গাঙ্গোত্রীর আরতি সন্ধ্যায়…

সনাতন ধর্মের অনুষ্ঠান আর উদযাপনের যেন কোন শেষ নেই। তবে এদের নানা রকম উৎসব, উদযাপন আর উপলক্ষের মধ্যে যে উৎসব বা উদযাপনটা আমার কাছে ভীষণ ভালো লাগে সেটা খুব ছোট একটা অনুষ্ঠান বা উৎসব। এই অনুষ্ঠানটা দুটি কারনে আমার ভীষণ ভালো লাগে। একটি হল খুব অল্প সময়ে হয়ে থাকে আর দুই এই সময়ে চারদিকে একটা আলো-আধারির খেলার সাথে কিছু সম্মোহনী সুরের খেলা করে। কারন এই অনুষ্ঠানটা মূলত সন্ধ্যায়-ই হয় কিনা জানিনা তবে আমি সব সময় সন্ধ্যাতেই এটি সব সময় দেখেছি। এটি হল “আরতি”।

আরতির আলোয়…। ছবিঃ সংগ্রহ

আরতি সন্ধ্যার আলো-আধারির খেলা, সাথে সুরের মূর্ছনা সবকিছু মিলে কেমন যেন একটা মাদকতার সৃষ্টি করে। যেটা আমার ভীষণ ভালো লাগে। একটা অন্য রকম আবেশ যেন ঘিরে ধরে। সুরের মধ্যেই এমন কিছু একটা আছে। সেই সাথে মিশে যায় সন্ধ্যার আলো-আধারির অপূর্বতা আর কাঁসার থালায় ছোট ছোট আলোকবর্তিকা তৈরি করে ভিন্ন একটা আকর্ষণ। সবকিছু মিলেই দারুণ একটা মুহূর্ত হল এই “আরতি সন্ধ্যা” আমার কাছে দারুণ ভালো লাগার একটা সময়, ছোট আনন্দ আর ক্ষুদে উৎসব।

আর এই ভালো লাগার “আরতি সন্ধ্যার” মধ্যে আমার আবার বিশেষ একটা আকর্ষণ ছিল গাঙ্গোত্রীর আরতি সন্ধ্যা দেখার। কারন কোন একটা লেখায় পড়েছিলাম গাঙ্গোত্রীর আরতি সন্ধ্যার বিশেষ আকর্ষণের কথা। সেই থেকেই মনের মধ্যে একটা সুপ্ত ইচ্ছা গাঙ্গোত্রীর আরতি সন্ধ্যা দেখার। তো যখন উত্তরকাশী থেকে জীপে গাঙ্গোত্রীর দিকে চলতে শুরু করেছিলাম, তখন থেকেই মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম, যদি সন্ধ্যায় আগে পৌঁছে যেতে পারি তবে অপূর্ব সন্ধ্যায়, অদ্ভুত মূর্ছনা ছড়ানো গাঙ্গোত্রীর আরতি সন্ধ্যা দেখতে যাবো, দেখতে পারবো। তারপর আমাদের জীপ যখন ঠিক সন্ধ্যার আগেই শেষ বিকেলে গাঙ্গোত্রী এসে পৌছালো তখন তিন রকম আনন্দে আমি খুশিতে ডগমগ।

গঙ্গার আরতি সন্ধ্যা। ছবিঃ সংগ্রহ

আনন্দ এক ছিল, প্রথম দিনেই দেরাদুন থেকে গাঙ্গোত্রী এসে পৌছাতে পেরেছি। যেটা সম্ভব হবে বলে কেউই সাহস দিতে পারেনি। এমনকি গুগল, বা ট্রিপ এডভাইজার পর্যন্ত দিতে পারেনি। সেটাই করতে পেরেছি বলে, কোথাও থেমে থেকে অযথা সময় নষ্ট না করে।

আনন্দ দুই ছিল, আজকেই গোমুখের অনুমোদন নিয়ে পরদিনই গোমুখ অভিমুখে মুল অভিযান শুরু করতে পারবো।

আর আনন্দ তিন ছিল, অনেক দিন ধরে একটি আরতি সন্ধ্যা দেখার ইচ্ছা ছিল, আর সেটি যদি হয় গাঙ্গোত্রীর মত প্রখ্যাত কোন যায়গায় তবে তো সেই আনন্দ কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। আর সেটাই হতে চলেছে বলে। একটু পরেই গাঙ্গোত্রী আরতি সন্ধ্যার মাধুর্যতায় মুগ্ধ হব বলে।

আরতির প্রস্তুতি। ছবিঃ সংগ্রহ

এই তিন আনন্দে উদযাপন মিলে আমি অভিভূত হয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। বরফ জলে গোসল করে একদম ঈদের নতুন কাপড় (আমার নতুন ভ্রমণ মানেই নতুন কাপড়, কারন ভ্রমণই হল আমার কাছে ঈদের মত!বা ঈদ), বুট আর জ্যাকেট পরে তৈরি হয়ে গেছি। সন্ধ্যা ছয়টায় প্রথম আরতি গঙ্গা\পদ্ম\ভাগরথির তীরে। আর সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় দ্বিতীয় আরতি ভাগরথির তীরের মন্ধিরে।

