নাইন গোল্ডেন রুলস অফ রক ক্লাইম্বিং

Young woman lead climbing in cave, male climber belaying. Kalymnos island, Greece.

পাহাড় পর্বতে আরোহনের ক্ষেত্রে সব সময় কিছু না কিছু নিয়ম অনুসরণ করা লাগে, কারণ কিছু নিয়মের বাইরে নির্বোধের মতো কাজ করলে ঘটে যেতে পারে মুহূর্তেই বড় কোনো অঘটন। তাই শৈলারোহণ অথবা পর্বতারোহণ যে আরোহনই হোক না কেন আপনাকে কিছু প্রাথমিক নিয়ম কানুন অনুসরণ করতে হবে।

শৈলারোহনের জন্য নয়টি গোল্ডেন রুলস রয়েছে। এই রুলসগুলো যদি আপনি আরোহণের সময় অনুসরণ করেন তাহলে নিরাপদে আরোহন করার একটি মানসিকতা সৃষ্টি হবে আপনার ভেতরে। আজ এই নয়টি নিয়ম সম্পর্কে ধারণা দেবার চেষ্টা করব। চলুন শুরু করা যাক।

Source: Yamnuska Mountain Adventuresy

১. পরিকল্পনা করা

পরিকল্পনা যে কোনো কাজেরই মুখ্য উপাদান। কোনো পাথুরে দেয়ালে অথবা কোনো বোল্ডারে আরোহন করার আগে সর্বপ্রথম দেখে নিতে হবে পাথরের ধরন। কারণ বিভিন্ন রকম পাথরে আরোহনের নিয়ম নীতি, বিভিন্ন রকম হতে পারে, আরোহনের হোল্ডস ভিন্ন রকম হতে পারে।

তাই কোন পথে উঠবেন এবং কীভাবে উঠবেন সেটির সকল পরিকল্পনা প্রথমেই সুনিপুণভাবে করে ফেলা উচিত। না হলে যদি কোনো দেয়ালে একটুখানি উঠে পরের অংশের পরিকল্পনা করতে চান সে ক্ষেত্রে আপনার শক্তির অপচয় হবে এবং পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তাই হোল্ডের পজিশনগুলো ভালোভাবে খেয়াল করে পরিকল্পনা মাফিক আরোহণ করলে সফলভাবে আরোহণ সম্পন্ন করতে পারবেন।

২. সঠিকভাবে দাঁড়ানো

অনেকেরই ধারণা রক ক্লাইম্বিংয়ের জন্য হাত এবং পা দুইটি সমান শক্তি প্রয়োজন হয়। এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল, যদি না আপনি কোনো ওভার হ্যাং যুক্ত পাথরের দেয়ালে আরোহণ করেন। কারণ সমকোণে থাকা কোনো দেয়ালে আরোহনের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র হাত সাপোর্ট হিসেবে কাজ করবে এবং পায়ের উপর ভর করে নিজের শরীরকে উপরের দিকে তুলতে হবে। এই ক্ষেত্রে নিজের ওজনের সেন্টার অফ গ্রাভিটিকে পায়ের হোল্ডের মাঝামাঝি জায়গায় রেখে একদম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আরোহন করতে হবে।

Source: Climbing Solutions

এতে করে আপনার শরীরের ভর প্রয়োজনীয় জায়গায় পড়বে। যদি একটু পেছন দিকে ঝুঁকে যান, সেক্ষেত্রে আপনার সেন্টার অফ গ্রাভিটি পরিবর্তিত হয়ে যাবে এবং পায়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকা অত্যাধিক কষ্টসাধ্য হয়ে পড়তে পারে। তাই আরোহন শুরু করার সাথে সাথে নিজের শরীরের ভরকে পায়ের হোল্ডের মাঝামাঝি জায়গায় ছড়িয়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আরোহন করলে সহজেই আরোহন করা যাবে।

৩. হোল্ড চেক করে নেয়া

পরিকল্পনা শেষ হবার পর আপনি যখন আরোহন শুরু করবেন, যে হোল্ডগুলো ধরে বা যে হোল্ডগুলোর উপর পা রেখে আপনি আরোহন করছেন সেই হোল্ডগুলোর উপর ভর প্রদানের আগে অবশ্যই বারবার চেক করে নেবেন, আপনার ভরে হোল্ডগুলো ভেঙে পড়ে যেতে পারে কিনা।

