সকালপর্বে চট্টগ্রামের আনাচে কানাচে পদব্রজের গল্পকথা

নোয়াখালী থেকে ভোর সকালে চট্টগ্রামগামী যে বাস ধরেছিলাম, সেটা আমাকে দুই ঘণ্টায় কৈবল্যধাম পৌঁছে দিল। বন্ধু নিলয়কে এ কথা জানাতেই, সে হাঁচড়ে পাঁচড়ে, শার্টের উল্টাপাল্টা বোতাম লাগিয়ে আমাদের নিতে এলো। ভাবতেই পারেনি, এত জলদি পৌঁছাতে পারবো। সকাল নয়টায় আমরা চট্টগ্রাম শহর ঘুরে বেড়ানোর জন্য পা বাড়ালাম। যেহেতু সবচেয়ে কাছে কৈবল্যধাম, তাই সেদিকেই গেলাম সবার আগে।

কৈবল্যধাম

যেহেতু আশ্রমটি পাহাড়ের উপরে, সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলাম প্রথমে। উপরে উঠে একটা নাটমন্দির দেখতে পেলাম। এর সামনেই কৈবল্যনাথের ছবি সম্বলিত মন্দির। দুয়েকজন পূজারি পূজা করছে ওখানে। পাশে মোমবাতি আর আগরবাতি জ্বালানোর স্ট্যান্ড। বাম পাশ দিয়ে এক সারি সিঁড়ি নেমে গেছে নিচের দিকে। সিঁড়ির মাঝামাঝিতেই দৃষ্টি গোচর হলো কৈবল্যধামের যাত্রী নিবাসটি।

সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে দেখলাম, কৈবল্যশক্তি নামে খ্যাত সেই বটবৃক্ষ। গাছটি এত পুরনো যে এর একেকটি ঝুরি সাধারণ বৃক্ষ জাতীয় গাছের মতো মোটা। এত বড় গাছ, অথচ কোথাও লাল সুতো বাঁধা নেই। সাইনবোর্ডে লেখাও আছে, লাল সুতো বাঁধা নিষেধ। কামশ্রীকুণ্ড বা কৈবল্য কুণ্ড নামে যে পুকুরটি আছে, ওতে মানুষজনের গোসল করা নিষেধ। গয়াঘরে পূজার আয়োজন চলছে।

সকাল বেলাটাতেই কেমন গরম পড়ছিল সেদিন। ওটুকু ঘুরতেই ঘেমে নেয়ে গিয়েছিলাম। সব দেখা শেষ করে পুকুরপাড়ে গিয়ে বসলাম। একঝলক ঠাণ্ডা বাতাসে শরীরটা জুড়িয়ে গেল। পুকুরঘাটের পাশেই অনেকখানি খালি জায়গা। সবুজ ঘাসে ছেয়ে আছে। ওখানটায় নাকি মৃতদেহের সৎকার করা হয়। পুকুরঘাটে বসে আড্ডা দেওয়া নিষেধ বলে এখানে আর বেশিক্ষণ বসলাম না।

কৈবল্যধাম। সোর্স: মাদিহা মৌ

কীভাবে যাবেন:

ঢাকা ট্রাঙ্ক রোড নামে সুপরিচিত ঢাকা-চট্টগ্রাম প্রধান সড়কের পাশে কৈবল্যধাম রেল স্টেশনের খুব কাছেই শ্রীশ্রীকৈবল্যধাম। হেঁটেই যাওয়া যায়।

কর্নেল উইলিয়াম জোনসের কুটির

কৈবল্যধামে মন্দিরের ঝকঝকে সৌন্দর্যের অন্তরালে যে একখানা প্রাচীন শীর্ণ কুটির পড়ে আছে, ওখানে সশরীরে উপস্থিত হয়েও কেউ বুঝবে না। এই নোনাধরা হলুদ কুটিরের খোঁজ দিয়েছেন অপু নজরুল ভাইয়া।

কর্নেলের বাড়ির পাহাড়টিতে উঠতে হলে পেরুতে হবে কৈবল্যধাম মন্দিরের গেট। সরাসরি যাওয়ার উপায় নেই। কুটিরের গেটটিতে তালা মারা। যেহেতু মন্দির সীমানার ভেতরে বাড়িটি, তাই অনুমতি নেওয়ার জন্য মন্দিরের অফিসে গেলাম। বিনীত গলায় জানালাম, ‘আমরা একটু কর্নেল জোনসের বাড়িতে যেতে চাই। তালাটা কি খুলে দেওয়া যাবে?’

