পুরুলিয়ার তিলাবনি পাহাড়ের ডাকে

সন্ধ্যে সাতটার আগেই আমরা হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে গেলাম। বরাবরের মতোই ব্যস্ত এই স্টেশন হাওড়া স্টেশনে নেমে আমরা পাঁচজন ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছি বাদবাকি দলের আশায়, কিন্তু কোথাও কাউকে দেখতে না পেয়ে আমরা আশপাশ দিয়ে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করতে লাগলাম। এখান থেকে ফিরে আমাদের সবারই ক্ষুধায় পেট জ্বলছিল। কলকাতা হাওড়া স্টেশনের পাশে সস্তায় খাবার দাবার পাওয়া যায় বলে শুনেছিলাম। তাই দলবল নিয়ে সেখানে চলে গেলাম খাওয়া দাওয়া শেষ করতে।

৩৫ টাকায় সুক্তোর সাথে ভাত আর ডাল খেয়ে নিয়ে আমরা আবার স্টেশনে চলে গেলাম বাদবাকি দল কখন আসে সেই অপেক্ষায়। আমাদের প্রায় দুই ঘণ্টা বসিয়ে রাত সাড়ে নয়টার মধ্যে বাদবাকি দল এসে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছালো। বাদবাকি দল বলতে Rope4 ও HDMTA থেকে প্রায় ৫০ জন মানুষ যারা আমাদের সাথে পুরুলিয়া যাচ্ছে টিলাবনি পাহাড়ে রক ক্লাইম্বিং কোর্সে। আমাদের ১০.৩০ এর ট্রেন প্রায় ১১টার সময় ছাড়লো পুরুলিয়ার উদ্দেশ্যে। হাওড়া স্টেশন তখন গম গম করছে ভারতবর্ষের বিভিন্ন ভ্রমণকারী মানুষের সমাগমে।

হাওড়ার ব্যস্ত ষ্টেশন। ছবিঃ জাবেদুল ইসলাম

ট্রেন চলতে শুরু করলেই হাওড়া ডিস্ট্রিক মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং অ্যাসোসিয়েশন থেকে আমাদের সিট প্লান দিয়ে দেয়া হলো। আমরা আমাদের যার যার সিটে বসে আড্ডা দিতে লাগলাম। বাংলাদেশ এবং ভারত থেকে প্রায় ৫০ জন আলাদা আলাদা মানুষ যাচ্ছে আমাদের সাথে এই ক্যাম্পে। তাই ভালোই হলো অনেক নতুন নতুন বন্ধু পাচ্ছিলাম।

অনেকদিন পর শীতের সময় ক্যাম্পিং ব্যাপারটা মনে পড়তেই মন খুশি হয়ে উঠছিল ক্ষণে ক্ষণে। সারারাত ধরে আমাদের তেমন কোনো কাজ ছিল না, ট্রেনের মধ্যে গল্প করতে করতে একটা সময় দলনেতা মহিউদ্দিন মাহী ভাইয়া বললেন, এখন ঘুমাতে চলো। সকাল সকাল উঠতে হবে। তাই সবাই যার যার স্লিপিং ব্যাগে ঢুকে পড়ল ঘুমানোর জন্য। ট্রেনের ঝিক ঝিক শব্দ বাড়ছে আর মায়া ট্রেনের ভেতরের মানুষগুলো ঘুম ঘুম দুলুনিতে দুলছে।

ট্রেন থেকে নামার জন্য ভিড় জমে গিয়েছে। ছবিঃ লেখক

রাতে কখন ঘুমিয়ে গেছি মনে নেই। সকাল বেলায় মাহি ভাইয়ার ডাকে ঘুম ভাঙলো। দেখলাম সবাই ঘুম থেকে উঠে যার যার ব্যাকপ্যাক থেক শীত পোশাক বের করে পরা শুরু করেছে। আমিও উঠে কোনোমতে চোখ মুছতে মুছতে ভাইয়াকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমরা কি চলে এসেছি? ভাইয়া বললেন, প্রায় চলে এসেছি, উঠে গুছিয়ে নাও। আমি তাড়াতাড়ি আমার স্লিপিং ব্যাগটা ব্যাকপ্যাকের মধ্যে ঢুকালাম এবং গোছানো শুরু করলাম। বেশ শীত লাগছিল তাই ব্যাগ থেকে ডাউন জ্যাকেটটা বের করে গায়ে চাপাতেই গায়ে একটা উষ্ণ ভাব পেলাম।

