একদিনে চন্দ্রনাথ পাহাড় ট্রেকের চন্দ্রকথন

বাংলাদেশের বেশ ভালো কয়েকটি ট্রেকিং জোন আছে বান্দরবানের দিকে। তবে শুধু যে বান্দরবানেই ট্রেক করা যায় বা বান্দরবানেই মিলবে কেবল ট্রেকিং জোন এটা সত্য নয়। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার দিকে একটু এগোলেই পথে পড়ে ফেনী জেলা। বাংলাদেশী সবাই-ই মোটামুটি ফেনী নামের সাথে পরিচিত। এই ফেনীর আশেপাশেই আছে দুর্দান্ত সব ট্রেকিং জোন। সেগুলোতে যেমন আছে ঝর্ণার ট্রেকিং, তেমনি আছে উঁচু প্রাচীন মন্দিরের ট্রেক।

ফেনী থেকে খুব কাছের একটি জায়গার নাম সীতাকুণ্ড। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান হিসেবে বিখ্যাত এই সীতাকুণ্ডে আছে প্রায় ১১৫২ ফুট উঁচুতে এক প্রাচীন মন্দির যার নাম চন্দ্রনাথ মন্দির। চন্দ্রনাথ মন্দিরে ধর্ম-নির্বিশেষে কম বেশি সবাই ট্রেক করতে ওঠেন।

তবে শিবরাত্রিতে সেখানে রাতের বেলায় ঢল নামে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের, তাদের জন্য বেশ পুণ্যময় রাত এটি, এ রাতে কয়েকশো মানুষ একসাথে চন্দ্রনাথ মন্দিরে উঠে থাকেন। চন্দ্রনাথ মন্দিরের উচ্চতার কারণে সেখান থেকে একদিকে পুরো সীতাকুণ্ড জনপদ আর অন্যদিকে ফটিকছড়ির একাংশ দেখা যায়। অপরূপ সে ল্যান্ডস্কেপ আর চন্দ্রনাথের দর্শন করতে প্রচুর মানুষ ছুটে যায় সীতাকুণ্ডে।

উপর থেকে দেখা দৃশ্য, ছবিঃ শাহরিয়ার হাসান

এখন প্রশ্ন থেকে যায় কিভাবে যাবো? ঢাকা থেকে খুব সহজেই চলে আসা যায় সীতাকুণ্ডে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী যেকোনো ট্রেনে প্রথমে নেমে যেতে হবে ফেনী স্টেশনে। আপনি যদি চিটাগং মেইল নামক লোকাল ট্রেনে আসেন তবে সরাসরি সীতাকুণ্ড স্টেশনে নামতে পারবেন। আর যদি এক্সপ্রেস ট্রেনে আসেন তবে নামতে হবে ফেনী স্টেশনে।

ফেনী স্টেশনে নেমে সেখানে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই হবে সীতাকুণ্ডের বাস কোথা থেকে ছাড়ে। ফেনী থেকে বাসে করে চলে আসুন সীতাকুণ্ডে। ফেনী থেমে সীতাকুণ্ড বাস ভাড়া ৪০ টাকা। বাস নামাবে সীতাকুণ্ড বাজারে। সেখান থেকে সিএনজি নিয়ে সোজা চলে আসতে হবে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের গোড়ায়, সিএনজি ওয়ালাকে বললেই হবে মন্দিরের নিচে যাবো। ভাড়া নেবে ২০ টাকা।

ছবিঃ শাহরিয়ার হাসান

মন্দিরের নিচে তো চলে এলেন, এবার শুরু করুন ট্রেকিং। মাটি আর পাথরের সংমিশ্রণে তৈরী উপরে যাওয়ার দুটো রাস্তা চোখে পড়বে, একটি ডান দিকে গেছে, আরেকটি বাম দিকে। স্থানীয় লোককথায় জানা গেছে, উপরে ওঠার সময় বাম দিকের রাস্তাটি ব্যবহার করা বেশি সুবিধাজনক।

ডান দিকের রাস্তার প্রায় অনেকখানি অংশ সিঁড়ি দিয়ে তৈরী এবং সিঁড়িগুলো সাধারণ সিঁড়ির চেয়ে উচ্চতায় একটু বেশি হওয়ায় সেগুলো চড়তে হয় অধিক কষ্ট। বাম দিকের রাস্তায় সিঁড়ি নেই, মাটির পথ তবে ডান দিকের রাস্তার তুলনায় দীর্ঘ।

নেমে আসার রাস্তা, ছবিঃ জাহাঙ্গীর আলম

দীর্ঘ পথ হলেও বাম দিকের রাস্তাটি অপেক্ষাকৃত সহজ, কেননা কষ্ট কম করতে হয় উঠতে। ওঠার সময় যে নান্দনিক দৃশ্য চোখে পড়বে তা সহজে ভোলার নয়। চন্দ্রনাথ মন্দিরে উঠে যেতে প্রায় আড়াই থেকে তিন ঘণ্টার মতো সময় লাগবে।

আগে থেকে বান্দরবানের বিভিন্ন জায়গায় ট্রেকিং করা থাকলে এই দুই-তিন ঘণ্টার ট্রেক কিছুই মনে হবে না। তবে যত উপরে উঠবেন, ততই সৌন্দর্য বাড়ছে বলে মনে হবে। জায়গায় জায়গায় ছোট ছোট ঝর্ণার দেখা মিলবে, হিম শীতল সে ঝর্ণার পানিতে চটজলদি গোসলও সেরে নেয়া যাবে।

