বালির শহর গাজিপুরের কালিয়াকৈরে একদিন

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য জনপদের নাম গাজীপুর। শাল, গজারী, মেহগনি, সেগুন বেষ্টিত এবং শীতলক্ষ্যা, ব্রহ্মপুত্র, বানার, তুরাগ বিধৌত জেলা গাজীপুর। বিলু কবীরের লেখা ‘বাংলাদেশের জেলা : নামকরণের ইতিহাস’ বই থেকে জানা যায়, মুহম্মদ বিন তুঘলকের শাসনকালে জনৈক মুসলিম কুস্তিগির গাজী এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিলেন এবং তিনি বহুদিন সাফল্যের সঙ্গে এ অঞ্চল শাসন করেছিলেন।

এ কুস্তিগির/পাহলোয়ান গাজীর নামানুসারেই এ অঞ্চলের নাম রাখা হয় গাজীপুর বলে লোকশ্রুতি রয়েছে। আরেকটি জনশ্রুতি এ রকম, সম্রাট আকবরের সময় চব্বিশ পরগনার জায়গিরদার ছিলেন ঈশা খাঁ। এই ঈশা খাঁরই একজন অনুসারীর ছেলের নাম ছিল ফজল গাজী। যিনি ছিলেন ভাওয়াল রাজ্যের প্রথম ‘প্রধান’। তারই নাম বা নামের সঙ্গে যুক্ত ‘গাজী’ পদবি থেকে এ অঞ্চলের নাম রাখা হয় গাজীপুর। গাজীপুর নামের আগে এ অঞ্চলের নাম ছিল জয়দেবপুর।

এ জয়দেবপুর নামটি কেন হলো, কতদিন থাকল, কখন, কেন আবার তা বদলে গেল- সেটিও ভাবনার বিষয়। ভাওয়ালের জমিদার ছিলেন জয়দেব নারায়ণ রায় চৌধুরী। বসবাস করার জন্য এ জয়দেব নারায়ণ রায় চৌধুরী পীরাবাড়ি গ্রামে একটি গৃহ নির্মাণ করেছিলেন। গ্রামটি ছিল চিলাই নদীর দক্ষিণ পাড়ে। এ সময় ওই জমিদার নিজের নামের সঙ্গে মিল রেখে এ অঞ্চলটির নাম রাখেন ‘জয়দেবপুর’ এবং এ নামই বহাল ছিল মহকুমা হওয়ার আগ পর্যন্ত।

যখন জয়দেবপুরকে মহকুমায় উন্নত করা হয়, তখনই এর নাম পাল্টে জয়দেবপুর রাখা হয়। এখনো অতীতকাতর-ঐতিহ্যমুখী স্থানীয়দের অনেকেই জেলাটিকে ‘জয়দেবপুর’ বলেই উল্লেখ করে থাকেন। গাজীপুর সদরের রেলওয়ে স্টেশনের নাম এখনো ‘জয়দেবপুর রেলওয়ে স্টেশন’। গাজীপুরের আগের নাম জয়দেবপুর এবং তারও আগের নাম ভাওয়াল। গাজীপুরকে ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দের পহেলা মার্চ জেলা এবং ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের ৭ই জানুয়ারী সিটি কর্পোরেশন ঘোষণা করা হয়।

গ্রাম মানেই সবুজতা। কিন্তু বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতে এটা কী গাছ, বুঝিনি। সোর্স: বন্ধুবৃত্ত

গাজিপুরের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানের বর্ণনা তো লিখেছি। আজ বলবো এই জেলার একটি গ্রামের কথা। গাজিপুরের কালিয়াকৈরে জহিরদের বাড়ি। ওর জন্মদিনের দিন হুট করে ওর বাড়ি যাওয়ার দাওয়াত দিয়ে বসল। বাকি সবাই-ই যাচ্ছে। আমি আর বারণ করি কেন?

