'ভয়ংকর' স্থানসমূহে ভ্রমণের ক্ষেত্রে ৯টি নির্দেশনা

ঘটনাটা ছিল এই বছরেরই জানুয়ারির শেষের দিকে, ভ্রমণ বাংলাদেশ ট্র্যাভেল গ্রুপের সাথে সুন্দরবনে বেড়াতে গিয়েছি। বিকেল বেলায় চা-বিস্কুট খেতে খেতে দুবলার চরের ওপাশটায় সূর্যের ডুবে যাওয়া দেখছি আর গল্প করছিলাম ভ্রমণ বাংলাদেশ এর গ্রুপ লিডার টুটুল ভাইয়ের সাথে।

কথায় কথায় জেনেছিলাম সেইন্ট মার্টিন দ্বীপে উনাদের সেখানে একটা রিসোর্টও আছে, কিন্তু টুটুল ভাই সেখানে বর্ষাকাল ছাড়া আর কোনো সময়ে যেতে চান না। কৌতূহলী হয়ে তাই জিজ্ঞাসা করা, কেন?

তিনি উত্তরে স্বাভাবিকভাবেই বললেন, কেবল বর্ষার সময়ই দ্বীপটা একেবারে নিরিবিলি পাওয়া যায়। দ্বীপের সত্যিকারের নীরবতা আর সমুদ্রের গান শুনতেই তিনি কেবল সেসময়ে যেতে পছন্দ করেন। তাছাড়া বেশী পর্যটকদের ভীড়বাট্টাও তাঁর ভালো লাগে না।
তখন জিজ্ঞেস করলাম, বর্ষার সময় সমুদ্র তো অনেক উত্তাল থাকে। ট্রলারে করে যেতে ভয় লাগে না? তখন উনার উত্তরটা ছিল,

“ভয় কখন নেই? এই যে স্টিমারে করে সুন্দরবনে ভেসে বেড়াচ্ছি, এটাও তো যেকোনো সময় দুর্ঘটনায় পড়ে যেতে পারে। তাই বলে কী বসে থাকবো নাকি?”

টুটুল ভাইয়ের এই কথাটাই আমাকে তখন নতুন করে ভাবতে শেখায়। সত্যিই তো! এভারেস্ট জয় করতে গিয়ে কত মানুষ মারা যায় প্রতি বছর, তবুও কি এভারেস্টের প্রতি কোনো মানুষের আকর্ষণ কমেছে?

জোঁকের ভয়ে কি কেউ তিনাপ সাইতার জলপ্রপাতে যাওয়া কিংবা হামহাম ঝর্ণায় যাওয়া বন্ধ করেছে? তাহলে আমি কেন ভয় পাবো?

তবে ভয় না পেলেও কিছু সতর্কতা তো মেনে চলা আবশ্যক। কারণ প্রাকৃতিক দুর্ঘটনায় আপনার হাত না থাকলেও মানবসৃষ্ট দুর্ঘটনার জন্য তো নিশ্চয়ই আগে থেকে সতর্ক হওয়া যায়। যার মাধ্যমে অনাকাঙ্ক্ষিত নানা সমস্যা থেকে আগাম রেহাই পাওয়া যায়। আজ তাই লিখছি সেরকম ভয়ংকর কোনো স্থানে ভ্রমণের ক্ষেত্রে ৯টি নির্দেশনা নিয়ে, যা অবশ্যই মেনে চলবেন।

ভ্রমণে যাওয়ার আগে… 

১. আপনার ভয়ের কারণগুলো খুঁজে বের করুন এবং সত্যতা যাচাই করুন

প্রথমেই ঠাণ্ডা মাথায় বসে পড়ুন। যে দেশ বা যে অঞ্চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন তা সম্পর্কে আপনি কী শুনেছেন? সেই দেশ বা অঞ্চল সম্পর্কে আপনি ঠিক কতটুকু জানেন? কোত্থেকে জানলেন এই তথ্যগুলো?

আপনার তথ্যের উৎসগুলো কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য? ভয়ংকর বলতে ঠিক কতটা ভয়ংকর? সেটা কী আগে থেকে কোনো প্রকার প্রস্তুতি নিয়ে রাখলে প্রতিকার করা সম্ভব?

