নজরুলের চুরুলিয়া: প্রিয় যাই যাই বলো না

সব গল্পই কি সুখের হয়? না. হয় না। কিছু কিছু গল্প থাকে ভীষণ কষ্টের, অব্যক্ত বেদনার, গোপনে চোখ ভিজে যাওয়ার মতো। আমার এই ভ্রমণ গল্পটা তেমনই। কারণ আমি নজরুলকে ভালোবাসি। কেন জানি না নজরুলের প্রতি বরাবরই আমার পক্ষপাত একটু বেশী। কেন সেটার কোনো ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই। তাই এবারের ছোট্ট ভ্রমণের প্রধান আকর্ষণই ছিল নজরুলের জন্মভূমি “কবিতীর্থ” চুরুলিয়া যাবো। আসানসোল থেকে চুরুলিয়া যাবো। তবে আমরা গিয়েছিলাম হাওড়া থেকে বীরভূম হয়ে, শান্তিনিকেতনে একটু বিশ্রাম নিয়ে।

আগেরদিন রাতেই খোঁজ নিয়ে এসেছিলাম, বীরভূম থেকে আসানসোলের বাস ছাড়ে সকাল সাড়ে ছয়টা থেকেই। তবে তার অধিকাংশ বাসই মোটামুটি লোকাল ধরনের, তবে স্টেট ট্রান্সপোর্টের বাসে উঠতে পারলে একদম আড়াই ঘণ্টায় আসানসোল পৌঁছে যাওয়া যায়। খুব ভোরে বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে একটু চা খেয়ে অপেক্ষা করছিলাম। সোয়া সাতটায় স্টেট বাস এসে পাঁচ মিনিট পরে ছেড়ে যাবে বলে জেনে রাখলাম।
ঠিক সোয়া সাতটায় বাস স্ট্যান্ডে ঢুকলো। আর ভাগ্যক্রমে আমরা একদম ড্রাইভারের পিছনের সিট দুটি পেয়ে গেলাম। একদম সামনে বলে সিট দুটো কিছুটা চাপা ছিল, যদিও দুজনের বসতে একটু সমস্যা হচ্ছিল তবুও নতুন জায়গা, নতুন পথ আর নতুন গন্ত্যব্যের আকর্ষণে সেই কষ্টটুকু মেনে নিয়েই দুজনের গায়ে দুজনে ঠেস দিয়ে বসেছিলাম। মূল শহর ছেড়েই বাস হুহু করে ছুটতে শুরু করলো। আজ আমরা বিদ্রোহী কবির জন্মস্থানে যাচ্ছি। মনে মনে বেশ একটা অন্য রকম আচ্ছন্নতা ঘিরে ধরেছে।

নজরুল ইন্সটিউট। ছবিঃ লেখক

ঠিক পনের মিনিট চলার পরেই বাস একটা বিরতি দিল। আসানসোল আর বহরমপুর বাইপাসে। যেখানে প্রথমবারের মতো নজরুলের একটি আবক্ষ মূর্তির দেখা পেলাম, আসানসোল শুরুর বাইপাসে। দারুণ উত্তেজনাবোধ করলাম তা দেখে। ঝটপট কয়েকটা ছবি তোলা হলো। আর ১০ মিনিটের ব্রেক পেয়ে চা-লিচু-মিষ্টি দিয়ে সকালের নাস্তাটা সেরে নিলাম দুজনেই।
বাস আবার চলতে শুরু করলো। এবার দুর্দান্ত আর বিস্তৃত হাইওয়ে দিয়ে আগের চেয়েও দ্রুত গতিতে। দুই পাশে ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে, গা ছমছমে একটা পরিবেশে ছুটে চলেছে আমাদের বাস। আমরা দুই পার্টনার দুইপাশের ঘন অরণ্যের রূপ দেখতে লাগলাম কাঁচের জানালা দিয়ে। কী অপূর্ব যে লাগছিল, খুব সকালের ঘন সবুজ অরণ্যর মাঝ দিয়ে ছুটে চলা বাসের অন্য রকম এক রোমাঞ্চ ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছিল আমাদের।
এভাবে কখনো ঘন অরণ্য, কখনো ফাঁকা মাঠ, কখনো দুইপাশে হলুদ ফুলের রাজ্য, কখনো বিস্তীর্ণ গ্রামের পথ আর কখনো ছোট-বড় শহর পেরিয়ে, আসানসোলের আগের বেশ জনাকীর্ণ আর আধুনিক এক শহর দুর্গাপুর পেরিয়ে ঠিক আড়াই ঘণ্টায় আমাদের আসানসোল পৌঁছে দিল স্টেট বাস, ভাড়া নিয়েছিল ৭০ রুপি করে।
প্রাচীন ও দুস্থ পোস্ট অফিস। ছবিঃ লেখক

