লাওস ভ্রমণ: মনোমুগ্ধকর ৫টি জলপ্রপাত

ভূখণ্ড দ্বারা বেষ্টিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি দেশ লাওস। এখানকার পানির প্রধান উৎস এখানকার নদীগুলো। এছাড়া উঁচু পাহাড়ের সবুজে ঘেরা এই দেশটি ভ্রমণ-প্রিয় মানুষদের কাছে শান্তির প্রতিশব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের দেশের মতোই লাওসের আবহাওয়াতেও মৌসুমি জল-হাওয়ার প্রভাব রয়েছে। ফলে এখানে ভালো পরিমাণে বৃষ্টিপাত হয় আর পাহাড়ের প্রাচুর্যের ফলে সৃষ্টি হয়েছে বেশ কিছু প্রাকৃতিক ঝর্ণারও। সুতরাং বুঝতেই পারছেন, লাওসে ঝর্ণার সংখ্যা অনেক; ফলে জলপ্রপাতও বেশি থাকবে, এটাই স্বাভাবিক।

ছবিসূত্র: bbc.com

সুউচ্চ পাহাড় থেকে ঝরে পড়া ঝর্ণার জলধারা উপভোগ না করলে লাওস ভ্রমণটাই বৃথা হয়ে যায়! কিছু কিছু ঝর্ণার পানি নিচে এসে জমে আকার নিয়েছে ছোট আকারের দীঘিতে। এখানে ভ্রমণে এসে অবশ্যই ঝর্ণার পানিতে গোসল করবেন কিংবা কেবল ঝর্ণার ছবি তুলবেন ঠিকই, তবে মনে রাখবেন লাওসের অধিবাসীরা বেশ রক্ষণশীল।

আপনার অযাচিত চেঁচামেচি তাদের ভালো লাগবে না একদমই। তাছাড়া মেকঙ নদী ছাড়া এইসব ঝর্ণা এবং জলপ্রপাতগুলোই তাদের একটি বড় পানির উৎস হওয়ায় তারা এসব ঝর্ণা এবং জলপ্রপাতগুলোকে বিশেষভাবে সম্মান করে। গেলে সেখানকার স্থানীয় লোকদের চোখে শালীন এমন কোনো জামাকাপড় পরাই শ্রেয়।

যাই-হোক, আজ লিখছি লাওসের চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্যে ভরপুর ৫টি জলপ্রপাত নিয়ে।

১. ট্যাড সা ওয়াটার-ফলসলুয়াঙ প্রাবাঙ প্রদেশ

সারা বছরের জন্য না হলেও বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ট্যাড সা ওয়াটার-ফলস পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতেই থাকে। ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের অন্তর্ভুক্ত শহর লুয়াঙ প্রাবাঙ থেকে দিনের মধ্যেই যাওয়া যায় এই জলপ্রপাতটিতে; দূরত্ব ১২ মাইল। যাত্রাপথেও আশেপাশের পরিবেশ মুগ্ধ করে রাখবে যেকোনো ব্যক্তিকেই। 

ছবিসূত্র: kento35/Shutterstock.com

সেখানে পৌঁছলেই দেখতে পাবেন স্থানীয় অধিবাসীদের গরমের দিনে জামাকাপড় গায়ে রেখেই গোসল করছে। জলপ্রপাতটির নানাবিধ ব্যবহারও রয়েছে, যেমন ধরুন তীব্র বেগে আসা জলপ্রপাতের জলধারা দিয়ে পিঠে হাইড্রো ম্যাসাজ করা। আশেপাশের পরিবেশ আপনাকে এই ধরনের মেডিটেশনের মধ্যে দিয়ে যেতে বেশ সাহায্যই করবে।

কাছেই অবস্থিত নাম খান নদীটি পার হতে টিকেট পার হতে হবে মোটর বোট সহকারে। সেখানে পাবেন ছোট্ট একটি রেস্টুরেন্ট। সাধারণত হালকা নাস্তা পাওয়া গেলেও বর্ষায় যখন পর্যটকদের ভিড় বাড়ে, তখন সেখানে স্থানীয় খাবারগুলোও পাওয়া যায়, যেমন: সবুজ পেঁপের সালাদ, ভাত কিংবা বারবিকিউ করা মাংস ইত্যাদি।

ছবিসূত্র: visit-laos.com

গত কিছু বছর ধরে জলপ্রপাতটির কাছের একটি অংশ হাতিদের বিচরণের কেন্দ্র হিসেবে পরিণত হয়েছে। যার ফলে এই ঝর্ণা দেখতে এসে আপনার সাথে দেখা হয়ে যাবে স্থানীয় হাতিগুলোর সাথেও। বিভিন্ন ট্যুর গাইড এবং এজেন্সি এখানে আসার ব্যাপারে আপনাকে সাহায্য করবে।

