ভাসমান পেয়ারার হাট এবং গুঠিয়া মসজিদে একদিন

কী অদ্ভুত ব্যাপার, খালের জলে নাকি ভাসমান পেয়ারার বাজার! ভাবতেই অবাক লাগে। এই রকম কোনো বাজার হতে পারে তা আমার জানা ছিল না। পানির উপর আশ্চর্য এক হাট। এই হাটের অন্যতম পণ্য পেয়ারা। সারি সারি নৌকার ওপর সবুজ-হলুদ পেয়ারা। দূর থেকে এই দৃশ্য দেখে রীতিমত অবাক আমরা। খালের উপর আজব এক হাট।

ভাসমান পেয়ারার বাজার; ছবিঃ সাইমুন ইসলাম

কত টাকা খরচ করে বিদেশে আমরা এই রকম জলবাজার দেখতে যাই, কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না যে আমাদের দেশে এমন ভাসমান বাজার আছে। ভীমরুলির ভাসমান পেয়ারার বাজার দেখতে এইবার আমাদের বরিশাল যাত্রা।

বিকেল ৫টায় সদরঘাট থেকে লঞ্চে করে যাত্রা শুরু করি। একসাথে অনেক মানুষ থাকায় লঞ্চের কেবিনের বদলে ডেকে বসে যাই। তাই ডেকের একপাশ আমরা দখল করে রাখি। রাতের খাবার লঞ্চের রেস্টুরেন্টে খেয়ে নেই। রাতভর আড্ডা, গল্প আর হইহুল্লোড় করতে করতে ভোরবেলায় বরিশালে চলে আসি।

খুচরা ক্রেতা; ছবিঃ সাইমুন ইসলাম

লঞ্চ থেকে নেমেই নাস্তা সেরে স্বরূপকাঠির বাসে উঠি। রাস্তার দু’পাশ জুড়ে মাঠ আর মাঠ, সবুজ গাছপালা পেরিয়ে যাচ্ছি সামনের দিকে। বর্ষা মৌসুম হওয়ায় রাস্তার কোথাও কোথাও পানি উঠে আছে। গ্রামের এই নির্জনতা বড় আপন করে নিচ্ছে আমাদের। সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা গ্রাম আর গ্রামের সহজ-সরল মানুষ দেখতে দেখতে জীবনানন্দের কবিতা মনে পড়াটা খুব একটা  দোষের কিছু নয়।

ঘণ্টা দেড়েক পর স্বরূপকাঠি চলে আসি। দুপুরে আর খাবারের সুযোগ না থাকায় তখনই ইলিশ মাছের মুখরোচক তরকারি আর ভর্তা দিয়ে ভাত খেতে হয়। আগে থেকে স্বরূপকাঠি খেয়াঘাটে ট্রলারে রিজার্ভ করা ছিল। সেই ট্রলারে করে ভাসমান পেয়ারার বাজারে দিকে রওনা দেই।

ট্রলারে করে যাত্রা; ছবিঃ সাইমুন ইসলাম

কিছুক্ষণ পর স্বরূপকাঠি পার হয়ে চলে আসি মাহমুদকাঠি। এখানেও রয়েছে ভাসমান বাজার, তবে এখানে চারা গাছ বিক্রি হয়। সামনের দিকে যতই যাচ্ছি ততই চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে। সুপরি, আমড়া আর পেয়ারার বন চারপাশে। আরও সামনের দিকে এগোতেই খাল যেন সরু হয়ে আসছে। এখানে জোরে ট্রলার চালানো সম্ভব না। স্বরূপকাঠি, মাহমুদকাঠি- এরপর আদমকাঠি। তারপর আমরা পৌঁছে যাই ঝালকাঠি। আশেপাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে কখন যে আমরা আমাদের গন্তব্যে চলে আসি, বুঝতেই পারিনি।

ভাসমান বাজারের উদ্দেশ্যে; ছবিঃ সাইমুন ইসলাম

এটাই ভিমরুলি, ভাসমান পেয়ারার বাজার বা হাট। চারিদিকে শুধু নৌকা আর পেয়ারা। আশেপাশের গ্রাম থেকে সারি সারি নৌকা ও ডিঙি নাও বোঝাই করে পেয়ারা নিয়ে আসা হয় এই বাজারে। চলতি পথে আসার সময় দেখছি গাছ থেকে পেয়ারা পাড়ার দৃশ্য।
গাছ থেকে পেয়ারা পাড়ছে; ছবিঃ সাইমুন ইসলাম

বাংলাদেশে উৎপাদিত মোট পেয়ারার প্রায় ৮০ ভাগই উৎপাদিত হয় স্বরূপকাঠি/ঝালকাঠির বিভিন্ন গ্রামে। আটগর, কুরিয়ানা, ভিমরুলী, ডুমুরিয়া, বেতার সহ ইত্যাদি এলাকার প্রায় ২৪,০০০ একর জমিতে পেয়ারার চাষ হয়। আর এই পেয়ারা বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভাসমান বাজার।

