প্রসঙ্গ, ট্রেকিং বুট ও প্রকারভেদ বিষয়ক

ট্রেকিং শব্দটি অনেকের কাছেই স্বপ্ন, অনেকের কাছে প্যাশন, অনেকের পেশা বা অনেকের কাছে ধর্মের মতো। পাহাড়-পর্বত বা ঝর্ণা সেটা যাই হোক দুর্গম প্রকৃতি পাড়ি দিয়ে সব ধরনের ট্রেকারই চায় স্বাচ্ছন্দে ট্রেকিং করে মনের খেরাক মেটানোর জায়গাগুলোতে পৌঁছাতে। এর জন্য অনেক সময় পরিবেশ বিচার করে, লাগে অনেক ধরনের সরঞ্জাম।

আবার কোথাও কোথাও কোনো সরঞ্জাম ছাড়াই পৌঁছানো যায়। তবে যেহেতু হেঁটে হেঁটেই পৌঁছানো লাগে কাঙ্ক্ষিত জায়গাগুলোতে। তাই পায়ের দিকে নজর দেয়াটা সব থেকে বেশী জরুরী বিষয়। দুর্গম পথে বা মুগ্ধ করা প্রকৃতির মাঝে, ট্রেকিং যেখানেই হোক সবার আগে দরকার একটি উপযুক্ত ট্রেকিং বা হাইকিং বুট।

অনেকেই ঘরে পরা জুতা নিয়ে দুর্গম পাহাড়ে গিয়ে বিপদে পড়েন, আবার অনেকেই পরিবেশ বুঝে উপযুক্ত ট্রেকিং বুট নিয়ে সাচ্ছন্দে ট্রেকিং করেন, কোনো সমস্যা ছাড়াই। বিভিন্ন সিজন ও স্থান ভেদে ট্রেকিং বুটের গঠন, প্রকৃতি ও আকার ভিন্ন হয়ে থাকে। গরমের মধ্যে যে বুট পরে ট্রেকিং করা হয় সেটা বরফের মধ্যে বা বর্ষার পানির মধ্যে ট্রেকিংয়ে উপযুক্ত হবে না এটাই স্বাভাবিক।

আবার হিমালয়ে যে বুট দিয়ে আপনি ট্রেকিং করবেন সেটা দিয়ে বান্দরবানের পানি কাদার কোনো ট্রেইলে হাঁটতে গেলে অসুবিধায় পড়তেই পারেন। তাই বুট কেনার আগে সেটা পরে কোথায় যাবেন, সে অঞ্চলের প্রকৃতি কেমন, আবহাওয়া কেমন, পাথরে হাঁটবেন নাকি বরফে এগুলো নিশ্চিত হয়ে বুট কেনাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

হাইকিং – এ টাইপ বুট:

এই ধরনের বুট মূলত প্রাত্যহিক কাজের জন্য তৈরি করা হয়। প্রতিদিন দৌড়ানোর জন্য এই বুট মূলত স্বাভাবিক মাটি, রাস্তা, ঘাসের ট্রেইল, সামান্য উঁচু পাহাড়ি রাস্তার জন্য উপযোগী। কোন শহরে ঘুরতে গেলেন বা দুই ঘণ্টার সাধারণ ট্রেইলে হাইক করার জন্য ক্লাস এ ক্যাটাগরির এই বুটগুলো ব্যবহার করতে পারবেন।

সাধারণ সোল কিছুটা নমনীয় করে তৈরি করা হয়। কিছু বুট থাকে রশি যুক্ত আবার কিছুতে বাঁধার জন্য রশি থাকে না। অবশ্যই এগুলো পরে হিমালয়ে বা বান্দরবানের গহীন কোনো কাদামাটি যুক্ত ট্রেকিংয়ে চলে গেলে বোকামি হবে।

ট্রেকিং –  বি টাইপ বুট:

এই বুটগুলো মাঝারি ধরনের ট্রেকিংয়ের জন্য তৈরি করা হয়। যেমন খুব বাজে ধরনের পাথুরে ট্রেইলে আপনাকে দিনে তিন থেকে চার ঘণ্টা ও সর্বোচ্চ চার থেকে ছয় দিন ট্রেকিং করতে হবে, তাহলে এই বুটগুলো আপনার জন্য উপযোগী। হাই অ্যাংকেল সাপোর্ট থাকায় এই বুটগুলো ট্রেকিংয়ের উঁচু নিচু বা পাথুরে রাস্তায় গোড়ালিকে বিশেষ ধরনের সাপোর্ট দেবে।

এছাড়া পাথুরে ট্রেইলে ট্রেকিংয়ের জন্য এর সোলের নিচে গভীর স্পাইক গ্যাপ দেয়া থাকে। যা পাথরে পা পিছলানো থেকে আপনাকে রক্ষা করবে। অবে বি টাইপ বুটগুলো বেশীর ভাগ সময়ে ওয়াটার প্রুফ ও ব্রিদেবল করে তৈরি করা হয় না। তাই পানি জমা রাস্তা ও বৃষ্টির মৌসুমে এই বুট ব্যবহারে সতর্ক থাকা উচিৎ।

অফ ট্রেইল – সি টাইপ বুট:

