দুইটি মগের আত্মকাহিনী

১২ দিনের লম্বা সফরে বেরিয়েছে দুই দম্পতি। ঘুরে বেড়াবে ভারতের কয়েকটি প্রদেশের নানা প্রান্তরে। কখনো জলে, কখনো স্থলে আর কখনো আকাশে। দেখবে পাহাড়, অরণ্য, ঐতিহাসিক স্থাপনা, সমুদ্র, মরুভুমি আর হিমালয়ের তুষার মোড়ান পাহাড় চূড়া। ছুটবে এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে। বৈচিত্রের যতটা স্বাদ নেয়া যায় নিতে চায় ওরা একই যাত্রায়। উপভোগ করতে চায় প্রাণ ভরে, খুশি হতে চায় মন ভরে, ফিরতে চায় অসীম আনন্দের স্মৃতি নিয়ে।

সবই ঠিক ছিল। ঘুরেছে যেভাবে ভেবেছে তার চেয়েও বেশি করে। দেখেছে, যা কিছু দেখতে চেয়েছে তারও চেয়ে অনেক বেশি, পেয়েছে যা কিছু পেতে চেয়েছে, তার চেয়ে ঢের বেশি। আনন্দে ভেসেছে, খুশিতে হেসেছে, মন-প্রাণ আবেগে উত্তাল হয়েছে আর সবকিছুর মাঝে শুধু দুটি মগ কিছু কিছু বিষাদ ছুঁইয়ে দিয়েছে! আনন্দের মাঝে বেদনা দিয়েছে, উচ্ছ্বাসের মাঝে কষ্ট দিয়েছে, সুখ স্মৃতির মাঝে একটু হতাশা দিয়ে গেছে!

বর্ণীল তৈজসপত্র। ছবিঃ লেখক

এমন লম্বা, সুখের, আয়েশের একটি ভ্রমণকে দুটি মগ কীভাবে কিছু কষ্ট, কিছু বেদনা, খানিকটা হতাশা, ক্ষণে ক্ষণে টেনশন অযথা বিড়ম্বনার মাঝে ফেলে দিতে পারে? হুম পারে তো। পারে না আবার! চলুন দেখি কীভাবে।

১২ দিনের দীর্ঘ ভ্রমণের সবে মাত্র শুরু। কলকাতা থেকে দিল্লী গিয়ে এক শীত সকালের হিম ঠাণ্ডায় কাক ডাকা ভোরে দুই পরিবারের চার দম্পতি উত্তরখণ্ডের শৈল শহর নৈনিতালের উদ্দেশ্যে গাড়িতে চেপে বসেছে। যেহেতু কাক ডাকা ভোরে যাত্রা শুরু করেছে, সেহেতু কারোই সকালের চা বা নাস্তা করা হয়নি। ভ্রমণ শুরুর ঘণ্টা খানেক পরে গাড়ির ড্রাইভারকে জানানো হলো ভালো প্রাকৃতিক পরিবেশ ও ভালো মানের সকালের নাস্তা পাওয়া যাবে এমন সম্মিলন দেখে কোথাও যেন গাড়ি থামানো হয়।

বেশ, ড্রাইভার তার সম্মতি জানিয়ে গাড়ি চালাতে শুরু করেছে। কুয়াশা ঘেরা উত্তর প্রদেশের চওড়া হাইওয়ে ধরে হু হু করে ছুটে চলেছে ওদের ছোট সুইফট কার। ঘন কুয়াশা আর গ্রামের ধান সেদ্ধ করা ধোঁয়ার বাঁধা পেরিয়ে সকালের সূর্য তার মিহি স্পর্শ দিয়ে যাচ্ছিল গাড়ির কাঁচের জানালা দিয়ে। খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠা, গাড়ির আপন ছন্দে ঢেউ খেলে, দোল দিতে দিতে ছুটে চলা আর শীত সকালের প্রথম সূর্যের আদরের পরশে একটা ঘুম ঘুম আবেশে তলিয়ে যাচ্ছিল সবাই-ই। এমনকি ড্রাইভার পর্যন্ত! হ্যাঁ তাই-ই।

ভ্রমণে ছোট্ট গাড়ি ও পথ। ছবিঃ লেখক

যেটা পিছনে বসা এক দম্পতির নজরে পড়ে গেল। কিছুক্ষণ ড্রাইভারকে নিরীক্ষণ করে তার ধারণার সত্যতা পেয়ে গেল। যে কারণে ড্রাইভারকে চেতনায় রাখতে একটু রাগানোর চেষ্টা করা হলো। ড্রাইভার সেটা বুঝতে পেরে কিছু বাদেই একটি ধাবা এসে যাওয়াতে সেখানে থামালো প্রাতঃরাশের জন্য। দুই পরিবারের চার দম্পতি ঘুমের জড়তা কাটিয়ে কোনোরকমে গাড়ি থেকে নেমে গেল।