জলপ্রপাতটি বহমান থাকে জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত, তবে এখানে যাওয়ার সর্বোৎকৃষ্ট সময় হচ্ছে ‘গ্রিন সিজন’ তথা বর্ষাকাল। তখনই ঝর্ণাটি তার নিজ সৌন্দর্যে পুরোপুরি প্রস্ফুটিত হয়।

ছবিসূত্র: Peter McGahan/Flickr

২. ওয়ান হান্ড্রেড ওয়াটার-ফলস, নঙ খিয়াও প্রদেশ

ওয়ান হান্ড্রেড ওয়াটার-ফলস নামকরণের পেছনে কারণ যা-ই থাকুক, এই জলপ্রপাত দেখতে গিয়ে আপনার কেবল কিছু ঝর্ণার অভিজ্ঞতাই হবে না, সাথে পাবেন অ্যাডভেঞ্চারের খোঁজও। আর লাওসে কেউ বেড়াতে এলে তাদের ভ্রমণ তালিকায় এই রোমাঞ্চকর ট্রেকিংয়ের সাথে জলপ্রপাতে ভ্রমণ রাখতেই  হবে!

ছবিসূত্র: laostravelguide.org

নাম অও নদীর কাছে অবস্থিত এই ওয়ান হান্ড্রেড ওয়াটার-ফলসের যাওয়ার রাস্তা দিয়ে অ্যাডভেঞ্চারে পূর্ণ ট্রেকিংটির ব্যবস্থা করেছে টাইগার ট্রেইল ট্র্যাভেল নামক স্থানীয় একটি ট্যুর এজেন্সি। প্রায় ৭ কিলোমিটার জুড়ে এই ট্রেকিংয়ে রয়েছে জঙ্গলের মাঝ দিয়ে হাঁটাচলা, পাশাপাশি দেখা যায় স্থানীয় গ্রাম, সেখানকার অধিবাসী, বাড়িঘর।

তাছাড়া চলার পথে কিছুক্ষণ পরপরই পড়বে ঝিরি পথ, অসংখ্য ছোট ছোট ঝর্ণা। অভ্যর্থনা (!) জানাতে প্রস্তুত জোঁকও! তাই জোঁক থেকে কিন্তু সাবধান থাকবেন!

ছবিসূত্র: studio-mali.com

সুবিশাল জলপ্রপাতে পৌঁছে গা ভিজিয়ে নেবেন। জলপ্রপাতের জলধারা আপনাকে জোঁকের কামড়ের কষ্টও ভুলিয়ে দিবে। তবে বেশীক্ষণ সময় নেওয়া যাবে না। কেননা জলপ্রপাতে পৌঁছে যাবার পর এখন পালা পাথরের গা বেয়ে বেয়ে এর উৎসের পথে যাওয়া। যত কঠিন মনে হচ্ছে, তেমন না।

প্রতি বছরই বহু মানুষ এই পথ দিয়ে যাওয়া-আসা করছে, সম্পূর্ণ নিরাপদ। জলপ্রপাতের সামনের পাথর বেয়ে পাহাড়ের উপরে চড়তে সময় লাগবে ৩৫ মিনিটের মতো, পুরো হাইকিং এর সবচেয়ে সহজ অংশ বলা হয় এটিকে।

ছবিসূত্র: explore-laos.com

উপরে উঠতে গিয়ে ভিজে চুপচুপে হয়ে যাবেন অবশ্যই। তবে এখনো ট্রেকিং শেষ হয়নি। এরপর অন্য পাশ দিয়ে নামতে হবে সেই পাহাড় থেকে। ছোটবেলায় পার্কের স্লাইডে চড়েছেন? ‘নামা’ বলার চেয়ে সেরকম কাদায় স্লাইড করে নামা বলা ভালো।

দুই হাতে দুটো বাঁশের পোল দেওয়া হবে আপনাকে, ব্যাল্যান্স রাখার জন্য। ব্যাল্যান্স রাখতে পারলে তো ভালোই! নাহলে স্লাইড খেয়ে খেয়ে নামবেন। ছেলেবেলায় ফিরে গিয়ে অবশেষে ট্রেকিংটা শেষ হলো। ক্ষতি কী!

