যে জাদুঘরটি ব্যর্থ প্রেম স্মরণ করে

জাগরেব শহরের পুরাতন অংশে কাছাকাছি দুটি চার্চ আছে। সেন্ট মার্ক আর সেন্ট ক্যাথরিন’স। ক্রোয়েশিয়ার রাজধানীর এই এক চার্চ থেকে অন্য চার্চে যেতে পথে একটি ব্যতিক্রমি যাদুঘর গড়ে উঠেছে। দ্য মিউজিয়াম অব ব্রোকেন রিলেশনশিপস, ভেঙে যাওয়া সম্পর্কের জাদুঘর। জাদুঘরটি ব্যর্থ প্রেম স্মরণ করে।

দ্য মিউজিয়াম অব ব্রোকেন রিলেশনশিপস, ছবি সূত্রঃ brokenships.com

দ্য মিউজিয়াম অব ব্রোকেন রিলেশনশিপসের ছাদে বেশ এক খানা রেস্তোরাঁ আছে। স্থানীয়দের মাঝে বিশেষ সুনাম আছে রেস্তোরাঁর কফির। সপ্তাহে প্রতি শনিবারে ওই চার্চ দুটিতে বর ও কনেরা আসেন। সঙ্গে আসেন বিয়েতে আমন্ত্রিত অতিথিরা। চার্চে বর ও কনে তাদের আসছে দিনগুলোতে পাশাপাশি থাকার প্রতিশ্রুতি করেন। ওই সময় অতিথিরা ব্রোকেন রিলেশনশিপসের ছাদে আয়েশ করে কফির মগে চুমুক দেন। এখানে সম্পর্ক ভাঙা-গড়ার অবস্থাকে এক সঙ্গে খুব কাছে থেকে দেখতে পাওয়া যায়। তখন কোনো চিরচেনা বিভক্ত শক্তিতে আমন্ত্রিত অতিথিদের হৃদয়ে বিয়ের আনন্দের সঙ্গে বেদনার শূন্য স্থান তৈরি করে দ্য মিউজিয়াম অব ব্রোকেন রিলেশনশিপস।


 

ক্রোয়েশিয়ারই এক শিল্পী দম্পতি ‘দ্য মিউজিয়াম অব ব্রোকেন রিলেশনশিপস’ তৈরির প্রথম চিন্তা করেন। চলচ্চিত্র প্রযোজক অলিনকা ভিসতিকা ও ভাস্কর ড্রেজেন গ্রুবিশিচ তাঁদের চার বছরের দাম্পত্য জীবনের অবসান হলে দেখলেন সম্পর্ক ভেঙে গেলে কিছু জিনিস পড়ে থাকে, এগুলো কেউ নিয়েও যায় না। তারা ঠিক করলেন এগুলো দিয়েই এমন এক সংগ্রহশালা শুরু করবেন যা মানুষের ব্যর্থ প্রেম স্মরণ করবে।

সংগ্রহশালার একাংশ, সূত্রঃ brokenships.com

২০১০ সালে জাদুঘরটির সংগ্রহ কাজ শুরু হলে, এটি জাগরেবের প্রথম ব্যক্তি মালিকানাধীন জাদুঘরের স্বীকৃতি পায়। ভিসতিকা বলেন, ‘ছেড়ে দেওয়া কিংবা পরিত্যক্ত জিনিসপত্র রাখার জন্য এটি একটি রূপক স্থান। এখানে কোনো চিহ্ন রাখা মানে হলো সম্পর্কটি ছিল আর তা আপনার কাছে গুরুত্ব রাখতো।’ প্রতিষ্ঠাতারা বিশ্বজোড়া মানুষের দুর্ভাগ্যের নিদর্শন সংগ্রহ করছেন। তেহরানের মরুভূমির কাছের এক অবকাশ যাপন কেন্দ্রের সামনে একটি খরগোশ দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে একটি প্ল্যাকার্ড। প্ল্যাকার্ডটি বলছে, ‘খরগোশটির পৃথিবী সফরের কথা ছিল, কিন্তু সে ইরান ছাড়িয়ে দূরে যেতে পারেনি।’

সাধারণের খুব অসাধারণ হয়ে ওঠা, ছবি সূত্রঃ brokenships.com

আপাতদৃষ্টিতে জাগতিক সব জিনিস দিয়ে দ্য মিউজিয়াম অব ব্রোকেন রিলেশনশিপসের কক্ষগুলো সাজানো হয়েছে। এসব সাধারণ জিনিসগুলোর নিচেই রয়েছে ভেঙে যাওয়া হৃদয় দিয়ে লেখা, কিছু গাঁথা। এই দুইয়ে মিলে জাদুঘরটি শূন্যতার মন্তাজের চূড়ায় পৌঁছে দিতে পারে দর্শনার্থীদের। যেমন বাগান সাজানোর জন্য বসে থাকা একটি বামন পুতুল। সেই পুতুলের নিচে গাঁথা রয়েছে কীভাবে বিমানের রাগান্বিত বাক্যালাপে এক দম্পতির দীর্ঘ ২০ বছরের সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে।

