পক্ষীপ্রেমিকদের জন্য ৫টি আকর্ষণীয় স্থান

উপন্যাস কিংবা সিনেমায় দেখা, বিশ্ববিখ্যাত ব্রিটিশ স্পাই জেমস বন্ডকে কে না চেনে! সেই জেমস বন্ডকে নিয়ে লেখার আগে লেখক ইয়ান ফ্লেমিংকে বহুদিন মাথা ঘামাতে হয়েছিল এই ভেবে যে, ব্রিটিশ স্পাইকে নিয়ে লিখতে চান ঠিক আছে কিন্তু তার নাম কী হতে পারে?

লেখন ইয়ান ফ্লেমিং ছিলেন একজন পক্ষীপ্রেমিক। তার সংগ্রহে একটি বই ছিল যার নাম Birds of West Indies. বইটির লেখকের নাম ছিল জেমস বন্ড, যিনি ছিলেন একজন আমেরিকান পক্ষীবিদ! সেই ব্যক্তির নাম দেখেই মনে ধরল ইয়ান ফ্লেমিংয়ের। জন্ম হলো জেমস বন্ড নামক স্পাইয়ের।

অনেকেই আছেন যারা পাখি দেখার জন্যই ভ্রমণে বের হন; ছবিসূত্র: Aragon Birding

আজকের আলাপ অবশ্য জেমস বন্ড কিংবা ইয়ান ফ্লেমিংকে নিয়ে নয়; বরং পাখি নিয়েই। ভ্রমণসূত্রে আমরা বিভিন্ন জায়গায় অনেক সময়ই অনেক দুষ্প্রাপ্য পাখির দেখা পাই। আবার একই রকম অনেকেই আছেন যারা পাখি দেখার জন্যই ভ্রমণে বের হন। এক ঢিলে দুই পাখি আরকি! পৃথিবীজুড়ে সেরকমই কিছু জায়গা নিয়ে লিখছি আজ। যেগুলোকে পাখির স্বর্গ বললেও ভুল হয় না।

শিকারি পাখির খোঁজে দাদিয়ায়: গ্রীস

দাদিয়া গ্রামের অবস্থান গ্রীসের উত্তরাঞ্চলে, অ্যালেক্সান্দ্রাপলিসে। গ্রামটি থেকে ঘণ্টা খানেকের হাঁটা দূরত্বে অবস্থিত পাখিদের আবাস দেখতে যাওয়ার পথেই আপনার মাথার উপরে চক্কর দিতে থাকবে গ্রিফন প্রজাতির শকুনেরা। ইউরোপের আটত্রিশটি শিকারি পাখির জাতের মধ্যে দুইটি জাতের পাখির দেখা মিলবে এই যাত্রাপথের বনাঞ্চলেই। জাত দুইটি হচ্ছে- কালো শকুন এবং সামুদ্রিক ঈগল। এখানকার স্থানীয় গাইডদের সূত্র অনুযায়ী সকাল নয়টা হচ্ছে এসব পাখি দেখার জন্য সর্বোৎকৃষ্ট সময়।

গ্রিফন প্রজাতির শকুন; ছবিসূত্র: Rewilding Europe

পাখি দেখার জন্য ঠিক সময়ে পৌঁছুতে পারবেন কিনা সেটা নিয়ে মনে সংশয় থাকলে দাদিয়ার ইকো-ট্যুরিজম সেন্টারেই থাকতে পারেন। বনের মধ্যে সাদা পাথর আর কাঠ নির্মিত একতলা ভবন সেটি।

এখানে থাকার আরেকটা বড় সুবিধা হলো, পাখি দেখার জন্য পরিবেশের সাথে ঠিকমতো মিশে যাওয়ার জন্য যে পর্যাপ্ত সময়টুকু দরকার সেটি আপনি পাবেন। স্থানীয় গ্রামের নীরবতার সাথে মিশে যাওয়ার পাশাপাশি ঘরের রান্নার গ্রামীণ স্বাদও নিয়ে নিতে পারবেন। স্থানীয় লোকজন খুবই অতিথিপরায়ণ।

দাদিয়ার ইকো-ট্যুরিজম সেন্টার; ছবিসূত্র: JTI Tour Guide System

এই অঞ্চলে ভ্রমণ বিষয়ক আরও বিস্তারিত তথ্য জানতে চাইলে, এখানে একটু ঢুঁ দিয়ে নিতে পারেন, www.ecoclub.com/dadia.

