাতের শক্তি দিয়ে কিছুটা চাপ কমানো যায় পায়ের উপর।

পোলের সাহায্যে পায়ের উপর চাপ কমানো যায়। ছবিঃ মহিউদ্দিন মাহি 

বাংলাদেশের পাহাড়ের গঠন প্রকৃতি অনুসারে দেশের পাহাড়ে ট্রেকিংয়ের সময় ট্রেকিং পোলের ব্যবহার কিছুটা অসুবিধাজনক বলে মনে হয় আমার কাছে। বাঁশের ব্যবহার আমাদের দেশের পাহাড়ে ট্রেকের জন্য বেশী উপযোগী। কিন্তু হিমালয়ে ট্রেকিংয়ের সময় ট্রেকিং পোল ছাড়া আমি ট্রেকের কথা চিন্তা করতে পারি না।

দুই হাতকে কাজে লাগিয়ে পায়ের উপর চাপ কমানোর জন্যেই আমি ট্রেকিং পোলের ব্যবহার শুরু করি। তবে ট্রেকিং পোল ইচ্ছেমতো একটা কিনে ফেললেই ভুল হবে। নিজের জন্য উপযুক্ত ট্রেকিং পোল কিনতে হলে কিছু ব্যাপার বিশেষভাবে খেয়াল রাখা দরকার।

পোলের আকার:

ট্রেকিং পোল সাধারণত ১০০ থেকে ১৩৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। উচ্চতা অনুসারে আপনার উচ্চতা যদি ৫ফিট ১ ইঞ্চি হয়ে থাকে তাহলে আপনার জন্য ১০০ সেন্টিমিটারের ট্রেকিং পোল বেশ ভালো কাজে দেবে। এভাবে ৫ থেকে ৫.৭ ফিট উচ্চতার জন্য ১১০ সেমি, ৫.৮ থেকে ৫.১১ ফিট উচ্চতার মানুষের জন্য ১২০ এবং ৬ ফিট উচ্চতার জন্য ১৩০-১৩৫ সেন্টিমিটার উচ্চতার ট্রেকিং পোলকে আদর্শ হিসেবে ধরা হয়।

এছাড়া আপনি অবশ্যই আপনার সুবিধা মতো নির্দিষ্ট উচ্চতার ট্রেকিং পোল ব্যবহার করতে পারেন। খেয়াল রাখতে হবে নিজের সমান্তরালে পোলটি সোজা করে ধরলে আপনার কবজি সমকোণে অর্থাৎ ৯০ ডিগ্রি কোণে অবস্থান করলে ওই ট্রেকিং পোল আপনার জন্য ভালো কাজ দেবে।


পোলের সংখ্যা:

একটি পোল ব্যবহার করবেন নাকি দুটি পোল ব্যবহার করবেন? অনেকের থাকে এই স্বাভাবিক প্রশ্নটা। যখন আপনি দীর্ঘ দিনের একটা ট্রেইলে অনবরত হাঁটবেন তখন দুটো পোল আপনাকে বিশেষ কিছু সুবিধা দিতে পারে। যেমন হাঁটার গতির সাথে নিঃশ্বাসের রিদম ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে। ট্রেকিংয়ের ধরনকে একটি নির্দিষ্ট তাল দিতে পারে। এবং আপনার লোডকে সুষমভাবে বণ্টন করে আপনার শরীরের ভারসম্য রাখতে সাহায্য করতে পারে।

লম্বা ট্রেইলে এই ধরনের ছোট ছোট ঘটনাগুলো আপনার ট্রেকিংকে স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তুলবে। এছাড়া ছোট কোনো ট্রেকিং যেমন এক বা দুই ঘণ্টার ট্রেকিংয়ে আপনার সুবিধা মতো একটি বা দুটি পোল ব্যবহার করতে পারেন।


পোলের গঠন উপাদান:

ট্রেকিং পোল যাতে সহজে ব্যবহার করা যায় ও খুব বেশী ভারী না হয়, এই বিষয় বিবেচনা করে পোল তৈরিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো কার্বন ফাইবার ও অ্যালুমিনিয়াম ধাতু দিয়ে ট্রেকিং পোল তৈরি করে থাকেন। কার্বন ফাইবার ওজনে খুব হালকা হওয়াতে, এই ধাতু দিয়ে তৈরি পোলগুলো ওজনে হালকা হয়।

অন্যদিকে একটু বেশী ওজনের অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে তৈরি করা হয় এক ধরনের পোল। দুই ধরনের পোলই মজবুত হয়। তবে অ্যালুমিনিয়ামের পোলগুলো সহজে ভেঙে না গেলেও বেঁকে যাবার সম্ভাবনা থাকে। অন্যদিকে কার্বন ফাইবারের পোলগুলো উচ্চচাপে ভেঙে যেতে পারে।

