নিসর্গপ্রেমীদের খৈয়াছড়া ঝর্ণায় অ্যাডভেঞ্চার

‘খুব যদি বিষণ্ণ হও,
কান্না পায় ক্লান্তির দৌড়ে,
তবে এদিকটায় একবার এসো।
ঝাঁপিয়ে পড়ো ঝর্ণাধারায়,
স্নান নিও সমুদ্রজলে,
তাবু গেড়ো ঐ সবুজ পাহাড়ে।
কথা দিলাম, জীবন পাবে,
নতুন এক জীবন জন্ম নেবে।’

বলছিলাম এমনই একটি জায়গার কথা। চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে অবস্থিত খৈয়াছড়া ঝর্ণা।

মূলত ট্রেইল শুরু এখান থেকেই; source: লেখিকা

ভ্রমণপ্রিয় মানুষ হওয়ায় কোথাও ভ্রমণে গিয়ে সেখানকার প্রকৃতির মধ্যেই যেন জীবন খুঁজে পাই। সেবার সেমিস্টার পরীক্ষা শেষ করেই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। এবার কোথাও ঘুরে আসা চাই। সেই অনুযায়ী পরিকল্পনাও হলো। জায়গা নির্ধারিত হলো খৈয়াছড়া ঝর্ণা।

বন্ধুদের জানালাম, আশ্বাস দিলো এবার যাবেই। তবে যাবার দিন সকাল পর্যন্ত নিশ্চিত হইনি তখনো ক’জন যাচ্ছি। কারণ প্রতিবারই এমন হয়ে আসছে পরিকল্পনা করছি বিশ জনের মতো, ট্যুরের দিন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে দুই কি তিনজন! তবে সেদিন সকালে শেষমেশ বাসে উঠি যখন, দেখি মোটমাট আটজন যাচ্ছি আকাঙ্ক্ষিত খৈয়াছড়ার উদ্দেশ্যে।

সবুজের আড়ালে হাতছানি দিয়ে ডাকছে ঝর্ণা; source: লেখিকা

যেহেতু ট্রেইল পার হতে হবে প্রস্তুতিও নিলাম সেভাবেই। ব্যাগ গুছিয়ে রাখলাম রাতেই, খুব সকালেই রওনা দেবো। রাতে ভালো ঘুম হয়নি। সত্যি বলতে কোনো ট্যুরের আগের রাত্রেই ঠিকমতো ঘুম হয় না। গিয়ে কী কী দেখবো বা কী কী করবো তা ভাবতে ভাবতেই সকাল হয়ে যায়।

ভোর পাঁচটার দিকেই উঠে গেলাম। যেহেতু একদিনের ট্যুরে যাচ্ছি তাই যত সকালে পৌঁছুতে পারি ততই লাভ। কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রাম খুব দূরের রাস্তা না হলেও ঠিকমতো উপভোগ করতে হলে সকাল ন’টার আগেই সেখানে উপস্থিত থাকতে হবে। ঠিকঠাক মতো তৈরি হয়ে বের হলাম বাসা থেকে। টিকিট কাটি প্রিন্স সৌদিয়া বাসের, টমছম ব্রীজ থেকে যাত্রা শুরু।

শুনি ঝিরিপথের গর্জন; source: লেখিকা

বাসে যখন উঠি তখন ঘড়িতে বেজে ছয়টা বিশ মিনিট। পাশের সিটে প্রিয় বন্ধু। বসেছি বাসের জানালার পাশে, বাতাসও ছিল প্রচণ্ড।

যাত্রার শুরুটাতেই কাজ করছিলো ভীষণ ভালো লাগা। বন্ধুরা মিলে হৈ হুল্লোড় করে কিছু ছবি তুললাম। বাস এগুচ্ছে দ্রুত গতিতে। ধীরে ধীরে ফেনী পার হয়ে প্রবেশ করলাম চট্টগ্রামে।

চট্টগ্রামের আকাশের প্রতি আমার একটা দুর্বলতাই রয়েছে বৈকি। সাদা মেঘগুলো ভেসে বেড়ায় যেন খুব স্বাধীনতায়। মেঘের ফাঁকে সূর্যের আলোর উঁকিঝুঁকিতে মুগ্ধতা বাড়ছে যেন সমান হারে। মীরসরাইয়ে বাস পৌঁছালে নেমে গেলাম সবাই।