আপনার ভয়ের কারণ গুলো খুঁজে বের করুন এবং সত্যতা যাচাই করুন ; ছবিসূত্র: Startup Ecosystem

উদাহরণস্বরূপ, ধরা যাক আপনি Despacito গানটা শুনে, মিউজিক ভিডিওতে পুয়ের্তো রিকোর সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে সেখানে যাবেন বলে ঠিক করলেন। সেখানে আপনি যেতে পারেন, পর্যটকদের জন্য ভয়ংকর কোনো জায়গা হিসেবে সেটি পরিচিত কিছু নয়। কিন্তু আপনি কী জানেন, পুয়ের্তো রিকো বন্দুক যুদ্ধের দিক থেকে সবচেয়ে ভয়ংকর অঞ্চলগুলোর মধ্যে পৃথিবীতে পঞ্চম?

যদিও এই বন্দুকযুদ্ধগুলো হয়ে থাকে অধিবাসীদের নিজেদের মধ্যেই, তবুও প্রায়ই সেসব যুদ্ধের মাঝে পড়ে গিয়ে অনেক নির্দোষ পথচারীর আহত হওয়ার ঘটনাও রয়েছে। তাই চাইলেই কিন্তু এ ধরনের ঝুট-ঝামেলা পরিহার করে চলা সম্ভব। তাছাড়া পুয়ের্তো রিকো বর্তমানে সাইক্লোন-পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সেখানে যাওয়ার আগে ভালোমতো জেনেশুনে যাওয়াই ভালো।

২. অঞ্চলভিত্তিক ভ্রমণ বিষয়ক সতর্কতা মেনে চলুন 

এই ব্যাপারটির সবচেয়ে বড় উদাহরণ হচ্ছে উপকূলীয় অঞ্চলে বিশেষ সতর্কবার্তা চলাকালীন সময়ে মানুষজনের কক্সবাজারে সমুদ্র দেখতে চাওয়ার ইচ্ছা হওয়াটা। ইচ্ছে করে নিয়ম ভাঙতে বিশাল এক আয়োজন যজ্ঞ যেন।

অথচ পর্যটকদের এরকম জরুরি অবস্থায় সবার আগে দরকার নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়া। তা না করে অতি উৎসাহী লোকজনের অসতর্কতার কারণে অনেকেই বেখেয়ালে প্রাণ হারান। তাদের জন্য উদ্ধারকর্মী সদস্যবৃন্দেরও নানারকম ঝামেলা সহ্য করতে হয়।

অঞ্চলভিত্তিক ভ্রমণ বিষয়ক সতর্কতা মেনে চলুন ; ছবিসূত্র: missionaryhealth.net

এছাড়া, বিদেশে কোনো অচেনা জায়গায় ভ্রমণের আগে অবশ্যই ইন্টারনেটের মাধ্যমে সেখানকার স্থানীয় পত্রিকা, স্থানীয় লোকজনের ব্লগ কিংবা যতটা যা খবর নেওয়া সম্ভব সেরকম সব ধরনের আপডেট নিয়ে কেবল তারপরেই সেখানে যাওয়ার পরিকল্পনা করা উচিত।

সম্ভবত গত বছরেই দার্জিলিংয়ে বেড়াতে গিয়ে সেখানকার জরুরি অবস্থার ফলে আটকে যায় প্রচুর বাংলাদেশী সহ বিভিন্ন দেশের পর্যটক। আগে থেকেই সেখানকার সেসময়কার রাজনৈতিক, সামাজিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে; বুঝেশুনে যাওয়ার পরিকল্পনা করে নিলে এরকম অবস্থা অনেকাংশেই এড়ানো যায়।

ভ্রমণ চলাকালীন সময়ে… 

সাবধানতা বজায় রেখে বেড়িয়ে পড়ুন অজানাকে জয়ের উদ্দেশ্যে ; ছবিসূত্র: Moyan Brenn/Flickr

৩. স্থানীয়দের সাথে সদ্ভাব বজায় রাখুন

একটা বহুল প্রচলিত প্রবাদ বাক্য হচ্ছে, 

When you are at Rome, 
Do as Romans do.

উল্টোপাল্টা কাজকারবার না করে যখন যে এলাকাতেই যাবেন, চেষ্টা করবেন ভদ্রতা বজায় রেখে সেখানকার সাধারণ মানুষজনের সাথে মিশে যেতে। অপরিচিত মানুষজনের সামনে, অপরিচিত পরিবেশে যতটা সম্ভব স্থানীয়দের সাথে সদ্ভাব বজায় রেখে ভ্রমণ করাই উত্তম।