ঝটপট বেরিয়ে পরলাম জানালা দিয়ে বাইরে দিনের আলো ফুরিয়ে গিয়ে সন্ধ্যা নামা দেখতেই। তখন ছয়টা পার হয়ে গেছে। তড়িঘড়ি করে মন্দিরের সাথে লাগোয়া গঙ্গার তীরে নামতে নামতে আরতি শেষের পথে প্রায়। তবে তখন কাঁসার থালায়, ছোট ছোট আলোকবর্তিকা নিয়ে অনেকেই গঙ্গার তীরে আছে বা কেউ কেউ ধীরে ধীরে উঠে আসছে, ছোট ছোট ঘণ্টা হাতে বাজিয়ে চলেছে কেউ কেউ, দুই একটা ঢোলের বাড়ি মৃদু সরে তখনো সুর তুলে চলেছে। হোক শেষ মুহূর্তের আরতি তবুও তো রেশটা আছে। সেই ঢের। আমি অতটুকুতেই খুশি ছিলাম। কারন জানি একটু পরে আর একটি আরতি আছে এখানেই। সেটার শুরু থেকে মিছ করা যাবেনা কিছুতেই।

সন্ধ্যার গাঙ্গোত্রী। ছবিঃ লেখক 

গঙ্গার তীরে আরতির শেষ রেখার মুগ্ধতায় চুপ করে বসেছিলাম। তাকিয়ে ছিলাম উচ্ছল বয়ে চলা জলরাশির দিকে। ওপারে লাল-নীল আলোর রোশনাই। ঘরে ঘরে, নানা রঙের বর্ণিলতা, পাশ ঘেঁসে রয়েছে সবুজ পাহাড়ের সারি। পাহাড়ের ছাদে তখন ঝুলেছিল খণ্ডিত চাঁদ, স্বচ্ছ আকাশে অজস্র তারা আর তাদের মিটিমিটি আলোর আহ্বান। চাঁদ, তারা আর বর্ণীল আলোর ঝলক পরছিল উচ্ছল বয়ে চলা গঙ্গার জলরাশিতে। স্বচ্ছ জলে সেই আলোর পরশ পরে রুপালী ঢেউ উঠেছিল গঙ্গার বুকে। ঝিলিক দিয়ে যাচ্ছিল উচ্ছল জলরাশির সাথে। দারুণ একটা ব্যঞ্জনা তৈরি করেছিল জল, ঢেউ, চাঁদ, তারা আর হোটেল গুলোর নিয়ন আলোর সম্মিলনে।

গঙ্গার পাড়ের অলসতা আর মুগ্ধতা ভাঙলো মন্দিরের আরতি শুরুর ঘণ্টা বাঁজাতে। ঝটপট উঠে পরলাম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অপূর্ব আরতির মুগ্ধ মুহূর্ত গুলো নিজ চোখে দেখতে আর অনেক দিনের আরতি দেখার স্বাদ মেটাতে। যে সিঁড়ি দিয়ে উঠছিলাম সেখানে অনেক গুলো কাশা-পিতলের ছোট, বড় আর মাঝারি ঘণ্টা বাঁধাছিল। সেগুলো একে একে করে দুলে দুলে বেজে উঠতে লাগলো মৃদু স্বরে। কারো না কারো হাতের স্পর্শে।

গাঙ্গোত্রীর সুরেলা সন্ধ্যা। ছবিঃ লেখক

ঘাঁটের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যেতেই একটা অদ্ভুত মূর্ছনায় আচ্ছন্ন হতে হলে, উপরে মুল মন্দিরের বেদীতে, বারান্দায় আর সদর দরজায়, সবগুলো উন্মুক্ত প্রবেশদ্বারে অসংখ্য পিতলের ঘণ্টা দুলছে, ঝুলছে কারো না কারো হাতের স্পর্শে সেগুলো সুর তুলে চলেছে। একটা, একটা করে গুনে দেখলাম, প্রতিটি দরজা বা বারান্দাতেই ১১ টি করে পিতলের ঘণ্টা ঝোলানো রয়েছে। ছোট, মাঝারি, বড় আকারের। কেন যে প্রতিটি যায়গায় ১১ টি করে ঘণ্টা ঝোলানো হয়েছে সেটা জানার কৌতূহল জাগলেও তেমন কাউকে কাছে পিঠে পাইনি জিজ্ঞাসা করে কৌতূহল মেটানোর।

গাঙ্গোত্রীর মন্দিরের উঠোন। ছবিঃ লেখক 

ঘণ্টার অনবরত ধ্বনির সাথে মৃদু স্বরে বেজে চলেছিল হাতে হাতে ছোট ছোট ঘণ্টার বাজনা, কাঁসার থালায় থালায় আরতি ঘুরে বেড়াচ্ছে একদি-ওদিক-সেদিন চারদিক। কখনো কখনো বেজে উঠছিল ঢোলের ছন্দ, সাথে ঘণ্টা ধ্বনি, কণ্ঠে পরিচিত মুগ্ধ করা সুর, চারদিকে নানা রকম আলোর রোশনাই, আকাশে চাঁদের আলো, তারাদের মিটিমিটি জ্বলা-নেভা, পাহাড়দের সেই সুর, তাল আর আলোর সাথে তাল মেলিয়ে হেলে দুলে আরতি সন্ধ্যার আলোতে, ধ্বনিতে আলাদা আকর্ষণ মেলানো। সবকিছু মিলে একটা জাদুকরি পরিবেশ, সম্মোহিত আয়োজন, আবেশে জড়ানো মুহূর্ত আর অপলক চেয়ে থেকে উপভোগ করার মত একটি সন্ধ্যা। যা বহুদিন কানের কাছে সুর তুলবে, আনন্দের ধ্বনি হয়ে বেজে চলবে, আকাশে, পাহাড়ে, নদীতে আলোর খেলা হয়ে চোখে আটকে রবে। উপভোগ করে…  

গাঙ্গোত্রীর আরতি সন্ধ্যা।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শীতকালীন ভ্রমণের জন্য একদম আদর্শ স্থান মধ্য ও পূর্ব ইউরোপ

১০টি শহরের হাস্যকর নাম আর তার পেছনের গল্প