প্রাচীনতম জনপদ নারায়নগঞ্জের আনাচে কানাচে একটি দিন

অন্যবাড়ির ছাদ থেকে। সোর্স: রিসাত

কোথাও বেড়াতে যাবার ব্যাপারে সবসময় সবচেয়ে বেশি উৎসাহ থাকে – আমার। ট্যুরে যাওয়ার জন্য সার্কেলের প্রত্যেককে আলাদা আলাদা করে ইনবক্সে বলি, যেন অবশ্যই যায়। সবচেয়ে বেশি লাফাই এবং যারা বেশি লাফায় তারাই শেষ পর্যন্ত যায় না – এই তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করে প্রতিবারই চাঁদপুর থেকে দৌড়ে ঢাকায় চলে আসি।

এবারের ট্যুরটার প্ল্যানিংও ছিল আমার। এই সেই কারণে এতবার এটা পিছিয়েছে যে শেষ পর্যন্ত মনে হচ্ছিল, এটা কি আদৌ হবে? আমার ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে হলো। এবং খুব ভালোভাবেই হলো। ঢাকা থেকে মুগড়া পাড়া বাস স্ট্যান্ড গেলাম। ওখান থেকে অটোতে করে প্রথমেই গেলাম পানাম নগর।

পানাম নগর

প্রাচীনকালের সমৃদ্ধ নগর সুবর্ণগ্রাম। পরে এর নাম হয় সোনারগাঁও। সোনারগাঁওয়ে সবচেয়ে সমৃদ্ধ এলাকা পানাম নগর। আমি ঠিক করেছিলাম, নগরের মধ্যকার আরেক নগরে অবস্থিত ৫২টা ভবনের প্রত্যেকটার ছবি তুলবো। কারণ পানাম নগর লিখে নেটে সার্চ করলে একটা ছবিই সবচেয়ে বেশি আসে, যেটায় রাস্তা আর তার দুইধারের দালানগুলোর ছবি দেখা যায়। ডিটেইলে দেখার উপায় নেই। তাই এরকম ইচ্ছে ছিল।
পরে জ্যাক ভাই বলল, সবগুলো ভবনের ছবি তুলতে পারবি না। কারণ সবগুলো পুরোপুরি অক্ষত নেই।

পানাম নগর; সোর্স: রিসাত

একটা বাড়ির তিনতলায় বহু কষ্ট করে উঠেছিলাম। সিঁড়িগুলো খুবই সংকীর্ণ আর ক্ষয়ে যাওয়া বলে খুব সাবধানে উঠতে হয়েছে। সবাই মিলে গ্রুপ ছবি তুলবো বলে একজন একজন করে ছাদে উঠেছিলাম। মিনিট পাঁচেক পর নিচ থেকে সিকিউরিটি গার্ড আমাদের তিন তলায় দেখে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দিলো। এত লোক উঠলে নাকি এটা ভেঙে পড়বে। আমরা চাইনি এটা ভেঙে পড়ুক। তাই চট জলদি নেমে পড়েছি।

কেবল রাস্তার দুই ধারের বাড়িগুলো দেখেই আমরা সন্তুষ্ট হইনি। আমরা চেয়েছিলাম সমস্ত জায়গাটা ভালো করে দেখতে। স্থাপত্যগুলোর পিছন দিকটায় গিয়ে দেখি চমৎকার বাতাসে জলাশয়ের ওপারে কাশফুলগুলো দুলছে। আবার পরগাছায় ছেয়ে থাকা দেয়াল, সিঁড়িতেও যেন আশ্চর্য সৌন্দর্য ঠিকরে পড়ছিল। ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করছিলাম।

শৈল্পিক আলপনা। সোর্স: রিসাত

প্রাচীনত্ব, এ যেন মায়ারই অন্যরূপ। কেন যেন এরকম জায়গায় এলে মনটা কেমন করে। বাড়িগুলোর নির্মাণকাজ দেখলে আপনা থেকেই আগেকার কারিগরদের প্রতি শ্রদ্ধা জাগে। এত নিখুঁত এত সুন্দর কারুকাজ সেই সময়ে … কী চমৎকার আর্ট! খুব জানতে ইচ্ছে করে এই প্রাচীন নগরীর মানুষগুলো কীভাবে জীবনযাপন করতো। জানতে ইচ্ছে করে পানাম নগরীর এতগুলো বাড়িতে বসবাসরত মানুষগুলো একসাথে কোথায় চলে গেল? কেন চলে গেল? ব্যবসা পড়ে গেলে সবাই কেন চলে যাবে? কেউ না কেউ তো থেকে যাবার কথা। সেটা হয়তো আর কখনোই জানা যাবে না।