বামন পুতুল, ছবি সূত্রঃ brokenships.com

কিংবা কোনো দম্পতির শেষ চেক বইটি, যা সাক্ষ্য হয়ে রয়েছে গণিকা ও গ্রাহকের গোপন কিন্তু চাঞ্চল্যকর বাক্যালাপের। অথবা সারায়েভোতে ছিন্ন হওয়া প্রথম প্রেমের পত্রটি, যুদ্ধের এক ঝলকে যে প্রেমিক যুগল বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। প্রবেশ পথেই রয়েছে একটি জীর্ণ পতাকা, নিচের দিকে খানিকটা ছেঁড়া। অতিথিদের হেলে-দুলে বেশ স্বাগত জানায় সে। এছাড়া বিভিন্ন গিফট শপে পাওয়া যায় সাধারণ এমন অনেক কিছুই এখানে এসে অসাধারণ হয়ে উঠেছে।

জাদুঘরের রেস্তোরাঁর মতোই ভেতরেও একটি কফি বানানোর এসপ্রেসো মেশিন আছে। মেশিনটি এক দম্পতির দীর্ঘ ২০ বছরের ভালবাসার সাক্ষ্য দেয়। এই মেশিনের নিচে একটি চিরকুটে লিখা আছে, ‘দীর্ঘ সময় এই এসপ্রেসো মেশিনে তার জন্য কফি বানিয়েছি। সে এই কফি ভালোবাসতো। সে আমাকে দীর্ঘ সময় ভালবেসেছে। কফি বানানোর মেশিনটি সেই আমাকে দিয়েছিল। তার পর এক দিন কফিটা তার আর ভালো লাগতো না, ওই এসপ্রেসো মেশিনেরই কফি, যেটা সে আমাকে দিয়েছিল। তাই আমি ওটাকে বেজমেন্টে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। মেশিনটাকে আর দেখতে চাইনি। কিন্তু এর পর থেকে প্রতিদিনই আমাকে বেজমেন্টে যেতে হয়েছে।’

এসপ্রেসো মেশিন, ছবি সূত্রঃ brokenships.com

কিংবা একটি পোস্টকার্ডের গল্প। অসীমের মাঝে ক্ষুদ্র দুটি মানুষ এক অপরের চোখে হারিয়ে গেছেন। আর মেয়েটির লাল জামা যেন চিত্রকরের মনের রঙে আঁকা। পোস্ট কার্ডের চিরকুটটিতে লেখা, ‘আমি আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানের ৭০ বছর বয়সী নারী। আমি সেই ১৯৬৭ সালে জাগরেবে গিয়েছিলাম আর শহরটি আমার খুবই প্রিয়। আমি স্থানীয় পত্রিকাতে দ্য মিউজিয়াম অব ব্রোকেন রিলেশনশিপসের কথা প্রথম জানতে পারি। এটা জানার পর আমি একই সঙ্গে আনন্দিত ও ব্যথিত হয়েছিলাম। পোস্ট কার্ডটি আমাদের প্রতিবেশীর ছেলেটি অনেক আগে দরজার নিচ দিয়ে আমাকে দিয়েছিল। আমাদের তিন বছরের ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল। আর্মেনীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী তার বাবা-মা আমার হাত চাইতে বাসায় আসেন। আমার মা-বাবা তাদের প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন যে তাদের ছেলে আমার যোগ্য নয়। তারা ক্ষোভ ব্যক্ত করে হতাশ হয়ে ফিরে যান। ওই দিন বিকেলেই তাদের ছেলেটি একটা খাড়া বাঁধের উপর থেকে গাড়ি চালিয়ে পড়ে যায়।’

পোস্টকার্ড, ছবি সূত্রঃ brokenships.com

এভাবেই পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে জিনিসগুলো এখানে এসে অতিবাহিত দিনগুলোর ব্যর্থ পারিবারিক বন্ধনের বিভিন্ন দৃষ্টিকোণের প্রতিফলন ঘটিয়েছে। ভিসতিকা বলেন, ‘ঐতিহাসিক জিনিসের মন্দিরের মতো জাদুঘরের ধারণার রূপান্তর ঘটিয়েছি আমরা। জাদুঘর আমার-আপনার সম্পর্কেও হতে পারে। আমরা এখানে এক রকম গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ যোগ করে ভালোবাসাকে পৃথিবী চেনার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছি।’ ভিসতিকা এমন জাদুঘরের জন্য আদর্শ স্থান হিসেবে নির্বাচন করেছেন ক্রোয়েশীয় বিমূর্ত চিত্রশিল্পী কাউন্ট কুলমারের পূর্বের প্রাসাদটি। এখানে বিশেষ ফানিকুলার ট্রেন প্রতিদিন সকালে এসে পৌঁছে। তাছাড়া শহরের নিচু অংশ থেকে শুরু করে পাহাড় পর্যন্ত অন্যান্য সাংস্কৃতিক বিষয় তো রয়েছেই।

মিউজিয়ামের দর্শনার্থীরা, ছবি সূত্রঃ brokenships.com

গেল বছর এখানে এক লাখের বেশি মানুষ এসেছেন। এখানে আসলে অনন্য এক অনুভূতি আপনাকে স্পর্শ করবে। ভিসতিকা বলেন, ‘পাবলিক স্পেসে এটি একটি অন্তরঙ্গ অভিজ্ঞতা। আর এটি অন্য কোথাও পাবেন না, দুষ্প্রাপ্য বলতে পারেন।’

ফিচার ইমেজ- imgur.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ইন্দোনেশিয়ার একটি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি: মাউন্ট আগুং

বান্দরবানের স্বপ্নকথন: আবার ফিরে আসা নাফাখুমে