প্রেয়সীর কাছে একটি খোলা চিঠি

প্রথম যেদিন তোমাকে দেখে ছিলাম দূর থেকে, সবুজ শাড়িতে, নীল সাজে আর সাদা ঝিকঝিকে হাসিতে। উহ, তুমি জানো না প্রথম দেখাতেই কতটা মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম আমি তোমাতে। তারপর ধীরে ধীরে এগোতে থাকলাম তোমার কাছে, এঁকেবেঁকে, কিছুটা ভয়, শঙ্কা আর দুরুদুরু বুকে, নিজের অজান্তেই দু-চোখের কোণে সুখের অশ্রু জমেছিল দু-ফোঁটা, ভীষণ আনন্দের আর অসীম উচ্ছ্বাসের।

আড়াল থেকে তাকে দেখা! ছবিঃ লেখক

এরপর যখন তোমার আরও কাছে এলাম, বেশ অনেকটা কাছে, প্রায় হাত ছোঁয়া দূরত্বে, তুমি লাজুক হেসেছিলে ঘোমটার আড়াল থেকে মুখ বের করে, ক্ষীণ সময়ের জন্য। আর পরোক্ষণেই আবার ঢেকে ফেলেছিলে নিজেকে ধূসর ঘোমটার আড়ালে। তবে সেই ক্ষণিকের দেখাতেই হারিয়ে ফেলেছিলাম নিজেকে তোমার মাঝে, অনন্তকালের জন্য। সেদিন আর দেখা পাইনি তোমার সেভাবে, তবে খুঁজেছিলাম অনেক অনেক, চোখ পিটপিট করে, এখানে-সেখানে, চুপিচুপি।
চুপিচুপি তাকে দেখা! ছবিঃ লেখক

দেখা পেয়েছিলাম পরদিন আবার খুব খুব ভোরে। সেজেছিলে কী দারুণ সাজে, হয়েছিলে একেবারের রঙিন ঝলমলে, কোনো রঙের কমতি ছিল না তোমাতে। আমি শুধু অপলক তাকিয়েই ছিলাম তোমার রূপের পানে। বাকরুদ্ধ ছিলাম কিছুক্ষণ, চোখ ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল তোমার রূপের ঝলকে। নিজেকে হারিয়ে আবার খুঁজে ফিরেছিলাম বারে-বারে। আহা, কী ছিল সেই সকালটা। আমার জীবনের অন্যতম সুন্দর আর সার্থক একটি সকাল ছিল সেটি।
তার অপরূপ সাজ! ছবিঃ লেখক

এরপর আরও কাছে গিয়েছিলাম তোমার, দেখেছিলাম তোমাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। খুব আপন করে আর কাছ থেকে। দেখেছিলাম তোমার গালে দিয়েছিলে ব্লাশারের নরম স্পর্শ, গাল দুটোকে রাঙিয়েছিলে হালকা গোলাপি-বেগুনী আর হলুদাভ আভায়! কপালের সাদা-কালো তিল দিয়েই বানিয়েছিলে টিপ! আর দুই গালের দুই তিল তো মাধুর্য বাড়িয়েছিল তোমার আরও বহুগুণ! আমি উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলাম তোমার মাঝে।
হারানোর ক্ষণ তার গহীনে! ছবিঃ লেখক

এরপর ফিরে গিয়েছিলাম নিজ লোকালয়ে। তবে কখনোই ভুলে যেতে পারিনি তোমাকে, মুছে ফেলতে পারিনি তোমার সেই চাহুনি, লাজুক অভিব্যক্তি, ঘোমটায় ঢাকা মিষ্টি মুখখানি, বর্ণিল সাজ, ঝকঝকে হাসি, মায়াবী তিল, আরও যে কত কী?
এরপরও বহুবার এসেছি জানো, তোমার খুব-খুব কাছে, আশেপাশে কিন্তু ঠিক তোমার কাছে নয়, সাহস করে উঠতে পারিনি তোমার কাছে যাবার, একটু চোখে চোখ রাখার, পাশে বসার, গল্প করার, আলতো করে ছুঁয়ে তোমার স্পর্শ নেবার। পারিনি আমি ইচ্ছে ছিল যদিও খুব, ছিল আকাঙ্ক্ষাও, ছিল আকুল আবেগ আর অসীম চাওয়া, তবুও পারিনি নিজেকে নিয়ে যেতে, ভয়ে-শঙ্কায়-অস্থিরতায় পাছে হারিয়ে ফেলি নিজেকে, তোমার মাঝে! যদি ফিরে যেতে না পারি নিজের আবাসে, তাই খুব কষ্ট করে হলেও নিজেকে সামলে রেখেছিলাম এতগুলো দিন-রাত, মাস আর বছর!
বর্ণীল প্রেয়সী! ছবিঃ লেখক

