নেপালের হিমালয় ঘুরতে যা যা জানা প্রয়োজন

হিমালয়ের সাথে পৃথিবীর কোনো পর্বতমালার তুলনা হয় না। পৃথিবীর সব থেকে বিশাল এই পর্বতমালাটি ভারতের ছাদ নামে পরিচিত। এটি ভারত থেকে শুরু হয়ে পর্যায়ক্রমে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, চায়না, নেপাল, তিব্বত এবং ভুটানের বেশ কিছু অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত। প্রধান হিমালয় পর্বতমালার অংশটুকু এই জায়গাগুলো জুড়ে ছাড়াও এর বাইরে বেশ কিছু জায়গা জুড়ে রয়েছে এই পর্বতমালার বিস্তৃতি।

এই পর্বতমালার মধ্যে পৃথিবীর সবথেকে উঁচু পর্বতের মধ্যে নয়টির অবস্থান যার মধ্যে রয়েছে পৃথিবীর সবথেকে উঁচু পর্বত মাউন্ট এভারেস্ট। নেপাল এবং চায়নার সীমান্তে অবস্থিত এই অঞ্চলটি নেপালকে সারা পৃথিবীর দর্শনার্থীদের কাছে অন্যতম চাহিদাপূর্ণ ভূখণ্ডে পরিণত করেছে। এই অঞ্চল প্রতিটি দর্শনার্থীর কাছে আলাদা আলাদা চাহিদা বহন করে। যা চুম্বকের মতো পর্বতারোহী, মাউন্টেন ট্রেকার এবং সাধারণ দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে চলেছে যুগের পর যুগ।

Source: REI Co-op

হিমালয়ের মহিমা অনুভব করার জন্য আপনাকে বিশেষভাবে সামর্থ্যবান হওয়ার প্রয়োজন নেই অথবা আপনি যদি শিক্ষার্থীও হয়ে থাকেন তবে খুব অল্প খরচে হিমালয়ের জনপ্রিয় বেশ কিছু জায়গায় ঘুরতে পারবেন। এর মধ্যে অন্যতম একটি জায়গা হলো ল্যাংটাং ন্যাশনাল পার্ক। এই অঞ্চলটিতে ঘুরতে যাওয়ার পর আপনি গ্রহের সবথেকে দর্শনীয় কিছু জায়গার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবেন।

নেপালি হিমালয় এক্সপ্লোর শুরু করার জন্য সেরা জায়গা

কাঠমুণ্ডু থেকে প্রথমত এই হিমালয় অঞ্চলের সাহসিকতাপূর্ণ ভ্রমণটি করার জন্য প্রথমেই চলে আসতে পারেন পোখারাতে। পোখারা মূলত নেপাল দেশটির প্রায় মাঝখান বরাবর একটি জায়গায় অবস্থিত। এই জায়গাটি প্রায় সবসময়ই দর্শনার্থী সমাগমে ভরপুর হয়ে থাকে। এখানে রয়েছে বেশ কিছু মনোমুগ্ধকর লেকসাইড গ্রাম এবং ব্যাগ প্যাকিংয়ের জন্য দারুণ দারুণ কিছু ট্রেকিং।

পোখারাতে কমবেশি সব কিছুই পাওয়া যায়। হোটেল, বার, রেস্টুরেন্ট এবং ট্রেকিংয়ের সাজ সরঞ্জামের দোকান। নেপালে এই সাজ সরঞ্জামের দোকানগুলো প্রতিটি পর্বতারোহীর কাছে যেন এক একটি স্বপ্নের ঠিকানা। এছাড়া পোখারা নেপালি চায়ের জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয়। এই এলাকায় ঘুরে দেখার জন্য রয়েছে অজস্র কমলালেবু, আপেল, নাশপাতি এবং চায়ের বাগান। পর্বত দিয়ে চারদিকে ঘেরা আর পৃথিবীর সবথেকে দৃষ্টিনন্দিত স্থান এটি।

Source: Stunning Adventure

পোখারা অঞ্চলটি অন্নপূর্ণা রেঞ্জের ট্রেকিংয়ের জন্য প্রধান দরজা হিসেবেই পরিচিত। সারা পৃথিবী থেকে প্রতিবছর যত মানুষ অন্নপূর্ণা সার্কিট ট্রেকিংয়ে আসেন তারা সবাই কাঠমুণ্ডু থেকে পোখারা হয়ে অন্নপূর্ণা সার্কিট ট্রেকিং করে থাকেন। এই শহর অথবা কাঠমুণ্ডু থেকে ট্রেকিংয়ের সাজ-সরঞ্জাম গাইড এবং পোর্টারের ব্যবস্থা করে চলে যেতে পারবেন ট্রেকিংয়ে।

