হাওড়ায় কুমারটুলির মূর্তি কাব্য

বাগ বাজারের লোকাল ট্রেনে প্রচণ্ড ভিড় হবে ভেবেই ট্রেনে উঠলাম দুর্গানগর থেকে। কয়েকদিন ধরে কলকাতার লোকাল ট্রেনগুলোতে চলাচল করতে করতে একটা অভ্যেস হয়েছে যে দরজার কাছে হাল ধরে দাঁড়াতে হবে। এভাবে দাঁড়ানোর সুবিধা হলো ভেতরে যতই ভিড় থাক সেটার চাপ আর গরম সহ্য করা লাগে না আবার কোনো স্টেশন এলে সহজেই নেমে অন্য যাত্রিদের ওঠা-নামার সুযোগ দিয়ে জায়গা মতো দাঁড়ানো যায়।

স্টেশন থেকে লোকালে উঠব। ছবিঃ লেখক

কিন্তু দেখলাম ভিড়-ভাট্টা নেই বললেই চলে। ভোর থেকে মোচের নিচে আটকে রাখা ফন্দিটা কাজে দিল না বলে একটু আশাহত হলাম বলা চলে। সেভাবেই স্টেশনের পর স্টেশন আসছে আর লোক উঠছে নামছে। ভালোই লাগে শহর কলকাতার গণমানুষের এরকম অদুত জীবন যাপন।

কলকাতায় সেবার আমি এসেছি ৫ম বারের মতো। প্রজেক্টের কাজে এসেছিলাম একটা ফটোগ্রাফি সেশনের। কয়েকদিন ইতস্তত ঘোরাঘুরি করে ভাবলাম কাজের মধ্যে ফেরা যাক। তাই ঈথাদিকে মহিলা কামরায় উঠিয়ে দিয়ে আমি লোকাল কামরার দরজায় ঝুলে ঝুলে বাগবাজার স্টেশনে নামলাম। স্টেশনে নেমেই আমার প্রথম কাজ ছিল ম্যাপ দেখে কোন দিকে কুমারটুলি এলাকা সেটা শনাক্তকরণ।

মিথোলজি থেকে বাস্তব এর পরিক্রমা। ছবিঃ লেখক

তাই একটু ফাঁকা দেখে সামনে এগোতেই দেখি বিশাল হুগলী নদী ফুর ফুর করে বাতাস দিচ্ছে। বিশাল বটগাছের নিচে নদীর জল পর্যন্ত দেয়ালে শিবের বিশাল একটা ছবি। ছবিতে শিব গাজা খাচ্ছেন ঠিক তার নিচে বসেই কয়েকজন ভৃত্য প্রভুকে অনুসরণ করে চলেছে। ছবি তুলতে তুলতেও তোলার সাহস পেলাম না।

ম্যাপ দেখে আমি প্রথমেই অন্য সব সময়ের মতো কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়লাম, কোনদিকে যাব। অবশেষে দিদির থেকে সাহস নিয়ে কয়েকজনের কাছে শুনে শুনে রাস্তা ধরে কুমারটুলির দিকে এগোলাম। কুমারটুলি মূলত কলকাতার বহু প্রাচীন এলাকা। শত শত বছর ধরে এই এলাকার মানুষ ভারতবর্ষ সহ সারা পৃথিবীতে মাটি, পাথর ও অন্যান্য উপাদানের মূর্তি বানিয়ে সাপ্লাই দিয়ে থাকেন।

পরম মমতা নিয়ে দেব দেবীদের হাতে গড়েন এই শিল্পীরা। ছবিঃ লেখক

সব থেকে বড় ব্যাপার হচ্ছে এখানকার মানুষে মমতা। কী পরম মমতা নিয়ে দেব-দেবী বা অন্যান্য সব মূর্তি এইখানের কুমোরেরা তৈরি করেন সেটাই ক্যামেরায় আনা ছিল আমাদের সেদিনের কাজ। স্থানীয় কিছু সংগঠনের নিয়ম অনুসারে একটা কুপন কাটলাম ২০ টাকা দিয়ে ছবি তোলার অনুমতি স্বরূপ।

এক একটা কারখানায় ঢুকছি আর চোখ ছানাবড়া হবার জোগাড়, এটাকে ঠিক কারখানা বলা ঠিক হবে না। ওনাদের মতে প্রতিটা মূর্তি কারিগরের ঘরকে স্টুডিও বলা হয়ে থাকে। এই সময়ে দেখলাম সবগুলো স্টুডিওই বেশ ব্যস্ত। মূর্তি তৈরির ধুম চলছে সব জায়গায়। মুখের ডাইস থেকে শুরু করে শরীর তৈরির কাঠামো সবগুলো উপাদানের কাজই দেখতে পারছিলাম কীভাবে কোথায় কোন উপাদানগুলো দিয়ে মূর্তি তৈরি করেন এখানকার শিল্পীরা।

