স্বর্ণ মন্দিরের সোনালী ছটার রূপরেখা

বান্দরবানের উপশহর বালাঘাটাস্থ পুল পাড়া নামক স্থানে স্বর্ণমন্দিরের অবস্থান। সোনালি এই মন্দিরটি বৌদ্ধ ধাতু জাদী নামে পরিচিত। এর অপর নাম মহাসুখ প্রার্থনা পূরক বুদ্ধধাতু চেতী। নাম স্বর্ণমন্দির হলেও এখানে স্বর্ণ দিয়ে তৈরি কোনো দেব-দেবীও নেই।

এটি তার সোনালি রঙের জন্য বর্তমানে স্বর্ণমন্দির নামে খ্যাত। বান্দরবান জেলা সদর থেকে এর দূরত্ব ৪ কিলোমিটার। সুউচ্চ পাহাড়ের চূড়ার তৈরি সুদৃশ্য এ প্যাগোডা। এটি বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের একটি পবিত্র তীর্থস্থান । এখানে দেশ-বিদেশ থেকে অনেক বৌদ্ধ ধর্মালম্বী দেখতে এবং প্রার্থনা করতে আসেন। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ মন্দির এই বৌদ্ধ ধাতু জাদী।

গৌতমবুদ্ধের সমসাময়িককালে নির্মিত বিশ্বের সেরা কয়েকটি বুদ্ধ মুর্তির একটি এখানে রয়েছে। প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে এটি নির্মাণ করা হয়। ভেন. ইউ পান্নইয়া জোতা মাহাথেরো ২১ শতকে এটি নির্মাণ করেন। এই প্যাগোডাটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সেরাগুলোর মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে স্বর্ণমন্দির উপাসনালয়টি পরিগনিত হচ্ছে বান্দরবান জেলার একটি অন্যতম পর্যটন স্পট হিসাবে।

স্বর্ণ মন্দির। সোর্স: বিডি নিউজ.কম

পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই প্যাগোডা থেকে বান্দরবানের বালাঘাটা উপশহর ও এর আশপাশের সুন্দর নৈস্বর্গিক দৃশ্য দেখা যায়। এ ছাড়া বান্দরবান রেডিও স্টেশন, বান্দরবান চন্দ্রঘোনা যাওয়ার আকাঁবাকাঁ পথও দর্শনীয়। প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময়ে এখানে মেলা বসে। প্যাগোডাটি পুজারীদের জন্য সারাদিন খোলা থাকে।

বৌদ্ধ মন্দির স্থানীয়দের কাছে কিয়াং নামে পরিচিত। এই পাহাড়ে একটি লেক আছে। লেকের নাম দেবতা পুকুর। দেবতা পুকুরটি সাড়ে তিনশত ফুট উঁচুতে হলেও সব মৌসুমেই পানি থাকে। বৌদ্ধ ভানে-দের মতে, এটা দেবতার পুকুর তাই এখানে সব সময় পানি থাকে।

মন্দিরে উঠতে হলে ১৯২ ধাপ সিঁড়ি পেরুতে হবে। সোর্স: আদার বেপারি

এই প্যাগোডা একটি আধুনিক ধর্মীয় স্থাপত্যের নিদর্শন। প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময়ে এখানে মেলা বসে। বর্তমানে স্বর্ণমন্দির উপাসনালয়টি বান্দরবান জেলার একটি অন্যতম পর্যটন স্পট হিসাবে পরিগনিত হচ্ছে। এটি বৌদ্ধ ধর্মাম্বলীদের একটি উল্লেখযোগ্য উপাসনালয়। এটির তৈরিতে মায়ানমার, চীন ও থাইল্যান্ডের বৌদ্ধ মন্দিরগুলোর নির্মাণশৈলী অনুসরণ করা হয়েছে।

বুদ্ধমুর্তি। সোর্স: বিডিনিউজ

নীলগিরি, চিম্বুক আর শৈলপ্রপাত ঘুরে গেলাম স্বর্ণ মন্দির। পাহাড়ের একদম চূড়ায় মন্দিরটা। চান্দের গাড়ি করে অনেকখানি উঁচুতে যাবার পর মন্দিরে ওঠার সিঁড়ি পেলাম। সিঁড়ি বেয়ে ওঠার আগে কে যেন বললো, ‘স্যান্ডেলগুলো গাড়িতে রেখে যা।‘ আমরা তাকে পাত্তা দিলাম না।

