দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার পাঁচটি আন্ডাররেটেড শহর

আধুনিক ব্যাংকক, ঐতিহাসিক হানোই কিংবা ভুবনবিখ্যাত অ্যাংকর ওয়াট মন্দিরের শহর সিয়েম রিপ — এগুলোই হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় কিছু স্থান যেখানে প্রতি বছর হাজারো দর্শনার্থী ভিড় করে। কিন্তু এই অঞ্চলে আরও অনেক জায়গাই আছে যেগুলো প্রায় একই বা কাছাকাছি পরিমাণ বিস্ময়কর সৌন্দর্যে পূর্ণ হলেও দর্শনার্থীদের সুনজরে পড়েনি এখনো। আজ আলোচনা করবো এমনই পাঁচটি আন্ডাররেটেড শহর নিয়ে।

১. সান্দাকান, মালয়েশিয়া

সান্দাকান শহরটিকে ঘিরে রেখেছে বুনো প্রকৃতির ছোঁয়া। শহরের কেন্দ্র থেকে কয়েক কিলোমিটারের মধ্যেই সেপিলক পুনর্বাসন কেন্দ্রে আসলে দেখা মিলবে ওরাংওটাঙের। এছাড়াও বর্নিয়ান সান বিয়ার পুনর্বাসন কেন্দ্রে দেখা হবে বর্নিয়ান ভাল্লুকের সাথে।

তবে যদি একটু প্রাণীদের কোলাহলের সঙ্গী হতে চান তাহলে যেতে পারেন লাবুক বে প্রবোসিস বানর অভয়ারণ্যে। এখানে পর্যটক হিসেবে সুযোগ সুবিধা কম মিললেও বর্নিও অঞ্চলের প্রাণীকুলের সাথে খুব কাছ থেকে দেখা হওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে।

বর্নিয়ান সান বিয়ার পুনর্বাসন কেন্দ্রে; ছবিসূত্র: Wikipedia

এসব জায়গা দেখা শেষে যেতে পারেন কিনাবাতাঙ্গান নদীতে। সাবাহ প্রদেশের সবচেয়ে বড় পানির উৎস এই নদীটি। একইসাথে বন্যপ্রাণীদের দেখা পাওয়ার জন্যও উৎকৃষ্ট জায়গা। হাতে সময় নিয়ে আসবেন যেন পিগমি হাতিগুলোর চলাচল দেখে যেতে পারেন, তবে কুমিরের ব্যাপারে সাবধান থাকতে ভুলবেন না!

কিনাবাতাঙ্গান নদীতীরে পিগমি হাতির দল; ছবিসূত্র: Jason isley/scubazoo.com

২. নান, থাইল্যান্ড

ওয়াট ফুমিন; ছবিসূত্র: Pinterest/Fabio Fabbri

নান অঞ্চলের ঐতিহ্যের সাথে মিশে আছে এখানকার মন্দিরগুলোর গায়ের ম্যুরাল পেইন্টিঙগুলো। বিশেষ করে শহরের মাঝখানে, প্রাচীন ওয়াট ফুমিনের ম্যুরালগুলো এই জায়গাটির সৌন্দর্যকে করে তুলেছে অমর। থাই লু জনগোষ্ঠীর নির্মিত এই অসাধারণ স্থাপত্যটি জীবন্ত হয়ে উঠেছে এখানকার স্থানীয় প্রাচীন জনজীবনের কথকতা দেয়ালের ম্যুরালে ফুটিয়ে তোলার মাধ্যমে।

এমনকি এই অঞ্চলে প্রথম ইউরোপীয় কলোনাইজারদের আগমনের কথাও ম্যুরালগুলোতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, ইতিহাস বলে থাইল্যান্ড দেশটি নিজে কখনো কোনো ইউরোপীয় কলোনাইজারদের অধীনে ছিল না।

ওয়াট ফুমিনের দেয়ালের ম্যুরাল; ছবিসূত্র: Thailnadee

যা-ই হোক, নানের আসল সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলে আপনার একটি যানবাহন ভাড়া করতে হবে, যেমন ধরুন একটি প্রাইভেট কার। তারপর সেটিতে করে নানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ঘুরে ঘুরে দেখবেন।

