গ্রীষ্মের দিনে শান্তির সন্ধানে: ভারতের ৭টি হিল স্টেশনে ট্রেন ভ্রমণ

ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ২০০ বছর থাকতে হয়েছে এই ভারতীয় উপমহাদেশকে। ব্রিটিশরা তাদের এই দীর্ঘ শাসনামলের নানা চিহ্ন রেখে গেছে পুরো ভারতবর্ষের বুক চিরে। বিশেষ করে বর্তমান ভারতে, গরমের সময়ে অতিষ্ঠ হয়ে তারা খুঁজে বের করেছিল ভারতের এমন কিছু জায়গা, যেখানে গেলে তাপমাত্রা কিছুটা কম থাকবে আর ছুটিও কাটানো যাবে শান্তিতে। সেসব অঞ্চলগুলোতে যাওয়ার জন্য তারা বসিয়েছিল রেললাইন, তৈরি করেছিল ট্রেন স্টেশন। বর্তমানে ট্রেন স্টেশনগুলোর কল্যাণে সেসব পাহাড়ি এলাকাগুলো ট্যুরিস্টদের জন্য সহজভেদ্য এবং বিশাল আকর্ষণের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড়, সেই পাহাড়ের ঢালে বেড়ে ওঠা চা বাগানের সবুজ সতেজ ভাব পর্যটকদের মনে আনে প্রশান্তি। ভারতীয়দের হানিমুন কিংবা পরিবার নিয়ে ঘুরে বেড়াবার জন্য আদর্শ এই জায়গাগুলো বিদেশী পর্যটকদের জন্যেও বিশুদ্ধতার এক পরম আশ্রয়। ট্রেনে করে ভারত ভ্রমণে সুবিধা হতে পারে এরকম ৭টি পাহাড়ি ট্যুরিস্ট স্পট নিয়েই লিখছি আজ।

১. ব্রিটিশ স্থাপত্যশিল্পে ঘেরা: শিমলা

‘পাহাড়ের রানী’ হিসেবে খ্যাত শিমলা, ব্রিটিশ রাজদের জন্য ছিল গরমে ছুটি কাটানোর জন্য সবচেয়ে পছন্দের জায়গা। সে কারণে সেখানকার স্থাপত্যশিল্পের মধ্য দিয়ে শিমলায় তাদের অস্তিত্বের চিহ্নও রয়ে গেছে অনেকখানি। বিশেষ করে হলদেটে রঙের পুরনো গির্জা কিংবা রাষ্ট্রপতি নিবাস, যেখানে ভারতের স্বাধীনতা নিয়ে পরিকল্পনা হয়েছিল এগুলো যেন ইংল্যান্ডের প্রতি সেইসব ব্রিটিশ রাজদের ভালোবাসার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আজও। বিকেলের দিকে ঘোরাঘুরির জন্য আসা পর্যটকেরা ভিড় জমায় শিমলার রাস্তার পাশের দোকানগুলোয়। তাদের হাতে থাকে আইসক্রিম কিংবা বেলুন।

পাহাড়ের রাণী শিমলা ; ছবিসূত্র: sabamonin/Creative Commons

২. টয় ট্রেনের নগরী: দার্জিলিং

দার্জিলিংয়ের অবস্থান পশ্চিমবঙ্গে, হিমালয়ের পাদদেশে। এখানে যাওয়া যায় উনিশ শতকের টয় ট্রেনে চড়ে। সেগুলো এখন কতটা ভালো সুযোগ সুবিধা দেয় সেটা নিয়ে নিশ্চিত কিছু বলা না গেলেও এটা বলা যায় যে, সেসব ঐতিহ্যবাহী টয় ট্রেন পর্যটকদের নজর না কেড়ে পারে না। ১৯৯৯ সালে দার্জিলিংয়ের এই হিমালয়ান টয় ট্রেন ব্যবস্থাকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত ঘোষণা করেছে।

দার্জিলিং নেপাল এবং তিব্বতের সীমানা ঘেঁষে অবস্থিত হওয়ায় সন্ধ্যার দিকে অবশ্যই আপনাকে ভারী জামাকাপড় পরে স্থানীয় বাজারের দিকে গিয়ে সবচেয়ে সেরা গরম গরম মোমো (এক ধরনের নেপালী খাবার) কিংবা থুকপা (নুডলস স্যুপ) খেয়ে শরীর রাখতে হবে চাঙা! এছাড়া দার্জিলিংয়ের চা কিংবা চা এর বাগান দেখার কথা নিশ্চয়ই আলাদাভাবে বলে দিতে হবে না!