দেবীর মুন্ডু বানিয়ে রাখা হয়েছে। ছিন্ন মস্তক ভাবলে ভুল হবে। ছবিঃ লেখক

কোথাও কোথাও অনেকগুলো হাত বা অনেকগুলো মাথা তৈরি করে রাখা। দেখলেই অদ্ভুত একটা সাইকোডেলিক পরিবেশ তৈরি হয়ে যায় চারপাশটা জুড়ে। তাই সারা পৃথিবীর ফটোগ্রাফারেরা ছুটে আসেন এই কুমারটুলিতে।

দুপুরের খাওয়াটা এখান থেকেই সেরে নিলাম। কুমারটুলি কলোনির বাঁ দিকের রাস্তাটা ধরে একটু আগালেই মোড়ের মাথায় এক লোক ভ্যানে করে ভাত বিক্রি করে। দেখতে বেশ ভালোই পরিচ্ছন্ন লাগছিলো বলে বসে পড়লাম। অদ্ভুতভাবে কলকাতার কিছু কিছু জায়গায় খাবারের দাম কল্পনাতীতভাবে কম। মুরগি, আলু ভাজি, শুক্তো আর ডালভাতের দাম মাত্র ৬০ টাকা।

এভাবের দেহের প্রতিটা অংশ আলাদা করে ডিজাইন করা হয় এখানে। ছবিঃ লেখক

যা আমাদের দেশের নর্মাল একটা হোটেলেই ২০০-৩০০ টাকায় হয়ে যাবে। দ্রুত খাওয়া শেষ করে আবার ঢুকলাম আলোছায়ার খেলা শুরু হওয়া এই নগরীতে। যেন বিশাল এক মূর্তির নগরী। থাকে থাকে দেব দেবী তৈরি হচ্ছে। তার মধ্যেই উপরের লাও কুঠুরী থেকে আলো এসে পড়ছে মেটে রঙের এই মূর্তিগুলোর উপর।

এক দল রঙিন গণেশ। ছবিঃ লেখক

কিছু কিছু স্টুডিওতে হাতের কাজে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে পাথুরে আর মাটির এসব মূর্তিদের অলংকারগুলো। আবার কিছু কিছু শুকনো মূর্তির গায়ে লাগানো হচ্ছে রঙ। প্রতিটা শিল্পীই অতি সূক্ষ্ম হাতের কাজের মাধ্যমে এসব মূর্তির সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলেন তাদের স্টুডিওগুলোতে। আর এগুলো লক্ষ লক্ষ টাকায় বিক্রয় করা হয় দেশে ও দেশের বাইরে। অনেক স্টুডিওর ভেতর ঢোকা নিষেধ বলা চলে।

সবে মাত্র শুরু করেছেন এই প্রবীন শিল্পী। ছবিঃ লেখক

সেগুলো একটু সতর্কভাবে এড়িয়ে যেতে হচ্ছিল। কিন্তু সব মিলিয়ে ছবি তোলার জন্য আলো, ছায়া আর কম্পোজিশন যেন প্রতিটা সেকেন্ডে পরিবর্তন হয়ে যায় এই মূর্তির মহা সমুদ্রে। স্থানীয় লোকেরা অত্যন্ত সদয়ভাবে দর্শনার্থীদের সাহায্য করেন। কখন যে দিনের আলো পড়ে আসলো বুঝতে পারছিলাম না। আজকের মতো এখানে ছবি তোলার সমাপ্তি দিয়ে ফিরতে লাগলাম বাগ বাজার স্টেশনের দিকে।

রুট ও খরচের খসড়া

প্রথমে যে কোনো পোর্টের ভারতীয় ভিসা দিয়ে আপনাকে কলকাতায় আসতে হবে। কলকাতার হাওড়া থেকে শোভা বাজার সুতানুটির বাস পাওয়া যাবে। ভাড়া পড়বে ১০ টাকার মতো। সেখান থেকে হেঁটে বা অটোতে করে চলে আসতে হবে কুমারটুলি। এছাড়া দম দম স্টেশন থেকে বাগ বাজারের ট্রেনে করে চলে আসা যাবে। খরচ পড়বে ৫ রুপি।

আবার হাওড়া ব্রিজের এপাশ থেকে বিবাদি বাগ স্টেশন থেকে বাগ বাজারের ট্রেনে করেও বাগবাজার আসা যায়। খরচ পড়বে ৫ রুপি। দুপুরের খাবার এখান থেকেই খাওয়া যাবে ৫০-১০০ টাকার ভেতর। তবে থাকার জন্য অবশ্যই কলকাতার ভেতর হোটেলের ব্যবস্থা করলে ভালো হয়।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নো ম্যান্স ল্যান্ডে দেড় ঘণ্টার রোমাঞ্চকর বাঁক!

এক সবুজ নদীর গল্প…