দেবতাখুম নামক স্বর্গীয় পথটির উপক্রমের খোঁজে

sdr_HDRB

দেবতাখুম অভিযানে ভেলাভ্রমণ চলছে। ভেলা গিয়ে ঠেকল পাথুরে খাঁড়িতে। এরপরে আর ভেলা পেরুনোর উপায় নেই। আমরা পাথুরে অংশটুকু পেরিয়ে অন্যপাশে খুমের পানি দেখতে পেলাম। এখানে লোকজন কম, যেহেতু আর কোনো ভেলা চলে না।

ভেলা না চলার কারণ হলো পাথুরে খাঁড়ি। যারাই দেবতাখুমে এসেছে, তাদের কারোর ইচ্ছে হয়নি, খাঁড়ি পার করে ভেলা এপাশে নিয়ে আসতে। যেহেতু খুমের এই অংশে লোক নেই বললেই চলে, আমি নেমে পড়লাম নির্দ্বিধায়। এই অংশের পানি বেশ নির্মল। দাপাদাপি করে বেশ খানিকটা চলেও গেলাম। সামনের দিকে তাকিয়ে দেখি তীর দেখা যাচ্ছে। আরও কিছুক্ষণ হাত পা ছুঁড়ে সামনে তাকিয়ে দেখি, ওপার বেশি দূরে নয়। ভাবলাম, চলে যাই ওপারে। দেখি, তার পরে কী আছে।

অন্য পাড়ের পাথুরে খাঁড়িতে এসে উঠলাম। শুনশান নীরব হয়ে আছে। ওপারের কোলাহল এখানে শোনা যাচ্ছে না। হঠাৎ করেই মনে হলো, আচ্ছা, এরপরে কী আছে? পায়ে পায়ে একটু এগিয়ে গেলাম। ওমা! পাথুরে খাঁড়ি পেরিয়ে আবারও অনেকখানি জলাধার৷ ইচ্ছে হলো, এটাতেও নেমে সাঁতরে দেখি কতদূর দেখা যায় সামনে। হয়তো আমি ছাড়া আর কোনো মানুষেরই পা পড়েনি এখানে! না তা অবশ্য সম্ভব নয়। এটা পাহাড়িদের রাজত্ব। ওরা নিশ্চয়ই এসেছে। কিন্তু হয়তো বা সমতলের কোনো মানুষ এখানে আসেনি।

Image source : ইভা

কিন্তু একা একা যাওয়ার সাহস পেলাম না। তাই পাথুরে পথটুকু পেরিয়ে, সদ্য সাঁতরে আসা জলাধারটা আবার সাঁতরে জনারণ্যে এলাম, যেখানে আমার বন্ধুরা ছবি তুলছে৷ ওদের মধ্যে কেবল নিলয়ই সাঁতার কাটতে পারে, ওকে বললাম, ‘ওপারে ঘুরে এসেছি। যাবি?’ আমার কথা আমাদের গাইড অংখিংও শুনতে পেলেন। তিনি বললেন, ‘যাবেন নাকি? চলেন?’

তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এটার উৎপত্তি কোথায় জানেন?’

উত্তর এলো, ‘জানি। গিয়েছি সেখানে।’

একটু আগে মনে মনে যা ভাবছিলাম, তাই। পাহাড়িরা নিজেদের এলাকা হাতের তালুর মতোই চেনে। ওরা ঠিকই গিয়েছে। উত্তেজনায় রীতিমতো টগবগ করে ফুটছি। বললাম, ‘আমরা যেতে পারবো?’