১৯২ ধাপ সিঁড়ি পেরিয়ে গেলাম বৌদ্ধ মন্দিরে। এসে দেখি স্যান্ডেল নিয়ে উপরে যাওয়া যাবে না। স্যান্ডেল পাহারা দেওয়ার জন্য একজন লোককে রাখা হয়েছে, তার কাছে স্যান্ডেল জমা দিয়ে যেতে হবে। নইলে জুতা হারানোর সম্ভাবনা প্রবল।

কী আর করা! টাকা দিয়ে আমাদের সবার জুতা পাহারা দেওয়ার জন্য রেখে ভেতরে ঢুকলাম। মন্দিরটা সুন্দর, কিন্তু এতসব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে এসে, আমার কাছে গোল্ডেন টেম্পলকে আহামরি কিছু মনে হয়নি। তবে দলের বাকিরা খুব পছন্দ করলো সোনালী মন্দির।

ঘুরে ঘুরে ছবি তুললো। ভেতরে মূর্তিগুলোর অনুকরণ করে ছবি তোলা নিষেধ। আর কিছু কিছু মূর্তির ছবি তোলাও নিষেধ। আমরা নিষেধাজ্ঞা মেনে নিয়েই ছবি তুললাম।

সোনালী কারুকাজ। সোর্স: বান্দরবান নিউজ

ভ্রমণবিধি

বৌদ্ধধর্মাবলম্বী ব্যতীত অন্যান্য ভ্রমনার্থীদের টিকিটের বিনিময়ে মন্দিরটি দর্শনের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে মন্দিরের মূল অংশে অর্থাৎ যেখানে জাদিটি আছে সেখানে সাধারণ দর্শনার্থীদের প্রবেশ করতে দেয়া হয় না। সন্ধ্যা ছয়টার পরে মন্দিরে সাধারণ দর্শনার্থীদের প্রবেশ নিষেধ।

মন্দির চত্ত্বরে শর্টপ্যান্ট, লুঙ্গি এবং জুতা পায়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ। যদি এই স্বর্ণ মন্দির দেখতে যান তাহলে অবশ্যই সকাল ৮টা ৩০ মিনিট থেকে ১১.৩০ মিনিটের মধ্যে যাবেন, আর যদি সকালে যেতে না চান তাহলে দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিট থেকে বিকেল ৬টার মধ্যে যেতে পারেন।

টিকেট মূল্য:

প্রবেশ মূল্য জনপ্রতি ২০ টাকা।

কীভাবে যাবেন:

স্বর্ণমন্দির যাওয়ার জন্য প্রথমে আপনাকে বান্দরবান শহরে যেতে হবে। ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন বান্দরবানের উদ্দেশ্যে কয়েকটি পরিবহন কোম্পানির গাড়ি ছেড়ে যায়। যেমন শ্যামলি, হানিফ, ইউনিক, এস আলম, ডলফিন- এর যেকোনো একটি বাসে চড়ে আপনি বান্দরবান যেতে পারেন।

রাত ১০টায় অথবা সাড়ে ১১টার দিকে কলাবাগান, সায়েদাবাদ বা ফকিরাপুল থেকে এসব বাস বান্দরবানের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। নন এসি বাসে জন প্রতি ভাড়া ৫৫০ টাকা। এসি ৯৫০ টাকা।

পাহাড়ের চূড়ায় স্বদর্পে দাঁড়িয়ে আছে স্বর্ণমন্দির। সোর্স: বিডি নিউজ

চট্টগ্রাম থেকে বান্দরবান যেতে পারেন। বদ্দারহাট থেকে বান্দারবানের উদ্দেশে পূবালী ও পূর্বানী পরিবহনের বাস যায়। এসব বাসে জনপ্রতি ২২০ টাকা ভাড়া রাখা হয়।

এরপর বান্দরবান বাস স্টেশন থেকে রিক্সা অথবা ট্যাক্সি করে যাওয়া যায় । রিক্সা ৩০-৩৫ টাকা এবং ট্যাক্সি রিজার্ভ ১১০-১৩০ টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকে। সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত এখানে গাড়ী চলাচল করে।

পরিবহন ভাড়া

ট্রেনে ঢাকা হতে চট্টগ্রাম: এসি- ৩৬৫-৪৮০ টাকা। নন এসি-১৫০-১৬৫ টাকা।
বাসে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম: এসি- ৫৮০-৭৯০ টাকা। নন এসি-২০০-২৫০ টাকা।
ঢাকা থেকে বাসে সরাসরি চট্টগ্রাম: ৩৫০ টাকা
চট্টগ্রাম হতে বান্দরবান: ৭০ টাকা।