চলে এলাম। অনেকদিন পর এই সার্কেলের সবার সাথে দেখা হবে। বাকিদের মতো আমিও খুব উচ্ছ্বসিত। সবসময়কার মতো বাঁদরামি তো চলছেই অনবরত। মিষ্টি আর চকলেট কিনে রেখেছিল আগের দিনই। ওসব নিয়ে বাস থেকে নেমে সিএনজিতে চড়ে বসলাম। আমাদের কাছে রইল চকলেটের প্যাকেট আর ইমরান-তৌসিফদের সিএনজিতে রইল মিষ্টির প্যাকেট।

গ্রামেও এখন আধুনিকতার ছোঁয়া। সোর্স: জহির

ছুটে চলা সিএনজির বাইরে তাকিয়ে দেখলাম রাস্তার দুইধারে বিশাল বিশাল গাছ। গাছগুলো খুবই অদ্ভুত ধরনের। হ্যারি পটারে একটা গাছ ছিল না, যেটা নড়াচড়া করতে পারে? এই গাছগুলোর আকৃতি যেন ঠিক ওটার মতো। অদ্ভুত সুন্দর।

গাজিপুরে টিম্বার মিল অনেক বেশি। জহিরদের বাড়িতে পা রাখতে না রাখতেই পিছন থেকে পলাশ চিৎকার করে উঠল, “হায় হায়! মিষ্টির প্যাকেট রেখে আসছি সিএনজিতে!” সাথে সাথেই দৌড়ে গেল সে। কাছেই ছিল ইমরান আর তৌসিফ, ওরাও ফেলে আসা রাস্তার দিকে ছুট লাগাল। এদিকে আমি, নীলান্তি, পিনি, সজল, জুলহাস, সাইফুল, শাহিন জহিরদের দাওয়ায় চেয়ারে গোল হয়ে বসে হা-হুতাশ করছি। মিষ্টি পাওয়া যাবে, না-কি যাবে না, সেইসব সম্ভাবনা নিয়ে। জহির ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে কাকে যেন ফোন করে যাচ্ছে। খানিক বাদে হাসিমুখে বলল, “মিষ্টি পাইছে!”

ক্ষেত আর বাগানের আইল ধরে আমাদের ঘুরে বেড়ানো। সোর্স: বন্ধুবৃত্ত

আমরাও খুশি। অপেক্ষা করছিলাম, কখন আমাদের বন্ধুরা বিজয়ীর বেশে আসবে, আর আমরা হাততালি দিয়ে তাদের সম্ভাষিত করব। কিন্তু মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে ঢুকলো, অপরিচিত একজন। তার পিছনে আমাদের সৈনিকেরা। ব্যাপার কী? তৌসিফ জানালো ব্যাপারটা। ওরা রাস্তায় গিয়ে দেখে একটা সিএনজি দাঁড়িয়ে। ওটায় মিষ্টি নাই।

যেটায় ছিল, সেটা চলে গেছে। বাজারে গেলে হয়তো সিএনজিটা পাওয়া যেতে পারে, এই ভাবনা নিয়ে ওরা বাজারের দিকে পা বাড়ালো। কিছুক্ষণ পর জহিরের ফুপাতো ভাই মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে এদিকেই আসছে। তৌসিফ যেন আরো কী কী আধিভৌতিক ঘটনার কথা বলেছিল। ভুলে গেছি, তাই লিখতে পারলাম না। ওরা ফিরলো। তারপর আমরা সবাই ডিম, পরোটা, আপেল, আঙ্গুর, কলা দিয়ে ভরপেট নাস্তা করে কড়া রোদের মধ্যেই হাঁটতে বের হলাম। মাটির রাস্তায় হায়রে বালি!

ইমরান কী এক অদ্ভুত উপায়ে বালি উড়াতে উড়াতে হাঁটছে। ধমক দিয়েও থামানো যায় না। রাস্তার এক পাশে নদী। ঠিক নদী বলা যায় না এটাকে, তুরাগ নদী থেকে বেরিয়ে আসা একটা খাল। জহিরকে নাম জিজ্ঞেস করলাম, বলতে পারল না। পরে বহুজনকে জিজ্ঞেস করে জেনেছি এটা ঘাঘট খাল। অপর পাশে বিস্তৃত ফসলী জমি। এই এলাকায় গগনচুম্বী আকাশমণি গাছ দেখলাম প্রচুর।

ঘাঘট খাল। সোর্স: জহির

দুপুর হয়ে আসছে। হাঁটতে হাঁটতে যে এতদূর চলে এসেছি, বুঝতেই পারিনি। আসলে কড়া রোদ থাকলেও ঝিরিঝিরি বাতাসে হাঁটতে খারাপ লাগছিল না। জহিরের বাড়ি ফেরার পথে ওদের পরিচিত এক বাড়িতে ঢুকলাম। এইবাড়ির পানি যেন ঠিক অমৃত!