ট্রেকিংয়ের ধরন অনুযায়ী ভেরি ডিফিকাল্ট বা চ্যালেঞ্জিং ট্রেকিংয়ের জন্য এই বুটগুলো ডিজাইন করা হয়। প্রতিদিন চার থেকে সাত ঘণ্টা, অত্যধিক উচ্চতা ও দশ থেকে কুড়ি দিনের লম্বা ট্রেকিংয়ের জন্য এই বুটগুলো উপযোগী। বিশেষভাবে এর সোল ডিজাইন করা হয় যাতে করে পাথর, বরফ, কাদামাটি বা পানির অনবরত আঘাতের ফলে সহজে ক্ষয়প্রাপ্ত না হয়। গঠনগতভাবে অত্যন্ত মজবুত, ব্রিদেবল, ওয়াটার প্রুফ, স্নো প্রুফ, ডাস্ট প্রুফ, হাই অ্যাংকেল সহ বেশ কিছু সুরক্ষাজনক সুবিধা মাথায় রেখে এই বুটগুলো ডিজাইন করা হয়।

আপনার শরীরের লোডকে সমানভাবে খুব অল্প জায়গার মধ্যে বণ্টন ও ভারসাম্য রাখার সুবিধা পাবেন এই ধরনের বুটে। অপেক্ষাকৃত মূল্যবান এই বুটগুলো নিয়ে আপনি যে কোনো ট্রেকিং পাহাড় বা পর্বতে অভিযান পরিচালনা করতে পারবেন। এর ফিতার ভিন্ন বন্ধন প্রক্রিয়া খুব সহজে আপনাকে জুতা খুলতে ও পরতে সাহায্য করবে। স্নো প্রুফের কারণে বরফে হাঁটার সময় আপনার পা গরম রাখতে সাহায্য করবে এবং ওয়াটার প্রুফ থাকায় পানির মধ্যে দিয়ে হাঁটা স্বত্বেও দীর্ঘক্ষণ ভেতরে পানি ঢোকা আটকে রাখবে। ব্রিদেবল হওয়াতে হাঁটার সময় পায়ে উৎপন্ন ঘাম জমে না থেকে বাষ্পাকারে বাইরে বেরিয়ে যাবে তাই ট্রেকিংয়ের সময় অত্যন্ত কমফোর্টেবল অনুভূত হবে।

মাউন্টেনিয়ারিং – ডি টাইপ বুট:

আপনি যদি টেকনিক্যাল ক্লাইম্বার হয়ে থাকেন, তাহলেই এই ধরনের বুট আপনার জন্য। পাঁচ হাজার মিটার বা তা অধিক পর্বতে অত্যন্ত রুক্ষ রুটে আরোহণের জন্য এই বুটগুলো ডিজাইন করা হয়ে থাকে। বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয় এর প্রতিটি অংশ। মাইনাস ত্রিশ ডিগ্রী তাপমাত্রার মধ্যেও এই বুট আপনার পা উষ্ণ রাখতে সাহায্য করবে। কোমর সমান বরফের মধ্যে, গ্লেশিয়ার আরোহণে বা পৃথিবীর উচ্চতম পর্বত অভিযানে এই ধরনের বুট ব্যবহার করা হয়।

অত্যধিক মূল্যবান এই বুটগুলো পর্বত আরোহন ছাড়াও অত্যন্ত রাফ ট্রেকিং রুটের জন্যেও ব্যবহার করা হয়। গ্লেশিয়ার বা পিচ্ছিল বরফের রাস্তায় হাঁটার জন্য এতে ক্র্যাম্পন, বাড়তি স্পাইক বা চেইন যুক্ত করার সুবিধা থাকে। আবার কিছু কিছু বুটে অটোমেটিক ক্র্যাম্পন সংযুক্ত করা থাকে। যে কোনো আবহাওয়া পরিস্থিতিতে আপনার পা উষ্ণ রাখা ও সঠিকভাবে ভারসাম্য রাখার জন্য এ ধরনের বুট আপনাকে সাহায্য করবে।

কিছু তথ্য:

ট্রেকিং বুটগুলো ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশের জন্য ডিজাইন করা হয়ে থাকে। তাই যে পরিবেশের জন্যেই আপনি বুট কিনবেন মাথায় রাখতে হবে কিছু সাধারণ বিষয়। বুটের ওজন যত কম দেখে কিনতে পারবেন আপনার ট্রেকিং ততই স্বাচ্ছন্দ্যময় হবে। পানি নিরোধী হতে হবে, পর্যাপ্ত সুরক্ষা সম্পন্ন হতে হবে। আপনার লোড সঠিকভাবে বহন করে সহজে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারবে এবং ট্রেকিং ট্রেইলের গঠন অনুযায়ী উপযুক্ত সোলের গঠন ও অ্যাংকেল সাপোর্ট থাকতে হবে।

Loading...

2 Comments

Leave a Reply
    • ভাইয়া, দামটা পন্য বুঝে হয়। কিভাবে, কোন ট্রেকের জন্য কোন টাইপ বুট দরকার হবে, সেটা সম্পির্কে প্রাথমিক ধারণা দেবার চেষ্টা করেছি। আর ব্র‍্যান্ড তো হাজার রকমের আছে আর দাম ও ভিন্ন। সব তো বলা সম্ভব না। তবে দুই হাজার টাকা থেকে দশ হাজার টাকার ভেতর মোটামুটি থেকে চ্যালেঞ্জিং ট্রেইলের বুট পাবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শীতের হিমালয় ও ব্যাকপ্যাকিং চেকলিস্ট

ঘুরে আসুন কাপ্তাইয়ের বেরাইন্যা লেক থেকে