দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দুর্দান্ত সব ট্রেকিং রুটের আদ্যোপান্ত

ভ্রমণকারী দুইরকম। একদল ভ্রমণকারী ভ্রমণানন্দের সাথে আরামটাও খোঁজে, চায় দুনিয়া দেখার পাশাপাশি একটু ভাল-মন্দ খাওয়া দাওয়া করতে, ভালো জায়গায় থাকতে আর খুব বেশি একটা কষ্ট না করতে। আরেকদল ভ্রমণপ্রেমী আছে যারা বনে-বাদাড়েই জীবনানন্দ খুঁজে পায়, এদের যেখানে রাত সেখানে কাঁত স্বভাব, অত বেশি বিলাসীতার দরকার নেই তাদের আর ভাল থাকা-খাওয়ার চেয়ে তাদের কাছে সৃষ্টিকর্তার বানানো এই প্রকাণ্ড বিশ্বের প্রতিটি কোণায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য সৌন্দর্যের বিষয়বস্তুই মুখ্য।

দ্বিতীয় প্রকার ভ্রমণপ্রেমীদের অনেকটা যাযাবর জীবনধরণ, এদের সাধারণ ভাষায় বলা হয় ট্রেকার। পায়ে হেঁটে সৌন্দর্যের অনুসন্ধানী মনের অধিকারীদেরই বলা হয় ট্রেকার। সেই সৌন্দর্য হতে পারে কোনো পাহাড়ের সর্বোচ্চ চূড়াকে ঘিরে, হতে পারে কোনো জলপ্রপাতের গগনবিদারী গর্জনের আষ্টেপৃষ্ঠে অথবা হতে পারে কোনো ভ্যালিকে কেন্দ্র করে যেখানে মোটরচালিত কোনো যানবাহনের যাওয়া প্রায় অসম্ভব এবং অকল্পনীয়।

আমাদের দেশে তো বটেই, আশেপাশের দেশগুলোতে প্রচুর ট্রেকিং রুট আছে যেগুলো একেকটা একেক কারণে বিখ্যাত। আমাদের আজকের আয়োজন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তেমন কিছু ট্রেকিং রুট নিয়ে যেগুলোতে যাওয়ার পরিকল্পনা শুরু করতে পারেন আজকে থেকে।

১. তামান নিগারা, মালয়েশিয়া

ছবিঃ tamannegara.asia

মালয়েশিয়ার তামান নিগারা অত্র অঞ্চলের সবচেয়ে বিখ্যাত ট্রেকিং রুটগুলোর মধ্যে একটি। এই ট্রেকিং রুটটি বিখ্যাত মূলত এর নিজস্ব কিছু কারণে। বিশ্বের অন্যতম পুরনো রেইনফরেস্টগুলোর একটি হচ্ছে তামান নিগারা। এখানে আপনি ট্রেকে এসে রাত কাটাতে পারবেন তাবুর কাপড়ের নিচে আর উপভোগ করতে পারবেন রাতের জঙ্গলের বিচিত্র অভিজ্ঞতা।

দিনের বেলায় জঙ্গলের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী ধরে হেঁটে যাওয়া যায় বহু দূর, হারিয়ে যাওয়া যায় চুনাপাথরের তৈরী অদ্ভুত সুন্দর প্রাচীন দেয়ালিকা আঁকা গুহাগুলোয় আর উঠে যাওয়া যায় এখানকার ছোট ছোট পর্বতগুলোর গায়ে বিচিত্র জীব-জঙ্গলের দেখা পেতে।

২. চ্যারিটি চ্যালেঞ্জ, ভিয়েতনাম

ছবিঃ humacharitychallenge.com

এই হাইকটি সাধারণত করা হয়ে থাকে উত্তর ভিয়েতনামের দিকে। প্রচণ্ড রোমাঞ্চকর এই হাইকিং আপনাকে নিয়ে যাবে ভিয়েতনামের সবচেয়ে পুরনো কিছু গ্রাম যেমন ব্ল্যাক হেমং, রেড ডাউ আর তাই মাইনোরিটিসের ভেতর দিয়ে। বহু বছর পুরনো সে গ্রামগুলোর উপজাতীয় সম্প্রদায়ের ঘরে থাকতে হবে বেশ কয়েকদিন।