সিএনজি করে পৌঁছে গেলাম বড়তাকিয়া বাজারে। বড়তাকিয়া বাজারের উত্তর পার্শ্বে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চার কিলোমিটার পূর্বে ঝর্ণার অবস্থান। এর মধ্যে এক কিলোমিটার পথ গাড়িতে যাওয়ার পর বাকি পথ যেতে হয় পায়ে হেঁটে।

দারুণ এডভেঞ্চার শেষে প্রায় চলে এসেছি ঝর্ণার কাছে; source: লেখিকা

বিশ মিনিট হাঁটার পর কিছু খাবার হোটেল আর দোকান পেলাম। ভারি ব্যাগ নিয়ে ট্রেইল পার হতে কষ্ট হবে সেটা জেনেই এসেছিলাম। তাই সবাই হোটেলে ব্যাগ জমা রাখি আর সকালের নাস্তা করে নিই, ঘড়িতে তখন দশটা বাজে।

পিচ্ছিল পাহাড়ি পথ দিয়ে যেতে হবে বলে সবাই একটা করে ছোট মজবুত বাঁশ নিয়ে রওনা হই সামনের দিকে। বাঁশের সাঁকো, ক্ষেতের আইল, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে মন মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন হচ্ছিলো অনবরত। বন্ধুরা মিলে কলরব তুলে এগুচ্ছিলাম বন্ধুর পথ।

বেশ খানিকটা কর্দমাক্ত উঁচুনিচু পথ আর ঝিরিপথ পার হয়ে একটা ছোট ঝর্ণার দেখা পেলাম। কয়েকজনকে জিজ্ঞাসা করলাম আর কতদূর? জবাব দিলেন এই যে সবে শুরু। কিন্তু এই পথের সৌন্দর্যেই আমাদের উচ্ছ্বাসের সীমা নেই। ঝিরিপথের হালকা স্রোত আর পিচ্ছিল রাস্তায় সাবধানে পা ফেলে আমরা এগুতে থাকলাম সামনের দিকে।

ঝর্ণার নয়নাভিরাম দৃশ্য; source: লেখিকা

এবার তুলনামূলক বেশি উঁচু আর খাড়া হতে লাগলো রাস্তাটা। এরকম কিছুদূর যাবার পর আরেকটা ঝর্ণার দেখা পেলাম এবং এবারেরটা আরো সুন্দর। ভেতরে ছলাৎ করে ওঠে ওই ঝর্ণার প্রবাহের আওয়াজে। কিছুক্ষণ থেকে আবার পাড়ি জমালাম পরবর্তী ধাপের লক্ষ্যে এবং এবারের ট্রেকিং সবচেয়ে খাড়া, ঢালু আর রিস্কি।

উঠতে লাগলাম বাঁশ হাতে নিয়ে সন্তর্পণে পা ফেলে। অবশেষে পৌঁছালাম ঝর্ণার মূল জায়গায়। এই অপার্থিব সৌন্দর্য দেখে যেন সারা গায়ে আনন্দের ঢেউ খেলে গেলো। ঝর্ণার উপর থেকে ধাপে ধাপে পানি পড়ছে বিরতিহীন অপূর্ব ছন্দে। চোখের পিয়াস, মনের পিয়াস বুঝি ঘুচলো আজ এই ঝর্ণার বুকে এসে।

পৌঁছেই বুঝে গিয়েছিলাম ভয়ংকর সৌন্দর্যের আরেক নাম খৈয়াছড়া। কারণ জায়গাটা যেমন সুন্দর, তেমনি বিপজ্জনক। পরপর ১২টি ঝর্ণা একটার পর আরেকটা সাজিয়ে সৃষ্টিকর্তা যে অসাধারণ সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছেন, সেটা নিজের চোখে না দেখলে ছবি বা ভিডিও দেখে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।