হিমালয়ের আশীর্বাদপ্রাপ্ত টয় ট্রেন, পাহাড় এবং চায়ের শহর দার্জিলিং ; ছবিসূত্র: Anirban Biswas/flickr

৩. নিবিড় চিত্তে অন্তরাত্মার সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে: ঋষিকেশ

হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত ঋষিকেশের সবুজে ঘেরা উপত্যকার মধ্য দিয়ে পবিত্র গঙ্গা নদীর বরফ-শীতল পানি বয়ে চলেছে সমতলের দিকে। ১৯৬০ সালের দিকে যখন ব্রিটিশ রক ব্যান্ড বিটলস  এখানকার একটি আশ্রমে থাকতে আসেন, তখন থেকেই ঋষিকেশ পশ্চিমাদের কাছে একটি আকর্ষণের জায়গা হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে বিভিন্ন বিখ্যাত আশ্রমের অধীনে নানারকম যোগব্যায়াম কিংবা এখানে আসা প্রচুর মানুষজনের নিবিড় মনে অন্তারাত্মার অনুসন্ধানের ইচ্ছা এই অঞ্চলকে খেতাব দিয়েছে ‘Yoga capital of the world’ হিসেবে।

এছাড়াও পর্যটকদের কাছে এখানকার প্রধান আকর্ষণ লছমনঝোলা।  ইস্পাতের সেতু পেরিয়ে দেখে নেওয়া যায় গীতা ভবন, কৈলাসানন্দ আশ্রম, বাবা কালিকমলির সমাধিস্থল, স্বর্গাশ্রম, রামঝুলা ও লক্ষ্মণঝুলা। বাড়তি পাওয়া হিসেবে থাকছে প্রতিদিন সূর্যাস্তের সময়ে অপূর্ব সুন্দর এক আকাশ।

ঋষিকেশের লক্ষ্মণঝুলা সেতু থেকে দেখা অপার্থিব সৌন্দর্যের সূর্যাস্ত ; ছবিসূত্র: Tyler Sundance

৪. চা এর রাজ্য: মুন্নার

চা বাগানের সবুজের সমারোহে ভরপুর কেরালার পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত মুন্নার। কেরালাকে বলা হয়, স্বয়ং বিধাতার নিজের রাজ্য, সোজা বাংলায় ‘স্বর্গ’। আর সেই স্বর্গের সুন্দরতম এলাকা বোধহয় এটি। মুন্নার, দক্ষিণ ভারতের চা উৎপাদনের রাজধানী। ক্রম বিস্তৃত উচ্চভূমির উপর প্রসারিত সবুজ চা বাগানের এই সৌন্দর্য যেমন একইসাথে চোখ ধাঁধিয়ে দেয় তেমনি চা চাষের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটির সাথেও চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা হয়ে যায় পর্যটকদের।

মুন্নারের ঠিক বাইরেই টাটা চা জাদুঘরটি এই অঞ্চলের চা চাষের ইতিহাস ঐতিহ্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। যেহেতু ১৮৮০ সাল থেকেই এই অঞ্চলে চা চাষ হয়ে আসছে তাই সেই জাদুঘরের মাধ্যমে চা চাষের প্রাচীন যন্ত্রপাতির সাথেও পরিচয় হয়ে যায়। এছাড়াও স্থানীয় দোকানগুলোতে চাইলেই পাওয়া যায় বিশুদ্ধতম চায়ের সন্ধান।

দক্ষিণ ভারতের চা উৎপাদনের রাজধানী মুনার ; ছবিসূত্র: munnartrekkingadventure.com

৫. বন্যপ্রাণীর খোঁজে: ওয়েনাদ

এটি কোনো সাধারণ ট্রেন স্টেশন নয়। ওয়েনাদ ভারতের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের পাহাড়ি ঢালের উপর বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল সমৃদ্ধ এলাকা। যদিও এখানে থাকার জন্য শহর (বিশেষ করে কালপেট্টা, মানান্থাভাদি এবং সুলতান বাথারি) তৈরি করা হয়েছে, তবু এখানকার প্রকৃত রোমাঞ্চের খোঁজে পাহাড়ি জঙ্গলের গহীনে থাকাই উত্তম। আপনার চারপাশ ঘিরে থাকবে ধানক্ষেত ও বাহারী মশলার গাছ।

