ল্যান্ডস্কেপ ফটোগ্রাফির ক্ষেত্রে ৭টি বিশেষ টিপস

কোথাও ভ্রমণের ক্ষেত্রে আমরা সবাই ছবি তোলার ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী। কারণ ছবিগুলো আমাদের ভ্রমণের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখে। আমরা সবাই চেষ্টা করি একটু ভালো এবং মনঃপুত ছবি তুলে আনার। যেগুলো দেখে বছরের পর বছর আমরা নিজেদের স্মৃতিকে স্মরণ করতে পারি। এই ল্যান্ডস্কেপ ফটোগ্রাফি কিছু নিয়মকানুন মেনে চললে আরো সুন্দর ছবি পাওয়া যায়। ছবি তোলার ক্ষেত্রে আগ্রহীদের জন্য আমার এই বিশেষ টিপসগুলো। এগুলো ফলো করলে আপনার ছবিগুলো হয়ে উঠতে পারে আরো বেশি সুন্দর।

Source: Graham Kelly Photography

ছবির তোলার জন্য নিজের মনকে স্থির করুন

আপনি যখন কোনো ছবি তুলবেন তখন অনুভব করার চেষ্টা করবেন ছবি তুলতে আপনি ভালবাসেন, একটি ছবি দিয়ে আপনি চারপাশটায় যা দেখেছেন সেটি আপনার নিজস্ব অনুভূতি দিয়ে প্রকাশ করার চেষ্টা করছেন। ফটোগ্রাফি হচ্ছে খানিকটা সঙ্গীতের মতো। একটা সংগীতকে সুন্দর করতে যেমন মন প্রাণ দিয়ে সঙ্গীতটি করার চেষ্টা করতে হয়, তেমনি ছবির ক্ষেত্রে একই ব্যাপার ঘটে। আপনি যখন মন প্রাণ দিয়ে আপনার মনের পূর্ণ অভিব্যক্তিটি পরিবেশের সাথে ফুটিয়ে তুলতে চাইবেন, তখনি আপনার ছবি সুন্দর হয়ে উঠবে।

Source: Tom Archer

পরবর্তীতে আপনি যখন আপনার তোলা ছবিটি দেখবেন তখন, সেটা আপনার হৃদয়ের স্পন্দন পর্যন্ত বুঝিয়ে দেবে ছবি তোলার মুহূর্তের। আমি সবসময় বিটলসের সেই গানটি মনে করি, “শী লাভস ইউ”। কারণ গানের রেকর্ডিং শেষে তারা বলেছিল, “হ্যাঁ, ঠিক যে অনুভূতি দিয়ে গানটি লেখা হয়েছিল সে অনুভূতি দিয়ে গানটি গাওয়া শেষ করতে পেরেছি”। তেমনি মন স্থির করে মনের ভাষাকে ছবির দ্বারা উজ্জ্বল করে ব্যক্ত করার চেষ্টা করলেই আপনার ছবিটি আপনার মনের মতো হয়ে উঠতে পারে।

ক্যামেরার সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তুলুন

যখন আপনি একটি ক্যামেরা ক্রয় করবেন তখন শুধুমাত্র ভাববেন না, বেশি টাকা দিয়ে কিনেছেন বলে ভালো ছবি পাবেন অথবা কম টাকা দিয়ে কিনেছেন বলে ছবি খারাপ হবে। নিজের প্যাশনের অমূল্য জিনিস কেনার ক্ষেত্রে সবসময় ভাবতে হবে আমি সেরা ছবিটি পাওয়ার জন্যই এই ক্যামেরাটি নিয়েছি যেটা আমাকে ভালো ছবি তোলার সুযোগ করে দেবে। এই ক্ষেত্রে ক্যামেরাকে যদি নিজের ভালো বন্ধু ভাবতে পারেন এবং ক্যামেরার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টি করতে পারেন তবে আপনি মনের মতো ছবিগুলো সহজেই পেয়ে যাবেন।

Source: iipedu

যেমন ক্যামেরার সাথে যদি আপনার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হয় তাহলে আপনি বুঝতে পারবেন কোন আলোয় কত অ্যাপাচার বা কত শাটার স্পিড কন্ট্রোল করতে হবে, কত দ্রুত সেটা করতে পারবেন। এছাড়া আপনি বুঝতে পারবেন কীভাবে এটি ভালোভাবে কাজ করে এবং কীভাবে আপনি আলাদা আলাদা সিচুয়েশনে দ্রুততার সাথে ভালো ছবি তুলতে পারবেন। ক্যামেরা ডায়াল সুইচগুলোর সাথে আপনি যত বেশি পরিচিত হবেন আলোর স্বল্পতা বা অতি আলোর ভেতরে তত দ্রুত ভালো কম্পোজিশন করে ছবিগুলো তুলতে পারবেন। তাই সব সময় চেষ্টা করুন নিজের ক্যামেরাকে ভালোভাবে বুঝে উঠতে।

