ঝালকাঠিতে একটি স্নিগ্ধ রহস্যময় প্রাভাতিক

ভোর সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর প্রসেন বললো, ঝালকাঠি ঘুরতে যাবো। বরিশাল শহরের ঘুম ভাঙার আগেই রূপাতলী বাসস্ট্যান্ডে চলে এলাম। বাসে বরিশাল থেকে ঝালকাঠি যেতে সময় লাগলো মাত্র আধা ঘণ্টা। বরিশাল শহরের কাছ ঘেঁষেই ঝালকাঠি জেলা। সেই সাথে বাস টেনেছেও খুব। বাস থেকে নেমেই আগে গেলাম কীর্ত্তিপাশা জমিদার বাড়ি।

কীর্ত্তিপাশায় ঢুকতেই দেখলাম কামারের লোহা পেটানো; Source : মাদিহা মৌ

কীর্ত্তিপাশা জমিদার বাড়ি

কীর্ত্তিপাশা জমিদার বাড়িটি সম্পর্কে প্রথম জানতে পারি বন্ধু মাহমুদুল হাসানের বই বিভূতির ভূষণ থেকে। এমনিতেই আমার যেকোনো পুরনো আমলের জমিদার বাড়ির প্রতি খুব টান, তার উপরে বইয়ে জমিদার বাড়িটির এমন পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা আর শিহরণ জাগানো ইতিহাস ছিল যে আগ্রহটা কয়েকগুণে বেড়ে গেল। তাই যখন বরিশাল বিভাগ ঘোরার প্ল্যান করলাম, তখন ঠিক করলাম, ঝালকাঠি জেলায় খুব বেশি ঘোরার জায়গা না থাকলেও যাব। কেবলমাত্র এই কীর্ত্তিপাশা জমিদার বাড়ি দেখার জন্য।

জমিদার বাড়ি; Source : মাদিহা মৌ

কীর্ত্তিপাশা জমিদার বাড়িটি ঝালকাঠির কীর্ত্তিপাশা গ্রামে অবস্থিত। প্রসেন আমাদের সাথে নিয়ে অটো ঠিক করলো কীর্ত্তিপাশা জমিদার বাড়ি যাওয়ার জন্য। বাড়িটি ঝালকাঠি সদর থেকে প্রায় ৪ থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এক জায়গায় রাস্তার কাজ চলছে, ওখানে এত ভয়াবহ খাদ যে অটো থেকে নেমে না গেলে অটো উলটে যেতে পারতো।

অটো থেকে নেমে হাঁটতে শুরু করলাম। আশেপাশে সবকিছুর মধ্যেই কীর্ত্তিপাশা নামটা আছে। মনে প্রশ্ন এলো কীর্ত্তি শব্দটা তো শুদ্ধ নয়, শুদ্ধ হলো কীর্তি। তাহলে কীর্ত্তিপাশা এলো কোত্থেকে? জানতে পারলাম, রাজা কীর্ত্তি নারায়ণের নাম অনুসারে এলাকাটির নাম হয় কীর্ত্তিপাশা।

জমিদার বাড়ি; Source : মাদিহা মৌ

জমিদারদের মঞ্চের গ্রিনরুম এবং হলরুমে করা হয়েছে বালিকা বিদ্যালয়। আমরা ছাত্রছাত্রীদের ওখানে ক্লাস করতে দেখলাম। তাই আর এই বাড়িটিতে প্রবেশ করিনি। দশ আনা বড় হিস্যা জমিদার বাড়ির সামনের উঠোনে একটা মঠ আকৃতির কাঠামো আছে। এটি কী হিসেবে ব্যবহৃত হতো, জানা নেই।

বড় হিস্যার পিছনে জঙ্গলে প্রায় ঢেকে থাকা বাড়িটি ছোট হিস্যা কিনা, জানার উপায় নেই। বটগাছের দৌরাত্ম্যে এটি এখন নড়বড়ে শরীর নিয়ে কোনো রকমে দাঁড়িয়ে আছে। তবে ছাদে ওঠা গেল। সেই একই নির্মাণশৈলী। তবে এই জমিদার বাড়িটিতে কারুকাজ নেই বললেই চলে। এরকমটি আমি আর দেখিনি। জমিদার বাড়ি মানেই মনোরম কারুকাজের আধার। একমাত্র এখানেই তেমন কিছু দেখা গেল না।

সমাধি মন্দির; Source : মাদিহা মৌ

তিনপাশে অরণ্য থাকায় বেশ গা ছমছমে অনুভূতি পেলাম পুরো সময়টায়। আমরা কেউ জোরে শব্দ করলাম না। যেন শব্দ করলেই হা রে রে করে তেড়ে আসবে জমিদারদের কোনো প্রহরী!

