এস্তোনিয়া ভ্রমণ: যে ৭টি কাজ অবশ্যই করবেন

স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর সবচেয়ে নিকটবর্তী দেশটির নাম এস্তোনিয়া। উত্তর ইউরোপের এই দেশটি ফুটবলে অত ভালো কোনো দল না হওয়ায় আমাদের কাছে অনেকটাই অপরিচিত। কিন্তু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার হওয়ায় এই দেশটিতে পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে। এস্তোনিয়া ভ্রমণে অবশ্যই করবেন এমন ৭টি কাজ নিয়ে আজকের এই লেখা।

১. আলাটস্কিভি প্রাসাদের সৌন্দর্য উপভোগ

প্রাসাদটি ষোড়শ শতাব্দীতে স্থাপিত হলেও পরবর্তীতে ১৮৭৬ থেকে ১৮৮৫ সালের মধ্যে বৃহৎ সংস্কার কাজ চালানো হয়। ব্যারন ভন নলকেন, স্কটল্যান্ডের বালমোরাল রাজ বাসভবন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এই সংস্কার কাজ চালান। প্রাসাদটির কোণা আকৃতির ছাদ থেকে উৎসারিত টাওয়ারগুলো এটির সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

পাশাপাশি নিও-গোথিক স্টাইলের বাড়িগুলোর মধ্যে অন্যতম সুন্দর জমিদার বাড়ি হিসেবে এই প্রাসাদটির আকর্ষণ পর্যটকদের কাছে অনেক বেশী।

ছবিসূত্র: www.alatskiviloss.ee

২. স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে পরিচয়, ভিলজান্দিতে

দক্ষিণ এস্তোনিয়ার ছোট্ট শহর ভিলজান্দি। কেবল এখানকার ছবির মতো সুন্দর লেক দেখেই পর্যটকেরা হয় বিমোহিত। কিন্তু এখানে দ্বাদশ শতাব্দীর টিওটোনিক অর্ডারের প্রাচীন এক প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষও রয়েছে। এই প্রাসাদটি প্রায় আট হেক্টর জায়গা জুড়ে অবস্থিত।

ছবিসূত্রঃ medievalheritage.eu

ভিলজান্দি হচ্ছে এস্তোনিয়ার ফোক মিউজিকের প্রাণের শহর। দেশটির সবচেয়ে বড় বার্ষিক ফোক মিউজিকের আয়োজন হয় জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে। এই বিশাল গানের আয়োজনের ভেন্যু হিসেবে এই প্রাচীন প্রাসাদও থাকে আবার শহরের বেশ কিছু জায়গাও ভেন্যু হিসেবে ব্যবহৃত হয়।  

ছবিসূত্র: Visit Estonia

ভিলজান্দির রাস্তাঘাট সাজানো হয়েছে আটটি বিশালাকার কনক্রিটের নির্মিত স্ট্রবেরি দ্বারা। এটি থেকে ধারণা করা যায় স্থানীয় বিখ্যাত নাইভিস্ট পেইন্টার পল কন্দাসের নানা রঙের মিশেলে আঁকা ছবিগুলোর পেছনের অনুপ্রেরণার কথা, বিশেষ করে, তাঁর বিখ্যাত পেইন্টিং ‘দ্য স্ট্রবেরি ইটারস’ (১৯৬৫)।

The Strawberry Eaters নামক বিখ্যাত চিত্রকর্ম। ছবিসূত্র: Visit Estonia

৩. তালিনের ইতিহাসের জাদুঘর থেকে তালিম নেওয়া

এস্তোনিয়ার গ্রেট গিল্ড ছিল চতুর্দশ শতাব্দী থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত শিল্পী এবং বণিকদের জন্য এক ধরনের সমবায় সংঘ। এই গ্রেট গিল্ডের প্রধান কেন্দ্র ছিল তালিন শহরের বর্তমান ইতিহাস জাদুঘর। জাদুঘরটি সাজানো হয়েছে এস্তোনিয়ার প্রায় ১১,০০০ বছর ধরে সংগ্রহ করা নানা রকম জিনিসপত্র দিয়ে। এই সংগ্রহশালাটির নাম ‘স্পিরিট অফ সারভাইভাল’।