৪. আপনার কাছের মানুষদের জানিয়ে যান আপনার ট্যুর প্ল্যান সম্পর্কে

শুনে প্রথমে বেশ ‘এ দিয়ে আবার কী হবে?’ ধরনের মনে হলেও সত্যি বলতে কাছের মানুষজন কিংবা বিশ্বাসযোগ্য মানুষজনদের ট্যুর প্ল্যান জানিয়ে যাওয়া খুবই দরকারী একটা কাজ। কারণ, সাবধানের মার নেই। পথেঘাটে, আপনার দুর্গম গন্তব্যে কিংবা যেকোনো স্থানেই আপনার সাথে বাজে কিছু ঘটতেই পারে।

তাই ‘অতিরিক্ত ভাবনা’ বলে মনে হলেও শান্তিতে ভ্রমণ করতে এই ছোট্ট কাজটি আপনাকে করতেই হবে। একটু হলেও বেশী নিরাপদে থাকবেন। বিশেষ করে একা একা ভ্রমণে বের হলে এই ধরনের জানিয়ে যাওয়া কিংবা খোঁজ দিয়ে রাখা পরবর্তীতে আপনাকে খুঁজে পেতে বেশ কাজে দিবে। 

৫. সবসময়ই ইমার্জেন্সি যোগাযোগের একটা নাম্বার রাখবেন আপনার মানিব্যাগ, পকেট কিংবা ব্যাগে

যেহেতু বিপদ-আপদ বলে-কয়ে আসে না, তাই আপনাকে সার্বক্ষণিকভাবে একটা ইমার্জেন্সি যোগাযোগের নাম্বার কিংবা যোগাযোগ পত্র সার্বক্ষণিকভাবে বহন করতেই হবে। আপনার সেই ইমার্জেন্সি যোগাযোগ নাম্বারটি হতে পারে আপনার নিকটাত্মীয় কারো মোবাইল নাম্বার, অবশ্যই বাংলাদেশের কান্ট্রি কোড (+৮৮) সহ লিখে রাখবেন।

আর ইমার্জেন্সি যোগাযোগ পত্র বলতে মূলত আপনার ছোট করে পরিচয়, আবাসস্থল, আপনার ব্লাড গ্রুপ এবং নিকটাত্মীয় কারো যোগাযোগের নাম্বার যিনি আপনার দায়ভার নিতে পারবেন তার মোবাইল কিংবা ফোন নাম্বার অবশ্যই লিখে রাখবেন তাতে (আবারও বলছি, কান্ট্রি কোড সহ লিখে রাখবেন)।

অবশ্যই লেখাগুলো বাংলা এবং ইংরেজি দুই ভাষাতেই লিখে রাখবেন। কোনো দেশের ভয়ংকরতম স্থানে গিয়ে আপনি বিপদে পড়তে পারেন সেটা তো আর আগে থেকে কেউ বলে রাখতে পারে না। তাই আগে থেকে সাবধানতা অবলম্বন করা বুদ্ধিমানের কাজ।

৬. যেখানেই যান, বিশ্বাসযোগ্য পরিবহন ব্যবহার করবেন

এটা বিশেষ করে একা ভ্রমণের ক্ষেত্রে খুবই কার্যকর। ভ্রমণের আগেই আপনার ঠিক করে রাখা উচিত যে কোত্থেকে কীসে করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাবেন। ট্যাক্সির মধ্যে বিশ্বের বেশ কিছু জায়গায় Uber অনেক বেশী বিশ্বাসযোগ্য, Uber এর গাড়ি বা ট্যাক্সি ব্যবহার করতে পারেন।

আবার আপনার আগে যারা সেসব এলাকা থেকে ঘুরে এসেছে তাদের কাছ থেকে নির্ভরযোগ্য চালকদের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করতে পারেন। আবার আপনি নিজেই যখন বেশ কিছুদিনের জন্য কোথাও বেড়াতে যান, আপনার উচিত যে ট্যাক্সি কিংবা অন্যান্য যা পরিবহন ব্যবস্থার চালকের মোবাইল নম্বর নিজ দায়িত্বে সংগ্রহে রেখে দেওয়া; অবশ্যই যদি সেই চালকের গাড়িতে আপনি নিজেকে নিরাপদ মনে করে থাকেন, তবেই।

ট্যাক্সির মধ্যে বিশ্বের বেশ কিছু জায়গায় Uber অনেক বেশী বিশ্বাসযোগ্য; ছবিসূত্রঃ focustaiwan.tw

ভ্রমণ শেষে… 

৭. আপনার অভিজ্ঞতাগুলো ছড়িয়ে দিন

এখন আপনি যেহেতু সহি-সালামতে ফিরে আসতে পেরেছেনই, তাহলে আর চুপ করে থাকবেন কেন? সবার সাথে শেয়ার করুন আপনার অভিজ্ঞতাগুলো। কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, “সত্যিই কী ভয়ংকর ছিল ট্যুরটা?”