আনারা পৌছেছি পুরো দল।

প্রায় ৮ ঘণ্টা জার্নির পর আমরা ভোর সকালে নামলাম আনারা স্টেশনে। এটা পুরুলিয়ার কোনো একটি স্টেশন, এখান থেকেই আমরা ছোট ট্রাকে করে আমাদের মালামাল সহ চলে যাব সোজা টিলাবনি পাহাড়ে। এবং সেখানেই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে বিশাল একটি ক্যাম্প, যে ক্যাম্পে আগামী চার দিন হবে আমাদের থাকার সব বন্দোবস্ত এবং ট্রেনিং এর সকল রকম কার্যক্রম। স্টেশনে প্রায় ৪০ মিনিটের মতো বসে থাকার পর আমাদের ডাক এলো। আমাদের স্টেশন অতিক্রম করে সামনের রাস্তায় যেতে হবে সেখানে আমাদের জন্য গাড়ি অপেক্ষা করছে। গাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে আমরা একটি গাড়িতে সকলের ব্যাকপ্যাক উঠিয়ে দিলাম।

৫০ জনের ব্যাকপ্যাক একটি ছোটখাট মিনি ট্রাকে ভরে গেল। তারপর আমাদেরকে পাঠানো হলো অন্য একটি ট্রাকে। প্রায় ৬টি ট্রাকে ছেলে এবং মেয়েদের আলাদা আলাদা করে উঠিয়ে ট্রাকটি চলতে শুরু করল পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তায়। পুরুলিয়ার এই এলাকাটি মালভূমি এলাকা। এখানকার পাহাড়গুলো অনেক দূরে দূরে একটি থেকে আরেকটির অবস্থান। একটি পাহাড় থেকে প্রায় ৭০-৮০ কিলোমিটার দূরে অন্য একটি পাহাড়ের অবস্থান। কীভাবে এই পাথরগুলো এখানে উদ্ভব হলো সেটা নিয়ে আমাদের কৌতূহলের সীমা ছিল না।  

তিলাবনি পাহাড়। ছবিঃ জাবেদুল ইসলাম

এই মালভূমিতে মূলত পাহাড়গুলোর উৎপত্তি হয়েছিল মাটির নিচে থেকে এই পাথরগুলো উঠে। হাজার হাজার বছর আগে এই পাহাড়গুলোর উদ্ভব হয়েছিল এই এলাকায়। আর এই পাহাড়গুলো অবিশ্বাস্য রকম হলেও এখনও একটু একটু করে বছরের পর বছর বাড়ছে। প্রায় কুড়ি মিনিট চলার পর আমাদের চোখের সামনে পড়ল বিশাল উঁচু এই টিলাবনি পাহাড়। অনেক দূর থেকে বোঝা যাচ্ছিল না এটি মূলত পাথরের পাহাড় নাকি সবুজ বান্দরবানের মতো পাহাড়।

কিন্তু যতই কাছে এগোচ্ছি ততই পাথরের সাদা সাদা দেয়ালগুলো চোখে লাগছিল। তখন আস্তে আস্তে বুঝতে পারলাম যে বিশাল উঁচু উঁচু বড় বড় পাথরের বোল্ডার দিয়ে এই পাহাড়গুলো তৈরি। একটি পাহাড় থেকে আরেকটি অনেক দূরে তাই অনেক দূর দিগন্তে যত দূরে চোখ যায় হয়তো একটি বা দুটি উঁচু পাহাড় দেখা যায়। এ ব্যাপারগুলো বেশ অদ্ভুত লাগে কারণ আমি এতকাল যাবৎ যত পাহাড়ি এলাকায় ঘুরেছি এলাকাগুলোতেই ছিল পার্বত্য অঞ্চল। পাহাড়ের পর পাহাড়, একটির পর একটি পাহাড়। তাই হঠাৎ বিশাল মালভূমির মধ্যে একটি পাহাড় দেখে বেশ অদ্ভুত লাগছিল বলা চলে।

বিশাল মালভূমি এলাকা। ছবিঃ জাবেদুল ইসলাম

ক্যাম্প সাইট। ছবিঃ লেখক

৪০ মিনিট অনর্গল পাহাড়ি রাস্তায় এঁকেবেঁকে দুলুনিতে চলার পর আমরা পাহাড়ের পাশে এসে থামলাম ছোট ছোট সবুজ বনের মধ্যে। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে একটি ক্যাম্প সাইট, বেশ বড় একটি ফাঁকা মাঠ এবং সেখানে যখন পৌছালাম বিশাল একটি উঠোনের চার কোনা দিয়ে অজস্র তাবু পিচ করা। সেখান থেকে দেখা যায় টিলাবনি পাহাড়ের অপরূপ মায়া।

মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছিলাম বারবার এই অপরূপ প্রকৃতি দেখে এই নতুন ধরনের প্রকৃতি দেখে যেগুলো খুব কমই চোখে পড়েছে। এর আগে আমাদের সকাল-সকাল তেমন কোনো কার্যক্রম শুরু হলো না। অনেকেই আমরা পাহাড়ের কাছে গেলাম কিছু কিছু পাথর দেখতে যারা আমরা এর আগে কখনো এই ধরনের পাথর দেখিনি তারা। বেশ কৌতূহলী হয়েই এই পাহাড়ের দিকে এগোলাম।

ক্যাম্প সাইট। ছবিঃ লেখক

যত সময় যাচ্ছিল আমাদের কৌতূহল তত বাড়ছিল, কারণ নতুন দেশে নতুন মানুষদের সাথে তাদের নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে কীভাবে ক্যাম্প পরিচালনা করা হবে তা নিয়ে আমাদের কারোই কৌতূহলের শেষ ছিল না। তো অবশেষে আমরা আমাদের ট্রেনগুলো পিচ করার পর সকলকে অ্যাসেম্বলিতে দাঁড় করানো হলো। এরপর হলো হাওড়া মাউন্টেনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশনের পতাকা উত্তোলন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বেশ কিছু বড় বড় অভিযানে যাওয়া কিছু মানুষ ছাড়া এমন কিছু বয়স্ক মানুষ ছিলেন যারা প্রায় ৫০ থেকে ৬০ বছর ধরে পাহাড়ে যান।

পাহাড়ের দিকে যেতে যেতে সবার মনেই চাপা উত্তেজনা। ছবিঃ লেখক

সেখান থেকে তারা যে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন সেগুলো আমাদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে এসেছেন শুনেই আমাদের খুব গর্ব বোধ হচ্ছিল। আমরা আমাদের টেন্টগুলো পিচ করার পর ভেবেছিলাম আমরা হয়তো সেই টেন্টেই থাকবো। কিন্তু সেগুলোতে আমাদের থাকা হয়নি । ক্লাব থেকেই প্রত্যেককে আলাদা আলাদা করে থাকার জায়গা করে দেয়া হয়েছিল।

কেউ নিজের মন মতো তাবু পায়নি দেখে প্রথমত খুবই মর্মাহত অবস্থায় ছিল। কিন্তু এর পর যখন দেখলাম ভারতীয় বন্ধুরা তাদের সর্বোচ্চ দিয়ে সাহায্য করছে, তার পরে আসলেই খুব ভালো লাগছিল। তারপর তাবুর দরজায় বসে পুরো ক্যাম্পসহ টিলাবনি পাহাড়ের অপরূপ মায়া দেখে মন ভালো হয়ে যাচ্ছিল, শান্তি লাগছিল মনের ভেতর।

চলেছি তিলাবনির দিকে। ছবিঃ লেখক

বরাবরই পাহাড়ে গিয়ে আমি প্রচুর শান্তি লাভ করি। তিলাবনী পাহাড়ের রূপ দেখে এবারও তার কম মনে হয়নি। সেই ধূসর রঙের বিশাল পাহাড় যখন চোখের সামনে ভেসে উঠছে তখনি অজানা উদ্দিপনায় মন শিহরিত হয়ে যাচ্ছে। ধুসর রঙের বিশাল পাথরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে কখন যে সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে গেল বুঝতে পারছিলাম না। মনটা উসখুস করছিল পাহাড়ের পাশে যাওয়ার জন্য।

সেই সুযোগ করে দেয়ার জন্যেই ক্যাম্প থেকে আদেশ আসলো সকলকে নিয়ে বেসিক বোল্ডারিং করানোর জন্য। তাই আমরা আমাদের নির্ধারিত রোপের জন্য নির্ধারিত ইনস্ট্রাক্টরদের পিছু পিছু ছুটতে লাগলাম তিলাবনি পাহাড়ের দিকে।

রুট ও খরচের খসড়া

কলকাতা থেকে আগ্রা অথবা আনারা চলে আসতে হবে ট্রেনে অথবা বাসে করে। এখান থেকেই মিনিট্রাক অথবা সি এন জি ভাড়া করে চলে আসা যাবে তিলাবনি পাহাড় বা তিলাবনি ক্যাম্প সাইটে। কোনো গ্রুপের সাথে গেলে এই কোর্সের খরচ পড়বে হাওড়া টু হাওড়া ৩,৫০০ – ৮,০০০ টাকা পর্যন্ত।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

হিমাচলের অপরূপ ছোট শহর মান্ডির পথে পথে

নো ম্যান্স ল্যান্ডে দেড় ঘণ্টার রোমাঞ্চকর বাঁক!