এক নজরে ভারতের সেরা ১০টি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা

নাগরিক জীবনে ক্লান্ত মানুষ বারবার প্রকৃতির কাছে ফিরে যেতে চায়। কাছে থেকে আরো কাছে, প্রকৃতির যতটা কাছে যাওয়া যায় ঠিক ততটাই যেতে চান অনেকেই। একসময় দিশেহারা হয়ে খুঁজতে থাকেন সঠিক জায়গা, যেখানে প্রকৃতির সাথে মিলে মিশে একাকার হওয়া যায়। আজ আমি তাঁদের জন্যই লিখেছি এমন কিছু স্থান নিয়ে, যাকে এক কথায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বলা চলে।

নোহকালিকাই জলপ্রপাত

নোহকালিকাই জলপ্রপাত; Source: ajabgjab.com

ভারতের মেঘালয়ে অবস্থিত চেরাপুঞ্জির ঠিক কাছেই রয়েছে দৃষ্টিনন্দন জলপ্রপাত ‘নোহকালিকাই জলপ্রপাত’। সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত অঞ্চল হিসেবে চেরাপুঞ্জি সবার কাছেই পরিচিত, আর এই বৃষ্টির পানির সব থেকে বড় উৎস হলো নোহকালিকাই জলপ্রপাত।
১,১১৫ ফুট উচ্চতা থেকে পানির ধারা নামতে দেখে আপনার চোখ জুড়াতে বাধ্য। বিশাল উচ্চতার কারণে এটিই ভারতের সব থেকে উঁচু জলপ্রপাত। এখান থেকে নেমে আসা পানির ধারা এসে স্থান পায় বিশাল একটি জলাধারে, আর এই জলাধারে জমা হওয়া পানি যেন চারপাশের পাহাড়ের সাথে নিজেকে মিলিয়ে সবুজ রঙ ধারণ করে।
সাধারণত, দূর থেকেই এই জলপ্রপাতের সৌন্দর্য উপভোগ করতে হয় কিন্তু জানা যায়, নভেম্বরের দিকে এর উপর থেকেও ঘুরে আসা যায়। আর উপরে গেলে বোনাস হিসেবে আপনি পাবেন, “তালাই” নামক অসম্ভব সুন্দর আরো একটি জলপ্রপাত।

মুন্নারের চা বাগান

মুন্নারের চা বাগান; Source: ajabgjab.com

প্রতি বছর হাজার-হাজার পর্যটকের চিত্তের খোরাক মিটিয়ে যাচ্ছে মুন্নারের চা বাগান। জীবনের তাড়না ও দূষণ থেকে দূরে হাঁফ ছাড়ার জায়গা হিসেবেও এর কদর রয়েছে। ১২ হেক্টর জুড়ে দৃষ্টি নন্দন চা বাগানই এর বিশেষত্ব। দক্ষিণ ভারতের অধিকাংশ সুস্বাদু চায়ের যোগান আসে এই বাগান থেকেই।
চা বাগানের কাছেই একটি জাদুঘর রয়েছে, যেখান থেকে চায়ের উৎপাদন সম্পর্কিত নানা তথ্য জানা যায় এবং অনেক কাছ থেকে বন্য প্রাণীদের দেখা যায়।

স্টক লঞ্জ, লাদাখ

স্টক লঞ্জ; Source: ajabgjab.com

লাদাখ জম্মু ও কাশ্মীরের মাঝামাঝি অবস্থিত। এটি উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় হিমালয় পর্বতশ্রেণীর সর্বোচ্চ পর্বতমালা। এখানকার অধিকাংশ জমি কৃষি কাজের জন্য উপযুক্ত নয়। এটি সমুদ্র সমতল থেকে প্রায় ১১,৮৪৫ ফুট উঁচু। স্টক কংরি এর এই স্টক রেঞ্জ পর্বতারোহীদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। বর্তমানে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত শিখর মাউন্ট এভারেস্টে আরোহণের পূর্বে স্টক রেঞ্জ আরোহণ করা যেন একটা রীতিতে পরিণত হয়েছে।
প্রায় সারা বছরই বরফ আবৃত থাকলেও, জুলাই এবং আগস্টের শেষের দিকে এই পর্বতশৃঙ্গের উপরের অংশ বরফাবৃত থাকে না; তাই এই সময়েই স্টক রেঞ্জ আরোহণের উপযুক্ত সময়।