ঠিক সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের সময়ে এখানকার বণ্যপ্রানী সংরক্ষণ কেন্দ্র (যেটি ইউনেস্কোর নীলগিরি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ প্রকল্পের অধীন) জীবন্ত হয়ে ওঠে। আপনি চাওয়ার আগেই পেয়ে যেতে পারেন বন্য হাতি, হরিণ সহ নানা বন্যপ্রাণীর দেখা। তবে বাঘের দেখা মেলে খুবই কম, সেই আশা না করাই ভালো।

বন্যপ্রাণীর আঁধার হিসেবে পরিচিত পাহাড়ি ওয়েনাদ ; ছবিসূত্র: Vythiri Resort, Wayanad

৬. দালাই লামার শহরে: ধর্মশালা

বিশ্ববিখ্যাত পরিচালক মার্টিন স্করসেজির ১৯৯৭ সালে নির্মিত Kundun সিনেমাটি নিশ্চয়ই দেখা আছে আপনার। সেখান থেকে তিব্বতের এক ছোট্ট শিশুর একটি দেশের ধর্মগুরু হয়ে ওঠার গল্পটিও জেনে থাকবেন। এছাড়াও কে না জানে তিব্বতের ধর্মগুরু দালাই লামার কথা! তিব্বতের এই ১৪তম দালাই লামা ১৯৫৯ সালে চীনের আগ্রাসনের ফলে তিব্বত ছেড়ে পালিয়ে চলে আসেন এই ধর্মশালায়। প্রতিষ্ঠা করেন তিব্বতিয় কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা (তিব্বতের নির্বাসিত সরকার)।

পাহাড়ি ঢালে পাইন গাছে ছাওয়া উত্তর ভারতের শান্তিময় এই শহরে সেই সময় থেকেই বসবাস করে আসছেন বর্তমান দালাই লামা। নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত বর্তমান দালাই লামার সাথে সামনাসামনি দেখা হতে পারা এবং তার গণ-ক্লাসে অংশ নিতে পারা রোমাঞ্চকর এক অভিজ্ঞতা পর্যটকদের জন্য। কিন্তু আপনার যদি দালাই লামার সাথে দেখা না-ও হয়, সেখানকার ‘দালাই লামা টেম্পল কমপ্লেক্স’ হতে তিব্বত সম্পর্কিত তথ্যাবলি জানতে পারাও কিন্তু কম নয়!

পাহাড়ের ভাঁজে সবুজের সমারোহে ধর্মশালা ;  ছবিসূত্র: mapsofindia.com

৭. অ্যাডভেঞ্চারের খোঁজে: মানালি

রিসোর্টের নগরী মানালি থেকে হিমালয়ের মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য খালি চোখেই ধরা পড়ে বলে এখানে বহুবার বলিউডের অনেক ব্লকবাস্টার সিনেমার শ্যুটিং হয়েছে। সেই সকল মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের বর্ণনা নাহয় না-ই দিলাম, গ্রীষ্মে পর্যটকদের মানালি আকর্ষণ করে অ্যাডভেঞ্চারের জন্য। বিশেষ করে ট্রেকিং, হোয়াইট ওয়াটার র‍্যাফটিং, প্যারাগ্লাইডিং, পাহাড়ে চড়া, র‍্যাপেলিং ইত্যাদি নানারকম অ্যাডভেঞ্চারের জন্য এই মানালিই তখন সর্বোৎকৃষ্ট ট্যুরিস্ট স্পট!

অপূর্ব সুন্দর নগরী সাথে এডভেঞ্চারের হাতছানি নিয়ে ডাকে মানালি ; ছবিসূত্র: adventures365.in

ভারতের গ্রীষ্মকাল থাকে এপ্রিল, মে এবং জুন জুড়ে। সে সময়েই ভারতীয়দের ভীড় বাড়ে এইসব অঞ্চলে। কিন্তু বছরের যেকোনো সময়েই আপনি পেতে পারেন এই সীমাহীন পাহাড়ি সৌন্দর্যের সান্নিধ্য। দিন তারিখ ঠিক করে বেরিয়ে পড়ুন আর ট্রেনে চড়ে ভারত ভ্রমণের সময়ে একইসাথে ঘুরে আসুন এসব অপূর্ব সুন্দর ট্যুরিস্ট স্পটগুলো থেকে!

ফিচার ইমেজ- Rafal Cichawa/Thinkstock/iStock

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

একদিনে সীতাকুণ্ডের সুপ্তধারা, সহস্রধারা ও বাঁশবাড়িয়া বীচ ভ্রমণের ইতিবৃত্ত

জল ও জঙ্গলের কাব্যে বৃত্তের সাথে একটি পুরো দিন