হিমাচলের অপরূপ ছোট শহর মান্ডির পথে পথে

মানালি থেকে রওনা হয়ে যখন মান্ডির দিকে এগোচ্ছি, দুই পাশের সবুজ পাহাড়ের গালিচা যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে আমায়। সবুজের এই অপরূপ মহিমায় চোখ জুড়িয়ে আসছিল প্রতি মুহূর্তে। আঁকাবাঁকা রাস্তাগুলো পাহাড়ের উপর থেকে নিচে আবার কখনো ঢাল বেয়ে নেমে গেছে গর্জন করা সব পাহাড়ি নদীদের মধ্যেখানে।

মানালি থেকে মান্ডির রাস্তা যে এত ভালো হবে সেটা বুঝতে পারিনি। বিশেষ করে মানালি থেকে কুল্লু শহর পর্যন্ত রাস্তার যে বেহাল দশা সেটার জন্যই বার বার চিন্তা হচ্ছিল আরামের ভ্রমণটা যেন ব্যারামে রূপ না নেয়। আমাকে অবাক করে দিয়ে মান্ডির রাস্তাটা অপরূপ হয়ে উঠছিল। আমার বাস যখন মান্ডিতে পৌঁছলাম তখন দুপুর হয়ে এসেছে।

মান্ডিতে ঢোকার মুহুর্তে। ছবিঃ লেখক

বাস থেকে নেমেই এক সাধু বাবার খপ্পরে পড়ে গেলাম। আমি নাকি সুদূর হিমালয়ের মধ্যখান থেকে গত জন্মে উঠে এসেছিলাম এই এলাকায়। তাই এই জন্মে তার সূত্র খুঁজতে খুঁজতে আমি এই জন্মে আবারো এই এলাকায় এসেছি। তিনি আমায় সাহায্য করতে চান ২০০ রুপির বিনিময়ে।

হাসতে হাসতে কোনোমতে বিদায় করলাম ভণ্ড বাবাকে। পাশের এক চায়ের দোকানী দেখলাম হাসছে আমার দিকে তাকিয়ে। ডেকে শুনলেন কোথা থেকে এসেছি। আমার কথা শুনে নাকি উনার মনে হয়েছে মহারাষ্ট্র এলাকা থেকে এসেছি। বুঝলাম না ইনিও ভণ্ডামি শুরু করেছেন নাকি আসলেই মনে হচ্ছে। যাই হোক উনার কাছ থেকে মহিষের দুধের এক কাপ গরম চা চেয়ে নিয়ে গল্প জুড়লাম।

পথে পথে হাঁটছি। ছবিঃ লেখক

মান্ডি শহরটা বেশ ছোট। চাইলে একদিনে ঘুরে ফিরে দেখা যায়। তার আগে দরকার ছিল এখান থেকে কোনোভাবে চণ্ডীগড় ফিরে যেতে হবে রাতের ভেতর। কারণ পাঞ্জাবে যত দ্রুত ফিরব ততই খরচ কমে যাবে আর দ্রুত দেশে ফিরে যেতে পারব। উল্টো পথে মান্ডি ভ্রমণটা ছিল নিতান্তই খেয়ালি।

পিঠে বিশাল সাইজের ব্যাকপ্যাক নিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। একটা বিশাল পাহাড়ি নদীর উপর দিয়ে ব্রিজ চলে গিয়েছে ওপারে শহরের দিকে। এই পাশের পাহাড়গুলো খুব বেশী উঁচু না আর দেখার মতো তেমন কিছু না পেয়ে ওপারের দিকেই হাঁটতে শুরু করলাম। ব্রিজের নিচে দিয়ে বিশাল গর্জনে বয়ে চলেছে হিমালয়ের বরফ গলা পানির স্রোত।

ব্রিজটা সভ্যতার সাথে সংযুক্ত করে দিয়েছে শহরকে। ছবিঃ লেখক

ব্রিজ পেরিয়ে নদীর ওপারে যেতেই চোখে পড়ল বিশাল পার্বতি ভ্যালির দুই দিকে উঠে গেছে উঁচু পাহাড় আর তার মধ্যে পাহাড়ের বুক ধরে থাকে থাকে পাহাড়ের সাথে পাল্লা দিয়ে উপরের দিকে চলে গিয়েছে পাহাড়ি দালানগুলো। এই পাহাড়ি দালানে প্রতিটা দিন কাটানোর যে কী আনন্দ তা এখানে না থাকলে বোঝানো সম্ভব না।

আমি সব সময় নিজের সব কিছু দিয়ে পাহাড়ের দিকে ছুটেছি গত কয়েক বছর ধরে, আর সেই ভালোবাসার জেরেই পাহাড় আমাকে কখনো খালি হাতে ফেরায়নি। একটু সামনে এগিয়ে দেখলাম মন্দিরের সারি শুরু হয়েছে। একটি মন্দির থেকে ফ্রিতেই দুপুরের খানা পিনা সেরে উঠে পড়লাম শহর দেখতে।