ফ্রিজের পানির মতো ঠাণ্ডা, অথচ সবে মাত্র নলকূপ চেপে আনা হয়েছে। নলকূপের পানিতে যে গন্ধটা থাকে সেই গন্ধটা পর্যন্ত নেই। দুপুরে পোলাও, ডিম, গোশত, দই, মিষ্টি, কোক দিয়ে লাঞ্চ করে কেউ নড়তে পারছে না। এরমধ্যে মিরাকলের মতো শান্ত এসে উপস্থিত হলো। যেই মেয়ে কিনা মহাখালী থেকে একা একা বনানী যেতে পারে না, সে ঢাকা থেকে গাজিপুরে জহিরদের বাড়ি পর্যন্ত চলে আসছে!

এইবাড়ির পানি যেন ঠিক অমৃত! ফ্রিজের পানির মতো ঠাণ্ডা, অথচ সবে মাত্র নলকূপ চেপে আনা হয়েছে। সোর্স: বন্ধুবৃত্ত

আবার হাঁটতে বের হলাম। জহিরদের খেলার মাঠে গিয়ে ছবি-টবি তুললাম। ওখানে ক্রিকেট খেলছিল স্থানীয় ছেলেরা। আমাদের জহির, ইমরান, তৌসিফ, জুলহাস, পলাস এগিয়ে গেল দুয়েকটা শট মেরে বাহাদুরি দেখাবার জন্য। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, ওরা কেউ হাত খুলে খেলতে পারল না। একটা কাঠবিড়ালি দেখলাম তরতর করে গাছের চূড়ায় উঠে যাচ্ছে।

এই এলাকার মানুষেরা মাটি বা গোবর দিয়ে উঠোন লেপে রাখে। জহিরের ফুপুর বাড়ি এসে এটাই মনে হলো। এই পর্যন্ত যতগুলো বাড়ি গেলাম, সবগুলো বাড়িই লেপে মুছে ঝকঝকে তকতকে করে রেখেছে। ঘরে ঢুকে বসতেই খাবারের প্লেট চলে এলো। আমরা সবাই চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করলাম, “মাত্র খেয়ে এসেছি” “এসবের কী দরকার ছিল” হেন তেন! অথচ মিনিট দশেকের মধ্যেই মিষ্টি ছাড়া বাকি সব প্লেট খালি!

ঘাঘটের পাড়ে ওয়ালটনের কেনা জমিতে আমরা চার কন্যা। সোর্স: বন্ধুবৃত্ত

গাজিপুরের মাটি এত রুক্ষ, বেলে মাটি, অথচ সবকিছুর ফলন হয় এখানে। মাঠের পর মাঠ ফসলি জমি। আমরা সেই বেলেমাটির জমির আইল ধরে হেঁটে হেঁটে দেখছিলাম। এত জমি, এত ফসল, অথচ পানিসেচের কোনো ব্যবস্থা নেই। এই রুক্ষ ভূমিতে কী করে এত ফসল হয়, আল্লাহ মালুম! হাঁটতে হাঁটতে শেষ সীমানায় চলে আসছি। সেই ঘাঘট খালের অপর পাড়ে।

খালের এপার থেকে ওপারে যাবার জন্যই হয়তো বাঁশ দিয়ে ব্রিজ বানানো হচ্ছে। সাঁকো নয়, ব্রিজই। ব্রিজটার আকৃতি দেখলে মনে হয় এখানে সার্কাস প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হবে। ওমা! বলতে না বলতেই আমাদের মার্টিন স্টেটের জাতির পিতা ইয়ে মানে পলাস, সার্কাস দেখানো শুরু করে দিল! সে এই অর্ধনির্মিত বাঁশের ব্রিজ বেয়ে উঠতে শুরু করল।