জবাব এলো, ‘কর্নেল জোনসের বাড়ি তো এখানে নেই। ওটা রাস্তার ওপাশে।’

তখনো আমি এই বাড়ির ইতিহাস সম্পর্কে পড়িনি। বললাম, ‘পাহাড়ের উপরে যে একটা বাড়ি আছে, ওটায় যেতে চাচ্ছি।’

মাথা নেড়ে বারণ করে দিল। সেই সাথে এও বললো, ‘এটা কর্নেল জোনসের বাড়ি নয়। উকিল সাহেবের বাড়ি। উকিলের নাম ছিল ইভেন্স।’

কর্ণেল উইলিয়াম জোনসের কুটির। সোর্স: মাদিহা মৌ

মন্দির কর্তৃপক্ষের লোক এই বাড়িটিকে উকিল ইভেন্স সাহেবের বাড়ি কেন বললেন, আমার জানা নেই। হয়তো কর্নেল জোনসের পরে উনি এই কুটিরে বসবাস করেছিলেন, তাই তার নাম বলেছেন। কিন্তু এটি বানিয়েছেন তো কর্নেল জোনস। তাহলে মন্দিরের কাজে নিয়োজিত লোকটি কেন বললেন, এটি কর্নেল জোনসের বাড়ি নয়? কর্ণেল জোনসের বাড়ি রাস্তার ওপাশে?

আর কথা না বাড়িয়ে আবার চলে এলাম কর্নেল কুটিরের গেটের সামনে। গেটের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে ছবি তুললাম কুটিরের। কিন্তু কাছে গিয়ে তো ভালোভাবে দেখা হলো না। গেটের পাশে একটি অনুচ্চ বেড়া আছে। চাইলেই বেড়া টপকে ওপাশে যাওয়া যাবে। কিন্তু বেড়ার পাশে পচনশীল আবর্জনার স্তুপ। মন্দিরের প্রসাদ তৈরির সমস্ত আবর্জনা এখানে এনে ফেলা হয়। বেড়া হয়তো আমি এমনিতেই টপকে যেতে পারতাম, কিন্তু লাফিয়ে আবর্জনার স্তুপ পেরুতে পারবো না। নিলয় বললো, ‘আমি পারবো।’

সে আবর্জনা এড়িয়ে দেয়াল টপকে ওপারে গেল। ও ছবি তুলে আনলো। বাড়িতে ওঠার জন্য পাহাড় কেটে বানানো সিঁড়ির ধাপ ছিল এককালে। এখন সেই ধাপে সিমেন্টের জমানো সরু আকৃতির থাম। এলোপাথাড়িভাবে পড়ে আছে।

পাহাড়তলি রেলওয়ে

ছোট থেকেই বৃষ্টিস্নাত আকাশ, মেঘলা বিকেল আর বৃষ্টিভেজা রেললাইন খুব পছন্দ। কত আড্ডা দিয়েছি রেললাইনে বসে। কত দূর পর্যন্ত চলে গেছি রেললাইনে হাঁটতে হাঁটতে। তাই রেললাইন আমার খুব প্রিয়। পাহাড়তলিতে যেহেতু রেলস্টেশন আছে, ওটাতেই বা যাব না কেন?

পাহাড়তলি রেলওয়ে। সোর্স: মাদিহা মৌ

রেললাইনের ওভার ব্রিজ থেকে দূরে চলে যাওয়া লাইন দেখতে খুব দারুণ লাগে। স্টেশনে নেমে চারপাশটা দেখলাম ঘুরে ঘুরে। এত পরিচ্ছন্ন একটা স্টেশন। দেখেই মন ভালো হয়ে যায়। পনেরোটার মতো মালগাড়ির পুরানো ওয়াগন বিভিন্ন জায়গায় পড়ে আছে। লালচে রঙের এইসব ওয়াগনও দেখতে খুব চমৎকার লাগে। সেই সঙ্গে বৃষ্টির আমেজ, ঠাণ্ডা হাওয়া দারুণ লাগছিল।