©Montem

চাপ  প্রতিরোধক ও লকিং সিস্টেম:

কিছু কিছু পোলে শক অ্যাবজর্ভার বা চাপ প্রতিরোধোক স্প্রিং থাকে। এর কারণে হুট করে পোলের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়লে সেটা পোলের ভেতরে থাকা স্প্রিং শুষে নেয়। এর ফলে কোনো কঠিন পাথুরে রাস্তায় বা বরফের রাস্তায় ট্রেকিংয়ের সময় পায়ের উপর চাপ কমায়। যাদের গোড়ালি বা কবজিতে কোনো চাপজনিত সমস্যা থাকে তাদের জন্য এই শক অ্যাবজর্ভার অত্যন্ত ভালো কাজ করে থাকে।

নিচে প্রদত্ত চাপ শুষে নিয়ে ওপরে ওঠার সময় একটা আপ ফোর্স তৈরি করে প্রয়োগকৃত শক্তির ৩০% ফিরিয়ে দেয়। এর ফলে সহজেই ওপরের দিকে ওঠা যায়। এছাড়া দুই ধরনের লকিং সিস্টেমের পোল বাজারে দেখা যায়। একটাতে স্ক্রু এর মতো পেঁচিয়ে লক করতে হয়, অন্যটাতে ক্ল্যাম্প আটকে লক করতে হয়।

প্রতিটি ট্রেকিং পোলের আলাদা তিনটি অংশকে জোড়া দেবার জন্য ও আপনার উচ্চতা অনুয়ায়ী পোলকে মানানসই সাইজের করে সেগুলো শক্ত করে আটকানোর জন্য এই ক্ল্যাম্প বা স্ক্রু লকিং সিস্টেম ব্যবহার করা হয়। স্ক্রু লকিং সিস্টেম একটু বেশী সময় নিয়ে থাকে অনেক সময় লকের জন্য, সেই হিসেবে ক্ল্যাম্প সিস্টেমটি দ্রুতগতিতে এ্যাডজাস্ট করে লক করা যায়।


পোলের গ্রিপ:

পোলের গ্রিপ সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই গ্রিপ মূলত তিন ধরনের উপাদান দিয়েই তৈরি করা হয়। ফোমের গ্রিপ, কর্কের গ্রিপ ও রাবারের গ্রিপ। ফোমের গ্রিপ বেশ ভালোভাবে কাজে দেয়। হাতের আকার অনুযায়ী সঠিকভাবে ধরার মতো একটা জায়গা তৈরি হয় এই গ্রিপে। কিন্তু বৃষ্টি হলে বা ভেজা আবহাওয়ায় এই গ্রিপের মধ্যে পানি জমে খুব সমস্যায় ফেলতে পারে। তাই শুধু মাত্র শুকনো আবহাওয়াতেই ফোমের গ্রিপ যুক্ত পোল নেয়া উচিৎ।

কর্কের গ্রিপগুলো হাতের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই বসে যায় এবং পানিরোধক হয়ে থাকে। কিন্তু যদি ঠাণ্ডা বা অতি গরম পরিবেশ হয় তাহলে এই গ্রিপও ঠাণ্ডা বা গরম হয়ে যায়। তাই যখন এই গ্রিপের পোল ধরবেন তখন শীতল বা গরম হয়ে যাওয়া গ্রিপগুলোর জন্য পোল ঠিক মতো ধরতে পারবেন না। রাবারের গ্রিপ সব দিক থেকেই উত্তম। এটি পানিরোধক হয়। ঠাণ্ডা বা গরমে এর তাপমাত্রার খুব বেশী পার্থক্য দেখা যায় না এবং ভালোভাবে হাতে আটকে থাকতে সাহায্য করে।


কিছু তথ্য:

পোল ব্যবহার করবার পূর্বে অবশ্যই নিজের উচ্চতার সাথে এডজাস্ট করে নেবেন। নরম বরফে হাঁটার সময় পোলের সাথে যুক্ত থাকা চাকতিটি পোলের নিচের দিকে লাগিয়ে নেবেন এতে করে পোল সঠিকভাবে আপনার লোড ছড়িয়ে দিতে পারবে। লক করার সময় সতর্কতার সাথে লক করবেন, নাহলে চাপের ফলে বসে বা স্লিপ করে ভারসাম্য হারাতে পারেন।

লকগুলো অত্যধিক টাইট করবেন না, এতে পরবর্তীতে আপনারই খুলতে অসুবিধা হবে। ট্রেকিং পোল ব্যবহার করে কোথাও ট্রেকিং করতে যাবার আগে এর সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে যাবেন।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বাংলাদেশের জাতীয় মন্দির ঢাকেশ্বরী মন্দির ভ্রমণ

বইপ্রেমীদের জন্য আদর্শ কিছু ‘বইয়ের শহর’