কুয়েট: রুপসৌন্দর্যে অনন্য এক বিশ্ববিদ্যালয়ের গল্প

বিশ্ববিদ্যালয় শব্দটা শুনলেই কল্পনায় ভেসে আসে একটা খাতা আর একটা কলম নিয়ে হেলেদুলে ক্লাসে চলে যাওয়া, চায়ের দোকানে দিন-রাত আড্ডা দেয়া আর পুরো ক্যাম্পাস ঘুরে বেড়ানো। আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে আছি তারা জানি যে উপরের অংশটুকু আংশিক কাল্পনিক, কেবল সিনেমাতেই তা শতভাগ সত্য। তবে তাই বলে বিশ্ববিদ্যালয় মানেই শুধু যে পড়াশোনা তা নয়, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনটাই আসলে অন্যরকম। চার বছরের সে জীবনে যারা আসেনি আর যারা পার করে গেছে উভয়ই সমানভাবে পেতে চায় এই জীবনকে। বাংলাদেশে বর্তমানে ৩৮টি অনন্য সুন্দর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে যার মধ্যে মাত্র চারটি আছে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। সৌন্দর্যে ভরপুর সেই চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নিয়ে গল্প করবো আজ, বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। সংক্ষেপে কুয়েট।

কুয়েট ক্যাম্পাস, ছবিঃ নিলয় শংকর সাহা

বাংলাদেশের অন্যতম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় কুয়েট। ১৯৬৭ সালে তৎকালীন পাকিস্তান আমলে স্থাপিত হওয়া এই বিশ্ববিদ্যালয়ের তখনকার নাম ছিল খুলনা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। ১৯৭৪ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে বিআইটি, খুলনা রাখা হয়। ততদিনে অনেক বছর পার হয়ে গিয়েছে। অবশেষে ২০০৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর খুলনা, রাজশাহী এবং চট্টগ্রামের তিনটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে একযোগে কুয়েট, রুয়েট, চুয়েট নামকরণ করা হয়। সেই থেকেই আধুনিক কুয়েটের পথচলা শুরু যার গোড়াপত্তন বহু প্রাচীন।
বৃষ্টিস্নাত কুয়েট, ছবিঃ নিলয় শংকর সাহা

খুলনা মূল শহর থেকে যশোর রোডে পা বাড়ালে প্রায় ১৪ কিলোমিটার পরে ফুলবাড়িতে দেখা যাবে কুয়েটের প্রথম বিশাল বিলবোর্ড। ফুলবাড়ি গেট থেকে হাতের বামে চলে যাওয়া রাস্তা ধরে এগোলেই দেখা মিলবে কুয়েটের। জনমতে জানা যায়, প্রথম দেখায় কুয়েটের বিশাল মূল ফটক দেখেই প্রেমে পড়ে যায় বেশিরভাগ লোক। প্রকৌশল জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে দৃষ্টিনন্দন স্থাপনার স্বাক্ষর কুয়েটে প্রবেশকালেই চোখে পড়বে।
কুয়েট মূল ফটক, ছবিঃ আল মাজেদুর রহমান প্রিন্স

মূল ফটক দিয়ে ঢুকতেই আরেকটু অবাক হওয়া লাগতে পারে। রাস্তার বাম পাশে ছোট টিলা-পাহাড়ের উপর বড় সাদা “KUET” লেখাটি দেখে যুক্তরাষ্ট্রের পাহাড়ের উপর হলিউড লেখাটি মনে পড়ে গেলে খুব একটা দোষ দেব না। কুয়েটে প্রবেশকালেই বুঝে যাবেন বেশ সুন্দর একটা ক্যাম্পাসে ঢুকছেন আপনি।
হলিউডের মতো কুয়েট লেখা, ছবিঃ নিলয় শংকর সাহা

কুয়েটের এই মূল রাস্তাটি সারা কুয়েট জুড়েই ছড়িয়ে আছে। রাস্তা ধরে আরেকটু সামনে এগোলেই হাতের ডান পাশে চোখে পড়বে একদম নতুন বিশাল এক শহীদ মিনার যা বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহীদ মিনার। শহীদ মিনারটি এ বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন করা হয়। প্রচুর সিঁড়ি আর বিশাল জায়গা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত এই শহীদ মিনারের ঠিক পেছনেই একটি কৃত্রিম হ্রদ রয়েছে। শহীদ মিনারটি এমনভাবে করা হয়েছে যাতে হ্রদের পানিতে এর পূর্ণ প্রতিফলন দেখা যায়। হ্রদের পাশ দিয়ে ইটের তৈরী রাস্তাও করা আছে, চাইলে হ্রদের পাশে হেঁটেই কাটাতে পারেন কোনো এক অলস বিকেল।
কুয়েট শহীদ মিনার, ছবিঃ নিলয় শংকর সাহা