মানচিত্র ছাড়া ভ্রমণ করুন

মানচিত্র ছাড়া কোথাও ভ্রমণ একটি ভালো ফটোগ্রাফীর উপকরণ। কিন্তু এটি আপনার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, কারণ আপনি কোথাও হারিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু মানচিত্র ছাড়া কোথাও যাবার কিছু নিয়ম যদি ফলো করেন সেক্ষেত্রে হারিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটি ঘটবে না। শুধু মনে রাখবেন দুই থেকে তিনটি পয়েন্ট বাছাই করবেন। পয়েন্ট এ, পয়েন্ট বি, পয়েন্ট সি এরকম করে।

Source: foto.dd

এরপর আপনি পয়েন্ট অনুযায়ী এগোবেন এবং লক্ষ্য রাখবেন যে আপনি যেকোনো পয়েন্ট থেকে ডানে বা বাঁয়ে দূরে কোথাও চলে যাচ্ছেন না। ফটোগ্রাফির আসল আনন্দ হচ্ছে আবিষ্কার এবং অন্বেষণ। নতুন জায়গা আবিষ্কার এবং নতুন অ্যাঙ্গেল খোঁজার জন্য আপনি এই পদ্ধতিটি ফলো করে যদি ছবি তুলতে যেতে পারেন তাহলে, গতানুগতিক অ্যাঙ্গেল থেকে অন্য অ্যাঙ্গেলে ছবি তুললে আপনার ফটোগ্রাফটি হয়ে উঠবে অমূল্য।

আপনি যেটা চাইছেন সেটার জন্য অপেক্ষা করুন

ফটোগ্রাফি ফ্রেমিং ঠিক করার পর একজন ফটোগ্রাফারের সবথেকে বড় কাজ হচ্ছে অপেক্ষা করা। আপনি বিভিন্ন ল্যান্ডস্কেপে কীভাবে একটি ছবি ভালোভাবে তুলতে পারেন অথবা কীভাবে একটি সাবজেক্টকে ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারবেন এটির সব থেকে প্রধান নিয়ামক হচ্ছে অপেক্ষা। এমন হতে পারে আপনি কোথাও দু-এক মিনিট বসে একটা ছবি তুলে নিয়ে চলে আসতে পারেন। সেক্ষেত্রে মাথায় রাখুন যদি হঠাৎ চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখতে পান একটি রাখাল একদল ভেড়ার পাল নিয়ে আসছে তবে অপেক্ষা করুন, আপনি মানুষের কার্যকলাপ সহ পুরো ল্যান্ডস্কেপে ছবিটি তুলতে পারবেন।

Source: Victoria Leigh Photo

একবার ভাবুন আপনার ছবিটি কত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই সব সময় চেষ্টা করতে হবে শুধুমাত্র আকাশ, পাহাড় বা সমুদ্রের ছবি তুলে ফেরত আসলেই ভালো ল্যান্ডস্কেপ ছবি হয় না। চারদিকে নজর রেখে অপেক্ষা করতে হয় উপযুক্ত মুহূর্তের জন্য। সেই মুহূর্তটি যখন আপনার সামনে চলে আসবে তখন আপনি অসাধারণ কিছু ছবি পেয়ে যেতে পারেন। এই ব্যাপারটি আসলেই খুব উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুন

আমি এত বছর যাবৎকাল পেইন্টিং থেকে অনেকগুলো ভালো ভালো আইডিয়া পেয়েছি। যখন আপনি একটি পেইন্টিং করবেন, অপেক্ষা করলে আপনি বুঝতে পারবেন কোথাও কোথাও পেইন্টকে পাতলা করতে হবে নাকি ঘন। অথবা আপনি যদি মুহূর্তের পর মুহূর্তে রং বদলাতে থাকেন তাহলে সম্পূর্ণ ব্যাপারটি জগাখিচুড়ী হয়ে যাবে। তখন মনে হবে আমি আর এটা করব না, তাই আপনি বিষয়টি বাদ দিয়ে দিবেন।

Source: kingjvpes photo

কিন্তু আপনি যদি আপনার ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন এবং নতুন করে শুরু করতে পারেন সেক্ষেত্রে আপনার জন্যই উপকার হবে। যেমন, ধরুন কোনো একটা ল্যান্ডস্কেপের ছবি তুলে আনার পর আপনি যখন সেটাকে রিভিউ করবেন তখন কোনো ভুল ত্রুটি চোখে পড়ল। এর পর সেটাকে ভালোভাবে রিসার্চ করুন। রিসার্চের পর আপনি হয়তো সেটিকে সঠিকভাবে তোলার আইডিয়াটি নিজের মাথা থেকে যাবেন। তাই আপনি যদি আপনার করা ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন সেক্ষেত্রে আপনার ফটোগ্রাফি দক্ষতারও উন্নতি ঘটবে।