শুভ্রত্ব। সোর্স: বান্দরবান নিউজ

কোথায় থাকবেন:

বান্দরবানে অসংখ্য রিসোর্ট, হোটেল, মোটল এবং রেস্ট হাউজ রয়েছে। যেখানে ৬০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় রাত্রিযাপন করতে পারবেন।

হলিডে ইন রিসোর্ট: মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্সের বিপরীতে ছোট্ট পাহাড়ের চূড়ায় হলিডে ইন রিসোর্ট। এখানে ছোট ছোট অনেকগুলো কটেজ রয়েছে। ফোন-০৩৬১-৬২৮৯৬।

হিলসাইড রিসোর্ট: বান্দরবান-চিম্বুক সড়কের ৫ কিলোমিটার নামকস্থানে অবস্থিত মিলনছড়ি। এখানে রয়েছে উন্নত পরিবেশে রাত্রি যাপনের সু-ব্যবস্থা। মোবাইল-১৫৫৬৫৩৯০২২।
হোটেল ফোর স্টার: বান্দরবান শহরে অবস্থিত হোটেল ফোরস্টার। এখানে এসি এবং নন এসি দু রকমের রুম রয়েছে। হোটেলের প্রতিটি কক্ষে রয়েছে টেলিভিশন। ফোন-০৩৬১-৬২৪৬৬।

হোটেল থ্রী স্টার: এটি বান্দরবান বাস স্টপের পাশে অবস্থিত। নীলগিরির গাড়ী এই হোটেলের সামনে থেকে ছাড়া হয়। এটি ৮/১০ জন থাকতে পারে ৪ বেডের এমন একটি ফ্ল্যাট। প্রতি নন এসি ফ্ল্যাট-২,৫০০ টাকা, এসি-৩,০০০ টাকা। বুকিং ফোন: থ্রী স্টার এবং ফোর ষ্টার হোটেল মালিক একজন, মানিক চৌধুরী-০১৫৫৩৪২১০৮৯ / ০১৮১৩২৭৮৭৩১।

হোটেল রিভার ভিউ: জেলা শহরের মধ্যে সাঙ্গু নদীর পাশ্ববর্তী প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে উঠেছে হোটেল রিভার ভিউ। এখানে নিজস্ব রেস্টুরেন্টও রয়েছে। ফোন-০৩৬১-৬২৭০৭।

স্বর্ণমন্দিরে আমরা। সোর্স: বন্ধুবৃত্ত

আপনি চাইলে নীলাচল স্কেপ রিসোর্টে থাকতে পারেন। নীলাচল স্কেপ রিসোর্টে তিনটি কটেজে ছয়টি কক্ষ আছে। প্রতিটি কক্ষের ভাড়া ৩ হাজার টাকা। এছাড়া রিসোর্টের অতিথিদের জন্য ভালো মানের খাবারের ব্যবস্থা করে থাকেন কর্তৃপক্ষ। যোগাযোগঃ ০১৭৭৭৭৬৫৭৮৯।

হোটেল ভাড়া

নীলাচল স্কেপ রিসোর্ট: ৩০০০ টাকা
পর্যটন মোটেল: ৭৫০ হইতে ২,০০০টাকা পর্যন্ত।
হোটেল ফোর স্টার: সিঙ্গেল-৩০০ টাকা, ডাবল- ৬০০, এসি-১,২০০ টাকা।

হোটেল থ্রী স্টার: নন এসি ফ্ল্যাট-২,৫০০ টাকা, এসি-৩,০০০ টাকা।
হোটেল প্লাজা বান্দরবান: সিঙ্গেল-৪০০ টাকা, ডাবল- ৮৫০, এসি-১,২০০ টাকা।
এছাড়াও মেঘলা পর্যটন কেন্দ্রে রয়েছে জেলা প্রশাসনের একটি সুন্দর রেস্ট হাউজ রয়েছে। যেখানে অবকাশ ভোগ করা যায় ভালোভাবে। এখানে রাত্রিযাপনের জন্য চারটি কক্ষ রয়েছে। প্রতি কক্ষ ২,৫০০/- (প্রতিদিন)। যে কেউ বুকিংয়ের জন্য ফোন করতে পারেন- ০৩৬১-৬২৭৪১ ও ০৩৬১-৬২৭৪২ নম্বরে।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আমেরিকার দুর্দান্ত সব জলপ্রপাতের গল্প

সীতারাম রাজার প্রাসাদের উপাখ্যান