যদি চেক না করে সোজাসুজি ওঠা শুরু করেন সেক্ষেত্রে ছোটখাটো কোনো হোল্ডের উপর আপনার ভর প্রয়োগ করার ফলে সেটি ভেঙে যেতে পারে। এক্ষেত্রে গুরুতর দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকবে। তাই কোনো হোল্ডের উপর শক্তি প্রয়োগ করার আগে দুই একবার দেখে নিতে হবে সেটি যথাযথভাবে আপনার ভর গ্রহণ করতে সক্ষম কিনা।

৪. থ্রি পয়েন্ট ক্লাইম্বিং

এই টার্মিনোলজিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি আরোহনের ক্ষেত্রে। আমরা সাধারণত দুই হাত এবং দুই পা এই চারটি অঙ্গের সাহায্যে আরোহন করে থাকি। থ্রি পয়েন্ট ক্লাইম্বিং বলতে এখানে বোঝানো হয়েছে সব সময় তিনটি অঙ্গ একসাথে ব্যবহার করা যাবে এবং একটি অঙ্গকে মুক্ত অবস্থায় রাখতে হবে। যেমন, আপনি যখন দুই পা দিয়ে কোনো পাথরের উপর দাঁড়িয়ে আছেন এবং একটি হাত দিয়ে নিজের শরীরের ভারসাম্য ঠিক করে রাখছেন সেই মুহূর্তে অন্য একটি হাত দিয়ে পরবর্তী হোল্ড খুঁজে তারপর সেটি ধরে উঠতে হবে।

Source: Adventure In You

যদি শুধুমাত্র দুই পায়ের উপর দাঁড়িয়ে দুই হাত দিয়ে হোল্ড খুঁজতে চান সে ক্ষেত্রে আপনার ভারসাম্য ঠিক থাকবে না। অথবা যদি একটি পায়ের উপর ভর দিয়ে দুটি হাত দিয়ে উপরে উঠতে চান সেক্ষেত্রে অন্য পায়ের জন্য হোল্ড খুঁজে পেতে সমস্যা হবে। তাই সবসময় থ্রি পয়েন্ট ক্লাইম্বিংয়ের জন্য একটি অঙ্গকে মুক্ত অবস্থায় রেখে বাকি অংশগুলো দিয়ে হোল্ডের উপর অবস্থান করতে হবে।

৫. দেয়ালের সাথে শরীরের দূরত্ব বজায় রাখা

যখন কোনো পাথুরে দেয়ালে আরোহন করবেন সেই ক্ষেত্রে দেয়ালের সাথে নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোর দূরত্ব বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরী। পাথরগুলো সাধারণত বেশ ধারালো হয়ে থাকে, সে ক্ষেত্রে শরীরের কোথাও পাথরের সামান্য ঘষা লাগলে ছিলে কেটে যেতে পারে। এতে করে গুরুতর দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থেকে যায়। এছাড়া শুধুমাত্র দুই হাত এবং দুই পা দিয়েই আরোহন করতে হয় বলে অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে আপনার মনোযোগ এবং শারীরিক শক্তির ব্যাঘাত ঘটতে পারে। তাই আরোহণের সময় নিজের শরীর এবং দেয়ালের মধ্যে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।

Source: Chelsea Piers

৬. হাতকে কাঁধের নিচে রাখা

নতুন কোনো আরোহী যখন আরোহন করতে শুরু করেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় তারা নিজের হাতকে কাঁধের অনেক উপরে তুলে কোনো হোল্ড ধরে তারপর নিজের শরীরকে টেনে তোলেন। কিন্তু এই বিষয়টি একটি মারাত্মক ভুল, কারণ আপনি যখন নিজের কাঁধের উপর নিজের হাত তুলে শক্তি প্রয়োগ করবেন সেই ক্ষেত্রে হাতের উপরের অংশে রক্ত চলাচল কমে যাবে এবং খুব দ্রুত আপনার হাত ক্লান্ত হয়ে পড়বে। আরোহনের ক্ষেত্রে শরীরের কোনো অংশ যদি অতি দ্রুত ক্লান্ত হয়ে যায় তবে আরোহনকারীর আরোহন ব্যর্থ হতে পারে খুব সহজে। তাই চেষ্টা করতে হবে নিজের কাঁধের খুব বেশি উপরে হাত না তোলার।