‘সাঁতার জানলে পারবেন।’ ঘাড় নেড়ে জবাব দিলেন অংখিং।

ব্যস, অংখিংয়ের ভরসায় আমি আর নিলয় সাঁতরাতে শুরু করলাম। ভেলাবিহীন প্রথম জলাশয় আর পাথুরে খাঁড়িটা মোটামুটি ছোট হলেও পরের জলাশয়টা বেশ বড়। আর গভীর এই খুমে তল পাওয়া যায় না একটুও। অংখিং আমাদের দেখিয়ে দিচ্ছে, কীভাবে খুমের দুইপাশের শিলা পাহাড়ের খাঁজের সহায়তা নিয়ে সাঁতরে যাওয়া যায়। এবারে একটু দুইপাশের এই রকি পাহাড় সম্পর্কে বলি। পাহাড়ের কিছু কিছু খাঁজ দেখলে মনে হয়, প্রাকৃতিক চেয়ার৷ সেসব খাঁজে আমরা একটু একটু জিরিয়ে নিয়েছি ভেলাবিহীন খুমের দ্বিতীয় অংশ পার হওয়ার সময়। আবার কিছু কিছু খাঁজ এমন যে পানির উপরের একটা খাঁজ ধরে পানির নিচের অন্য আরেকটা খাঁজে পা রেখে বিশ্রাম নেওয়া যায়।

Image source : ইভা

এমন করে করে এগুচ্ছি। কখনো কখনো গাইড অনেক সামনে চলে যাচ্ছে, আবার নিলয় পিছিয়ে পড়ছে। সেই সময়গুলোতে যে একদমই ভয় পাইনি, তা নয়। মনে হচ্ছিল, পানিতে ক্ষতিকারক কোনো প্রাণী নেই তো? তবুও ভয়কে পাত্তা পেতে দিইনি৷ নিলয় ক্রমেই ক্লান্ত হচ্ছে৷ আমিও ভয় পেয়ে গেলে সমস্যা। ফেরাই মুশকিল হয়ে যাবে৷ খুমের উৎপত্তিস্থল খোঁজার জন্য আমরা দুই বন্ধু সাঁতরে পেরুলাম মোট তিনটি জলাধার। তৃতীয় জলাধারটি অনেক বড়।

যখনই ভাবলাম, তৃতীয় এই জলাধারটির কি আর শেষ নেই? তখনই যেন আরও একটি পাথুরে খাড়ি দেখতে পেলাম৷ পিচ্ছিল বড় বড় পাথরের সেই তীরে এসে ধাতস্থ হবার জন্য কিছুক্ষণ সময় দিলাম নিজেদের। তারপর এই পাথর থেকে ওই পাথরে লাফিয়ে লাফিয়ে সামনে এগুতে শুরু করলাম।

Image source : ইভা

এই খাড়িটিও অনেক বড়। চলছি তো চলছিই। বড় পাথর, ছোট পাথর, পাথরের গুড়ি, কোথাও পাথর খুব পিচ্ছিল, কোথাও শুকনো। এখানে একবার টাল হারিয়ে পিছলে পড়লে, কোমর তো ভাঙবেই, বেকায়দায় মাথাও যে ফেটে যাবে না, তার গ্যারান্টি নেই। ওদিকে আমার মনে ভয় জাঁকিয়ে বসছে৷ গাইডকে বিশ্বাস করে যে এতদূর চলে এলাম, যদি কোনো বিপদ হয়? সামনে এগিয়ে যাচ্ছি। রোখ চেপে গেছে, শেষটা দেখেই ছাড়ব। আবার একটু অদ্ভুত অনুভূতিও হচ্ছে এই ভেবে যে, এই জায়গায় অন্ততপক্ষে আমরা ছাড়া আর কোনো সমতলের মানুষ আসেনি। কারোর তো আর খেয়ে কাজ নেই যে এই ধরনের পাগলামি করে বেড়াবে!

খাড়ি শেষ হলো। আমাদের হতাশ করে দিয়ে সামনে আবারও একটি জলাধার। নিলয় একটা পাথরে বসেই পড়ল। মাথা নেড়ে জানিয়ে দিচ্ছে, আর সামনে যেতে চায় না সে। আমিও ভাবছি, আমাদের অন্য ট্যুরমেটরা হয়তো চিন্তা করবে আমাদের জন্য। দেবতাখুমের উৎপত্তিস্থল খুঁজতে গিয়ে এত সময় লাগবে, বুঝতে পারিনি।