ছবিঃ শাহরিয়ার হাসান

চন্দ্রনাথ মন্দিরে পৌঁছার আগে রাস্তায় বিরু পক্ষ মন্দির পড়বে। যারা গিয়েছেন তাদের অনেকে চন্দ্রনাথ মন্দিরের চেয়ে বিরু পক্ষ মন্দিরকেই বেশি সুন্দর হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বিরু পক্ষ মন্দির থেকে দেখা দৃশ্যটাও অনন্য সাধারণের সাথে তুলনা করেন পর্যটকরা।

এই মন্দিরে অনেক বিজ্ঞ এবং যথেষ্ট বয়স্ক একজন ভান্তের দেখা মিলবে। ভান্তে মানে হলো বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ধর্মগুরু। বিরু পক্ষের শ্রদ্ধেয় এই ভান্তের কাছে শোনা যাবে এই মন্দিরের প্রাচীন কাহিনী। সাথে তো মন-মাতানো সৌন্দর্য আছেই। বিরু পক্ষ থেকে পনেরো থেকে বিশ মিনিট হাঁটলেই পৌঁছে যাবেন গন্তব্য চন্দ্রনাথ মন্দিরে।

বিরু পক্ষ মন্দির, ছবিঃ শাহরিয়ার হাসান

মন্দিরের প্রাচীনত্ব আর সৌন্দর্য্যে মোহিত হতে বেশি সময় লাগবে না। তবে মন্দিরের পাশাপাশি মন্দিরের আশেপাশের যে দৃশ্য ধরা পড়বে চোখের দৃষ্টিতে, তা মোটেই অগ্রাহ্য নয়। যদি ভাগ্য ভালো থাকে আর বিকেল বেলায় চন্দ্রনাথে গিয়ে পৌঁছান, তবে মোহনীয় এক সূর্যাস্তের সাক্ষী হতে পারবেন অনায়াসেই। সেই দিগন্তখেলা স্মরণ করতে হবে আজীবন ধরে।

ছবিঃ শাহরিয়ার হাসান

চন্দ্রনাথ মন্দিরে মোটামুটি এক-দেড় ঘণ্টা কাটিয়ে নামার রাস্তা ধরুন। ওঠার সময় যেমন বাম দিকের রাস্তাটি অবলম্বন করেছিলেন তেমনি নামার সময় হাঁটতে থাকুন ডান দিকের রাস্তা ধরে। প্রচুর সিঁড়ি দিয়ে গড়া ডান দিকের রাস্তা ধরে নেমে যাওয়া যায় যে সময়ে উঠে এসেছেন তার অর্ধেক সময়ে।

তবে সিঁড়ি খুব খাড়া হওয়ায় নামার সময় যথেষ্ট সাবধান থাকতে হবে। মন্দির থেকে নেমে সীতাকুণ্ড বাজারে চলে আসুন। দুপুর বা রাতের খাওয়া-দাওয়া এই বাজারে করাই ভালো। মোটামুটি ১০০ টাকার মধ্যে ভালো খাবার-দাবার পাবেন এখানে।

ছবিঃ শাহরিয়ার হাসান

এভাবেই সুস্থ সুন্দরভাবে শেষ করুন একদিনের চন্দ্রনাথ ট্রেক। তবে প্রথমবার ট্রেকিং করছেন এমন কেউ থাকলে মানতে হবে কিছু সর্তকতা। চন্দ্রনাথে ওঠার সময় স্যালাইন আর হাফ লিটার পানির বোতল নিয়ে নিন।

একটু উপরে উঠলেই একজন লোকের দেখা পাবেন যিনি ১০ টাকায় হাতের লাঠি বিক্রি করেন। ট্রেকিং করার সময় হাতের লাঠি শরীরের ওজন কমিয়ে দেয় আর বেশ ভালো সহায়ক হিসেবে কাজ করে। পাহাড়ে ওঠার সময় ব্যাগে ভারী কিছু বহন করা থেকে বিরত থাকুন।

ফটিকছড়ি জনপদ, ছবিঃ শাহরিয়ার হাসান

এটা তো গেল প্রথম বার যারা ট্রেকিং করছেন তাদের জন্য করণীয়। তবে ট্রাভেলার হিসেবে আমাদের সবারই কিছু দায়িত্ব থাকে ভ্রমণস্থানে গেলে। চন্দ্রনাথ মন্দিরেও তার ব্যতিক্রম নেই। মন্দিরে উঠে কেউ দয়া করে চিৎকার-চেঁচামেচি করবেন না এবং করতে দেবেন না। সাথে করে নিয়ে যাওয়া খাবারের উচ্ছিষ্টাংশ, পানির বোতল, স্যালাইনের প্যাকেট, কলার খোসা কখনোই পাহাড়ে রেখে আসবেন না।

চন্দ্রনাথ মন্দির, ছবিঃ blogspot.com

একটা আলাদা পলিব্যাগে সাথে করে নিয়ে আসুন নিচ পর্যন্ত আর নিষ্কাশন করুন সঠিক উপায়ে সঠিক স্থানে। ট্রেকার বেশি থাকলে কখনোই ওঠা বা নামার সময় তাড়াহুড়ো করা উচিত নয়। আর তাড়াহুড়ো করলেই আশেপাশের সৌন্দর্য এমনিতেও হাতছাড়া হয়ে যাবে। সম্পূর্ণ এই ট্যুরে যদি ৫ এর গুণিতক সংখ্যাক গ্রুপ মেম্বার হয় তবে ১,০০০ টাকায় এই ট্যুর শেষ হয়ে যাবে। ভ্রমণ হোক সুন্দর ও উচ্ছল।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সুস্থ বিনোদনের মাধ্যম নিরিবিলি পিকনিক স্পট

বাংলাদেশের বর্ষার রানী সিলেট ভ্রমণের বিস্তারিত