সংস্কারের অভাবে বড় হিস্যার নাটমন্দির, হলঘর, ছোট-বড় মন্দির প্রায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আমরা অবশ্য এগুলো কোনোটাই আলাদা করে চিনতে পারিনি। নির্দেশিকা না থাকলে কোন স্থাপনাটি কী, কীভাবে বুঝবো?

রাধা গোবিন্দ মন্দির ও শিবমন্দির

কীর্ত্তিপাশা জমিদার বাড়ি থেকে কয়েক কদম হাঁটার পরই চোখে পড়বে একটা মন্দির। শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ মন্দিরটিকে কীর্ত্তিপাশা সার্বজনীন হরিসভাও বলা হয়। এটি বাংলা ১৩৮৫ সালে স্থাপিত হয়। এর পাশে একটি জমিদারদের পারিবারিক শিবমন্দির এবং একটি শিবমূর্তিও আছে।

মন্দির; Source : মাদিহা মৌ

মন্দির দুটোর একটু দূরেই একটি সমাধি মন্দির। বাবু প্রসন্ন কুমার রায় চৌধুরীর সমাধি মন্দিরটি ১২৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তার মানে রাধা গোবিন্দের মন্দিরটি খুব বেশি পুরনো না হলেও এই সমাধি মন্দিরটি প্রায় দেড়শ বছরের পুরনো। যদিও আমি কীর্ত্তিপাশা জমিদার বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা রামজীবন সেনের সাথে এই প্রসন্ন কুমার রায় চৌধুরীর সম্পর্ক বের করতে পারিনি। তবুও ধরে নিতেই পারি, জমিদার বাড়িটি অন্তত দুইশ বছরের পুরনো। এখন পর্যন্ত যত পুরনো স্থাপনা দেখেছি, তার প্রায় সবই দুইশ বছরের পুরনো।

গাবখান খাল ও হাসপাতাল

এখান থেকে বেরিয়ে কাছেই বয়ে চলা গাবখান নদীর খালটির কাছে গেলাম। একটা ব্রিজ আছে, ওখানে দাঁড়িয়ে আশপাশটা দেখলাম। খালের পাশেই একটি হাসপাতাল আছে, এটি দেখে মোটেও হাসপাতাল মনে হলো না। মনে হলো, কবরখানা! অবশ্য তার কারণও আছে। এটি জেলা সদর হাসপাতালের চেয়েও পুরনো।

গাবখান খাল; Source : মাদিহা মৌ

গাবখান চ্যানেল ও গাবখান ব্রিজ

কীর্তিপাশা জমিদার বাড়ি ঘুরে বের হতেই প্রসেন বললো, ‘চল, বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু ব্রিজ দেখবি।’

আমি তেমন আগ্রহ পেলাম না। ও বলল, ‘এখান থেকে বেশি দূরে নয়, দেখেই যা।’ ঠিক আছে, তাই সই!

কী মনে হতে হেঁটেই ব্রিজে উঠতে চাইলাম। ওমা, হাঁটছি তো হাঁটছিই! পথ আর শেষ হয় না। এতই লম্বা এই ব্রিজ। শেষে বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘ধুর ছাই! অটোতে চড়েই যাবো।’ প্রসেন বললো, ‘আর একটু! চল না একটু কষ্ট করে।’

গাবখান সেতু; Source : মাদিহা মৌ

একটু কষ্ট করে হেঁটে যাওয়ার ফলটা একটু পরেই পেলাম। ব্রিজটা এত উঁচুতে যে, ব্রিজের গোড়া থেকে অনেকখানি দূর পেরিয়ে যাওয়ার পরে পানি পাওয়া গেল। এর মধ্যে অনেক নিচে দালানকোঠা আর গাছপালাগুলো অদ্ভুত দেখাচ্ছিলো। মনে হচ্ছিলো আমি কোনো পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে আছি। যার পাদদেশ দিয়ে বয়ে গেছে চমৎকার জলরাশি। উপর থেকে সবুজে ঘেরা সে জলরাশি দেখে মনটা যে প্রশান্তিতে ভরে যাচ্ছিল। ঠিক নিচেই একটা নৌকায় বসে জেলে মাছ ধরার জাল পাতছিলো। পুরো দৃশ্যটিই যেন ছবির মতো সুন্দর।

বলছিলাম গাবখান চ্যানেলের উপরে সদর্পে দাঁড়িয়ে থাকা গাবখান সেতুর কথা। আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে গাবখান চ্যানেলটি ব্যবহৃত হয় এবং চ্যানেলটির নাব্যতা হ্রাস পাওয়াতেই গাবখান সেতুটি এতটা উঁচু করে বানানো হয়েছে। আর এজন্যই আমরা এত সাধারণ জায়গাতেও এতটা অপরূপ দৃশ্য দেখতে পাই।