গিজগিজে সব ঘরবাড়ীর স্তূপ। ছবিঃ লেখক

মোটামুটি ছোট ও নির্জন পাহাড়ি এলাকা হলেও ভারতের অনেক নাগরিক এখানে এসে পাহাড়ের অনেক উপরে নিজেদের ঘর বাড়ি নির্মাণ করে থাকেন। এখানে বাড়ি বানানো বেশ ব্যয়বহুলও বলা চলে, কারণ সভ্যতার আধুনিক সামগ্রী দিয়ে বাড়ি বানাতে হলে সেগুলো পাহাড়ের উপর পর্যন্ত টেনে আনাও কষ্টের কাজ। দোকানগুলোতে ভিড় লেগে আছে আগত শীতের জন্য শীত পোশাকের।

অধিকাংশই উলের তৈরি পোশাক। বর্ষার সময় সবুজ হয়ে থাকলেও শীতের সময় রীতিমতো সাদা হয়ে থাকে সম্পূর্ণ এলাকা বরফের আস্তরণে। তাই কম দামের পোশাকের ভেতর উলের পোশাকই পাহাড়ীদের কাছে বেশী জনপ্রিয়। সামনে এগিয়ে দেখলাম অন্য শহরের মতো বিশাল টাউন হল রয়েছে এখানে একটা। গণ্যমান্যরা এখানেই বসে রোদ পোহায় মনে হলো।

যে নদী পাহাড়ের বুকে বয়ে চলে। ছবিঃ লেখক

পাহাড়ের দিন যে কত দ্রুত পেরোয় তা পাহাড়ে ঘুরতে যাওয়া মানুষই বোঝে। দেখতে দেখতে বিকেল হয়ে এলো। আমি লোকালয় ছাড়িয়ে একটু দূরে কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার মতো জায়গা খুঁজি প্রতিবার। এবারো দেখলাম একটি ঘাসের গালিচা যেন ওঁত পেতে আছে আমার জন্য। পাহাড়ের উপরে এই গালিচায় বসলেই দেখা যায় নিচের পাহাড়ি নদী বয়ে গেছে বিশাল পাহাড়ি প্রান্তরের মধ্যে দিয়ে।

সূর্যের তাপ একটু কমে আসতেই আমি নিচের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। সব থেকে বড় ভুল করেছি আসার আগে বাসের টিকেট না কেটে, সেটা নামার সময়ই মনে হচ্ছিল। কয়েক ঘণ্টা ধরে আশেপাশের সব কিছু দেখতে দেখতে যখন নিচে পৌঁছালাম তখন সন্ধ্যা হয়ে এসেছে।

ভারতীয় WWE ফাইটার গ্রেট কালি ও বিজ্ঞাপন। ছবিঃ লেখক

ভাগ্য ভালো ছিল বলা চলে। এসে দেখি বাসের ৫টা সিট ফাঁকা আছে। এই সিজনে পর্যটকদের চাপ একটু কম থাকে তাই ভাগ্য সুপ্রসন্ন। অন্য সময় হলে এখানে থেকে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকত না। বন্ধুকে ফোন দিয়ে কোনোমতে কলকাতার ট্রেনের  টিকেট কাটিয়ে রাখলাম কালকা মেইলে।

দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। প্রায় ১১ ঘণ্টার জার্নি, তাই নিজে প্রস্তুত হয়ে নিলাম। হাতে ঘণ্টা দুয়েকের মতো সময় ছিল, তাই মার্কেটের মধ্যে ইতস্তত কিছুক্ষণ ঘুরে ফিরে সময় পার করে রাত ৮টায় বাসে উঠলাম চন্ডিগড়ের উদ্দেশ্যে। শহর পেরিয়ে যাচ্ছে, পাহাড়ের উপর আলোর বিন্দুগুলো ছোট হয়ে আসছে। আমি পাহাড় থেকে দূরে সরে যাচ্ছিলাম ক্রমে ক্রমে।

কীভাবে যাবেন ও খরচের খসড়া:

মান্ডি যেতে হলে আপনার দরকার হবে একটি ভারতীয় ভিসা। যে কোনো পোর্ট দিয়ে প্রবেশ করে কলকাতা থেকে ট্রেন, বাস বা বিমানে যেতে হবে দিল্লি অথবা চণ্ডীগড়। ট্রেনে শ্রেণীভেদে দিল্লি বা চণ্ডীগড়ের ভাড়া পড়বে ৬৭৫ থেকে ৩,৫০০ রুপি। বিমানে পড়বে ২,৪০০ থেকে ১২,০০০ রুপি। চণ্ডীগড় থেকে বাস পাওয়া যাবে মান্ডির। বাস ভাড়া পড়বে ৪৩০ রুপি ।

মানালি বা শিমলা থেকে মান্ডির বাস ভাড়া ২৫০ রুপি। অথবা ট্যাক্সি ভাড়া করে সরাসরি চলে যেতে পারেন মান্ডিতে। আর পুরো ট্যক্সি ভাড়া করলে পড়বে ট্যক্সির ধরন অনুয়ায়ী ৬,০০০-১০,০০০ রুপি। HRTC এর বাসের টিকেট যাবার সময় ও ট্যক্সি ভাড়া করতে হবে যাত্রার আগের দিন।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফুল ও ফোয়ারার জয়পুর আমের গার্ডেন

পুরুলিয়ার তিলাবনি পাহাড়ের ডাকে