সামনে আর যাব না। তাই পানিতে নেমে কেবল যতদূর দেখা যায়, দেখতে চাইলাম৷ এখানকার খুমটি নব্বই ডিগ্রি কোণে বাঁক নেওয়ায় চোখের সামনে শিলাময় একটা পাহাড় বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পানির মাঝখানে গিয়ে সামনে তাকালাম, খুমের শেষটা দেখার প্রত্যাশায়। কাছে যেতে না পারি, দূর থেকে দেখে হলেও নয়ন জুড়াই। কিন্তু না, আমাকে হতাশ করে দিয়ে সামনে সেই পরিচিত দৃশ্য ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইল। দুইপাশের পাথুরে শিলায় গঠিত উচ্চতায় ছোট পাহাড়ের মতো, তারই মাঝে বইছে জলপ্রপাত। শেষ সীমা দেখা যাচ্ছে না। দৃষ্টি আটকে গেছে পাহাড়ের জন্য। যেন ব্যঙ্গের হাসি হেসে দেবতাখুম বলতে চাচ্ছে, ‘আমার রহস্য উন্মোচন করা এত সহজ নয়। সবাই তো ওই মাঝপথ পর্যন্ত এসেই ফিরে যায়। তুমি কেন হাল ছাড়ছো না বাছা? আমাকে বুঝতে হলে আরও উদ্যোম, সময় আর সাহস দরকার।’

আমার কাছে সময় নেই। সাহসেও কিছুটা ঘাটতি পড়েছে। তাই আর সামনে যাওয়ার চেষ্টা করিনি।শেষ পর্যন্ত আমরা উৎপত্তিস্থল পেলাম না, এই দুঃখ বুকে নিয়েই ফেরার জন্য পা বাড়ালাম। আমি তখনো ভেঙে না পড়লেও, নিলয় খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। ওর অবস্থা দেখে গাইড বললো, ‘আপনারা চাইলে পাহাড়ের উপর দিয়ে যেতে পারি, সাঁতরে না গিয়ে। চোখ তুলে পাহাড়ের উপরে যেখান দিয়ে সূর্যরশ্মি আসছে, সেখানে তাকালাম। নাহ, এখন এই পাথুরে পাহাড় বাওয়ার শখ নেই। সাঁতরে ফিরব।

Image source : ইভা

ক্রমে ক্লান্ত হয়ে পড়লেও, এক সময় নিরাপদেই ফিরতে পেরেছি। এদিকে আমাদের বন্ধুরা তো চিন্তায় অস্থির। আমাদের কোনো বিপদ হয়ে গেল কি না, এত দেরি হচ্ছে কেন! একজন তো আর্মি ডেকে আমাদের খোঁজে লোক পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত আমরা সহি সালামতেই ফিরতে পেরেছিলাম। শুধুমাত্র পানিতে লম্বা সময় থাকার কারণে হাত পায়ের চামড়া কুঁচকে সাদা হয়ে গিয়েছিল।

বেলা চারটায় দেবতাখুমের স্বর্গীয় পথ বেয়ে শিলবাঁধা পাড়ায় ফিরে এলাম নৌকায় চড়ে। খিদেয় পেট জ্বলছে খুব। শিলবাঁধা পাড়ায় আমাদের খাবার তৈরি রাখতে বলা হয়েছিল। পাড়ায় ফিরে ভিজে কাপড় বদলে খাবারের খোঁজে গেলাম। খেয়ে দেয়ে কচ্ছপতলী ফিরে এলাম।

আমাদের ইচ্ছে ছিল, রাতে শিলবাঁধা পাড়াতে থাকার। কিন্তু কচ্ছপতলীর আর্মি ক্যাম্প থেকে ওখানে থাকার অনুমতি পাইনি। তাই আমাদের রাতে থাকার ব্যবস্থা হলো কচ্ছপতলীতে গাইড অংখিংয়ের মামার বাসায়। একই সাথে তিনি আমাদের খাওয়ার ব্যবস্থাও করলেন।

সারাদিনের ট্রেকিং শেষে তখন প্রচণ্ড ক্লান্ত। সেই সাথে ক্ষুধার্তও। গাইড অংখিং আমাদের খাবার নিয়ে এলেন। জুম চালের ভাত, আলু ভর্তা, বেশি করে পেঁয়াজ মরিচ দিয়ে ডিম ভাজি আর ডাল। খাওয়ার আগে একবার মনে হলো, শিলবাঁধা পাড়ার মতো রান্না হলে তো এক লোকমাও খাওয়া যাবে না। অভুক্তই না থাকা লাগে!