কবির জন্মস্থান এই আসানসোল থেকে আর এক ঘণ্টা গ্রামের ভাঙাচোরা আর প্রাচীন পথ পেরিয়ে আগেই সেটা জানতাম। বাস থেকে নেমে একটু ফ্রেশ হয়ে খোঁজ করতেই পেয়ে গেলাম নজরুলের জন্মভূমি চুরুলিয়ার বাস। উঠে পড়লাম ভিড় ঠেলেই। কারণ এই বাসে সিট পাওয়া যাবে না সেটা জানাই ছিল। দাঁড়িয়ে, গাদাগাদি, চাপাচাপি, ঠাসাঠাসি করেই যেতে হবে। সেই প্রস্তুতি আমাদের ছিল বলেই বাসে উঠে সামনের দিকে ব্যাগ রেখেই কোনো রকম হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম।
এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার পরে আমাদের নামিয়ে দিল চুরুলিয়া বাজারে। হায় এ কোথায় এলাম? জরাজীর্ণ, দুস্থ, ভঙ্গুর, কোনোরকমে জীবনকে বয়ে নিয়ে চলা এক জনপদ চুরুলিয়া। দেখেই মনটা ভীষণ রকম খারাপ হয়ে গেল। প্রত্যাশার পারদ মুহূর্তেই তলানিতে নেমে গেল, বাজারে একটি হোটেল পর্যন্ত খুঁজে না পেয়ে। এখানে কোনো হোটেল নেই কেন?
এক জনকে জিজ্ঞাসা করাতে জানলাম। এখানে হোটেলে খাবার মতো কেউ নেই, কেউ থাকে না, কেউ আসে না তেমন। তাই এখানে কোনো হোটেল নেই, চলে না। শুধু দুই একটি গ্রাম্য চায়ের দোকান যেমন থাকে, তেমনি চায়ের দোকান ছাড়া। আর আছে অতীত দুস্থতার সাক্ষ্য বহন করে চলা কিছু দোকান, কোনোরকমে টিকে থাকা দুয়েকটা মনোহারির দোকান, বিড়ির দোকান এইসব।
কবিতীর্থ কোথায়, কোন দিকে? স্থানীয় মানুষের কাছে জিজ্ঞাসা করতেই বাম পাশের গলি দেখিয়ে দিল। সামনে পাঁচ-ছয় মিনিট হাঁটলেই কবির জন্মভিটা চোখে পড়বে। কিন্তু মন যে ভার হয়ে গেছে স্থানীয় বাজার দেখেই, সামনে যে আর কী ভয়াবহ অবস্থা চোখে পড়বে ভাবতেই নিজের ভেতরে আঁতকে উঠছিলাম। সত্যিই তাই, গলির পথ ধরে হাঁটতে শুরু করতেই, না চাইতেও চারপাশের জরাজীর্ণ বাড়িঘরের দিকে চোখের দৃষ্টি চলে যেতে থাকলো। সবচেয়ে দুঃখের ব্যাপার হলো, পুরো এলাকা জুড়ে হেঁটে যেতে যেতে, কোনো একটা বাড়ি চোখে পড়েনি যে মোটামুটি ভদ্রস্থ বা একটু অবস্থা সম্পন্ন। একটিও চোখে পড়েনি তেমন বাড়ি, ঘর, বারান্দা বা বাড়ির কোনো গেট।
মন ভার করে দেয়া বাস্তবতা! ছবিঃ লেখক