অন্নপূর্ণা সার্কিট ট্রেকিং ছাড়াও বেশ কিছু ছোটখাটো এক বা দুই দিনের ট্রেকিং পোখারা থেকে ম্যানেজ করা যায়। এই জায়গাগুলো পোখারার স্থানীয় কমিউনিটি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত থাকে। তাই ইচ্ছা করলে খুব কম খরচে যখন খুশি এগুলো দেখে আসতে পারবেন। পোখারা থেকে হিমালয় দর্শনের অভিজ্ঞতার আরো বেশ কিছু উপায় রয়েছে।

Source: International Traveller

যেমন পোখারা থেকে আশেপাশের উঁচু উঁচু পাহাড়গুলো বা অঞ্চলগুলোতে গেলে আপনি হিমালয়ার নেপালি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের হিমালয়ান জীবনের অভিজ্ঞতা পেতে পারেন। এছাড়া এখান থেকে সারাংকোট গিয়ে প্যারাগ্লাইডিং করা যায় অথবা বাঞ্জি জাম্পের মতো অভূতপূর্ব সাহসী এক্টিভিটিগুলো করা যায়, যেগুলো সারা পৃথিবীর খুব কম জায়গাতে গিয়ে উপভোগ করা যাবে!

ল্যাংটাং জাতীয় উদ্যানের ট্রেকিং

তিব্বত সীমান্তের কাছাকাছি কাঠমুন্ডু থেকে উত্তর দিকের ল্যাংটাং ১৯৭৬ সালের দিকে নেপালের হিমালয় প্রথম জাতীয় উদ্যান হিসেবে স্বীকৃতি পায়। আজও এটি নেপালের সেরা দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি স্থান। অন্নপূর্ণা ও এভারেস্টের তুলনায় বেশ ছোট তাই স্বল্প পরিসরে ট্রেকিং করতে এক সপ্তাহ থেকে দুই সপ্তাহ লাগে সর্বোচ্চ। কাঠমুন্ডু থেকে বাসে করেই যাওয়া যায় এই অঞ্চলে। ল্যাংটাং হিমবাহের মুখ থেকে উৎপন্ন ভ্যালিটির প্রাকৃতিক দৃশ্যের মহিমা মুখে বলে শেষ করা যায় না।

এই অঞ্চলটির মাটিকে বলা হয় নেপালের বসন্তের কম্বল অর্থাৎ এই অঞ্চলে শরৎকালের অজস্র ফুলের মেলা বসে বিশাল বিশাল পর্বতগুলোর মাঝে। এই ফুলের মালাযুক্ত ভ্যালিটি তাই অন্যান্য ভ্যালি থেকে বেশ আলাদা। বসবাসরত সাধারণ প্রাণীগুলোর মধ্যে ছাগল, হিমালয়ের কালো ভাল্লুক, লাল পান্ডা এগুলোই বসবাস করে। বুদ্ধ ক্রিপ্টোলজিস্টরা হিমালয়ের এই লোকারণ্যকে একটি ভরাট পর্বতমালা বলে চিহ্নিত করেছেন।

Source: Visit Himalaya Treks

২০১১ সালের ভূমিকম্পে এই অঞ্চলের একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী সহ বেশ কিছু গ্রাম বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে ধীরে ধীরে নেপাল সরকারের তত্ত্বাবধানে এই শহর এবং গ্রামগুলো আবার গড়ে উঠেছে। এখানে গেলে শুধুমাত্র পাহাড় দেখায় না, নেপালী স্থানীয় মানুষের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড মুগ্ধ করবে আপনাকে। এই ভ্যালিতে ইচ্ছা করলে রাফটিং, ট্রেকিং আর মাউন্টেন ক্লাইম্বিং করতে পারবেন

এভারেস্ট এলাকা ভ্রমণ

নেপাল দর্শনের সময় এভারেস্ট দর্শনের লোভ সামলানো আসলেই দায়। পৃথিবীর সবথেকে উঁচু পর্বত ৮,৮৪৮ মিটার উঁচু মাউন্ট এভারেস্ট নেপালের সাগর মাতা রেঞ্জে অবস্থিত। অনেকেই কাঠমুন্ডু থেকে লুকলা পর্যন্ত প্লেনে এবং সেখান থেকে এভারেস্ট বেস ক্যাম্প পর্যন্ত ট্রেকিং করে যান। পৃথিবীর সবথেকে আইকনিক পর্বতের রুটটি হলো লুকলা থেকে মাউন্ট এভারেস্ট বেস ক্যাম্প। মাউন্ট এভারেস্ট বেস ক্যাম্প যদিও সাধারণ কোনো ট্রেকিং বা পিকনিকের উপযোগী ট্রেকিং নয়।