পোস্ট প্রোডাকশনের উপর নির্ভর করবেন না

আজকাল আমার দেখা মতে অনেকেই ছবি তোলে এবং তারা মূলত নির্ভর করে ফটোশপের উপর। কারণ তারা ভাবে কোনো একটি ছবি RAW-তে তুলেই তারা ফটোশপে এডিট করে সেটাকে সুন্দর করে ফেলতে পারবে। কিন্তু ফটোগ্রাফির মুখ্য উদ্দেশ্য সেটা নয়। ফটোগ্রাফের মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে আপনি আপনার ক্যামেরা দ্বারা কীভাবে আপনার পরিবেশকে এবং আপনার অনুভূতিকে সঠিকভাবে ফুটিয়ে তুলবেন। শুধুমাত্র রং পাল্টাপাল্টি করে এবং ফ্রেমিং ক্রপ করলেই একটি ছবি সুন্দর হয়ে যায় না। এক্ষেত্রে আপনার সব সময় মাথায় রাখতে হবে আপনার ক্যামেরার ফ্রেমের ভেতর দিয়ে আপনি যে ছবিটি মনের মতো করে চাইছেন সেই ছবিটি আপনাকে ক্যামেরা দিয়ে তুলতে হবে।

Source: Fstoppers

কিছু কিছু ফটোগ্রাফি রুলসের ভেতর কোনো একটি ছবির ১০ ভাগ আপনি পোস্ট প্রোডাকশনের জন্য রেখে দিতে পারেন। বাকি ৯০ ভাগ আপনাকে অবশ্যই ক্যামেরা দিয়েই সম্পন্ন করতে হবে। এর জন্য আগে ফটোগ্রাফি ব্যাপারটা মাথায় ভালোভাবে বুঝে তারপর ছবি তোলার জন্য মন স্থির করা উচিৎ। পোস্ট প্রোডাকশনের ক্ষেত্রে সফটওয়্যারগুলো মূলত ছবির স্বল্প পরিবর্তনের জন্য ব্যবহার করা উচিৎ। যেমন কোনো ছবিতে যদি আপনার দেখা কালারটি সঠিকভাবে না আসে সেটা আপনি ফটোশপ বা অন্যান্য সফটওয়্যার দিয়ে কমিয়ে বা বাড়িয়ে নিতে পারবেন। কিন্তু এর মানে এই নয় যে ছবির ৯০ ভাগই পোস্ট প্রোডাকশনের জন্য রেখে দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে বরং আপনার ফটোগ্রাফি স্কিলের অবনতি ঘটবে বলেই আমার ধারণা।

ছবির প্রতিটি উপাদান মন মতো সাজান

কোনো সঙ্গীতজ্ঞ বা সুরকার কখনো বলবে না, আমি জানি না সংগীতের নোটগুলো কীভাবে আসবে অথবা এখানে ভায়োলিন থাকবে নাকি গিটার থাকবে। ঠিক সেরকমই ফটোগ্রাফি এরকম আরেকটি উদাহরণ। একজন ফটোগ্রাফার কখনোই বলতে পারবে না, ছবির ভেতরে ভেতরকার উপাদানগুলো সে কীভাবে সাজাবে! তাই আপনার মনের গভীর থেকে যদি কোনো ছবির প্রতিফলন ঘটে থাকে, সে ক্ষেত্রে চারদিকের উপাদানগুলো ভালোভাবে প্রথমে দেখে দেখে মনের ভেতর নোট করে নিন কীভাবে উপাদানগুলোকে ছবির মধ্যে সাজাবেন।

Source: nextsuccession

কীভাবে সাজাতে চেয়েছিলেন সেটা একবার কল্পনা করে তারপর ফ্রেমিং ঠিক করুন। এমন কোনো কিছু ছবির মধ্যে রাখা উচিত না যেটি আপনার কল্পনার বাইরে ছিল অথবা যেটা একটি ভালো ছবি তৈরি করতে সাহায্য করবে না। তাই ভালো ছবি তোলার ক্ষেত্রে একটি অন্যতম উল্লেখযোগ্য নিয়ম হলো, উপাদানগুলোকে ভালোভাবে ছবির মধ্যে সাজিয়ে নেয়া।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

প্রাণী রাজ্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে একদিন

ধর্মসাগর নামক দীঘির পাড়ে