দয়া করে আপনার সাথে যা যা ঘটেছিল সেটাই বলবেন। বাড়িয়ে বা কমিয়ে কিছু নয়। সবচেয়ে ভালো হয় যদি আপনি আপনার নিজস্ব ব্লগে বা বর্তমানে ফেসবুক, ইউটিউবে যেমন অনেকেই তাদের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা শেয়ার করে সেরকম আপনিও সেসব কথা জনগণের সামনে ছড়িয়ে দিতে পারেন।

আপনার অভিজ্ঞতাগুলো ছড়িয়ে দিন সামাজিক গণমাধ্যমগুলোতে ; ছবিসূত্র: Apple.com

বিশেষ করে যদি এমন কোনো জায়গায় আপনি যেতে পারেন যেখানে জনসাধারণ ভয়ে খুব একটা যায় না, কিন্তু আপনি আবিষ্কার করেন যে ভয়ের সংবাদগুলো মিথ্যে প্রপাগান্ডা ছাড়া আর কিছুই না এবং সেখানে ভ্রমণের মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি করা সম্ভব তাহলে অবশ্যই সেই ধরনের এলাকাগুলোর কথা বেশী করে ছড়িয়ে দেবেন।

এইক্ষেত্রে আপনি কয়েকজন ভ্রমণকারীর লেখা, ছবি এবং ভিডিওগুলোর দিকে নজর রাখতে পারেন, যারা ব্লগ, ফেসবুক, ইউটিউব, ইন্সটাগ্রামে প্রায় নিয়মিত তাদের ভ্রমণ অভিজ্ঞতাগুলো শেয়ার করে থাকেন। তাদের কয়েকজনের সাইটের প্রোফাইল লিংক শেয়ার করছি। 

ফেসবুক পেইজ: https://www.facebook.com/nasdaily
ব্লগ: https://theplanetd.com
ইউটিউব: https://www.youtube.com/user/DamonAndJo
ইন্সটাগ্রাম: https://www.instagram.com/chrisburkard

৮. আরো জানতে থাকুন

আপনি আপনার ভ্রমণ থেকে ফিরে মোটামুটি একটা অসাধ্য সাধন করে বেশ আরামে দিন কাটাচ্ছেন, কিন্তু তাই বলে সেই জায়গাটার কথা ভুলে গেলে চলবে না। যেরকম আপনি সেখানে যাওয়ার আগে ছোটখাটো গবেষণা করে গিয়েছিলেন তেমনি আগ্রহ নিয়ে সেখান থেকে আসার পরও সেখানকার সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক খোঁজখবর রাখা এবং সে জায়গা সম্পর্কে জেনে নিজেকে আরো সমৃদ্ধ করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। 

৯. আরো ভ্রমণ করুন 

পৃথিবী একটি বিশাল জায়গা। নানা বিপদসংকুলতার সাথে রয়েছে বিস্ময়কর সৌন্দর্যও। বেরিয়ে পড়ুন অজানার উদ্দেশ্যে, সতর্কতার সাথে। ফিরে আসুন আর সবাইকে জানান সেসব ভয়ংকর সুন্দর জায়গাগুলো নিয়ে। এক সময় দেখবেন পৃথিবীতে যত জায়গা অনেক ভয়ংকর বলে মনে হতো, এখন আর সব জায়গা অত ভয়ংকর লাগছে না। সুতরাং বেরিয়ে পড়ুন, ভ্রমণ করুন!

বেড়িয়ে পড়ুন, ভ্রমণ করুন! ছবিসূত্র: basecampadventure.com

অনু তারেকের ‘আইল্যান্ড পিক’ জয়, ওয়াসফিয়া নাজরিনের ‘সেভেন সামিট’ জয়, ৬৭ বছর বয়সী ক্ষীতিন্দ্র চন্দ্র বৈশ্যের বিরামহীন ১৮৫ কিলোমিটার সাঁতার কেটে বিশ্বরেকর্ড করা— এসবই আপনার, আমার আশেপাশের কিছু মানুষের কৃতিত্ব। চাইলে আপনিও পারবেন। কেবল সাহস করে, যথাযথ সাবধানতা অবলম্বন করে বেরিয়ে পড়ার অপেক্ষা।

সবার ভ্রমণ নিরাপদ এবং আনন্দের হোক! 

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

হিমালয়ের নৈসর্গিক শহর মানিকারান উপাখ্যান

পাহাড়ের ভাঁজে অনন্য এক রূপায়ন সাইরু হিল রিসোর্ট