বেশ নান্দনিক একটা ধাবা। শুরু থেকেই সবুজ আর রঙিনের একটা মোহময় ছড়াছড়ি। ধাবার দুইপাশে দুই একটি মনোহারি দোকান, একটি কসমেটিক্স, একটি আইসক্রিম আর একটি সিরামিকের দোকান তাদের বর্ণিল পসরা সাজিয়ে বসেছে। এসব দেখে দুই পরিবারের পুরুষ দুজন প্রমাদ গুনতে শুরু করেছে, পাছে কসমেটিক্সের দোকানে অন্য দুজনের নজর পড়ে যায়। কোনোরকমে সেই দোকান এড়িয়ে গিয়ে, বেশ ভালো মানের নাস্তা দিয়ে সকালের আহার শেষ করে গাড়িতে ওঠার পথ ধরেছে।

দুই কর্তা তাদের অর্ধাঙ্গিনীদের আবারো কসমেটিক্সের দোকান থেকে নজর এড়াতে একটু ভিন্ন পথে তাদেরকে নিয়ে যেতে চাইল। তারা গেলও। কিন্তু দুই কর্তার বিধি বাম। তারা কসমেটিক্সের দোকান এড়াতে পারলেও, দুই জনের চোখ থেকে নানা রঙে সেজে থাকা আর সূর্যের প্রথম আলো পড়ে আরও আকর্ষণীয় হয়ে থাকা রঙ বেরঙের সিরামিক পণ্যের দোকান থেকে তাদের নজর এড়াতে পারলেন না। সাদা সিরামিকের বাইরের চারদিকে নানা রকম ফুলের হালকা কাজ করা আর ভিতরে লাল, হলুদ, কমলা, নীল, সবুজ, বেগুনী, গোলাপি রঙের উপরে প্রথম সূর্যের আলো পড়ে এক একটা সিরামিক পণ্য যে দ্যুতি ছড়াতে শুরু করেছে, সেই সম্মোহন থেকে রক্ষা করার সাধ্য সেই সময় কারো ছিল না।

ধাবার আইসক্রিমের দোকান। ছবিঃ লেখক

তবুও দীর্ঘ পথ ভ্রমণের কথা মাথায় রেখেই কিনা কে জানে, দুই কর্তার দুই অর্ধাঙ্গিনী তাদের নিজেদের বাসার ডাইনিং টেবিলে চায়ের শোভা বর্ধন আর একটু আভিজাত্য বাড়াতেই হয়তো কয়েকটি রঙিন চায়ের কাপ আর বর্ণিল মগ কিনে ফেললেন নিজেদের কাছে রক্ষিত রুপি দিয়েই। সেগুলো খুব যত্নে প্যাকেট করে, ছোট্ট গাড়ির পিছনে জায়গা না থাকায় সামনের সিটের পায়ের কাছে রাখা হলো। যখনই সেখানে রাখা হলো একজন মন্তব্য করলো, ওগুলো যে অল্প দামে পেয়ে কিনে নিলে, শেষ অবদি বাসা পর্যন্ত পৌঁছাবে তো! স্বাভাবিকভাবেই অর্ধাঙ্গিনীর অর্ধেক ধমক খেয়ে চুপ মেরে রইলো।

এহ, মিনসে, নিজের তো কিনে আনার জো নেই, সংসারে কোনো খেয়াল নেই, আবার আমি কিনলে সেখানেও তোমার ফোঁড়ন কাটা বন্ধ কর। তাও যদি হতো, ওনার পয়সায় কেনা! তবেও না হয় দু কথা কইলেও শুনতাম। এত আমি নিজের পয়সায় কিনলাম, তবুও কেন তোমার গায়ে লাগছে হে! তোমাকে টানতে হবে না, যখন যেখানে লাগবে আমিই টানবো। চুপ করে বাইরে দেখ। ব্যস, মিনসে চুপ করে গেল।

সিরামিকের মগ আর কাপেরও কী ভাগ্য বুঝুন। পুরো ১২ দিনে গাড়ি, ট্রেন, বাস, প্লেন সব রকমের বাহনে চড়ে, উত্তর প্রদেশ, উত্তরখণ্ড, নৈনিতাল, ভিমতাল, আরও কত তাল, পথঘাট, মাঠ, আকাশ, নদী পেরিয়ে, আগ্রার তাজ, জয়পুরের প্রাসাদ, দিল্লির দুর্গ মাড়িয়ে, পুরো ভ্রমণে কত শত লাঞ্ছনা, গঞ্জনা উপহার দিয়ে (সব বললে খবর আছে!) কলকাতায় ফিরে হোটেলে ওঠার আগেই সুটকেসের হ্যান্ডেল থেকে সোজা পিচ ঢালা পথে গড়িয়ে পড়লো! আর তারপর যা হবার তাই হলো। সেই গল্পটুকু নাহয় না বলাই রইলো।