নুব্রা ভ্যালি, লাদাখ

নুব্রা ভ্যালী; Source: ajabgjab.com

ঘন নীল আকাশ, ধূসর পাহাড়, বিশাল-শান্ত হ্রদ, পান্না সবুজ পপলার বৃক্ষরাজি ও খরস্রোতা নদী – সব মিলিয়ে লাদাখ এক ভিন্ন স্বাদের ভ্রমণ স্থান। আর এখানকার নুব্রা ভ্যালি (Nubra Vally) পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র বিন্দু।
লুব্রা ভ্যালি মানেই যেন ‘ফুলের উপত্যকা’। লুব্রা ভ্যালিতে যাওয়ার জন্য প্রথমেই একটা ইনডোর পারমিটের দরকার হয়, কারণ এখানে যাওয়ার জন্য আপনাকে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পয়েন্ট কার্দুংলা পাসটি পার হতে হবে। হুন্দার এবং পানামিক গ্রাম নুব্রা ভ্যালির দ্বিমুখী আকর্ষণ।
হুন্দারকে ‘আকাশের মরুভূমি’ বলা হয়। এটি এমন একটি জায়গা যেখানে আপনি দুইটি কুঁজ বিশিষ্ট উটে চড়ে মরুভূমিতে ঘুরে বেড়াতে পাবেন। এছাড়াও নুব্রা ভ্যালিতে যাওয়ার সময় দর্শন লাভ করা যায় ৩২ মিটার লম্বা একটি বিখ্যাত মৈত্রেয়ী মূর্তির। মূর্তিটি পাকিস্তানের দিকে মুখ করে অপার সৌন্দর্য ও মহিমা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

মাথেরান

মাথেরান; Source: ajabgjab.com

ব্রিটিশ রাজত্বকালে গ্রীষ্মের ছুটির জন্য মাথেরান একটি জনপ্রিয় স্থান হয়ে ওঠে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা ২,৬২৫ ফুট উঁচুতে। এটি মুম্বাইতে অবস্থিত ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের একটি প্রিয় স্থান ছিল। ভারতের এই ছোট্ট পাহাড়ী স্টেশন মুম্বাই থেকে ৯০ কিলোমিটার দূরে। নেরাল থেকে ছোট ট্রেনে করে পাহাড় বেয়ে যেতে হয় মাথেরানে।

নন্দা দেবী মাউন্টেইন

নন্দা দেবী মাউন্টেইন; Source: ajabgjab.com

নন্দা দেবী মাউন্টেইন ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের অন্তর্গত গধল জেলায় অবস্থিত। এই পাহাড়টি হিমালয়ের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে অবস্থিত একটি বিখ্যাত পর্বতমালা। চ্যামোলি থেকে ৩২ মাইল পূর্বে এর অবস্থান।
বিশাল পাহাড়ের চূড়ার দুইটি অংশের মধ্যে, নন্দাদেবী পিক সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৫,৬৪৫ ফুট উঁচু। হিন্দুরা বিশ্বাস করে যে, শঙ্করের স্ত্রী নন্দা দেবী এই পাহাড়ে বসবাস করেন।

মিজোরাম

মিজোরাম; Source: ajabgjab.com

মিজোরামের পুরো এলাকা জুড়ে যেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ছড়াছড়ি। এখানে পাহাড়গুলো ঘন চিরহরিৎ বনভূমিতে আচ্ছাদিত; বৃক্ষরাজির মধ্যে রয়েছে চম্পাক, আয়রনউড এবং গুরজুনের মতো মূল্যবান কাঠের গাছ। এখানকার প্রকৃত বনভূমির আয়তন ১৮,৭৭৫ বর্গ কিলোমিটার, যা ভৌগোলিক এলাকার প্রায় ৮৯ শতাংশ। বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই জঙ্গলে হাতি, বাঘ, হরিণ ও বন্য মেষসহ অনেক প্রাণীর বাস।