শহীদ মিনারের ঠিক বিপরীত পাশে রয়েছে কুয়েটের অন্যতম পুরনো ছাত্র হল “খান জাহান আলী হল”। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঢুকতে সবার প্রথমে এই হলেরই দেখা মিলবে। হলের পেছনেই রয়েছে সুবিশাল পুকুর যার স্থানীয় নাম “খাজার পুকুর”। রৌদ্রের দাবদাহে জীবন যখন অতিষ্ঠপ্রায় তখন এই খাজার পুকুরই হয় এখানকার ছাত্রদের একমাত্র ঠিকানা। খাজার পুকুরের ঠিক বিপরীত পাশেই রয়েছে কুয়েট কেন্দ্রীয় মাঠ। বেশ বড়সড় এই মাঠের এক কোণায় বসে থাকলে সাধারণত যেকেউ না খেয়াল করেই চলে যাবে। ক্যাম্পাসের ছোট-বড় সকল খেলার মূল ভেন্যু হওয়ার পাশাপাশি এই কেন্দ্রীয় মাঠ ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে আড্ডা দেওয়ার উত্তম জায়গাও বটে।
কুয়েট কেন্দ্রীয় মাঠ, ছবিঃ নিলয় শংকর সাহা

মাঠ থেকে একটু মূল ক্যাম্পাসের দিকে পা বাড়ালে দেখা যাবে নতুন আরেকটি স্থাপনা, কুয়েট স্টুডেন্টস ওয়েলফেয়ার সেন্টার। সংক্ষেপে এসডব্লিউসি। এই এসডব্লিউসিতে দেখার মতো বিশাল ভাষা আন্দোলনের দেয়ালিকা আছে যার পুরোটাই পোড়ামাটির তৈরী। বিশাল এই দেয়ালিকায় চোখ বুলালে অনায়াসেই মনে পড়ে যাবে ৫২’র কথা। আধুনিক এই ভবনে সবার প্রবেশাধিকার না থাকলেও এর ঠিক পেছনে রয়েছে মুক্তমঞ্চ যেখানে বড়সড় একটি মঞ্চ বানানো আছে। কুয়েটের ইদানীং সব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এই মঞ্চ কেঁপে উঠেছে বারবার। এই ভবনের ভেতর আছে বাংলাদেশের সবচেয়ে নবীন বিশ্ববিদ্যালয় সুইমিংপুল যার উদ্বোধন এখনো হয়নি।
কুয়েট এসডব্লিউসি, ছবিঃ নিলয় শংকর সাহা

এসডব্লিউসি থেকে বের হলেই সামনে পড়বে সংস্কার চলমান কুয়েট অডিটোরিয়ামের। ধারণা করা হচ্ছে বাংলাদেশের অন্যতম আধুনিক অডিটোরিয়াম হবে এটি। অডিটোরিয়াম থেকে দুই কদম হাঁটলেই দেখা মিলবে কুয়েটের ঠিক কেন্দ্রে অবস্থিত অনিন্দ্যসুন্দর এক ভাস্কর্যের যার নাম “দুর্বার বাংলা”। বিকেল বেলায় ক্যাম্পাসে ঘুরতে আসা মানুষজন এই দুর্বার বাংলাকে খুব পছন্দ করে, এর নিচে গোল করে সাজিয়ে রাখা পাথরে বসে আড্ডা দেয়ায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
দুর্বার বাংলা, ছবিঃ নিলয় শংকর সাহা

কুয়েটের কেন্দ্রীয় একাডেমিক ভবনের ছাদ থেকে পুরো কুয়েট দেখায় অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করে। এই একাডেমিক ভবনের পাশেই বিজ্ঞান ভবনের ঠিক সামনে রয়েছে কুয়েটের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা “পদ্ম পুকুর”। চারপাশে সবুজ গাছ, মাঝখানে একটু লাল ইটের রাস্তা আর একপাশে সবুজ ছোট মাঠ আরেক পাশে পুকুরের টলটলে জলে ভাসতে থাকা পদ্মফুল যে কারো মন কেড়ে নিতে সক্ষম। পদ্ম পুকুরের এই পুরো এলাকাটির সৌন্দর্যই অন্যরকম, বসে থাকলে বসেই থাকতে ইচ্ছে হবে প্রচুর।
পদ্মপুকুর, ছবিঃ নিলয় শংকর সাহা

পদ্মপুকুর থেকে বের হয়ে যন্ত্রকৌশল বিভাগের সামনে যাওয়ার পথে যদি রাস্তায় চোখ বুলান তবে চোখে পড়বে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ত্রিমাত্রিক আলপনা যা এখানকার শিক্ষার্থীদেরই তৈরী।
কুয়েটের ত্রিমাত্রিক আলপনা, ছবিঃ মারুফ হোসেন

বিশাল এই আলপনাগুলো বেশি চোখে পড়বে বিশ্ববিদ্যালয় দিবস ১ সেপ্টেম্বর ঘনিয়ে এলে এবং কুয়েটের ভর্তি পরীক্ষার সময়। জানামতে কেবলমাত্র এখানকার শিক্ষার্থীরাই ভর্তি পরীক্ষার্থীদের স্বাগতম জানায় আলপনা আঁকার মাধ্যমে অন্য এক আমেজে।
চলছে আলপনার কাজ, ছবিঃ নিলয় শংকর সাহা

