মোহময় মুন্নারের চা বাগানঘেরা মোহনীয় পথে

ইরনাকুলাম স্টেশনে আতিথিয়তায় ফ্রেস হয়ে, পাশের রেস্টুরেন্টে খাবার খেয়ে, ওদেরকে বসিয়ে রেখে বাইরে গেলাম ট্যাক্সির খোঁজ নিতে। কয়েক জায়গায় খোঁজ নিয়ে দেখলাম যাওয়া-আসা বা শুধু যাওয়া অথবা দুই দিনের জন্য প্যাকেজ ঠিক করে নেয়া কোনটাই ৩,৫০০-৬,০০০ রুপীর নিচে সম্ভব হচ্ছে না। ইরনাকুলাম থেকে মুন্নারের দূরত্ব ১২৫ থেকে ১৩০ কিলোমিটারের মধ্যে। যার মধ্যে প্রায় অর্ধেকই আঁকাবাঁকা পাহাড়ি উঁচুনিচু পথ।
যেখানে ট্যাক্সিতে করে যেতেই অন্তত চার ঘণ্টা লাগবে আর বাসে গেলে পাঁচ ঘণ্টা। ফেসবুক বন্ধু আকাশ এক্ষেত্রে বেশ উপকার করেছে। ওর সাথে যোগাযোগ করে ৩,৫০০ রুপীর ট্যাক্সি না নিয়ে এক কিলোমিটার দুরের স্টেট বাসস্ট্যান্ডে চলে গেলাম। যদিও ট্যাক্সির ড্রাইভাররা বারবার নিরুৎসাহিত করেছে বাস স্ট্যান্ডে যেতে, সকালের পরে নাকি আর মুন্নারের বাস পাওয়া যায় না বলে। তবুও আকাশের পরামর্শ মতো গেলাম। দেখি না পাওয়া গেলে তখন না হয় ট্যাক্সি নেব।

মুন্নারের পথে… ছবিঃ লেখক

হঠাৎ করে ৩৭ ডিগ্রী গরমে এক পশলা বৃষ্টির স্পর্শ হয়ে কোথা থেকে যেন আযানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে এলো। নীরব হয়ে আযান শুনে, বাসের খোঁজ নিতে শুরু করলাম। কখন আর কোথায় আসবে মুন্নার যাওয়ার বাস? বেশ কয়েকবার ভাষা সংক্রান্ত জটিলতা এড়িয়ে মুন্নারের বাস কোনটা সেটা জেনে নিয়ে ব্যাগপত্র নিয়ে উঠে পড়েছিলাম। আমাদের সাথে আরও বসেছিল তিন ইতালিয়ান। ওরাও মুন্নার যাবে, ব্যাকপ্যাকার ট্র্যাভেলার তিনজনই। একটি মেয়ে আর দুটি ছেলে। ঠিক ঠিক ১২:৫০ মিনিটে বাস স্ট্যান্ড থেকে মুন্নারের উদ্দেশ্যে বাস ছেড়ে দিয়েছিল। তিনজন মিলে আরাম করে তিন সিট নিয়ে বসে পড়লাম। ইরনাকুলাম থেকে মুন্নারের প্রায় ১৩০ কিলোমিটার পথের বাস ভাড়া নিয়েছিল ফুল ১১৬ রুপী আর হাফ ৫৭ রুপী করে মাত্র।
চলার পথে সবুজের হাতছানি, ছবিঃলেখক

বাস এগিয়ে চলেছে কেরালা শহরের নানা রাস্তা পেরিয়ে মুন্নারের দিকে। সেদিন বেশ গরম পড়েছিল। তবুও ক্লান্তি আর বাসের ঝাঁকুনিতে কে যে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি বুঝতে পারিনি। এক জায়গায় এসে বাস থেকে নামতে হল, বাসের কোনো একটা সমস্যা হয়েছে সেটা ঠিক করবে বলে। সেখানে প্রায় ১০-১৫ মিনিট অপেক্ষার পরে আবার বাস ছেড়ে মেইন রাস্তায় উঠতেই চোখে পড়ল নানা রকমের মসজিদ একটু পরপর। দেখেই কেমন যেন একটা ভালো লাগায় পেয়ে বসল।
কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম এরপর ঠিক মনে নেই। ঘুম ভাঙল যখন সমতল ছেড়ে পাহাড়ি পথে চলতে শুরু করেছিলাম। এক পাহাড়ি বাস স্ট্যান্ডে বাস থেমেছিল ১০ মিনিট বিরতিতে, এত খটমট নাম যে মনে রাখা মুশকিল তাই ওদিকে আর মনোযোগ না দিয়ে সেখানে একটু চা, একটু কেক আর পানি নিয়ে, ঝিরঝিরে বৃষ্টি ঝরতে শুরু করতেই আবার বাসে উঠে পড়লাম। বাসও ছেড়ে দিল সাথে সাথে। এর পরেই শুরু হয়েছিল মুন্নার যাবার মনোমুগ্ধকর রাস্তা।
মোহ ছড়ানো পথে, ছবিঃ লেখক

আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে উপরে উঠি আর সবুজের অরণ্য ভেদ করে নানা রকম আকর্ষণীয় সবুজের সমারোহ দেখতে দেখতে সামনে এগোতে থাকি। তখন ঝিরঝিরে বৃষ্টিটা তার ঝরে পড়া আর একটু বাড়িয়ে দিয়েছিল, যে কারণে সবুজে ঘেরা পাহাড়ি পথের দুই পাশটা আরও বেশী কমনীয় হয়ে উঠেছিল। একপাশে সবুজের সমুদ্র ঢেউ খেলানো চা বাগান, তার একটু উঁচুতে গভীর আর ভেজা অরণ্য, অন্যপাশে উঁচু উঁচু পাহাড়, পাহাড়ের গায়ে গায়ে ছোট বড় নানা রকম রূপালী ঝর্ণা, সাদা মেঘের ভেলা, কাছে দূরে কুয়াশার নিজের মতো করে খেলা। এক অপরূপ আবেশ তৈরি করে দিয়েছিল মুহূর্তেই।
আর হুট করেই বেশ ঠাণ্ডা লাগায় মোবাইলের স্কিনের দিকে তাকিয়ে দেখি দুপুরের ৩৭ ডিগ্রী তাপমাত্রা কখন যেন কমে ১৭ তে চলে এসেছে! মানে উত্তপ্ত গরম থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে শীতের দেশে চলে এসেছি। বাহ কী অদ্ভুত একটা ব্যাপার তাই না? যদিও এমন অভিজ্ঞতা আমি দার্জিলিংয়ে বহুবার পেয়েছি, কিন্তু ওরা এবারই প্রথম তাই আমার চেয়ে অনেক বেশী রোমাঞ্চিত ছিল। গরমে মা-ছেলের গোমড়া মুখে শীতের সুখ সুখ পরশ বুলিয়ে দিয়েছিল মুন্নার যাবার পথের সবুজের সমুদ্র, ঢেউ খেলানো চা বাগান, গভীর আর অচেনা অরণ্য, ঝিরঝিরে বৃষ্টি, কাছে দুরের ছোট বড় পাহাড়, পাহাড়ে-পাহাড়ে জমে থাকা মেঘের দল, মাঝে মাঝে বাসের খোলা জানালা দিয়ে আঁকড়ে ধরা শীতের কুয়াশা আর পাহাড়ের গা থেকে ঝরে পড়া অসংখ্য রূপালী ঝর্ণাধারা।
পথের বাঁকে সবুজের ঢেউ! ছবিঃ লেখক

আমি দুইপাশের দুই রূপ দেখবো নাকি সামনে এগিয়ে আসা আর পিছনে ফেলে যাওয়া ঘন অরণ্য দেখবো ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। আমার বামে ছিল উঁচুনিচু সবুজ চা বাগানের সারি সারি, প্রান্তর জুড়ে সবুজের সমুদ্র নান্দনিক চা বাগান, যেখানে ঝিরঝিরে বৃষ্টির পরশে ওরা ওদের সবুজের স্নিগ্ধতা যেন আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল বহুগুণ, চা বাগান যেন নয় এক একটা সবুজ কাঞ্জিভরম পরে যেন সেজে উঠেছিল চারপাশ। কারণ একটু পর পর মোড়ে মোড়ে দেখা মিলছিল কাঞ্জিভরমের বড় বড় বিল বোর্ড। তাই গুলিয়ে ফেলছিলাম। মাঝেমাঝে বাস এঁকেবেঁকে ছুটে চলছিল গভীর অরণ্যের মাঝ দিয়ে। ভেজা অরণ্যের যে কী অপরূপ রূপ ভাষায় লিখে বোঝানো আমার জন্য মুশকিল।
অপূর্ব পথে ছুটে চলা। ছবিঃ লেখক

সর্বাঙ্গ জুড়ে যেন সুখের বৃষ্টির ফোঁটা জড়িয়ে আছে এখানে সেখানে আর হালকা আবেগি হাওয়ায় সেসব বৃষ্টির ফোঁটা যেন ঝরে ঝরে পড়ছে পাগল করা আকর্ষণে। মাঝে মাঝে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। কোথায় আর কাকে দেখছি আমি, সবুজ কাঞ্জিভরম জড়ানো স্নিগ্ধ চা বাগানকে? সদ্য ঝর্ণায় স্নান করে ফেরা রমণীবেশী অরণ্যকে, কাছে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা বৃষ্টি ভেজা পাহাড়কে? পাহাড়ের গায়ে, পায়ে আর পিঠে জড়িয়ে থাকা ঝর্ণাধারাকে নাকি সামনের আঁকাবাঁকা অপূর্ব রাস্তার দুইপাশে ফুটে থাকা আর ঝুলে থাকা রঙ বেরঙের ফুলকে?
এসব সম্মোহনে সম্মোহিত হয়ে, অবাক চোখে তাকিয়ে থেকে, প্রায় বাকরুদ্ধ হয়ে কখন যেন বাস এসে থেমে গেছে মুন্নারের ঝলমলে চত্বরে বুঝতেই পারিনি। বাসের সহকারীর ডাকে চেতনা ফিরে পেয়ে বাস থেকে নামলাম মুন্নার বাস স্ট্যান্ডে।
ফিচার ইমেজ- blogspot.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

তাজপুর গ্রামের প্রাচীন বাবুর বাড়ি মঠ

বান্দরবানের স্বপ্নকথন: আবার ফিরে আসা নাফাখুমে