৩. খন ফাফেঙ, চাম্পাসাক প্রদেশ

খন ফাফেঙ জলপ্রপাতটির অবস্থান মেকঙ নদীর ঠিক পাশেই। ছোট ছোট অনেকগুলো প্রপাত মিলে সৃষ্টি হয়েছে এই জলপ্রপাতটির। কম্বোডিয়ার সীমান্তবর্তী চাম্পাসাক প্রদেশের এই জলপ্রপাতটি উচ্চতায় তেমন বেশী না হলেও জায়গার দিক দিয়ে (৯.৭ কিলোমিটার বিস্তৃত) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম জলপ্রপাত। লাওসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থানগুলোর মধ্যে এটি একটি।

ছবিসূত্র: bestpricevn.com

জলপ্রপাতটির অবস্থান যেখানে, তার নাম সি ফান ডন। যার অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, ‘চার হাজার দ্বীপপুঞ্জ’। মজার ব্যাপার হলো, এই জলপ্রপাতটি উপভোগ করার শ্রেষ্ঠ সময় শুকনো মৌসুমে। কেননা বর্ষার সময়ে মেকঙ নদীর পানির উচ্চতা বেড়ে গিয়ে এই জলপ্রপাতটিকে একেবারে ঢেকে ফেলে।

ছবিসূত্র: leolaksi.wordpress.com

জলপ্রপাতটির ঠিক উপরেই একটি প্যাভিলিয়ন বানানো হয়েছে, যেখান থেকে জলপ্রপাতটি সহ আশেপাশের অসংখ্য দ্বীপের সৌন্দর্য আরও ভালোমতো টের পাওয়া যায়। তাছাড়া সেই প্যাভিলিয়নের কাছে ফুড স্টল সহ রয়েছে স্থানীয় লোকজনের হাতের কাজ করা নানারকম দ্রব্য কেনার সুযোগ। 

৪. টেড ফান, চাম্পাসাক প্রদেশ

দক্ষিণ লাওসের চাম্পাসাক প্রদেশের বলাভান প্লাতেউয়ে এর অবস্থান। যমজ দুটি পাহাড়ি ঝর্ণা প্রায় ১০০ মিটার (৩৩০ ফুট) উচ্চতা থেকে পড়ছে ছোট্ট একটি গিরিখাতের উপর। প্রপাতটির অবস্থান একটি জঙ্গলের মধ্যে, যেখান থেকে চিতা বাঘ, হাতি এবং বানর দেখা যায় মুক্তভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দক্ষিণ লাওসের দিকে গেলে এই জলপ্রপাতটি দেখে যেতে ভুলবেন না!

ছবিসূত্র: sabaideevalley.com

৫. কুয়াঙ সি, লুয়াঙ প্রাবাঙ প্রদেশ

শুরু আর শেষ একই প্রদেশের জলপ্রপাত দিয়ে করলেও এই জলপ্রপাতটি বাকি আর সব জলপ্রপাতের চেয়ে আলাদা। কেননা বলা হয়, লাওসের জলপ্রপাতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশী প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ধারণ করে আছে কুয়াঙ সি জলপ্রপাতটি। অসংখ্য ঝিরিপথের মাঝে দেখা পাওয়া যায় ছোট বড় ঝর্ণা র মেলা।

আর সবচেয়ে বড় প্রপাতটি উচ্চতায় ৬০ মিটার (২০০ ফুট)! আপনি চাইলে মূল ঝর্ণাটির বামদিকের ট্রেইল ধরে এগিয়ে গেলে ঝর্ণাটির চূড়ায়ও উঠতে পারবেন। সেই চূড়া থেকে আশেপাশের পুরো অঞ্চলটির মন মাতানো দৃশ্য দেখতে পারবেন।

ছবিসূত্র: http://activeasia.online

জলপ্রপাতটির কাছেই সামান্য প্রবেশমূল্যের বিনিময়ে ভাল্লুক সংরক্ষণ কেন্দ্র থেকেও ঘুরে আসতে পারেন এবং অবশ্যই, কুয়াঙ সি পার্ক সংলগ্ন বাটারফ্লাই পার্কটি থেকে ঘুরে আসতে ভুলবেন না!

লাওস আমাদের দেশের মানুষজনের কাছে এখনো তেমন পরিচিত কোনো দেশ নয়। তবে নতুন নতুন দেশ ভ্রমণে কাউকে না কাউকে তো এগিয়ে আসতে হবেই! তাই ঘুরে আসুন লাওস থেকে। জলপ্রপাতের মেলায় ভিজে ভিজে বেড়িয়ে আসুন শান্তিপ্রিয় এই দেশটি থেকে।

ফিচার ইমেজ: vivutravel.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মালানা ভিলেজ, হিমালয়ের এক লুকানো রহস্য

বিদেশের মাটিতে বাজেট ট্রিপ: দার্জিলিং ভ্রমণ