যন্ত্রকৌশল বিভাগের সামনের রাস্তা ধরে কুয়েটের আরো ভেতরে ঢুকে গেলে চারদিকের বিশাল সব সবুজ গাছপালা আর একদম পরিচ্ছন্ন রাস্তা আপনাকে মুগ্ধ করবে কোনো প্রশ্ন ব্যাতিরেকে।
সবুজ কুয়েট, ছবিঃ নিলয় শংকর সাহা

কুয়েট ক্যাম্পাসের আয়তন খুব বেশি নয়, মাত্র ১০১ এককের এই ক্যাম্পাসে মোট বিভাগ সংখ্যা ১৪টি, মোট হল সংখ্যা ৭টি। প্রতি হলের সামনেই আছে হলের নিজস্ব খাবার দোকান বা ক্যান্টিন। তাই ঘুরতে আসা কাউকে খাবারের জন্য ক্যাম্পাসের বাইরে যেতে হয় না। ক্যাম্পাসের মসজিদটিও যথেষ্ট সুন্দর। ভোরবেলায় এই পবিত্র স্থানের সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। গম্বুজের ফাঁক গলে যখন সূর্য উকি দেয় তখন সৃষ্টি হয় অপার্থিব এক মুহূর্তের।
কুয়েট কেন্দ্রীয় মসজিদের ভোর, ছবিঃ আল মাজেদুর রহমান প্রিন্স

রাতের বেলায় এখানকার শিক্ষার্থীদের মূল আড্ডাখানা ক্যাম্পাসের একদম সাথেই অবস্থিত পকেটগেট। প্রাক্তন, বর্তমান সকল কুয়েটিয়ানেরই প্রাণকেন্দ্র এই পকেটগেট। টং দোকানের চা থেকে যে আড্ডার ঝড় ওঠে সেটি শেষ হয় এখানকার ভাতের হোটেলের কোনো টেবিলে। এখানকার খাবার-দাবারও বেশ সস্তা। ৫০-৬০ টাকার মধ্যে বেশ ভালোভাবে দুপুরের খাবার খেয়ে নেয়া যায়।
পকেট গেট, ছবিঃ নিলয় শংকর সাহা

বাংলাদেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে গুণগত মানে তো বটেই, সৌন্দর্যের দিক দিয়েও বেশ নামডাক আছে কুয়েটের। তবে কুয়েটের আসল সৌন্দর্য দিনে নয়, রাতে। কুয়েটে একরাত থেকেছেন অথচ রাতের কুয়েটের প্রেমে পড়েননি এমন মানুষ পাওয়া সত্যি সত্যি খুব মুশকিল। দিনের কুয়েট যেমন রাতের কুয়েট তার থেকে অনেক আলাদা এবং অনেক বেশি সুন্দর। চারদিকে রঙবেরঙের আলোকসজ্জা আর পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতায় অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা পাওয়া যাবে রাতের কুয়েট ঘুরতে বের হলে।
রাতের নিস্তব্ধ কুয়েট, ছবিঃ আল মাজেদুর রহমান প্রিন্স

বাংলাদেশের অন্যতম পরিষ্কার ক্যাম্পাস কুয়েট ক্যাম্পাসের আরেক নাম গ্রিন ক্যাম্পাস, এই নামের কারণ এর চোখ জুড়ানো সবুজতা। পুরো ক্যাম্পাসকে প্রতিনিয়ত পরিষ্কার রাখতে এখানে প্রতিদিন কাজ করে ২০ জনেরও অধিক পরিচ্ছন্নতা কর্মী। কুয়েটে ঘুরতে আসা যায় কোনো চিন্তা ছাড়াই, খুলনা শহর থেকে মাত্র ২৫ টাকা অটো ভাড়া। তবে আসল সৌন্দর্যের সন্ধান পেতে চাইলে রাতেও থাকতে হবে কুয়েটে। তাই আসার আগে পরিচিত কোনো শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলে নিলে সে-ই করে দেবে থাকার ব্যবস্থা। ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যের মতোই এখানকার শিক্ষার্থীদের আতিথেয়তার কোনো কমতি নেই। ভ্রমণ হোক সুন্দর ও প্রাঞ্জল।
ফিচার ইমেজ- আল মাজেদুর রহমান প্রিন্স

Loading...

One Comment

Leave a Reply
  1. যে মানুষটির জন্য আজ কুয়েটের এই অবস্থা লেখনিতে তার নাম থাকাটা দরকার ছিল। মাত্র ৯ বছর আগে কুয়েট এমন ছিলনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শহরের প্রাণকেন্দ্রে বই পড়া ও আড্ডা দেওয়ার মনোরম স্থান ‘বেঙ্গল বই’

জমিদারদের ব্যবহৃত নান্দনিক স্মৃতিচিহ্নে অনন্য ময়মনসিংহ জাদুঘর