সেই যে ছোট বেলায় যেমন পড়েছিলাম কবি নজরুলের সংক্ষিপ্ত জীবনী। আসানসোলের চুরুলিয়া গ্রামের এক নিদারুণ দুস্থ পরিবারের নজরুলের জন্ম। ঠিক তেমনিই যেন ইতিহাস তার কালের সাক্ষ্য এখনো বহন করে চলেছে সেই অষ্টাদশ শতাব্দীর মতো করেই। ভাঙাচোরা প্রতিটি বাড়ির দেয়াল, খসে পড়া পলেস্তারা, অর্ধ নগ্ন লোহার গেট, ভেজা দেয়ালের গায়ে গায়ে গজিয়ে ওঠা আগাছা, ভাঙা কার্নিশে ঝুলে থাকা নোংরা কাপড়, পুষ্টির অভাবে বেরিয়ে থাকা পুরনো বাড়ির কঙ্কাল, যে বাড়িগুলোতে জন্মের পরে আর কোনো কিছুর প্রলেপ পড়েনি, কোনো সংস্কার করা হয়নি, অতি দরিদ্রদের ভাতের অভাবে বেরিয়ে থাকা কণ্ঠার হাড়ের চিত্র প্রতিটি বাড়ির গেটে, দেয়ালে, কার্নিশে, সব জায়গায়। যেন সেই ১৮ শতকের সবকিছু ঠিক তেমনই আছে।
এসব দেখতে দেখতে সকালের ভালো মনটা একদমই খারাপ হয়ে গেল। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় চোখে পড়লো ফেলে আসা জীর্ণ বাড়িগুলোর মতোই প্রায় জীর্ণ কিন্তু একটু রঙ করা একটি বাড়ির তিনতলায়।যেখানে নজরুলের প্রকৃতি তার জন্মভিটার অবস্থানের কথা জানান দিচ্ছে যেন দাঁড়িয়ে থেকে, গলা উঁচু করে। বাড়িটির সামনে পৌঁছাতেই দুজন লোক এলেন আমাদের সাথে কথা বলতে। একজন পাশের হোমিও ডাক্তার আর একজন নজরুলের বাড়ির বর্তমান কেয়ারটেকার বা দারোয়ান।
কবি তীর্থ! ছবিঃ লেখক

স্বাভাবিকভাবেই আমাদের খোঁজ খবর নিলেন, আমরাও উনাদের খোঁজ খবর নিলাম, নানা রকম কথা বললাম, জানলাম, নজরুলের বাড়ির সাথেই লাগোয়া লাইব্রেরীর সাথে দারুণ অবহেলায় পড়ে থাকা তার মিউজিয়াম দেখলাম আধো আলো আর আধো অন্ধকারে। সেই জাদুঘর নামের প্রহসনও যেন প্রতিটি মুহূর্তে জানান দিচ্ছিল দরিদ্র আর দুস্থ নজরুলের সেই সময়ের অবস্থার, আর শুধু সেই সময়ের কেন? যেন খোঁচা দিয়ে আর চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছিল যে, দেখ তোমাদের নজরুল তখন যেমন দুস্থ, দরিদ্র, দিনহীন আর একাকী ও নিঃসঙ্গ ছিল, আজও তেমনিই আছে। তার সামাজিক, আর্থিক, সার্বিক অবস্থান আজও তেমনিই আছে, আজ থেকে ১২০ বছর আগে জন্মের মতো যেমন ছিল!
হায়রে একটি দুর্লভ জাদুঘরের স্বল্প দামের নিয়ন আলোও যেন তার আলো-আঁধারি দিয়ে সেই কথা বলছিল! এতটাই করুণ, অবমাননাকর, অবহেলায়, অপমানে পড়ে রয়েছে সবকিছু। এমনকি চমৎকার একটা খোলামেলা পরিবেশে অবস্থিত প্রমীলা দেবী ও তার ছেলেদের সমাধিও ঠিক একই রকম অবহেলা আর অনাদরে পড়ে আছে দূরের এক স্কুল মাঠের পাশে। যদিও সেই জায়গার নান্দনিকতা ছিল, দারুণ ঝিরঝিরে বাতাস আর ছায়াঘেরা পরিবেশ ছিল। কিন্তু তবুও অনাদর, অবহেলা আর অপমান কোনো কিছু দিয়ে যেমন ঢেকে রাখা যায় না।
কবির কৈশোরের উচ্ছ্বসিত পুকুর। ছবিঃ লেখক