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের আত্মাহুতিস্থল

কৈবল্যধাম ঘুরে পা বাড়ালাম বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের আত্মাহুতিস্থল দেখার জন্য। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। এমন একজন বাঙালী, যিনি ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নারী মুক্তিযোদ্ধা ও প্রথম বিপ্লবী নারী শহীদ ব্যক্তিত্ব।

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের আত্মাহুতিস্থল। সোর্স: মাদিহা মৌ

পাহাড়তলি রেলব্রিজ পার হয়ে রাস্তার লোকজনকে জিজ্ঞেস করতে করতেই পেয়ে গেলাম জায়গাটি। একটা তেরাস্তার মোড়ে বীরকন্যার ভাস্কর্য স্থাপন করা আছে। ওটার পাশেই এক ধারে রয়েছে এম. এস. হক স্মৃতি মিলনায়তন।

প্রীতিলতার আত্মাহুতিস্থল ঘুরে ঘুরে দেখছি, চট করে বড় বড় ফোটায় বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো। আশেপাশে তাকিয়ে দেখি চমৎকার লালচে রঙের একটি বিদ্যালয় দেখা যাচ্ছে। দৌড়ে ওখানে আশ্রয় নিই। এটি রেলওয়ে স্কুল। খুব সম্ভবত এই স্কুলঘরটি সেই ব্রিটিশ আমলেই তৈরি করা হয়েছিল।

কারণ বিদ্যালয়টির স্থাপত্যকলার সাথে কার্জন হলের মিল পাওয়া যায়। বৃষ্টি বন্দি হয়ে স্কুলটিও ঘুরে ঘুরে দেখেছি। দৃষ্টিনন্দন এই বাড়িটির উপরতলা থেকে প্রীতিলতার ভাস্কর্য দেখা যায়। বৃষ্টি একটু ধরে আসতেই, বাংলার সকল বিপ্লবীদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে এখান থেকে ফিরে গেলাম পরবর্তী গন্তব্যে বাটালি পাহাড়ে।

রেলওয়ে স্কুল। সোর্স: মাদিহা মৌ

টাইগার পাস ও বাটালি পাহাড়

ওখান থেকে কাছেই জিলাপি পাহাড়। কত কাছে বা হেঁটে যাওয়া যাবে কি না, তা কিন্তু জানি না! যেহেতু চিনি না, তাই ঝুঁকি না নিয়ে একটা সিএনজি থামালাম। জিজ্ঞেস করলাম, আমাদের নিয়ে জিলাপি পাহাড়ে যাবে কি না। রাজি হলো।

তিনজনের ভাড়া চাইলো ৬০ টাকা। আমি আর নিলয় একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে বুঝতে চাইলাম, অযথা ভাড়া দিয়ে সিএনজিতে যাচ্ছি কিনা। ভাড়া যেহেতু কম চাচ্ছে, হয়তো একটু সামনেই পাহাড়টা!

বাটালি পাহাড়। সোর্স: মাদিহা মৌ

ছাইপাঁশ না ভেবে উঠে পড়লাম। পরে বুঝেছি, উঠে খুব ভালো করেছি। সিএনজি চলতে শুরু করার মিনিট দুয়েকের মধ্যে ঝুম বৃষ্টি নামলো। যেহেতু আমাদের কাছে ছাতা নেই, ভিজতে হতো। সেই সাথে সারাটা দিন মাঠে মারা যেত। 

আমরা জানতাম, বাটালি হিলেরই আরেক নাম জিলাপি পাহাড়। এখন দেখি সিএনজি চালক অন্য কথা বলছে। তিনি আমাদের টাইগার পাসের চৌরাস্তার কাছে নামিয়ে দিয়ে বললেন একটু সামনে গেলেই বাটালি পাহাড় পাবো। ওখানে সিএনজি আর যাবে না। ৬০ টাকা করে ভাড়া ঠিক করলেও আমরা উনাকে ১০০ টাকা দিলাম। কারণ, ইনি যদি আমাদের বৃষ্টির মধ্যে আগের পাহাড়টার গোড়ায় নামিয়ে দিতেন, কিংবা জিলাপি পাহাড়ের উপরে, তাহলে আমরা ভালোই বিপদে পড়তাম।