কিন্তু এবার? এবারও ইচ্ছা ছিল তোমার কাছাকাছি যাবার, তোমার স্পর্শ পাবার, তোমাকে ছোঁয়ার, তোমার কাছে গিয়ে একটুক্ষণ থেকেই ফিরে যাবার! ভেবেছিলাম এরপর যখন তোমার কাছে যাবো, অনেকটা সময় নিয়ে যাবো। তুমি-আমি হাঁটবো পাশাপাশি, ছুঁয়ে-ছুঁয়ে একে অন্যকে। তুমি-আমি দেখবো দুজন-দুজনকে দু-চোখ ভোরে, দেখে-দেখে তৃষ্ণা মেটাবো তোমাকে দেখার। কিন্তু তবুও যেতেই হলো, একেবারেই নিরুপায় হয়ে, খুবই অল্প সময়ের জন্য। আর তাই মন কাঁদছিল এই গানের মতো করে।
অশ্রু ভেজা সে! ছবিঃ লেখক

“একটু চাওয়া আর একটু পাওয়া,

কাছে এসে চলে যাওয়া,

আর তো ভালো লাগে না।”

কিন্তু এবার আমি যেতেই তুমি মন খারাপ করে রইলে খুব। একেবারে গুমোট হয়ে রইলে পুরোটা বিকেল-সন্ধ্যা-রাত। দুই-একবার অশ্রুও ঝরিয়েছিলে তুমি ঢেকে তোমার দু’হাত। আমি দেখেছি, আমি বুঝেছি, আমি অনুভব করেছি, তোমার সেই ব্যথা। বাঁধা দেইনি কোনো, মন খারাপ করিনি এতটুকু, কাঁদতে দিয়েছি তোমায়, তোমার মতো করে। হালকা হতে দিয়েছি তোমায়, কাঁদার সুযোগ করে দিয়ে। আর আমিও পাথর বেঁধেছিলাম বুকে, তোমাকে বুঝতে না দিয়ে। তুমি জানো না।

তাকে ছেড়ে ফিরে যাবার বেলায়! ছবিঃ লেখক

তবুও তুমি বেঁধেছিলে আমায়, তোমার পরম আলিঙ্গনে, দিয়েছিলে উষ্ণ আদর, ছুঁয়ে ছিলে হৃদয়ের গহীনের কোণ, একান্ত আদর, পরম মমতা আর নিখাদ ভালোবাসা দিয়ে। আমায় নিয়ে গিয়েছিলে তোমার প্রিয় জায়গায়, যেখানে সবাই যেতে চায়, যেখানে এর আগে আমার যাওয়া হয়নি তোমার সাথে। তুমি হাতে রেখেছিলে হাত, রেখেছিলে আমার কাঁধে তোমার কাঁধ, বেঁধেছিলে বুকে তোমার অবিচ্ছেদ আবেগে।
আর পরদিন যখন ফিরে যাবো তোমার কাছ থেকে, দেখেছি তোমার অবিরত অশ্রু ঝরা কপোল, দু-চোখের অশ্রুতে ভেসে যাওয়া সাজ, আছড়ে পড়েছিলে আমার বুকে ভেঙে দিয়ে সব লাজ। আমি শক্ত পাথর হয়ে গিয়েছিলাম, তোমাকে ছেড়ে আসার অসহ্য বেদনায়। তুমি জানো না।
অশ্রু শিক্ত বিদায় বেলা! ছবিঃ লেখক

এই জীবনে কেউ যদি জানতে চায়, সময়-সুযোগ পেলেই কার কাছে যেতে চাও? আমি বলি, আমি তোমার কাছে যেতে চাই, শুধু তোমার কাছেই গিয়ে নিজের একান্ত সময়গুলোকে তোমার সাথে কাটাতে চাই, প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করতে চাই, তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে থেকে অপলক দৃষ্টিতে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চাই, তোমার মাঝে।
তুমি আমার এতটা আপন, এতটা কাছের-আবেগের আর ভালোবাসার তুমি জানো না।
তুমি আমার আমৃত্যু প্রেয়সী।
প্রেয়সী দার্জিলিং।
তার একান্ত সাঁজ। ছবিঃ লেখক

প্রেয়সী এই দার্জিলিং যাবার সবচেয়ে সহজ উপায় ঢাকা থেকে পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা হয়ে ফুলবাড়ি সীমান্ত দিয়ে শিলিগুড়ি। শিলিগুড়ি দিয়ে শেয়ার বা রিজার্ভ জীপে করে সহজেই পৌঁছে যেতে পারবেন দার্জিলিং রুপী অপরূপ প্রেয়সীর কাছে। যদি ৪/৬/৮ জনের গ্রুপ করে যান, তবে যাওয়া-আসা, থাকা-খাওয়াসহ সবকিছু মিলে জনপ্রতি খরচ হবে ১০০ ডলারের চেয়েও কম! সুতরাং একবার তাহলে এমন অপরূপার কাছে যাওয়া যেতেই পারে। কী বলেন?
ফিচার ইমেজ- লেখক

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সফেদ সমুদ্রের নীলিমা রিসোর্টে দুটি দিন

জমিদার আনন্দ কিশোরের বাসভবন ও দুর্গামন্দির