এছাড়া শহর থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার উত্তরে ‘থাম পা’ ফরেস্ট পার্কে হাইকিং করবেন কিংবা দক্ষিণে ৫০ কিলোমিটার গেলে স্যান্ডস্টোন পিলার দ্বারা নির্মিত ‘সাও দিন না নই’ একটি দারুণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের উদাহরণ।

সাও দিন না নই; ছবিসূত্র: Wikimedia Commons

সময় করে একবার নান রিভারসাইড আর্ট গ্যালারিতেও ঢুঁ দিয়ে যেতে পারেন। দোতলা বিশিষ্ট এই আর্ট গ্যালারিতে থাইল্যান্ডের বর্তমান নানা শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়ে থাকে। এছাড়া এখানে নিয়মিত পরিচর্যা করা হয় এমন একটি বাগানের মাঝে দারুণ একটি ক্যাফেও রয়েছে। কফি কিংবা স্থানীয় কোনো পানীয় খেয়ে নিজেকে চাঙ্গা করে নিতে পারবেন।

৩. দাওয়েই, মায়ানমার

মায়ানমারের দক্ষিণাঞ্চলের রাজধানী থানিনথারই অঞ্চল, থাইল্যান্ডের সাথে একই সমুদ্র সৈকতের অধীন, যার নাম আন্দামান সৈকত। কিন্তু আন্দামানের তীরবর্তী পর্যটক আকর্ষণের স্থানগুলোর মধ্যে দাওয়েই হচ্ছে সবচেয়ে প্রশান্তির একটি জায়গা। তাছাড়া এটি পুরো মায়ানমারের মধ্যে সবচেয়ে পরিষ্কার শহরগুলোর মধ্যেও একটি।

পুরো মায়ানমারের মধ্যে এই অঞ্চলেই কলোনিয়াল যুগের সবচেয়ে বেশী পরিমাণ স্থাপত্য টিকে আছে, যেসকল জায়গা আকর্ষণ করবে যেকোনো পর্যটককেই। এই স্থাপত্যগুলো বাদেও এখানকার আরও আকর্ষণের জায়গা হলো এখানকার প্রায় জন-মানবহীন সমুদ্র সৈকতগুলো।

কলোনিয়াল স্থাপত্য; ছবিসূত্র: Urs Flueeler

মাওংমাকান, শহরের নিকটবর্তী হওয়ায় এবং স্থানীয়দের কাছেও জনপ্রিয় হওয়ায় এখানে ইদানীংকালে পর্যটক আকর্ষণের জন্য কিছু উন্নয়নমূলক কাজ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কিছুটা ভেতরের শহর মসকস দ্বীপের ভেতরের দিকে যেখানে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে সেটি এখনো পর্যটকদের ধরাছোঁয়ার বাইরেই।

এখানকার উপদ্বীপের নিকটবর্তী সৈকত দিয়ে মোটরবাইক ভাড়া করে ঘুরে বেড়াতে পারেন এবং চাইলে থানিনথারই ন্যাশনাল পার্কের রেইনফরেস্টে গিয়ে প্রকৃতির সাথে সময় কাটাতে পারেন।

মাওংমাকান সৈকত; ছবিসূত্র: go-myanmar.com

৪. দাভাও, ফিলিপাইন্স

ফিলিপাইন্সের সর্ব দক্ষিণের নিরাপত্তা-বেষ্টিত দ্বীপাঞ্চল মিন্দানাওয়ের একটি জায়গা দাভাও। এখানকার অতিথিপরায়ণ স্থানীয় লোকজন এবং বেশ কিছু দর্শনীয় স্থান এই অঞ্চলটিকে করেছে আকর্ষণীয়।

দ্বীপের নাম স্লিপিং ডায়নোসর; ছবিসূত্র: Trover.com

এখানে এসে স্থানীয় বারাঙ্গা বাদাস পাহাড়ের চূড়ায় উঠে স্লিপিং ডায়নোসর নামক দ্বীপটি দেখবেন। এটি ফিলিপাইনের সবচেয়ে অদ্ভুত আকৃতির একটি দ্বীপ, তাই এরকম নামকরণ। এছাড়া আপনি যদি আরও উচ্চতা পছন্দ করেন, পাশাপাশি বুনো জীবজন্তুর দেখা পেতে চান তাহলে, হামিগুইতানে যেতে পারেন।