কিংফিশার ইকোলজ থেকে পাখি দেখা: লাওস

লাওসের চাম্পাসাক প্রদেশের উত্তরাংশে অবস্থান এই কিংফিশার ইকোলজের। লম্বা খুঁটির উপর নির্মিত এখানকার ছয়টি বাংলো প্রকৃতির সাথে মানিয়ে গিয়েছে পুরোপুরি। এর সবগুলোই আবার সোলার প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার মাধ্যমে পরিবেশগত কোনো প্রকার ক্ষতি থেকে রক্ষা করছে। তবে বাংলোগুলোর সবচেয়ে দারুণ ফিচার হচ্ছে বিশাল সাইজের কাঁচের জানালাগুলো মেলে দিলেই বিস্তৃত বনভূমির মধ্যে বসবাসের আমেজ পাওয়া যাবে।

কিংফিশার ইকোলজের একটি বাংলো; ছবিসূত্র: Enchanting Travels

এখান থেকে একইসাথে কাছের পাহাড়ে চড়ার ব্যবস্থা যেমন রয়েছে, সাথে রয়েছে অনেক পাখি দেখার সুযোগ। এখানকার ঘরে বানানো স্থানীয় খাবারদাবার পেট পুরে খেয়ে নিয়ে প্রকৃতির কোলে আরাম-আয়েশে দিন কাটাতে পারবেন।

এছাড়া ইকোলজটিতে যাওয়া, থাকা, খরচ ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত জানতে এই ওয়েবসাইটটি দেখুন www.kingfisherecolodge.com.

জায়ান্ট আইবিস পাখির খোঁজে: কম্বোডিয়া

বর্তমানে মাত্র একশ জোড়া আইবিস পাখি অবশিষ্ট আছে। তাই এই পাখিগুলোর দেখা পাওয়া যেকোনো পক্ষীপ্রেমিকের কাছে নিঃসন্দেহে আকাঙ্ক্ষিত। কিন্তু কম্বোডিয়ার উত্তরাঞ্চলের জলাভূমিতে, যেখানে তাদের সবচেয়ে বেশী বিচরণ ছিল, সেখানে বর্তমানে জনবসতি বেড়ে যাওয়ায় সেখানে তাদের দেখা পাওয়া ভার। বরং কুলেন প্রমটেম্প বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রে গেলেই আইবিস পাখিগুলোকে খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।

কম্বোডিয়ার জায়ান্ট আইবিস পাখি; ছবিসূত্র: Prey Lang Community Network 

সিয়াম রিপ থেকে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রের মধ্যে অবস্থিত একটি গ্রাম মাতবোয়ে পর্যন্ত চারদিনের একটি ট্যুরের ব্যবস্থা রেখেছে সেই কেন্দ্রটিই। দর্শনার্থীরা গাইডের কথামতো গ্রামটিকে ঘিরে থাকা স্যাঁতস্যাঁতে মাটি-যুক্ত জঙ্গল ঘুরে ঘুরে আইবিস পাখি খোঁজে। এখানে জায়ান্ট আইবিস পাখি যেমন আছে, তেমন White-Shouldered আইবিস পাখিরও দেখা পাওয়া যায়। এসব পাখিগুলো শুধুমাত্র এই জায়গাতেই বাসা বাঁধে।

White-Shouldered আইবিস পাখি; ছবিসূত্র: BirdLife International

এই পুরো পাখি ঘুরে দেখা কার্যক্রমের জন্য কিছুটা অর্থ ব্যয় করতে হয়, যার পুরোটাই চলে যায় এখানকার গ্রামের অধিবাসীদের কল্যাণে। যাতে করে তারা নিজ থেকেও এসব পাখিগুলো সংরক্ষণে যথাসাধ্য উৎসাহী হয়।

এই সম্পূর্ণ পাখি পর্যবেক্ষণ ট্রিপ সম্পন্ন করার জন্য বিস্তারিত জানতে পারবেন এখান থেকে – www.samveasna.org.

ঘুরে আসুন পাখির রাজ্য থেকে: জর্ডান

পক্ষীপ্রেমিকদের জন্য জর্ডান হলো স্বর্গের মতো! প্রতি বছর রঙবেরঙের লক্ষাধিক পাখি ইউরোপ, এশিয়া এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে অন্য দেশে ভ্রমণের ক্ষেত্রে জর্ডান হয়ে যায়। ফলে জর্ডান জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে খুব কাছ থেকে অসাধারণ কিছু প্রজাতির পাখি দেখার জন্য দর্শনীয় একটি দেশ হিসেবে।