ছবিসূত্র: The Mathematical Tourist

জাদুঘরটির বৃহদাকার ভূগর্ভস্থ সংগ্রহশালা এবং কাঠের কারুকাজ মনোমুগ্ধ করে রাখবে যে কাউকেই। এই বেজমেন্টে জাদুঘরটির ইতিহাসও দেখানো হয়েছে ভিন্ন ধর্মী আলোকসজ্জার মাধ্যমে। যেখানে বলা হয়েছে এটি অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে বিভিন্ন শিল্পকর্ম বিক্রয়ের জন্য একটি নিলাম ঘর হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। পরবর্তীতে লুমিয়ের ব্রাদার্সের কল্যাণে ১৮৯৬ সালে প্রথম সিনেমা প্রদর্শনের মাধ্যমে জায়গাটি নিলাম ঘর থেকে সিনেমা দেখানোর জায়গা হিসেবেই ব্যবহৃত হওয়া শুরু হয়।   

৪. সমুদ্রের বুকে জীবনের অনুসন্ধান, সিপ্লেন হারবার মিউজিয়ামে

সিপ্লেন হারবার মিউজিয়াম; ছবিসূত্র: Visit Estonia

তালিন শহরের সিপ্লেন হারবার মিউজিয়ামটি নিঃসন্দেহে সমগ্র ইউরোপেরই সেরা জাদুঘরের একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৯১৬-১৭ সালের দিকে নৌ-বিমানের সংরক্ষণ-কেন্দ্র হিসেবে এই স্থাপত্যটির নির্মাণ করা হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে এটি ছিল সেইন্ট পিটার্সবার্গ রক্ষার জন্য পিটার দ্য গ্রেটের নির্মিত নৌ দুর্গ।

মিউজিয়ামটির অভ্যন্তরের একাংশ; ছবিসূত্র: In Your Pocket

কয়েকটি সেতু জাদুঘরটির বহির্গমন পথের সাথে সংযুক্ত আছে। যার ফলে এই পথ দিয়ে নৌ-বিমান এবং বরফ-ভাঙা জাহাজের পথের মিলনের সৃষ্টি হয়েছে এবং পর্যটকেরা চাইলে সেই সব নৌ-বিমানে চড়ে সমুদ্রের গহীনের প্রাণীদের সাথে দেখা করতে পারেন কিংবা বরফ-ভাঙা জাহাজে চড়ে সমুদ্রের বুক চিঁরে ঘুরে বেড়াতে পারবেন।

এছাড়াও জাদুঘরটিতেই রয়েছে ১৯৩০ সালে ব্রিটিশদের দ্বারা নির্মিত একটি সাবমেরিন ‘লেম্বিট’। এটিই একমাত্র যুদ্ধজাহাজ যেটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ের আগে নির্মিত হয়েও এখনো টিকে আছে। পর্যটকেরা চাইলে এই যুদ্ধজাহাজে চড়ে সমুদ্রের গহীনে জীবনের অনুসন্ধান করে আসতে পারেন।

৫. সবার সাথে গানে মেতে উঠুন এস্তোনিয়ান সংগীত উৎসবে

স্থানীয় সবচেয়ে জনপ্রিয় সঙ্গীত উৎসব এটি। খোলা আকাশের নিচে প্রায় শতাধিক গানের দল একসাথে অংশ নেয় এই উৎসবে। আর গানের এই মিলন-মেলা অনুষ্ঠিতও হয় পাঁচ বছর পর পর। এই উৎসবের পরবর্তী আসর বসবে ২০১৯ অর্থাৎ আগামী বছরেই। সুতরাং অনুষ্ঠানটি মিস করা ঠিক হবে না মোটেই!