বর্ষাকালে পাবেন এমন স্রোতধারা; source: লেখিকা

কিছুক্ষণ ঝর্ণার রূপ দেখে হিম শীতল পানিতে নেমে গেলাম শেষমেশ। মনে হচ্ছিল এখানেই থেকে যাই অনন্তকাল। কিন্তু ফিরতে যে হবে, মনকে এক প্রকার বুঝিয়ে ফেরার পথ ধরলাম। ওই খাড়া, পিচ্ছিল পথ বেয়ে আবার ফিরে আসার কথা ভাবতেই গা হিম হয়ে এলো। শেষ পর্যন্ত নিরাপদেই ফিরে এসেছিলাম সবাই।

ফেরার পর সবাই জামাকাপড় বদলে ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নিলাম ঝর্ণা হোটেলে। এদের আপ্যায়নটাও ছিল অতিথিপরায়ণ। ক্ষুধা পেটে খাবার ভালোই লেগেছিল। ১৫০ টাকায় মুরগীর মাংস, আলু ভর্তা, ভাত, ডাল।

আর জোঁকের কথাটা তো বলা হলো না। অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে জোঁক ধরলো কিনা। আমি অবশ্য হুলস্থুল কাণ্ড বাঁধিয়েছিলাম হাতের মধ্যে জোঁক দেখে। অবশেষে বলতে হচ্ছে, অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী মানুষদের জন্য নিঃসন্দেহে এই জায়গাটা হলো স্বর্গরাজ্য। পাহাড়ের সবুজ রং আর ঝর্ণার স্বচ্ছ জল মিলেমিশে একাকার হয়েছে মিরসরাইয়ের খৈয়াছড়া ঝর্ণায়।

খরচ :

আমাদের ট্যুরটা ছিল একদিনের। কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে।

বাসভাড়া – ৪৮০ টাকা (আসা-যাওয়া)
খাবার খরচ – ২০০ টাকা
সিএনজি ভাড়া ও অন্যান্য খরচ – ১০০ টাকা

সাবধানতা :

১. খৈয়াছড়া ট্রেইল করতে হলে কখনোই সাধারণ স্যান্ডেল বা স্লিপার নিয়ে যাওয়া উচিত না। ভালো গ্রিপের স্যান্ডেল বা জুতা নিয়ে যেতে হবে, তাহলে পাহাড়ে উঠতে সুবিধা বেশি। আমরা অবশ্য গিয়েছিলাম খালি পায়ে। কারণ বর্ষাকাল থাকায় তখন পথ ছিল বেশি পিচ্ছিল।

ক্যাসকেডের মন ভোলানো সৌন্দর্য; source: Wikipedia.com

২. সাথের ব্যাগ যতটা সম্ভব হালকা রাখার চেষ্টা করতে হবে কারণ ভারী ব্যাগ নিয়ে উপরে ওঠা এবং অনেকটা পথ হাঁটা অবশ্যই কষ্টসাধ্য।

৩. বর্ষাকালে খৈয়াছড়ায় প্রচুর পরিমাণে জোঁক থাকে। তাই সাথে করে লবণ নেওয়া যেতে পারে। কোথাও জোঁক আক্রমণ করলে হালকা লবণের ছিটা দিলেই সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দিবে।

৪. যেহেতু ঝিরিপথের রাস্তা তাই ভিজে গেলেও সমস্যা হবে না তেমন পোশাক পরিধান করা উচিত।

৫. আর কোথাও ভ্রমণে গিয়ে আমরা অবশ্যই ময়লা আবর্জনা ফেলে পরিবেশ নষ্ট করবো না। কারণ আমাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষার দায়িত্ব আমাদেরই অবশেষে বিকেলের দিকে চট্টগ্রামের আরেকটি উল্লেখযোগ্য সুন্দর জায়গা বাঁশবাড়িয়া সমুদ্রসৈকতে সূর্যাস্ত দেখে আমরা ফেরার বাস ধরলাম।

বাসে ওঠার পর বুঝতে পারছিলাম কতটা ক্লান্ত হয়ে আছি সবাই। পায়েও ব্যথা হচ্ছিল বেশি। তবে অভিজ্ঞতায় যোগ হলো নতুন এক অধ্যায়, তাতেই তুষ্ট ছিলাম খুব।

Feature Image: লেখিকা

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

গ্রামে শীত আসে বিশেষ রূপে

স্কিয়িং এবং স্নো-বোর্ডিংয়ের জন্য সেরা ৭টি স্থান