আফসোস থেকে যাবে দিনের পর দিন, শতাব্দীর পর শতাব্দী।

সোনাকান্দা দুর্গ

পানাম ঘুরে সাড়ে বারোটার মধ্যে নবিগঞ্জ গিয়ে দেখা হলো নারায়নগঞ্জেরই ছেলে হিমেলের সাথে। সেখান থেকে অটোয় সোনাকান্দা দুর্গ। সোনাকান্দা দুর্গ শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব তীরে নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দরে অবস্থিত একটি মোঘল জলদুর্গ।

সারা সকাল মেঘলা আবহাওয়া থাকলেও সোনাকান্দায় এসে পৌঁছাতে পৌঁছাতে গনগনে রোদ আমাদের ঝলসে দিতে শুরু করলো। আমরা তাই তড়িঘড়ি করে জলদুর্গের ছায়ায় আশ্রয় নিলাম। এখানে বসে কোমল পানীয় দিয়ে গলা ভিজিয়ে আড্ডা দিলাম কিছুক্ষণ। হেনুর আম্মিকে কল করে লাইভ রবীন্দ্র সংগীত শুনলাম।

সোনাকান্দা দুর্গ; সোর্স: গুগল

এখান থেকে বেরিয়ে জাকির ভাই হিমেলকে নিয়ে যে হাঁটতে শুরু করলেন, পিছনে আর ফিরে তাকালেন না। আমরাও ছোট ছোট দল বেঁধে তাদের দুইজনকে অনুসরণ করে গেলাম।

ওমা! হাঁটছি তো হাঁটছিই! হাঁটার কোনো শেষ নেই যেন! ওদিকে পা টনটন করছে।
এম্নিতে আমি অনেক হাঁটতে পারি, কোনো সমস্যা ছাড়াই। কিন্তু হাই হিলস পরে এতদূর হাঁটা যায় নাকি? তারস্বরে চেঁচিয়ে জাকির ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করলাম, যাচ্ছিটা কোথায়?
প্রশ্নবিদ্ধ হবার ভয়েই হয়তো ভাইয়া একটু দাঁড়ালেনও না।

অবশেষে গন্তব্য এলো। স্পেশাল চা খাবার জন্য একটা দোকানে এলাম। টংয়ের দোকানের একটু ভালো ভার্সন ওটা। চা খেতে খেতে একটু আড্ডাবাজি। চায়ের দোকান ছেড়ে যাওয়ার আগে দেখি খুব চমৎকার একটা সাদা ইঁদুর খাঁচায় বসে আছে।

নবীগঞ্জে লাঞ্চ করতে একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকলাম। ঢুকেই দেখি, টিভিতে খেলা শুরু হয়ে গেছে। চটজলদি আমি আর মুন্নু খেতে খেতে খেলা দেখার মতো সুবিধাজনক জায়গায় বসে পড়লাম। বাকিরা আমাদের এই সিট দখল করতে না পারার কারণে একটু আফসোস করলো। ওই খাবার হোটেলে কাচ্চি ছাড়া আর কোনো খাবার নেই। তাই-ই অর্ডার করা হলো। আমি আমার লাইফে এত্ত বাজে কাচ্চি খাইনি! তবুও খেলা দেখতে দেখতে কোনো রকমে গলাধঃকরণ করে বেরিয়ে এলাম।

কদম রসূল দরগা

আবার অটো। অটোয় করে কদম রসূল দরগা। জুতা খুলে যেতে হবে। তাও আবার পাহারাদার আছে, তার কাছে জমা রেখে যেতে হবে। স্বর্ণমন্দিরেও একই ব্যাপার দেখেছিলাম বান্দরবান গিয়ে। কী করার আছে? জুতা চুরি হয়ে যাওয়ার রিস্ক তো নেওয়া যাবে না।