অল্প করে ভাত বেড়ে নিয়ে আলুভর্তা মেখে খেতে শুরু করলাম। একি! এটা তো অমৃত! এই আলুভর্তা তো বগা লেকের সিয়াম দিদির বানানো আলুভর্তাকেও অতিক্রম করে গেছে! ভরসা পাওয়ায় সাথে ডিমও নিয়ে ফেললাম। এটাও চমৎকার করে ভেজেছে। ডাল রান্নাটাও ভালো হয়েছে। শেষ পর্যন্ত আমাদের এই খাবার আমরা প্রায় কাড়াকাড়ি করে খেয়েছি। পরে কথা বলে জানতে পেরেছি, অংখিংয়ের মামা সাবেক আর্মি। লম্বা সময় ধরে বাঙালিদের মাঝে থেকেছেন। তাই বাঙালিদের রুচি বোঝেন। খাবার পর এক পানা পাহাড়ি কলাও দিয়ে গেলেন।

এখানে থাকতে হলে, কিংবা এখানকার খাবার খেতে চাইলে আপনার গাইড হিসেবে অংখিংকেই নিতে হবে। আমাদের বাজেট কম ছিল বলে আমরা ডাল আলুভর্তা আর ডিমভাজি নিয়েছিলাম। আপনারা অন্য কিছু খেতে চাইলে জানাতে হবে। তারা সেসবের ব্যবস্থা করবে। গাইড অংখিংয়ের ফোন নাম্বার 01870059250.

রাতে খোলা আকাশের নিচে ছাদে বসে কিছুক্ষণ আড্ডা আর গান হলো। পরদিন ভোরে বান্দরবান ফেরার বাস ধরলাম আমরা। এভাবেই শেষ হলো আমাদের দেবতাখুম অভিযান।

খরচ

ঢাকা থেকে বান্দরবান বাসভাড়া= ৬২০
সকালের নাস্তা= ১০০
রোয়াংছড়ি স্ট্যান্ড পর্যন্ত অটো ভাড়া= ২০
রোয়াংছড়ি বাস ভাড়া= ৬০
কচ্ছপতলী সিএনজি= ৬০
হালকা খাবার, পানি= ৩০
খুমে ভেলা = ১০০ (৭ জন)
গাইডের খরচ ১,০০০ টাকা।

শিলবাঁধা ক্যান্টিনে খাবারের দামও ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি বান্দরবানের অন্যান্য পাহাড়ি জায়গার তুলনায়। মুরগি সেট মেন্যুর দাম পড়ে প্রতি জনে ১৮০ টাকা। আর ডিম সেট মেন্যুর দাম পড়ে প্রতি জনে ১২০ টাকা।

কীভাবে যাবেন

দেবতাখুম বা তিনাপ অভিযানে গেলে প্রথমেই আপনাকে বাংলাদেশের যে কোনো জায়গা থেকে চলে যেতে হবে বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলায়। সেখানকারই দুটো জায়গা শিলবাঁধা এবং কচ্ছপতলী। বান্দরবান সদর থেকে বাস/চাঁদের গাড়ি/সিএনজি/ মোটর সাইকেলে করে রোয়াংছড়ি যেতে এক ঘণ্টা লাগে। সেখান থেকে সিএনজি বা মোটর সাইকেলে কচ্ছপতলী বাজার। বাজারের কাছেই অংখিংয়ের মামার বাসা। অংখিংয়ের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন 01870059250 এই নাম্বারে।

কচ্ছপতলী বাজার থেকে পায়ে ঘণ্টাখানেক হাঁটলেই শিলবাঁধা পাড়া এবং ক্যান্টিনের দেখা মিলবে। তারপর ভেলায় চড়ে দেবতাখুম।

Feature Image : ইভা

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অপার্থিব পাঁচটি দৃশ্যপট

স্পেনের গোপন দ্বীপগুলো