বিশেষ করে জর্ডানের আকাবা নামক অঞ্চলটি। এই অঞ্চলের ঝোপঝাড়ে পরিপূর্ণ চারপাশ এবং গাছপালাগুলো, পাখিদের বিশ্রামের জায়গা হিসেবে বেশ প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। আপনি পায়ে হেঁটে এই পুরো অঞ্চল ঘুরে ঘুরে নানা প্রজাতির পাখি দেখতে পাবেন যেমন পিপিত, বিভিন্ন প্রজাতির গাল, সেজ-ওয়ার্বল এ ধরনের বহু পাখি।

আকাবা অঞ্চলের পাখি-স্বর্গের একাংশ; ছবিসূত্র: Flickr Hive Mind

খরচাপাতি সহ কোথা থেকে কোথায় যেতে হবে এরকম বিস্তারিত জানার জন্য এবং বুকিং দিয়ে রাখার জন্য দেখুন এখানে, www.naturetrek.co.uk.

গোলাপি পায়রার দেশে: মরিশাস

Best Honeymoon Destination হিসেবে মরিশাসের খ্যাতি অনেক পুরনো। পূর্ব আফ্রিকার এই দ্বীপরাষ্ট্রটি  ফাইভ স্টার হোটেলের পাশাপাশি, বালুময় সমুদ্রসৈকতের জন্য পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে। পক্ষীপ্রেমিকদের জন্য মরিশাসের খ্যাতি ছিল প্রাচীন ডোডো পাখির জন্য, বর্তমানে যা একটি বিলুপ্ত প্রজাতি। এই বিখ্যাত প্রজাতিটির বহু হাজার বছর আগেই বিলুপ্তি হলেও বর্তমানে অন্যান্য প্রজাতির পাখিগুলোর প্রতি অবহেলায় সেগুলোও এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে।

এরকম দুরবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য মরিশাস বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্র গত বিশ বছর ধরে দ্বীপটির নানা জীববৈচিত্র্য ধরে রাখতে নানারকম প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এই ধরনের কাজের জন্য তারা অর্থের বিনিময়ে পর্যটকদের এখানকার সংরক্ষিত প্রাণীদের আবাসস্থল ঘুরিয়ে দেখানোর ব্যবস্থা আয়োজন করে থাকে। জায়গাটির নাম Ile Aux Aigrettes. এখানে বিশাল আকারের কচ্ছপের পাশাপাশি রয়েছে দুর্লভ গোলাপি পায়রা।

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রটির সবচেয়ে বড় সাফল্য হচ্ছে, ১৯৯০ এর দশকে গোলাপি পায়রার সংখ্যা নেমে এসেছিল মাত্র দশে কিন্তু বর্তমানে তাদের একনিষ্ঠ প্রচেষ্টায় সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬০ এর অধিক, যার মধ্যে ৭৫টি পায়রার আবাস এই Ile Aux Aigrettes-এই।

মরিশাসের গোলাপি পায়রা; ছবিসূত্র: The COnversation

দর্শনার্থীরা এখানে আসেন নৌকায় করে। এরপর গাইডের সাথে সাথে পুরো কেন্দ্রটি ঘুরে দেখার মাধ্যমে মরিশাসের বন্য জীবনযাপন, জীববৈচিত্র্যের সাথে পরিচিত হন।

মরিশাসের দক্ষিণ-পূর্ব সৈকতের পয়েন্ট জেরোমের ওল্ড স্যান্ড জেটি থেকে দিনে ছয়বার বোট ছেড়ে যায় Ile Aux Aigrettes এর উদ্দেশ্যে। এই বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য ile-aux-aigrettes.com ওয়েবসাইটটি দেখতে পারেন। এছাড়াও মরিশাস বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্র প্রায়ই কেন্দ্রের নানা কাজে স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে থাকে। এই বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, mauritian-wildlife.org.

মূল মরিশাস থেকে বিচ্ছিন্ন Ile Aux Aigrettes-এ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রটির অবস্থান; ছবিসূত্র: Mauritius Attractions

সব মিলিয়ে এগুলোই হলো আপাতত পাখি দেখার জন্য কম জনপ্রিয় কিন্তু আকর্ষণীয় কিছু স্থানের বর্ণনা। ঘুরতে ঘুরতে পাখি দেখুন কিংবা পাখি দেখতে দেখতে ঘুরে বেড়ান। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে এগিয়ে আসুন। বন-প্রাণী-প্রকৃতি রক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।

ফিচার ইমেজ: Smithsonian Magazine

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

খুলনার রূপসা নদীতে নৌকাবাইচ

সন্ধ্যার শ্বাসরুদ্ধকর হাকালুকি হাওর!