সবচেয়ে বড় ভাসমান বাজার; ছবিঃ সাইমুন ইসলাম

প্রায় ঘণ্টা তিনেকের মত ভিমরুলি ভাসমান পেয়ারার বাজারে থাকি। সেখানে সবাই মিলে হালকা নাস্তা করে পেয়ারা কিনতে যাই। তখন স্থানীয় লোকদের সাথে কথা বলে জানতে পারি, সকালে পেয়ারার দাম বাড়তি থাকলেও বেলা বাড়ার সাথে সাথে দাম কমতে থাকে। আরও জানতে পারি, এই বাজারে শুধু পেয়ারা বিক্রি হয় তা কিন্তু নয়। চালতা, সবজি, আমড়াও বিক্রি হয়।

বাক্সবন্দী পেয়ারা; ছবিঃ সাইমুন ইসলাম

তবে অনেকে মনে করে থাকেন ঝালকাঠি/স্বরূপকাঠির খালগুলোতে শীতকালে পানি থাকে না। কিন্তু এই খালগুলো নদীর সাথে সম্পৃক্ত। জোয়ারভাটার কারণে পানি কিছুটা বাড়ে কমে, তবে শুকিয়ে যায় না। তাই সময় সুযোগ পেলে যে কেউ একদিনে ঘুরে আসাতে পারে জলের রাজ্যে।

ফেরার সময় ঘনিয়ে আসছে আর তখনই শুরু হলো ঝুম বৃষ্টি। কী আর করার, বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ট্রলারে উঠতে হলো।

বাসে করে আবার বরিশালে ফিরছি। ফেরার সময় পথিমধ্যে দেখা যাবে বায়তুল আমান জামে মসজিদ, যা বরিশালের এক অনন্য স্থাপনা।

গুঠিয়া মসজিদ; ছবিঃ তানভীর মাহমুদ কনক

বরিশাল মহানগরী থেকে ২২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে বানারীপাড়া সড়ক সংলগ্ন উজিরপুর উপজেলায় গুঠিয়া গ্রামে অবস্থান। এস সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু নামে একজন ভদ্রলোক সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত করেছেন দেশের অন্যতম স্থাপত্য শৈলীর এই নয়নাভিরাম স্থাপনা। আধুনিক ও চাকচিক্য সম্পূর্ণ বায়তুল আমান জামে মসজিদ ও ঈদগাহ কমপ্লেক্স দেখে চক্ষু ছানাবড়া অবস্থা আমার।

গুঠিয়া মসজিদ; ছবিঃ তানভীর মাহমুদ কনক

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। রাতের লঞ্চে ঢাকায় ফিরবো। তাই সময় স্বল্পতার কারণে একরকম বাধ্য হয়ে ফিরতে হয়।

যেভাবে যাবেন:

সদরঘাট থেকে প্রতিদিন বিকেল ৫টার পর বরিশালগামী লঞ্চ ছেড়ে যায়। লঞ্চের ডেকে গেলে ভাড়া ২০০ টাকা। চাইলে কেবিনও নিতে পারেন সেক্ষেত্রে আগে থেকে টিকিট কাটতে হবে। ইন্দুরহাট নামক ঘাটে নেমে যাবেন। এছাড়া ঢাকার গাবতলি থেকে বাসে করে যাওয়া যায় বানারীপাড়া পর্যন্ত। বরিশাল শহর থেকে মহেন্দ্র বা বাসে করে স্বরূপকাঠি। স্বরূপকাঠি খেয়াঘাট থেকে ট্রলার ভাড়া করবেন। ট্রলার ভাড়া ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা।

বিক্রয়য়ের জন্য নৌকা ভর্তি পেয়ারা; ছবিঃ সাইমুন ইসলাম

থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা:

শুধু স্বরূপকাঠির ভাসমান পেয়ারা বাজার এবং গুঠিয়া মসজিদ দেখতে গেলে থাকার দরকার হয় না। দিন গিয়ে দিনে ঘুরে আসা যায়।

বরিশালে লঞ্চ থেকে নেমেই নাস্তা করে নেওয়া ভালো। এরপর খাওয়ার তেমন সুযোগ পাওয়া যায় না। আর দুপুরের খাবার স্বরূপকাঠি খেয়াঘাট থেকে খেয়ে নিতে হবে। অল্পদামে ভাল খাবার পাওয়া যায়।

অবশ্যই মনে রাখবেন:

*যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা থেকে দূরে থাকবেন।

*খেয়াল রাখবেন আপনার অতি উচ্ছ্বাসে প্রকৃতির যেন কোনো ক্ষতি না হয়।

*সঙ্গে নেওয়া পলি প্যাকেটগুলো সঙ্গে নিয়ে ফিরুন।

ফিচার ইমেজ- সাইমুন ইসলাম

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বাগেরহাট ষাটগম্বুজ মসজিদ ভ্রমণ

খুলনার অন্যতম আকর্ষণ করমজল পর্যটন কেন্দ্র