সবকিছু দেখে, গুমোট মনটা আরও গুমোট, আরও মেঘলা আরও বেদনায় ছেয়ে যাওয়াকে একটু কমাতে চেয়েছিলাম নজরুলের জন্মভিটার বারান্দায় বসে একটু পানি পান করে। কিন্তু সেখানেও অবহেলা আর অনাদরের ছাপ স্পষ্ট। বাড়ির বারান্দা, দেয়াল, চেয়ার-টেবিল, সিঁড়ি, জানালা, গ্রিল কোনো কিছুতেই কোনো যত্ন নেই। শেষ কবে সেসবে কারো যত্নের হাত পড়েছে বা ওগুলো ধোয়া-মোছা হয়েছে প্রশ্ন আছে। অবশেষে সেই বেদনা আর অসীম কষ্টের পাথর বুকে নিয়েই ফিরতি পথ ধরেছিলাম আসানসোলের।
আর মনে মনে ভাবলাম, ভাগ্যিস, ভাগ্যিস প্রিয় কবির, প্রিয় গীতিকারের শেষ দিনগুলো আর সমাধিটা এদেশে এসেছিল। শেষ সম্মানটুকু তিনি পেয়েছিলেন। সম্মান আর ভালোবাসার পরশ জড়িয়ে চির নিদ্রায় শায়িত আছেন আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের প্রাণকেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে। এটাই একমাত্র সান্ত্বনা। তবুও চলে আসার সময় বারে বারে ফিরে চাইছিলাম, যেন নজরুলের শৈশব, কৈশোর আমার দিকে তাকিয়ে গেয়ে উঠছিল-
কবি যে মসজিদে মোয়াজ্জিন ছিলেন, তার আধুনিক রূপ! ছবিঃ লেখক

“প্রিয়, যাই যাই বলো না,

প্রিয় যাই যাই বলো না…”

কীভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে বাসে বা ট্রেনে ভেঙে বা সরাসরি কলকাতা। ভেঙে গেলে ৮০০-১,০০০ আর সরাসরি গেলে ২,০০০-২,৫০০। হাওড়া আর শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে আসানসোল ভাড়া ৫০-১০০ ট্রেনের ধরন সাপেক্ষে। এরপর আসানসোল বাস স্ট্যান্ড থেকে লোকাল বাসে চুরুলিয়া ভাড়া ২০ রুপি। ফিরতে পারেন একইভাবে বা আসানসোল থেকে সরাসরি বাসে কলকাতা। তবে ট্রেনই সবচেয়ে ভালো আর আরামদায়ক বাহন।

কবি তীর্থ চুরুলিয়া। ছবিঃ লেখক

ফিচার ইমেজ- লেখক

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ হয়ে হুমায়ূন স্যারের গৌরীপুর জংশনে

রাজসিক রাজশাহী ভ্রমণের গল্পগাথা