বাকি দিনগুলো ক্যাম্পিং করে কাটাতে হবে। একবার ভাবুন, কত রোমাঞ্চকর হবে হাইকিংটি! তবে এখানে আসার আগে বেশ ভালো করে টাকা-পয়সা জমাতে হবে। এই হাইকিংটি করাই হয় মূলত চ্যারিটি অর্থাৎ দান করার জন্য, তাই গ্রুপে আসা প্রতিটি মানুষের সাথে আত্মিক সম্পর্ক তৈরী হয়ে যায় নিমেষেই।

৩. ইন্ট্রেপিড ট্রাভেল, থাইল্যান্ড

ছবিঃ intrepidtravel.com

যাদের হাতে সময়টা একটু কম এবং সৌভাগ্যবশত থাইল্যান্ড যাচ্ছেন ঘুরতে, তাদের জন্য এই ইন্ট্রেপিড ট্রাভেল ট্রেক। মূলত থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই পাহাড়ের ক্যারেন জনগোষ্ঠীর গ্রামগুলোতে ৩ দিনের ছোট্ট ট্রেকিং এই ইন্ট্রেপিড ট্রেকিং। প্রতিদিন হাঁটতে হবে মাত্র তিন থেকে চার ঘণ্টা, ঘন বিশাল জঙ্গলের মধ্য দিয়ে আর প্রতিরাতে থাকতে হবে ক্যারেন জনগোষ্ঠীর গ্রামে গ্রামে।

অত্যন্ত সহজ এই ট্রেকিংয়ে থাইল্যান্ডের বন-জঙ্গল সম্পর্কে ধারণা একদম পরিষ্কার হয়ে যাবে। সাথে গ্রামগুলোতে পরিষ্কার আকাশের নিচে কাটানো রাতগুলোও হয়ে থাকবে অতুলনীয়।

৪. খামোয়ান ইকোগাইডস, লাউস

ছবিঃ onemoretrips.com

থাইল্যান্ড আর মায়ানমারের একদম কাছের দেশ লাউস। এখানকার সবচেয়ে বিখ্যাত এবং সহজ ট্রেকগুলোর মধ্যে ফো হিন ফোউন ট্রেক বেশ জনপ্রিয়। এই ট্রেকে আপনি পাবেন চুনাপাথরের তৈরী অসংখ্য গুহা যাত্রা আর ঘন জঙ্গল।

দুই দিনের এই ট্রেকে আপনি পাবেন এমন সব রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা যা আবারো লাউসে টেনে আনবে আপনাকে। বলতে ভুলে গেছি, এই ট্রেকে আসার সময় টর্চ আনতে ভুলবেন না কারণ আপনাকে পাড়ি দিতে হবে এখানকার সবচেয়ে বড় গুহা “কং লর” যা প্রায় ৭ কিলোমিটার লম্বা।

৫. পুহ ইকো ট্রেক, থাইল্যান্ড

ছবিঃ nyt.com

থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই থেকে ফিরে আসার পথে আপনার গাইড জ্বলজ্বলে টর্চের আলোয় আপনাকে নিয়ে যাবে পুহ ইকো ট্রেকে যেখানে আপনি পাবেন প্রচুর গভীর কিছু গুহা যেগুলো বাদুড় দিয়ে একদম ভরপুর।

আরো পাবেন ক্যারেন জনগোষ্ঠীর সাথে মতবিনিময় আর সঙ্গ পাওয়ার সুযোগ। তাদের আতিথেয়তাই মুগ্ধ করতে বাধ্য প্রতিটি ট্রেকারকে। তবে সব কিছুর পরে যখন ট্রেক শেষ হবে তখন আপনি আরো একটি জিনিস শিখতে পারবেন, তা হলো জঙ্গলে কীভাবে খাবার সংরক্ষণ করা হয়।