৭. হাত-পা ক্রস না করা

সাধারণত হাত এবং পা দিয়ে আরোহন করার সময় একটি পায়ের উপর দিয়ে আরেকটি পা অথবা একটি হাতের উপর দিয়ে আরেকটি হাত দিয়ে কোনো হোল্ড ধরে আরোহন করা উচিত নয়। এক্ষেত্রে যখন কোনো একটি হাত বা পা সরিয়ে পরবর্তী হোল্ডে যাওয়ার প্রয়োজন হবে তখন যে হাত বা পায়ের উপর আপনার ভর প্রদত্ত আছে সেই পায়ের ভারসাম্য হারিয়ে যেতে পারে অন্য হাত অথবা পায়ের ধাক্কায় আপনার প্রদত্ত ভরযুক্ত হাত অথবা পা সরে যেতে পারে। এই ক্ষেত্রে খুব সহজেই ঘটে যেতে পারে মারাত্মক দুর্ঘটনা। আরোহণের সময় এই ব্যাপারটি ভালোভাবে খেয়াল রাখতে হবে যেন কোনো হাত অথবা পা একে অপরেকে ক্রস না করে।

Source: Chelsea Piers

৮. শক্তি সঞ্চয় করা

আরোহণের সময় নতুন আরোহীদের ক্ষেত্রে আর একটা ব্যাপার লক্ষ্য করা যায় যেটি তারা কোনো একটি জায়গায় গিয়ে কখনো নিজের কোন অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে বিশ্রাম দেয় না। আবার কোনো একটি নড়বড়ে পজিশনে নিজেকে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করিয়ে রাখে। এর ফলে শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলোর উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং এই অঙ্গগুলো ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়তে শুরু করে।

আরোহনের ক্ষেত্রে সব সময় লক্ষ্য রাখতে হবে একটি ভালো পজিশনে দাঁড়ানোর পর সেখানে নিজের হাত এবং পাকে বিশ্রাম দেওয়া এবং কোনো নড়বড়ে পজিশনে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে না থাকা। এতে করে শারীরিক শক্তির অপচয় হবে না এবং নিরাপদ জায়গায় বিশ্রাম করার ফলে শরীরের শক্তি সঞ্চিত হতে শুরু করবে। তাই দ্রুত ক্লান্ত না হয়ে স্বাভাবিকভাবে আরোহন করার জন্য নিজের শরীরের শক্তি সঞ্চয় করাটা অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ।

Source: Asgard Beyond

৯. নির্দিষ্ট তালে আরোহণ করা

আরোহন সঙ্গীতের মতো। সংগীতের যেমন থাকে তাল, লয় এবং সুর, আরোহণেরও রয়েছে বিভিন্ন রকম তাল। যেমন, আপনি যদি একটি নির্দিষ্ট ভঙ্গিমায় আরোহন করেন এবং সেভাবেই আরোহন করতে থাকেন তাহলে সহজেই সময় এবং নিজের শক্তিকে সঞ্চয় করে আপনি আপনার লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে পারবেন।

কিন্তু আরোহণের সময় যদি আপনি বারবার এই তাল পাল্টাতে থাকেন বা আরোহণের স্টাইলটি পরিবর্তন করতে থাকেন সেই ক্ষেত্রে সময় এবং শক্তি দুটোরই অপচয় হবে। আমরা আগেই জেনে আসছি নিরাপদ আরোহণের ক্ষেত্রে শক্তি এবং সময় দুটি সবথেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই পরিকল্পনা এবং বাদবাকি নিয়মগুলো যদি ভালোভাবে অনুসরণ করে থাকেন তবে নিজের ক্লাইম্বিং স্টাইলে রিদমলি আরোহণের চেষ্টা করবেন।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্মৃতিতে নাটোর

পোস্টম্যানের ঘন্টি: ব্রজযোগিনী পর্ব