যাই হোক, হাঁটতে হাঁটতে টাইগার পাসের মোড়টা পেরুচ্ছি। এখানকার রাস্তার দু’পা‌শে উঁচু পাহাড়। এই জায়গার নাম টাইগার পাস হবার পিছনে কিছু লোককথা আছে। গেল শত‌কে এই এলাকার পাহাড় গভীর বনজঙ্গলে অাবৃত ছিল। কোনো লোকজন বাস করতো না। এই জঙ্গলে দিনদুপু‌রে বাঘ চলা‌ফেরা কর‌তো। প্রায়ই বা‌ঘের গর্জন শোনা যেতো এখানে। ‌কোনো ক্রমে গৃহপালিত গরু ম‌হিষ জঙ্গলে ঢ‌ুক‌লে আর ফি‌রে আসতো না। এমনকি বাগে পেলেই মানুষও মার‌তো বাঘ।

ট্রেনের ওয়াগন।  সোর্স: মাদিহা মৌ

টাইগার পাসের কাছেই বাটালি পাহাড়। আসলে এটাকে সত্যিই জিলাপি পাহাড়ও বলা হয়। সিএনজি চালক হয়তো জানতেন না। জিলাপি পাহাড় নাম হবার কারণ, পাহাড়ে ওঠার রাস্তাটা জিলাপির প্যাঁচের মতো এঁকেবেঁকে চূড়ায় উঠেছে। পাহাড়ে যাওয়ার পথটা ছায়াঘেরা সবুজ। ২৮০ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট এই পাহাড়টি চট্টগ্রামের সর্বাধিক উঁচু পাহাড়। আমরা প্রথম কয়েকটি জিলাপির প্যাঁচ ঘুরে ঘুরেই উঠেছি।

বৃষ্টি ভেজা পাহাড়ি এই মোড়গুলো অদ্ভুত সুন্দর দেখাচ্ছে। এই রাস্তা বানাতে কী পরিমাণ পরিশ্রম করতে হয়েছে, সেটা ভেবেই অবাক হই। কিছুক্ষণ সরাসরি উঠে, তারপর ক্লান্ত হয়ে পড়ায় সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেছি। ওহ হ্যাঁ, বলতেই তো ভুলে গেছি, মোড়গুলো পেরুনো ছাড়াও উপরে ওঠা যায় সিঁড়ি বেয়ে। সিঁড়ি বানানো হয়েছে শর্টকাট রাস্তা হিসেবে।

উঠতে উঠতে ডিসির বাংলো সহ আরোও কিছু বাড়ি দেখলাম বাটালি পাহাড়ে। একসময় চূড়ায় চলে এলাম। এখানে এসে প্রথমেই একটা সাইনবোর্ড পেলাম। ১৯৭৫ সালে নির্মিত শতায়ু অঙ্গন। এখানে নিয়মিত এলে সত্যিই হয়তো শত বছর আয়ু লাভ করা যাবে। কারণ এটি একটি খোলা ব্যায়ামাগার। ব্যায়াম করার কিছু উপকরণ এখানে আছে। আরমান তো রীতিমতো গা গরম করে ফেললো এখানে এসে।

হাইওয়ে সুইটসের কেক। সোর্স: মাদিহা মৌ

শতায়ু অঙ্গনের উঁচু মঞ্চে দাঁড়িয়ে চট্টগ্রাম শহরের অনেকটা অংশ পরিষ্কারভাবে দেখতে পেলাম। এমনকি একটু আগে সিএনজিতে করে আমরা যে জিলাপি পাহাড়ে উঠেছি ওটাও একদম কাছেই মনে হলো। হয়তো ওটা এই পাহাড়েরই একটা অংশ।

কীভাবে যাবেন:

বাটালি হিল যেতে হলে আগে আপনাকে চট্টগ্রাম যেতে হবে। চট্টগ্রামে যেতে পারেন বাসে অথবা ট্রেনে। চট্টগ্রাম থেকে অটোরিকশায় কিংবা ব্যক্তিগত গাড়িতে করে বাটালি হিল যেতে পারেন।

বাটালি হিলের কাছেই হাইওয়ে সুইটস। খেতে খেতে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে পারেন। কারণ চট্টগ্রামে একদিনে ঘোরাঘুরির কেবল প্রথম অংশ শেষ হলো।

ফিচার ইমেজ: মাদিহা মৌ

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এক নজরে দেশের ৬৪ জেলার দর্শনীয় স্থান: ঢাকা, সিলেট, খুলনা ও বরিশাল বিভাগ

লাওস ভ্রমণ: খুঁজে-ফিরে দেখা ‘প্লেইন অফ জারস’