Source: wikimedia commons

প্রায় দুই সপ্তাহ সময় নেয় এই ট্রেইলটি। উচ্চতা এবং ঠাণ্ডা উভয় দিক থেকেই অন্নপূর্ণা অন্যান্য রেঞ্জ থেকে অত্যন্ত কঠিন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হয়। বিশেষ করে কোথাও যদি এর আগে ট্রেকিংয়ের অভিজ্ঞতা থাকে এবং উচ্চতার প্রভাব সম্পর্কে আপনার শরীরের যে পরিবর্তন সে সম্পর্কে জ্ঞান থাকে তাহলে আপনিও মাউন্ট এভারেস্ট বেস ক্যাম্প ট্রেকিং করতে পারবেন। আর একবার আপনি মাউন্ট এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে গেলে সারা জীবনের আবেগকে জাগিয়ে তুলতে পারবেন।

হিমালয় ভ্রমণের জন্য কী কী প্যাক করবেন

সাধারণত আপনার ভ্রমণের সব থেকে জরুরি একটি বিষয় হলো কী কী প্যাক করবেন। যদি আপনি ট্রেকিংয়ে যান বা এমনি ঘুরতে যান তবে এই শীত এবং পাহাড়ের দেশে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে একটি বুট। ভালো মানের পানিরোধী এবং বরফ রোধী বুট খুবই প্রয়োজন। এতে করে নিজের পা সুরক্ষিত রাখা যাবে। প্রথমবারের মতো যদি ট্রেকার হন তাহলে অতিরিক্ত এবং উচ্চ প্রযুক্তির সরঞ্জামগুলো দেখে আপনি প্রলুব্ধ হতে পারেন।

তবে যদি অল্প খরচের মধ্যে যেতে চান তাহলে অবশ্যই এই সরঞ্জামগুলো কেনাকাটা না করে কাঠমুন্ডু বা অন্যান্য জায়গাগুলো থেকে ভাড়া নিতে পারেন। খুব কম খরচে আপনি ডাউন জাকেট, ট্রেকিং বুট, স্লিপিং ব্যাগ, তাবু, ট্রেকিং ব্যাকপ্যাক এবং অন্যান্য সরঞ্জাম ভাড়া পেয়ে যাবেন। এতে করে আপনার অতিরিক্ত পয়সা খরচ হবে না। এছাড়া বরফের জন্য চোখ বাঁচাতে সাথে রাখতে হবে পোলারাইজড সানগ্লাস। সানস্ক্রিন, ঠোঁটের জন্য ভালো লিপজেল এবং হাতের জন্য ভালো হ্যান্ড গ্লাভস।

Source: 1 Life on Earth

মৌলিক চিকিৎসার জন্য আপনার নিত্য প্রয়োজনীয় মেডিসিনগুলো সাথে নেবেন এবং যদি অতি উচ্চতায় সমস্যা হয় সেই ক্ষেত্রে সাথে ডায়ামক্স নামক মেডিসিন নিতে পারেন। এটি আপনাকে উচ্চতম পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে সহযোগিতা করবে। এছাড়া স্টার প্লাস্টার, এন্টিসেপটিক ক্রিম, পানি পরিশোধন ট্যাবলেট এবং স্যালাইন সাথে রাখা উচিত। হিমালয় যাবার আগে আপনার স্বাস্থ্য এবং উচ্চতা জনিত রোগগুলো সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা উচিত।

AMS এর মতে, উচ্চতাজনিত সমস্যাগুলো সম্পর্কে যদি ভালোভাবে জেনে যান তাহলে কোথাও আটকে যাবেন না। আগেরকার সময়গুলো থেকে বর্তমান সবার কাছে হিমালয় বেশ কষ্ট মুক্ত। আপনি যদি এভারেস্ট বেস ক্যাম্প ট্রেকিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন তাহলে শুধুমাত্র শক্তিশালী হলে হবে না আপনাকে সাহসী হতে হবে, প্রতিটি পদক্ষেপে ভেবেচিন্তে এবং নিয়ম অনুযায়ী পা বাড়াতে হবে। তাই হিমালয়ের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করুন এবং নিজের সাহসের উপর আস্থা রাখুন। হিমালয় আপনাকে নিরাশ করবে না।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বেকার দিনের ভ্রমণ গল্প

সমুদ্রের প্রথম পলক