ছবিসূত্র: Travelsignposts

এই ঐতিহ্যের সূত্রপাত ঘটে ১৮৬৯ সালে, এস্তোনিয়ার গণজাগরণের সময়কালে। সেই সময়ে এস্তোনিয়ার অধিবাসীরা তাদেরকে একটি সংঘবদ্ধ দেশের অধিবাসী হিসেবে ভাবতে শুরু করে। পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালে এসে হাজার হাজার সঙ্গীতশিল্পী একত্রিত হয়ে দেশাত্মমূলক গান গাওয়ার মাধ্যমে সোভিয়েত শাসন থেকে মুক্তির দাবি জানায় এবং স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই ঐতিহ্যবাহী গানের উৎসবে প্রায় ১৮,০০০ কণ্ঠের মিলিত স্বরে গাওয়া গান এক অনন্য স্মৃতি হয়ে থাকবে অংশগ্রহণকারী পর্যটকদের মানসপটে। 

৬. ওল্ড বিলিভার্সদের সাথে সাক্ষাতে লেক পেইপসি ভ্রমণ

ওল্ড বিলিভার্স চার্চ; ছবিসূত্র: Visit Estonia

সপ্তদশ শতাব্দীতে রাশিয়ার একটি অর্থোডক্স চার্চের কিছু সদস্যকে ফাঁসির হুকুম দেওয়া হলে তারা পালিয়ে চলে আসেন এস্তোনিয়াতে। সেই সদস্যদের দোষ ছিল তারা রাশিয়ান শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। এই সদস্যরাই ইতিহাসের পাতায় পরিচিত ‘ওল্ড বিলিভার্স’ হিসেবে। এই বর্তমানকালেও সেই ওল্ড বিলিভার্স গ্রুপের সদস্যরা বেঁচে আছেন এস্তোনিয়ার পেইপসি লেকের তীরে।

এই লেকটি ইউরোপের পঞ্চম বৃহত্তম লেক এবং রাশিয়া ও এস্তোনিয়ার বর্ডারে অবস্থিত। ওল্ড বিলিভার্সের সদস্যরা এখনো বহু বছর পুরনো নিজস্ব ঐতিহ্য বহন করে চলছেন। তারা নিজেদের টিকিয়ে রাখছেন লেক থেকে মাছ শিকার এবং নিজস্ব পদ্ধতিতে শসা এবং পেঁয়াজ চাষের মাধ্যমে। 

নিজস্ব পদ্ধতিতে শসা এবং পেঁয়াজ চাষ; ছবিসূত্র: View From the Pier

 ৭. ওতেপাতে স্কি, স্লেজ কিংবা স্নো-বোর্ডিং

ওতেপা নামক ছোট্ট শহরটিতে প্রাণ আসে শীতের সময়ে। এটি বাল্টিক সাগর তীরবর্তী অঞ্চলগুলোর মধ্যে শীতকালীন খেলাধুলার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এছাড়া এস্তোনিয়ার স্কিইং এবং স্কি-জাম্পিংয়ের রাজধানী হিসেবেও পরিচিত।

এই শহরটি স্কিয়ার্স, স্নোবোর্ডার্স, টিউবারস এবং স্লেজারদের জন্য স্বর্গ হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় বহু দেশ থেকে দলে দলে লোক এসে ভিড় জমান এই শহরে। এছাড়াও এস্তোনিয়ান অলিম্পিক টিমের ট্রেনিং গ্রাউন্ড হিসেবেও এই শহরটি পরিচিত।

ছবিসূত্র: Visit Estonia

শীতকাল বাদেও গ্রীষ্ম কিংবা বসন্তে শান্তিতে সময় কাটাতে অনেকেই আসেন এই শহরে। তাছাড়া নয়নকাড়া সৌন্দর্যে ভরপুর পুহাজারভ লেক এবং এর আশেপাশের প্রশান্তিময় গ্রামীণ পরিবেশ ও ছোট আকারের পাহাড়ে ঘেরা প্রকৃতি উপহার দেয় চনমনে মন। এমন পরিবেশে চুপচাপ হেঁটে বেড়ালে শরীর ও মন দুটোই পায় পর্যাপ্ত তৃপ্তি।  

পুহাজারভ লেক; ছবিসূত্র: Visit Estonia

প্রকৃতির অপার বিস্ময়ে ভরপুর এসব দেশ ভ্রমণের মাধ্যমে নিজে থাকুন মানসিকভাবে সুস্থ। এছাড়া ছবি কিংবা ভিডিওর মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ করুন অন্যান্য পর্যটক ভাই-বোনদেরও।

ফিচার ইমেজ: CV Travel

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

তাজিংডং থেকে ফেরার বিভীষিকার গল্প

সাশ্রয়ী উপায়ে জাপান ভ্রমণের ইতিবৃত্ত