এই খোপ থেকে ওই খোপে যায়, ওই খোপ থেকে এই খোপে। আমরা কয়েকজন এই বিপদজনক কাজটা করতে বারণ করলেও, বাকি দুষ্টের হাড্ডিগুলো ওকে আরো উৎসাহ দিচ্ছিল। পলাস এটা কর, ওটা কর! বেশি বাহাদুরি দেখাতে গিয়েই তাল সামলাতে না পেরে ধুপ করে নিচে পড়ে গেল সে।

বাঁশের সেঁতু। সোর্স: জহির

নিচে পড়ে বসেই রইল। কী ভয়াবহ ব্যথাটা যে সে পেয়েছে সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু লজ্জায় বলতেও পারছে না। সে নাকি “ভাবছিল” ব্যথা পাইছে, আসলে পায় নাই! বাকি সবগুলো মিলে তুমুল হাসাহাসি চলছে। আসলে সিচুয়েশনটাই এমন যে হাসি এসে যাচ্ছে। সবাই খাল পেরিয়ে এপারে চলে এলেও সে কোমর ধরে, ওপারেই রয়ে গেল। হাঁটতেও পারছে না বেচারা।

বাঁশের সেঁতুর নিচে আমাদের আড্ডা। সোর্স: বন্ধুবৃত্ত

যাই হোক, আমরা ফিরলাম। বাড়ি ফিরে দেখি জহিরের মা গামলা ভর্তি করে পিঠা বানিয়ে রেখেছে। মালপুয়া, সংসারী ( মাংসের পুর দিয়ে বানানো ঝাল পিঠা) আরো একটা কী পিঠা যেন। পিঠাগুলো এতোই মজার হয়েছে যে সবাই কাড়াকাড়ি করে খেয়ে শেষ করে ফেলেছে।

সংসারী পিঠা। সোর্স: জহির

জুলহাস বলছিল, ওরে নিয়া ইনভার্টেড কমার মধ্যে দিয়ে কিছু যেন লিখি। পোস্ট শেষ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ওরে নিয়ে কিছুই লেখা হলো না। লিখবো কী করে? অন্য সবসময় তো কেবল ইমরান আমাকে পচাতো, এবার ইমরানকেও কয়েক গুনে ছাড়ায় গেছে জুলহাস।

প্রায় সারাটা দিন আমার পিছনেই পড়ে ছিল। এমন পচানি খেয়ে ইনভার্টেড কমাযুক্ত বাক্য লেখা যায় বুঝি? বললাম, মার্টিন স্টেডিয়ামটার বিল পাস কর, তাও করলি না। ওটা করলেও তো কিছু লিখতে পারতাম তোকে নিয়ে!

গ্রামের খেলার মাঠে। সোর্স: বন্ধুবৃত্ত

অনেক কিছুই লিখলাম। কিন্তু কালকের দিনে ঠিক কী পরিমাণ মজা করেছি, এই পোস্ট পড়ে বোঝা যাবে না। ছোট ছোট ফাজলামিগুলো, চাঁদের ধবধবে রুপালি আলোয় আলতো পায়ে হাঁটতে হাঁটতে চিৎকার করে গান গাওয়ার যে অনুভূতি, একে অন্যকে পচিয়ে সবাই মিলে হাসাহাসি – ওগুলো বর্ণনা করে ফুটিয়ে তোলা আমার পক্ষে সম্ভব না।

এতদিন পর সবার সাথে দেখা হয়েছে, আবার ঠিক কবে দেখা হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এমন একটা দিন কাটাবার পর ওদের বিদায় দিতে সত্যিই খুব কষ্ট হচ্ছিল। ইউসুফ, দোস্ত তোকে খুব মিস করেছি। আগামি ট্যুর পর্যন্ত তোদের সবাইকে খুব মিস করব।
ফিচার ইমেজ- জহির

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

১৪০ দিনে ৭ মহাদেশের ৩২টি দেশ ভ্রমণ: দুর্দান্ত এক জাহাজ ভ্রমণের হাতছানি

কাশ্মীরের রোমাঞ্চকর যোজিলা পাস