লোনার লেক

লোনার লেক; Source: ajabgjab.com

লোনার লেক মহারাষ্ট্রের বুলাধানা জেলায় অবস্থিত একটি নোনা জলের হ্রদ। এটি উল্কা পিণ্ডের আঘাতে সৃষ্ঠ হ্রদগুলোর মধ্যে প্রথম হ্রদ, বৈজ্ঞানিকদের ধারণা মতে যা প্রায় ৫৫,০০০ বছর পূর্বে সৃষ্ট হয়েছিল। মনে করা হয়, ১০ মিলিয়ন টন ওজনের একটি উল্কা পিণ্ডের আঘাতে নির্মিত হয় এই উল্কা হ্রদটি। এছাড়াও এর লবণাক্ত পানি দেখে মনে হতে পারে, হয়তো কোনো এক সময় এখানে একটা সমুদ্রের অস্তিত্ব ছিল।
১.৮ কি.মি. ব্যাস বিশিষ্ট উল্কা হ্রদটি ১৫০ মিটার গভীর। এখানকার ঘন সবুজ পানি সমুদ্রের পানির থেকে প্রায় ৬ গুণ নোনতা। যদি আপনি কখনো এখানে যান, তবে হ্রদ ছাড়াও দেখতে পাবেন প্রাচীন কিছু মন্দির, যা আপনার স্থাপত্য প্রীতিকে বাড়িয়ে দেবে।

যুমথাং ভ্যালি

যুমথাং ভ্যালি; Source: ajabgjab.com

যুমথাং ভ্যালি তার সৌন্দর্যের জন্য সিকিমের সুইজারল্যান্ড নামে পরিচিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩,৫৬৪ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত  এই এলাকা ফুলের উপত্যকা হিসাবে বিশ্ববিখ্যাত। উপত্যকাটি উত্তর সিকিমে অবস্থিত, যা হিমালয় পর্বতমালা থেকে নেমে এসেছে। জায়গাটিকে গোচারণ ভূমি হিসেবেও ব্যবহার করা হয়।
সিকিমের সব জেলার থেকে উত্তরের এই জেলাটিই বেশি সুন্দর। কারণ, এটি কাঞ্চনজঙ্ঘা পর্বতের কোলের উপর দিয়ে চলতে চলতে অনেক উচ্চতায় পৌঁছে গেছে।

লেহ:

লেহ; Source: ajabgjab.com

লেহ জম্মু কাশ্মীরের লাদাখ জেলায় অবস্থিত, যা এখানকার প্রধান শহর। এটি সিন্ধু নদীর তীরে ১১,০০০ ফুট উচ্চতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জায়গাটা এতটাই সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ যে, ভূমিতে দাঁড়িয়ে পর্যটকরা পেতে পারে স্বর্গের অনুভূতি। লেহের চূড়ায় গেলে মেঘেরা এতটাই কাছে এসে পড়ে যে, হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেয়া যায়। গগনচুম্বী এই পাহাড়ে ট্র্যাকিং করতে হলে আপনিও যেতে পারেন এখনই।
লেহে পাহাড় ও নদী ছাড়াও অনেক ঐতিহাসিক ভবন রয়েছে, যা আপনার ভ্রমণে সৌন্দর্যের ভিন্ন মাত্রা যোগ করতে পারে। এছাড়াও এখানে অনেক বৌদ্ধ বিহার রয়েছে এবং সেখানে অনেক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বাস করেন।
কিছু কথা: ভারত যেহেতু অনেক বড় রাষ্ট্র, তাই আমি মনে করি যাদের বিশ্ব ভ্রমণের সাধ আছে তাঁরা ভ্রমণ লিস্টে প্রথমেই ভারতকে রাখতে পারেন। আর হ্যাঁ, ভারত ভ্রমণে সময় বেশি না নিয়ে বের হলে কিন্তু পরে আফসোস করতে হবে!
Feature Image: hdqwalls.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লাটাগুড়ি: ডুয়ার্সের এক নির্জন স্টেশনের গল্প

নড়াইল বাধাঘাট ভ্রমণ: যার মায়ায় মুগ্ধ হয়েছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়