বাহারি আয়োজন। ছবিঃ লেখক

কিন্তু এত সাধের কাপ আর মগ, এত দূর থেকে কিনে আনা, হাজার হাজার মাইল পেরিয়ে ঘরের কাছে এনে ফেলে দিতে হবে! সেই জ্বালা কি সওয়া যাবে? সেই কষ্ট কি মেনে নেয়া যাবে? সেই দুঃখ কি ভোলা যাবে? সেই আক্ষেপে কি পোড়া যাবে?

নাহ, একদমই নয়। তাই সেগুলো সব ফেলে না দিয়ে, যেটার যতটা ব্যবহার করা যায় এমন দেখে ঘরে নিয়ে আসা হলো। কলকাতা থেকে ঘরে আসতে বাকি পথে, বাসের ওঠানামা, হ্যাঁচকা টান, হেলপারের অসতর্কতায় আরও যা যা হবার তাই হলো। অবশেষে দুই পরিবারের রঙিন কাপ আর বর্ণিল মগের মধ্য থেকে দুটি কোনো রকমে ঘরে এলো।

যাক তৃপ্তি এই যে, অবশেষে একদম ফেলে না দিয়ে কিছু হলেও তো আনতে পেরেছে। কিন্তু কিন্তু কিন্তু, সেই আনন্দও বেশি সময় রইলো না। কারণ ঘরে এসে, সেই প্রথম মগে হাত দিতেই একমাত্র মগের হাতল ধরে মগ তুলতেই দেখা গেল, মগের বডি যেখানে ছিল সেখানেই রইলো, হাতে শুধু মগের হাতল উঠে এলো! মানে শেষ রক্ষাও আর হলো না বুঝি!

ব্যথাতুর কলকাতার পথ। ছবিঃ লেখক

কর্তা শুধু হাসে আর অর্ধাঙ্গিনীর লজ্জাবনত শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তাতে করে অর্ধাঙ্গিনী আরও বেশি করে অদৃশ্য আগুনে জ্বলে-পুড়ে মরে।

ঘটনা এখানেও শেষ হতে পারতো। কিন্তু না, রাত শেষে সকালে কর্তা অফিস চলে গিয়েছে। ফিরেছে সেই রাতের বেলায়। রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষ করে, ঘুমতে যাওয়ার আগে ওয়াশরুমে ঢুকেছে ব্রাশ করতে। গিয়ে দেখে তার ব্রাশ আর টুথপেস্ট রাখা আছে সেই হাতল ভাঙা, হাজার মাইল পেরিয়ে আসা, উত্তর প্রদেশের বর্ণিল সেই মগের ভেতরে! কর্তা কিছু না বলে ব্রাশ শেষ করে বেরিয়ে অন্য পরিবারের কর্তাকে ফোন দিল।

নানা রকম কুশল সংবাদের পরে জানতে চাইলো উত্তর প্রদেশের মগের কী হলো? কিছু আছে না সবই শেষ। সেই কর্তা জানালো, না ভাই আছে আছে, কী করে শেষ হবে।

বাহারি পণ্যের সমাহার। ছবিঃ লেখক

যাক ভাই আপনি তবু ভাগ্যবান, কিছু তো আছে।

হুম খুবই ভাগ্যবান ভাই, কিন্তু কীভাবে আছে সে তো আর জানেন না!

কেন ভাই, কীভাবে আছে?

বেলকোনির ছোট্ট ঝুলন্ত গাছে পানি দেবার জন্য আছে!

কেন ভাই, হাতল নেই?

হাতল আছে কিন্তু যেখানে ঠোঁট রেখে পানি খাবেন সেখানে ভেঙে গেছে!

ওহ।

আর আপনার?

মগ ঠিক আছে ভাই, শুধু হাতলটা ভেঙে গেছে। তাই ওটা এখন ওয়াশ রুমে ব্রাশ আর পেস্ট রাখার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে!

উত্তর প্রদেশের বর্ণীল মগ, বাংলাদেশের বাথরুমে! ছবিঃ লেখক

দুই কর্তার বাকি কথোপকথনটুকু নাহয় না বলাই থাকুক আর দুই অর্ধাঙ্গিনীর মনের অবস্থা আপনারাই বুঝে নিন।

এই হলো দুইটি মগের আত্মকাহিনী।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চীনের প্রতীক পান্ডা দেখতে সিচুয়ান

গোমুখ অভিযান: গাঙ্গোত্রী ও গোমুখ যাওয়ার আনুষ্ঠানিকতা