কদম রসূল দরগা। সোর্স: icwow.blogspot.com

দরগার মোজাইক করা সিঁড়িগুলো সব রোদে তপ্ত হয়ে আছে। পা পেতে রাখা যায় না। তারপর আবার দেখলাম কয়েকজনের কবর আছে। একটা গাছে সূতা বেঁধে রাখা হয়েছে অনেক। সম্রাট শাহজাহানের আদেশে কদম রসুল দরগাহে মিলাদ মাহফিল ও গরিব ভোজ চালু করা হয়েছিল ১২ রবিউল আউয়াল, যা এখনো চলছে।

কদম রসূল দরগা থেকে বেরিয়ে জ্যাক ভাই আর হিমেল ভাইকে সামনে ফেলে আমরা একটু নদীর ধারে গেলাম। এই পাশ দিয়ে নৌ পারাপার হয় না।

হাজিগঞ্জ দুর্গ

ঘাটে গিয়ে শীতলক্ষ্যা পার হয়ে গেলাম হাজিগঞ্জ দুর্গ। নদীরঘাট থেকে হাঁটা দূরত্বে দুর্গটা। এটা দেখে হতাশ হলাম। কারণ এটা পুরোপুরি সোনাকান্দা দুর্গের মতোই। অল্প কিছু ছবি তুলে বেরিয়ে পড়লাম।

হিমেল বললো, এই জায়গাটা স্থানীয় মাদকাসক্তরা দখল করে রাখে। বেশিক্ষণ থাকা ঠিক হবে না।

বিবি মরিয়মের সমাধি

বিবি মরিয়মের মাজারে যাবার সময়ে আবারো দলছুট। আমি, জ্যাক ভাইয়া, কামরুল ভাইয়া, হিমেল ভাইয়া, শিহান আর মুন্না – এই কজন সামনে ছিলাম। বিবি মরিয়মের সমাধি ঘুরে, ছবি টবি তুলে বেরিয়ে পড়ার পর দলের বাকিদের দেখা পাওয়া গেল। ওদের বললাম, ভিতরে কিচ্ছু নাই দেখার মতো। সব জায়গায় দেরি করলে শাস্তি তো পেতে হবেই! ওদের সাথে ফাঁকিবাজি করে বাসস্ট্যান্ডে ফিরে আসার জন্য রিকশা ঠিক করলাম। ওখান থেকে মেট্রোতে গিয়ে বি আর টি সি করে ঢাকা।

হাজিগঞ্জ দুর্গ; সোর্স: Foujeya Yeasmin

বিদায় নেওয়ার আগে হিমেল ভাইয়া বলছিলো, শুক্রবার বলে অটোভাড়া নাকি বেশি নিয়েছে। নরমাল সময়ে তিন-চার ঘণ্টার জন্য অটো একবারে রিজার্ভ করে নিলে সস্তায় সেরে নেওয়া যায়। মজার ব্যাপার হলো, বাসে উঠে জাকির ভাইয়া সব খরচের হিসেব করে পেলেন, ঢাকা থেকে এসে নারায়নগঞ্জের পাঁচটি জায়গা ঘুরে মাথাপিছু খরচ পড়েছে মাত্র ২৮৩ টাকা!

কীভাবে যাবেন

ঢাকার যে কোনো স্থান থেকে আপনাকে প্রথমে যেতে হবে, গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ী বা কমলাপুর। গুলিস্তান বা যাত্রাবাড়ী থেকে নারায়ণগঞ্জ যেতে পারবেন এসি বা ননএসি বাসে। গুলিস্তানের বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ গেট অথবা একটু দক্ষিণে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারে ওঠার পথে বন্ধন, আনন্দ, উৎসব বাসের টিকেট কাউন্টার রয়েছে যাতে চড়ে ৪০ মিনিটেই সরাসরি চলে আসতে পারবেন নারায়ণগঞ্জ।

আর কমলাপুর থেকে যাবেন ট্রেনে, ভাড়া ২০ টাকার বেশি নয়। কম-বেশি ৪৫ মিনিটে পৌঁছে যাবেন ঢাকা থেকে ২২ কিলোমিটার দূরের নারায়ণগঞ্জে।

Feature Image : রিসাত

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

রূপমুহুরী ঝর্ণার সন্ধান পেতে ঘুরে আসুন আলিকদম

হর্নবিল ফেস্টিভ্যাল ও নাগাল্যান্ড প্রসঙ্গ