গাবখান চ্যানেল; Source : মাদিহা মৌ

চাঁদপুরে আমাদের ছোট্ট ডাকাতিয়ার উপরে দাঁড়িয়ে থাকা চাঁদপুর সেতুতেই যেকোনো উৎসবের দিনেই লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। পহেলা বৈশাখ, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের দিনে উপচে পড়া ভিড় থাকে আমাদের ব্রিজে। মৌমাছির চাকের মতো সেই ভিড়ে যেন মনে হয় ভেঙেই পড়বে ওটা। আর এখানে তো সবচেয়ে উঁচুতে দাঁড়িয়ে থাকা সেতু। এতে যে লোকে ঘুরতে আসবে, তা বলাই বাহুল্য। তাই এই সেতুর উপর থেকে প্রকৃতির নির্মল হাওয়া, নদী, নদীর মোহনার সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভ্রমণপ্রেমীরা আসেন।

গাবখান সেতুর এই জনপ্রিয়তার জন্যই হয়তো ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় ন্যাশনাল ইকোপার্ক স্থাপন করার কাজ চলছে। গাবখান, সুগন্ধা, বিষখালী ও জীবনানন্দের ধানসিঁড়ির মোহনায় নির্মিত হচ্ছে পার্কটি। সৌন্দর্যময় এ প্রাকৃতিক লীলাভূমি দেখতে ব্রীজ ঘুরে নদীর পাশ দিয়ে বেড়ি বাঁধের উপর ইকো বনায়নের মধ্য দিয়ে দূষণমুক্ত পরিবেশে পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়াতে যে কারোরই ভালো লাগবে।

ধানসিঁড়ির তীরের মিনি পার্ক

একটা সকাল ঘুরে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। জীবনানন্দের মামাবাড়ি কাছেই ছিলো, কিন্তু ওই জায়গাটা পেরিয়ে আসার পর জেনেছিলাম, ওখান দিয়েই জীবনানন্দের মামাবাড়ি যেতে হয়। জীবনানন্দের মামাবাড়ি দেখতে না পারার দুঃখ ঘোচাতে গেলাম, ধানসিঁড়ি নদীর তীরে। সেখানে একটা মিনি পার্কও আছে। পার্কে বসলাম কিছুক্ষণ। পার্কের বাইরে দই ফুচকা আছে খেলাম। এখানকার দই ফুচকা দেখতেও সাধারণ ফুচকার মতোই। ফুচকার খোলে কেবল ঘুঘনি দেওয়া। আলাদা একটা প্লেটে টক দইয়ের সাথে আরো কিছু মশলার মিশ্রণ। সেই সাথে ডিমঝুরি ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছে উপরে।

দোকানি এসে বললো, এই ঝোলটা যত বেশি ঢোকাবেন ফুচকার খোলে, ততো মজা লাগবে। খেয়ে মজাও পেয়েছি। তবে দামটা অনেক বেশি নিয়েছে। এক প্লেট দই ফুচকার দাম পড়েছে দেড়শ টাকা। যদিও আমরা হাফপ্লেট দিতে বলেছিলাম, কিন্তু তারা জানালো হাফপ্লেট বিক্রি হয় না। এই দই ফুচকাটি আমার খাওয়া দই ফুচকার মধ্যে অন্যতম সেরা ছিল। আর এখানেই আমাদের ঝালকাঠি ভ্রমণ পর্ব শেষ হলো।

মিনিপার্ক; Source : মাদিহা মৌ

কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে ঝালকাঠি স্থল পথে সরাসরি নন স্টপ বাসে করে যাওয়া যায়। বাসের মধ্যে এসি/নন এসি উভয় ধরনের বাসের সুব্যবস্থা রয়েছে। নন এসি বাসের মধ্যে রয়েছে হানিফ এন্টারপ্রাইজ, সার্বিক পরিবহন, সাকুরা পরিবহন। হানিফের ভাড়া ৫৫০ টাকা করে। আর বাকি দুটোতে ৫০০ টাকা ভাড়া।

টিকেট বুকিং কল সেন্টার- 01517-832110

দই ফুচকা; Source : মাদিহা মৌ

কোথায় থাকবেন

ঝালকাঠি শহরে থাকার মতো তেমন ভালো কোনো হোটেল নেই। আপনি চাইলে বরিশাল ফিরে আসতে পারেন। বরিশালের কাঠপট্টিতে থাকার জন্য বেশ কিছু আবাসিক হোটেল রয়েছে। এসব হোটেলের রুম ভাড়া ৮০০-২,০০০ টাকার মধ্যে।

Feature Image : শিহান

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নামিবিয়ার বিখ্যাত যত ল্যান্ডস্কেপ

তিস্তা পাড়ের লালমনিরহাট