৬. হিল ট্রাইব ট্যুরস, থাইল্যান্ড

ছবিঃ thailandpackagedeals.com

এই ট্রেকটি মূলত থাইল্যান্ডের চিয়াং মাইয়ের এক এনজিও দ্বারা পরিচালিত। থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বা চিয়াং মাই থেকে শুরু এবং শেষ হওয়া ট্রেকগুলোর মূল লক্ষ্যে মূলত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের চেয়ে সাংস্কৃতিক আত্মতৃপ্তি বেশি প্রাধান্য পায়। যেহেতু দৈনিক ট্রেকগুলো মাত্র কয়েক ঘণ্টার, তাই মূল সময় ব্যয় করা যায় স্থানীয়দের সাথে কথা বলে, তাদের দৈনন্দিন জীবন-যাপন পর্যবেক্ষণ করে।

মোট তিনটি সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীর বসবাস এখানে- লাহু, আখা আর ক্যারেন। অত্যন্ত অতিথিপরায়ণ এই জনগোষ্ঠীর মানুষদের আপনি আপনার কটেজের সামনে বাঁশের মেঝেতে খাবার বানাতে দেখবেন। আবার কাউকে দেখবেন স্থানীয় বিদ্যালয়গুলোতে নিযুক্ত থাকতে। বিচিত্র এই জীবনযাপন দেখতেই মূলত ছোট কিন্তু দরকারি এই ট্রেকগুলো হয়ে থাকে।

৭. ইয়াক লাউম ট্রেক, কম্বোডিয়া

ছবিঃ localtravelista.files

উত্তর-পূর্ব কম্বোডিয়ান জেলা রাতানাকিরির প্রত্যন্ত অঞ্চল ইয়াক লাউম। এত বৈচিত্র্য এই ট্রেকে যে আপনি একা গিয়ে বেশি একটা সুবিধে করতে পারবেন না। তিন-চারজনের একটি গ্রুপ আর একজন গাইড সঙ্গে নিলেই পাওয়া যাবে ট্রেকের আসল রোমাঞ্চ। গাইড আপনাকে এমন সব দুর্দান্ত সুন্দর প্রত্যন্ত জায়গায় নিয়ে যাবে যা একা একা চিনে যাওয়া প্রায় অসম্ভব।

এখানে আছে ইয়াক লাউম হ্রদ যা একটি মৃত আগ্নেয়গিরি থেকে সৃষ্টি। এই হ্রদের চারপাশে গড়ে উঠেছে পাঁচটি তাম্পুয়েন গ্রাম যাদের ঐতিহ্যবাহী হাতের কাজ, রীতিনীতি আর ধর্মবিশ্বাস নজড় কাড়ার মতো।

৮. রিনজানি ট্রেক, লম্বক

ছবিঃ insighttoasia.com

আজ থেকে প্রায় বিশ বছর আগেও কেউ জানতো না লম্বকের মাউন্ট রিনজানি নামেরও একটি জায়গা আছে যেখানে প্রতিনিয়ত সৌন্দর্যের ফোয়ারা উঠে আগ্নেয়গিরির গাত্র বেয়ে। এই মাউন্ট রিনজানির আবিষ্কারক হলেন মিস্টার জন। মিস্টার জনের “জন’স এডভেঞ্চার” এর অংশ হিসেবে তিনি স্বয়ং আপনাকে নিয়ে যাবেন আগ্নেয়গিরির গা বেয়ে মাউন্ট রিনজানিতে।

ট্রেকটি মূলত তিন দিনের সহজ ট্রেক। মাউন্ট রিনজানিতে আছে অত্যন্ত পবিত্র এক হ্রদ যেটি “সিগারা আনাক” মানে সমুদ্রের বৎস বলে পরিচিত। তিন দিনের ঘর্মাক্ত ট্রেক শেষে এত বড় জলাধার পেয়ে নিশ্চয়ই আর নিজেকে আটকে রাখতে পারবেন না আপনি।

ফিচার ইমেজ- adventureinyou.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

গোয়া ভ্রমণের খরচাপাতি

এক নজরে একটি জেলা: অতীতের পাতা থেকে রাজশাহী জেলা