এটি ইউনেস্কোর অন্তর্ভুক্ত ১,৬২০ মিটার উচ্চতা সম্পন্ন একটি পাহাড় যেখানে হাইকিং ট্রেইল রয়েছে, ট্রি-টপ এক্টিভিটি রয়েছে আবার একই সাথে এটি একটি রিজার্ভ ফরেস্টও। শহর থেকে খুব একটা দূরেও নয় এর অবস্থান।

হামিগুইতান পাহাড়; ছবিসূত্র: Google Sites

কিন্তু আপনি যদি পাহাড়ের চেয়ে সমুদ্রের প্রতি বেশী আকর্ষণ অনুভব করে থাকেন তাহলে দাভাও থেকে ২০ কিলোমিটার পূর্বে রয়েছে সাদা বালুর দ্বীপ, পুজাডা। স্থানীয় মাতি নামক জেলা থেকে নৌকায় করে মাত্র ৪০ মিনিটের দূরত্ব। এখানে আপনি পাবেন দাহিকান সৈকত, যেখানে বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে সাদা বালুর রাজত্ব।

তাছাড়া সার্ফিং পছন্দ করলে এটি হতে পারে আপনার ভ্রমণের অন্যতম সেরা আকর্ষণ। সৈকতের কাছেই স্কিমবোর্ডারদের বেশ বড় একটা কমিউনিটিও আছে।

৫. বান্দা নেইরা, ইন্দোনেশিয়া

আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের ফলে সৃষ্ট পাহাড় গুনুঙ আপির কারণে ইন্দোনেশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের মালুকুর বান্দা দ্বীপপুঞ্জতে যাওয়া বেশ কষ্টকর। কিন্তু যেতে পারলে সেটি নিঃসন্দেহে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ইন্দোনেশিয়ার দুর্ভেদ্য এই দ্বীপপুঞ্জের বান্দা নেইরা জায়গাটি জয়ফল এবং মেসের জন্য ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে আকর্ষণ করেছিল। এখানকার স্থানীয় মরিস্টিকা গাছে এই উপকারী মশলাগুলো প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হতো, এখনো হয়।

এখানকার ছোট ছোট কিছু ক্যাফে আর একমাত্র এটিএম বুথটিকে বাদ দিলে বান্দা নেইরাকে এখনো তার কলোনিয়াল যুগের ব্যস্ত সময় থেকে খুব একটা আলাদা করা যায় না। পর্যটকরা এখানে বেড়াতে আসেন নির্ভয়ে-নিশ্চিন্তে কিছু সময় কাটানোর উদ্দেশ্যে।

অন্যান্য জায়গার মতো ভিড় না থাকায় এখানে ডাইভিং কিংবা স্নোরকেলিং এর সুযোগ সুবিধা পর্যটকদের আকর্ষণ করে। এছাড়া সব মিলিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া তো বটেই কখনো পুরো পৃথিবীর মধ্যেই সবচেয়ে বেশী প্রাকৃতিক আরাম-আয়েশের সুবিধা-সম্পন্ন জায়গা হিসেবে বান্দা নেইরা সুপরিচিত হয়ে উঠছে।

বান্দা নেইরার একাংশ; ছবিসূত্র: erikbmx/reddit

সুপরিচিত জায়গাগুলোর পাশাপাশি এরকম অপরিচিত জায়গাগুলো ভ্রমণের মাধ্যমে আপনি যেমন প্রচুর পর্যটকের ভিড় এড়িয়ে শান্তিতে ঘুরে বেড়াতে পারবেন তেমনি নতুন অঞ্চলে ঘুরে আসার মাধ্যমে সেখানকার স্থানীয় লোকজনের জন্য অর্থসংস্থানের উপায়ও হয়।

এরকম অঞ্চলগুলোতে ঘুরতে যাওয়ার মাধ্যমে সেসব অঞ্চলের অজানা নানা তথ্য আপনি নিজেই আবিষ্কার করতে পারেন এবং সেগুলো জানিয়ে দিতে পারেন পুরো বিশ্বকে। এর মাধ্যমে এসব জায়গাগুলো নতুন পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠতে পারবে।

ফিচার ইমেজ: indoglobaltours.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আভিজাত্য হারানো ধ্বংসপ্রায় লক্ষ্মণ সাহা জমিদার বাড়ি

নির্মল হাওয়ায় চন্দ্রনাথের চূড়ায়